বর্তমানে চট্টগ্রাম বিভাগের একটি জেলা নোয়াখালী। নুরুল ইসলাম খান রচিত ‘বাংলাদেশ ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার্স-নোয়াখালি’ থেকে জানা যায়, ১৮২২ সালের ২৯ মার্চ তৎকালীন গভর্নর জেনারেলের আদেশে এ জেলা গঠিত হয়। ১৮৬৮ সাল থেকে এ জেলা নোয়াখালী নামে পরিচিতি লাভ করে। একেএম মক্রমবিল্ল্যা চৌধুরী ও অশ্বিনীকুমার সোম তত্ত্বনিধি প্রণীত ‘নোয়াখালির ইতিহাস’ থেকে জেলাটির নামকরণের একটি ইতিহাস জানা যায়। বইটি থেকে পাওয়া তথ্যানুসারে, নোয়াখালী শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া খালের নামানুসারে জেলাটির নামকরণ হয়েছে। খালটির নাম নতুন খাল। কিন্তু নোয়াখালী অঞ্চলের স্থানীয় উচ্চারণে নতুনকে ‘নোয়া’ বলা হয়। সে কারণে নতুন খাল হয়ে যায় নোয়াখাল। আর সেখান থেকেই নোয়াখালী। অবশ্য এমন নামকরণে ফার্সি ভাষার প্রভাব থাকাও বিচিত্র নয়। ফার্সি ভাষায় নতুন খালকে বলা হয় ‘নওখাল’। সেখান থেকেও ‘নোয়াখালি’ নামের উদ্ভব ঘটার দাবি করেছেন অনেক ঐতিহাসিক। নোয়াখালীর নামকরণ প্রসঙ্গে ‘বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন’-এ উল্লেখ আছে, ‘ইতিহাসবিদদের মতে, একবার ত্রিপুরার পাহাড় থেকে প্রবাহিত ডাকাতিয়া নদীর পানিতে ভুলুয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চল ভয়াবহভাবে প্লাবিত হয় ও ফসলি জমির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় হিসেবে ১৬৬০ সালে একটি বিশাল খাল খনন করা হয়, যা পানির প্রবাহকে ডাকাতিয়া নদী হতে রামগঞ্জ, সোনাইমুড়ি ও চৌমুহনী হয়ে মেঘনা ও ফেনী নদীর দিকে প্রবাহিত করে। এ বিশাল নতুন খালকে নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায় নোয়া (নতুন) খাল বলা হতো, ফলে অঞ্চলটি একসময়ে লোকের মুখে মুখে পরিবর্তিত হয়ে নোয়াখালী হিসেবে পরিচিতি লাভ করতে শুরু করে।’

নোয়াখালী জেলার উত্তরে কুমিল্লা, পূর্বে  চট্টগ্রাম জেলা ও সন্দ্বীপ প্রণালি, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর ও পশ্চিমে মেঘনা নদী। ‘বাংলাদেশ ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার্স-নোয়াখালি’র তথ্যানুসারে, প্রাথমিকভাবে তৎকালীন ত্রিপুরা জেলার সুধারাম, বেগমগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর, মুনিয়া ও ফাঁড়ি থানা, চট্টগ্রাম জেলার হাতিয়া, সন্দ্বীপ ও বামনি থানা এবং বাকেরগঞ্জ (বর্তমান বরিশাল) জেলার দক্ষিণ শাহবাজপুর (বর্তমান ভোলা) থানা নিয়ে নোয়াখালী জেলা গঠিত হয়েছিল। ১৮২৩ সালে ত্রিপুরার (বর্তমান কুমিল্লা) এলাহাবাদ পরগনা নতুন জেলাটির অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে ১৮৬৯ সালের ২৭ এপ্রিল জারীকৃত এক বিজ্ঞপ্তি অনুসারে, সংযুক্ত পরগনাসহ দক্ষিণ শাহবাজপুর তথা ভোলাকে পুনরায় বাকেরগঞ্জের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৯৫৫ সালে সন্দ্বীপকে পুনরায় চট্টগ্রাম জেলায় ফিরিয়ে আনা হয়। কালের পরিক্রমায় এসব পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নোয়াখালী জেলা বর্তমান রূপ লাভ করে। ‘বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন’ অনুসারে, বর্তমানে নোয়খালী জেলায় নয়টি উপজেলা, নয়টি থানা, আটটি পৌরসভা, ৯৩টি ইউনিয়ন, ৮৮২টি মৌজা, ৯৬৭টি গ্রাম ও ছয়টি সংসদীয় আসন আছে। উপজেলাগুলো হলো কবিরহাট, কোম্পানীগঞ্জ, চাটখিল, নোয়াখালী সদর, বেগমগঞ্জ, সুবর্ণচর, সেনবাগ, সোনাইমুড়ি, হাতিয়া। প্রতিটি উপজেলায় একই নামে একটি করে প্রশাসনিক থানা অবস্থিত। পৌরসভাগুলোর নাম হলো কবিরহাট, বসুরহাট, চাটখিল, নোয়াখালী, চৌমুহনী, সেনবাগ, সোনাইমুড়ি ও হাতিয়া। জাতীয় সংসদের ২৬৮-২৭৩ নম্বর আসন নোয়াখালী জেলায় অবস্থিত। চাটখিল ও সোনাইমুড়ি উপজেলা (বারগাঁও, অম্বরনগর ও নাটেশ্বর ইউনিয়ন ব্যতীত) নিয়ে নোয়াখালী-১ আসন। সোনাইমুড়ি উপজেলার বারগাঁও, অম্বরনগর ও নাটেশ্বর ইউনিয়ন এবং সেনবাগ উপজেলা নিয়ে নোয়াখালী-২ আসন। নোয়াখালী-৩ আসন বেগমগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত। নোয়াখালী-৪ আসনে আছে নোয়াখালী সদর ও সুবর্ণচর উপজেলা। কবিরহাট ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা দুটির সমন্বয়ে নোয়াখালী-৫ আসন। নোয়াখালী-৬ আসন হাতিয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত।

