বরিশাল বাংলাদেশের
দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম
ঐতিহ্যবাহী জেলা।
বরিশাল বিভাগীয়
সদরের এ
জেলার দক্ষিণে
বরগুনা ও
পটুয়াখালী জেলা,
উত্তরে গোপালগঞ্জ,
মাদারীপুর ও
শরীয়তপুর, পশ্চিমে
পিরোজপুর, ঝালকাঠি
ও গোপালগঞ্জ
এবং পূর্বে
লক্ষ্মীপুর ও
ভোলা জেলা
অবস্থিত। জেলাটির
পুরনো নাম
চন্দ্রদ্বীপ। প্রাচীন
চন্দ্রদ্বীপ নামক
জেলাটি সুলতানি,
মোগল ও
ব্রিটিশ শাসন
আমলের বহু
কীর্তি এবং
কৃতিত্বের ধারক
ও বাহক।
খাদ্যশস্য ও
মত্স্য উৎপাদনের
অন্যতম মূল
উৎস বরিশালকে
বাংলার ভেনিস
বলা হয়।
বরিশাল বাংলাদেশের
সমাজ, সংস্কৃতি
ও রাজনীতিতে
এক অনন্য
স্থান দখল
করে নিয়েছে।
জননেতা শের-ই-বাংলা
এ কে
ফজলুল হক,
কবি জীবনানন্দ
দাশ, চারণকবি
মুকুন্দ দাস,
কবি সুফিয়া
কামালসহ অনেক
কীর্তিমান ব্যক্তি
বরিশালে জন্মগ্রহণ
করেন। ১০টি
উপজেলা নিয়ে
গঠিত এ
জেলায় রয়েছে
অনেক ঐতিহ্যের
স্মারক।
বরিশাল জিলা
স্কুল
জিলা স্কুল এশিয়া মহাদেশের অন্যতম প্রাচীন, দক্ষিণবঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ এবং দেশের দ্বিতীয় প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ঐতিহ্যবাহী এই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা বরিশাল জেলার জজ ও ম্যাজিস্ট্রেট মি এন ডব্লিউ গ্যারেট। ১৮২৯ সালে তিনি ‘বরিশাল ইংলিশ স্কুল’ নামে এটি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৫৩ সালে ব্রিটিশ সরকার এর ব্যয়ভার ও পরিচালনার দায়িত্ব নেয়। তখন থেকে নামকরণ করা হয় বরিশাল জিলা স্কুল। সে সময় স্কুলের ছাত্রসংখ্যা ছিল প্রায় ৬০০। গড়ে তোলা হয় তিনটি ভবন। বরিশাল শহরে কয়েকটি বেসরকারি স্কুলের শিক্ষকদের আন্দোলনের কারণে ১৮৯২ সালে সরকার জিলা স্কুলকে বেসরকারি ঘোষণা করা হয়। সায়েস্তাবাদের জমিদার সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন বাংলার গভর্নরকে স্কুলের জন্য অর্থ ও জমি প্রদানের আশ্বাস দেয়ার পর ১৯০৬ সালে পুনরায় এটিকে জাতীয়করণ করা হয়।
ব্রজমোহন (বিএম)
কলেজ
বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ও প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিএম কলেজ। ১৮৮৯ সালে প্রখ্যাত সমাজসেবক, রাজনীতিবিদ ও শিক্ষানুরাগী অশ্বিনীকুমার দত্ত কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেন। তখন কলেজটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ছিল। সে সময়ে এ কলেজের মান এতই উন্নত ছিল যে অনেকে একে দক্ষিণ বাংলার অক্সফোর্ড বলে আখ্যায়িত করেন। ১৯৬৫ সালে কলেজটির জাতীয়করণ করা হয় ও বর্তমানে কলেজটি বাংলাদেশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত। কলেজটিতে স্নাতক (সম্মান) শ্রেণীতে ২২টি বিষয়ে ও স্নাতকোত্তর শ্রেণীতে ২১টি বিষয়ে পাঠদান করা হয়। কলেজে ছাত্রদের জন্য তিনটি এবং মেয়েদের জন্য চারতলা ভবনের একটি হোস্টেল রয়েছে। কলেজের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে মোট বইয়ের সংখ্যা ৪০ হাজার। এখানে একটি বাণিজ্য ভবন, দুটি কলাভবন, একটি অডিটোরিয়াম, চারটি বিজ্ঞান ভবন ও তিনটি খেলার মাঠ রয়েছে। এছাড়া দুই প্রান্তে দুটি দিঘী কলেজের সৌন্দর্যকে করে তুলেছে মনোমুগ্ধকর।
বিএম স্কুল
বরিশালের
ঐতিহাসিক বিএম
স্কুলের নাম
আগে ছিল
ব্রজমোহন ইনস্টিটিউট।
পরে এর
নাম হয়
বিএম স্কুল
বা ব্রজমোহন
স্কুল। ১৮৮৪
সালে মহাত্মা
অশ্বিনীকুমার দত্তের
উদ্যোগে প্রতিষ্ঠানটি
প্রতিষ্ঠা করা
হয়। তিনি
পিতার নামে
বিদ্যালয়ের নাম
রাখলেন ব্রজমোহন
ইনস্টিটিউট। ১৮৮৪
সালের ২৭
জুন ৮৪
জন ছাত্র
নিয়ে বিদ্যালয়ের
কাজ শুরু
হয়। তখন
বরিশালে আরেকটি
স্কুল এত
প্রয়োজনীয় ছিল
যে দ্বিতীয়
দিনেই স্কুলের
ছাত্রসংখ্যা দাঁড়ায়
১১৪, তৃতীয়
দিনে দাঁড়ায়
১৭৯ এবং
চতুর্থ দিনে
২৩৪। ১৮৮৫
সালে ৩১
মার্চ ছাত্রসংখ্যা
দাঁড়ায় ৩৭৫
এবং ১৮৮৬
সালের ৩১
মার্চ ছাত্র
ছিল ৪৪২
জন। ১৯০৫
সালে বঙ্গভঙ্গ
রদ আন্দোলনে
অশ্বিনীকুমার দত্তের
আহ্বানে ব্রজমোহন
বিদ্যালয় ও
ব্রজমোহন কলেজের
ছাত্র ও
শিক্ষকরা ঝাঁপিয়ে
পড়ে।
বরিশাল পুরনো
কালেক্টরেট ভবন
বরিশাল
পুরনো কালেক্টরেট
ভবনটি নিম্ন
গাঙ্গেয় অববাহিকায়
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক
শাসন নামে
নির্মিত প্রথম
প্রশাসনিক ভবন
বলে মনে
করা হয়।
১৮৯১ সালে
পুরনো কালেক্টরেট
ভবন নামের
ইমারতটি নির্মাণ
করা হয়।
১৯৮৪ সালে
ভবনটি পরিত্যক্ত
ঘোষণা করা
হয়। ২০০৩
সাল থেকে
বাংলাদেশ সরকার
ভবনটিকে পুরাকীর্তি
হিসেবে সংরক্ষণ
করছে। ২০০৫
সালে ভবনটিকে