নোয়াখালীর প্রাচীন নাম ভুলুয়া। এ নামকরণের সঙ্গে একটি কিংবদন্তি জড়িত। কিংবদন্তি অনুসারে, এ রাজ্যের গোড়াপত্তন করেন বিশ্বম্ভর শূর। তিনি মিথিলার রাজকুমার ছিলেন। তেরো শতকের গোড়ার দিকে তিনি চন্দ্রনাথ তীর্থে আসেন। তিনি জলপথে যাত্রা করেছিলেন। কিন্তু ঘন কুয়াশার কারণে নাবিকরা দিকভ্রান্ত হন। তারা পথ ভুলে বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী একটি দ্বীপে পৌঁছান। রাতে বিশ্বম্ভর শূর বারাহী দেবীকে স্বপ্নে দেখেন। দেবী জানান, তিনি অদূরেই সমুদ্রের পানিতে ডুবে আছেন। সেখান থেকে তুলে যথাযথ স্থানে স্থাপন করে পূজা করতে বিশ্বম্ভরকে আদেশ দেন বারাহী দেবী। বিশ্বম্ভর সে আদেশ পালন করলে তার রাজ্যলাভ হবে বলে দেবী তাকে আশীর্বাদ করেন। বিশ্বম্ভর শূর দেবীকে সমুদ্রগর্ভ থেকে তুলে এনে পূজা করেন। তবে অতিরিক্ত কুয়াশা থাকায় দিগনির্ণয় করতে না পেরে দেবীকে পূর্বমুখী করে স্থাপন করা হয়। এটি রীতিবিরুদ্ধ। সাধারণত দক্ষিণ বা পশ্চিমমুখী করে দেব-দেবী প্রতিষ্ঠা করা নিয়ম। দেবীকে সন্তুষ্ট করার জন্য ছাগল বলি দেন বিশ্বম্ভর। সেখানেও ভুল। পশ্চিমমুখী করে ছাগলটিকে বলি দেয়া হয়। রাতের আঁধারে এসব ভুল কারো নজরে আসে না। কিন্তু সূর্যোদয়ের পর ঘন কুয়াশার আবরণ সরে গেলে সবাই ভুল বুঝতে পারেন। তখন তারা ‘ভুল হুয়া’, ‘ভুল হুয়া’ বলে সমস্বরে চিৎকার করে ওঠেন। এ কিংবদন্তির উল্লেখ করে বসন্তকুমার সেনগুপ্ত তার ‘ভুলুয়া’ নামক প্রবন্ধে লেখেন, ‘এই “ভুল হুয়া” শব্দ হইতেই “ভুলুয়া” নামের উত্পত্তি। কালক্রমে বিশ্বম্ভর শূরের প্রতিষ্ঠিত নবীন রাজ্য “ভুলুয়া” নামে অভিহিত হয়। অদ্যাপি “ভুলুয়া” প্রদেশে বহু স্থানে পশ্চিমাস্য করিয়া ছাগবলি দিবার ব্যবস্থা আছে।’ সুরেন্দ্রমোহন বসুর ‘ভুলুয়া রাজবংশ’ নামক প্রবন্ধেও এ কিংবদন্তির উল্লেখ আছে। ‘বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন’ থেকে জানা যায়, ১৭৮৭ সালে সমগ্র বাংলাদেশকে ১৪টি জেলায় ভাগ করা হয়। জেলাগুলোর অন্যতম ছিল ভুলুয়া। ১৭৯২ সালে ত্রিপুরা নামে একটি নতুন জেলা গঠন করে ভুলুয়াকে তার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৮২২ সালে ভুলুয়া পুনরায় স্বতন্ত্র জেলার মর্যাদা ফিরে পায়। তৎকালীন সরকারি নথিপত্রে ‘জেলা ভুলুয়া’র উল্লেখ পাওয়া যায়।

নোয়াখালীর প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না। তা অধিকতর গবেষণার দাবি রাখে। এ প্রসঙ্গে ‘নোয়াখালির ইতিহাস’ বইয়ের দ্বিতীয় খণ্ডের প্রথম পরিচ্ছেদের শুরুতে উল্লেখ আছে, ‘নোয়াখালি জেলার প্রাচীন ইতিহাস ঘোর তমসাচ্ছন্ন। ইহার কোন লিখিত প্রাচীন ইতিবৃত্তমূলক পুস্তক না থাকায় ধারাবাহিক বিবরণ সঙ্কলন সহজসাধ্য নহে।’ তবে প্রাচীন যুগে এ অঞ্চলে হিন্দু ও বৌদ্ধ নৃপতিদের রাজত্ব ছিল বলে বইটিতে উল্লেখ আছে। মধ্যযুগ হতে নোয়াখালী অঞ্চলের ইতিহাস বিস্তারিত জানা যায়। আগেই আমরা মিথিলাগত রাজকুমার বিশ্বম্ভর শূর ও বারাহী দেবীর কিংবদন্তি উল্লেখ করেছি। মুসলমান সেনাপতি বখতিয়ার খিলজির বাংলা আক্রমণ ও বিশ্বম্ভর শূরের ভুলুয়া রাজ্য প্রতিষ্ঠা একই সময়ে সংঘটিত হয়েছে বলে ঐতিহাসিকদের দাবি। এ প্রসঙ্গে সুরেন্দ্রমোহন বসু ‘ভুলুয়া রাজবংশ’ নামক প্রবন্ধে লেখেন, ‘বঙ্গোপসাগরের উত্তর পূর্ব প্রান্তস্থিত দ্বীপপুঞ্জের সমাহারে ভুলুয়া পরগনার সৃষ্টি হয়। ... জনশ্রুতি আছে যে ভুলুয়ার শূর রাজবংশ জাতিতে ক্ষত্রিয় ছিলেন।’ বিশ্বম্ভর শূর ছিলেন এ রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা। তবে কালক্রমে বিশ্বম্ভরের উত্তরসূরিরা ত্রিপুরা রাজ্যের বশ্যতা স্বীকার করে নিতে বাধ্য হন। ত্রিপুরার সামন্ত শ্রেণীতে তারা ‘সর্বপ্রধান’ উপাধিতে পরিচিত ছিলেন। ত্রিপুরার নৃপতিদের রাজ্যাভিষেককালে ভুলুয়ার রাজারা তাদের কপালে রাজটীকা দিতেন। বিশ্বম্ভর শূরের চার পুত্র—গণপতি, মনোহর, হেমন্ত ও দামোদর। বিশ্বম্ভর শূরের মৃত্যুর পর তার গণপতি ‘রায়’ উপাধি ধারণ করে সিংহাসনে আরোহণ করেন। গণপতি রায়েরই এক উত্তর পুরুষ রাজা লক্ষ্মণমাণিক্য রায় বাংলার বারোভূঁইয়াদের অন্যতম ছিলেন।

১২৭৫ সালে দিল্লির সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবন বাংলার শাসনকর্তা হিসেবে মালিক তুগ্রলকে নিয়োগ দেন। এ সময় সর্বপ্রথম মুসলমানরা নোয়খালী অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেন। ত্রিপুরার তৎকালীন রাজা রত্নফা তুগ্রলের বশ্যতা মেনে নেন। তখন ভুলুয়ার রাজা ছিলেন শূরানন্দ। তুগ্রল তাকে ‘খান’ উপাধিতে ভূষিত করেন। তবে এ সময় ভুলুয়ায় মুসলমানদের রাজত্ব নির্বিঘ্ন ছিল না। বিভিন্ন সময়ে ত্রিপুরা ও আরাকান রাজাদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হতে হতো মুসলমান শাসকদের। কালক্রমে ইলিয়াস শাহী বংশের প্রতিষ্ঠাতা সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের পূর্ববঙ্গ জয়ের পর ভুলুয়ায় মুসলমানরা নিরঙ্কুশ আধিপত্য অর্জন করেন।

 

নিজাম আশ শামস: লেখক ও অনুবাদক