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের
কাছে হস্তান্তর
করা হয়।
পরে সংস্কার
করে এটিকে
বরিশাল বিভাগীয়
জাদুঘর হিসেবে
উদ্বোধন করা
হয় ২০১৫
সালের ৮
জুন।
মিয়াবাড়ি মসজিদ
বরিশাল
অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী
এ মসজিদে
ঐতিহাসিক কোনো
শিলালিপি পাওয়া
যায়নি। ঐতিহাসিকদের
মতে, সম্ভবত
খ্রিস্টীয় আঠার
শতকের শুরুর
দিকে মসজিদটি
নির্মিত হয়েছিল।
জনশ্রুতি রয়েছে,
মসজিদটির মূল
প্রতিষ্ঠাতা হায়াত
মাহমুদ নামক
একজন ব্যক্তি।
তিনি ব্রিটিশ
শাসন আমলের
শুরুর দিকে
ব্রিটিশ শাসনের
বিরুদ্ধে বিদ্রোহ
করার কারণে
প্রিন্স অব
ওয়েলস দ্বীপে
নির্বাসিত হয়েছিলেন।
এ নির্বাসনকালে
তিনি তার
উমেদপুরের জমিদারি
হারান। ১৬
বছর পরে
তিনি নির্বাসন
থেকে দেশে
ফিরে আসেন
এবং দোতলাবিশিষ্ট
মসজিদটি নির্মাণ
এবং দুটি
দিঘী খনন
করেন।
মসজিদটির স্থাপত্যশৈলীর
সঙ্গে পুরান
ঢাকায় শায়েস্তা
খান কর্তৃক
নির্মিত মসজিদের
কিছুটা মিল
খুঁজে পাওয়া
যায়। মসজিদটির
পূর্ব দিকের
দেয়ালে তিনটি
প্রবেশপথ। প্রবেশপথগুলোর
প্রত্যেকটিতে দুটি
করে খিলান
রয়েছে। বাইরের
খিলানটি বহুপকার
নকশাযুক্ত (muftifoil)
ও অপেক্ষাকৃত
উঁচু এবং
ভেতরের খিলানটি
শিখবিশিষ্ট (lancet)
বা গোথিক
(gothic)।
মসজিদটির উত্তর
ও দক্ষিণ
দেয়ালে একটি
করে এরূপ
প্রবেশপথের মতো
জানালা রয়েছে।
মসজিদটির অভ্যন্তরের
পশ্চিম দেয়ালে
তিনটি মিহরাব
রয়েছে। শিখরবিশিষ্ট
খিলান নকশার
মিহরাব তিনটির
মধ্যে মাঝের
মিহরাবটি অপেক্ষাকৃত
বড়। এছাড়া
মসজিদটির ভেতরের
দেয়ালে একাধিক
কুলঙ্গি রয়েছে।
মসজিদটির উপরে
রয়েছে অলংকৃত
চড়াবিশিষ্ট (finial)
তিনটি গম্বুজ।
বড় গম্বুজ
তিনটির চারদিকে
অর্থাৎ ছাদের
চারদিক ঘিরে
আটটি বড়
ও ১৬টি
ছোট আকারের
মিনারসহ সর্বমোট
২৪টি মিনার
রয়েছে। এ
মসজিদের নিচতলার
কক্ষগুলোয় মাদ্রাসার
শিক্ষা কার্যক্রম
পরিচালিত হয়।
মুসলিম স্থাপত্য
নিদর্শনটি সরকারের
একটি সংরক্ষিত
পুরাকীর্তি হিসেবে
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের
তালিকাভুক্ত ও
তত্ত্বাবধানে রয়েছে।
অক্সফোর্ড মিশন
বা এপিফানি গির্জা
১৮৮৯
সালে ইংল্যান্ডের
আর্চবিশপের আদেশে
অ্যাংলিক্যান মিশনারিজের
একটি দল
ভারতের মাদ্রাজ
আগমন করে।
তাদের একটি
দল ভারতের
মাদ্রাজ থেকে
বাংলাদেশে আগমন
করে এবং
বরিশাল শহরে
মিশনের কাজ
শুরু করে।
১৯০৩ সালে
এ মিশনের
গির্জাটির নির্মাণকাজ
শুরু হয়ে
১৯০৭ সালে
শেষ হয়।
জানা যায়,
সিস্টার এডিথর
স্কেচ ও
নকশা অনুসারে
ফাদার স্ট্রং
গির্জা ভবনটির
নকশা অংকন
করেন। গির্জাটি
নির্মাণকাজের প্রধান
প্রকৌশলী ছিলেন
ডিরিক উগলাস
নামে একজন
ব্রিটিশ।
অক্সফোর্ড মিশন
গির্জাটি গ্রিক
স্থাপত্য শিল্পের
এক অপূর্ব
নিদর্শন। একতলাবিশিষ্ট
গির্জাটি প্রায়
১৫ মিটার
উঁচু। পোড়ামাটির
ইট দিয়ে
নির্মিত গির্জাটি
৪০টি খিলানের
ওপর ভর
করে দাঁড়িয়ে
আছে। বিশাল
আকৃতির গির্জাটির
রয়েছে নান্দনিক
একটি প্রার্থনা
হল। কাঠ
দিয়ে আচ্ছাদিত
এ প্রার্থনা
হলের মেঝেতে
মার্বেল পাথরের
টালি ব্যবহার
করা হয়েছে।
প্রার্থনা হলের
বেদির ওপরে
বড় আকারের
একটি ক্রস
রয়েছে। গির্জার
ভেতর ও
বাইরের দেয়ালগুলো
লাল রঙ
দিয়ে রঞ্জিত
করা হয়েছে।
তবে গির্জার
ভেতরের স্তম্ভের
গায়ে রয়েছে
সাদা রঙ।
উচ্চতার বিচারে
এ গির্জাকে
এশিয়া মহাদেশের
দ্বিতীয় বৃহত্তম
ধরা হয়।
এছাড়া উঁচু
সুরক্ষা প্রাচীরবেষ্টিত
এ গির্জার
আশপাশে রয়েছে
ছোট-বড়
মিলিয়ে প্রায়
১৩টি পুকুর,
ছাত্র হোস্টেল,
ফাদার ও
সিস্টারদের জন্য
আবাসন, লাইব্রেরি,
হাসপাতাল ও
বিদ্যালয়।
লাখুটিয়ার রায়
জমিদার বাড়ি
আনুমানিক
খ্রিস্টীয় উনিশ
শতকে রাজচন্দ্র
রায় কর্তৃক
লাখুটিয়ার রায়
জমিদার বাড়িটি
নির্মাণ করেন।
রূপচন্দ্র রায়
নামক জনৈক
ব্যক্তি এ
জমিদার বংশের
আদি পুরুষ।
রূপচন্দ্র আনুমানিক
খ্রিস্টীয় ষোল-সতের
শতকে লাখুটিয়া
গ্রামে বসতি
স্থাপন করেন।
পরে তার
পৌত্র রাজচন্দ্র
খুটিয়ায় এ
জমিদারি প্রতিষ্ঠা
করেন। বর্তমানে
এ জমিদার
বাড়িতে বাংলাদেশ
কৃষি উন্নয়ন
করপোরেশন (বিএডিসি)
অবস্থিত।
এছাড়া এ
জেলোর গৌরনদীতে
নয় গম্বুজবিশিষ্ট
কসবা মসজিদ,
তিন গম্বুজবিশিষ্ট
কমলাপুর মসজিদ,
শিখরি মন্দির
শিল্পের নিদর্শন
মাহিলাড়া সরকার
মঠ, বাকেরগঞ্জ
উপজেলায় নসরত
গাজী জামে
মসজিদ, কলসকাঠি
জমিদার বাড়ি,
হিজলার পঞ্চরত্নখ্যাত
বড়দাকান্ত মিত্র
মঠ, মেহেন্দিগঞ্জের
দুর্গবেষ্টিত চর
এককরিয়ার পাকাবাড়ি,
উলানিয়ার জমিদার
বাড়িসহ অসংখ্য
ঐতিহাসিক নির্দশন
রয়েছে এ
বরিশালে।
এম মিরাজ হোসাইন: সাংবাদিক






