নোয়াখালী জিলা স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৮৫০ সালে। সময়ের স্রোতে ভাসতে ভাসতে পার করেছে ১৭৩ বছর। আয়ারল্যান্ডের সরকারি কর্মকর্তা জোনস নোয়াখালীর পুরনো শহরে (সুধারাম) জিলা স্কুলটি নির্মাণ করেন। প্রথম তিন বছর বেসরকারিভাবে স্কুলের কার্যক্রম চলতে থাকে। তিন বছর পর তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার স্কুলটিকে সরকারি করে নেয়।

আঠারো শতকে ব্রিটিশ সরকার ভারতবর্ষের বেশকিছু জেলায় সরকারিভাবে স্কুল প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করে। এগুলোর মধ্যে বর্তমানে বাংলাদেশে ১৬টি ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ১১টি জিলা স্কুল রয়েছে। এর মধ্যে নোয়াখালী জিলা স্কুল অন্যতম।

একটি সুপরিকল্পিত নগর হিসেবে গড়ে ওঠে নোয়াখালী। পরবর্তী সময়ে যা পরিণত হয়েছে ঐতিহাসিক নগরীতে। ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে পর্তুগিজ, স্পেনীয়, ইংরেজ ও আরবীয় স্থাপত্যের বহু ইমারত ও ভবন। নোয়াখালী টাউন হল ছিল জার্মান, গ্রিক ও রোম সভ্যতার মিশ্রণে অপূর্ব স্থাপত্যকলার নিদর্শন। ছিল ঘোড়দৌড়ের মাঠ। ছিল কালেক্টরেট ভবন, জজকোর্ট, পুলিশ লাইন, জেলখানা, হাসপাতাল, মসজিদ, মন্দির, গির্জা, স্কুল, মাদরাসা। ছিল সুপ্রশস্ত রাস্তা। শহরে যানবাহনের মধ্যে ছিল ঘোড়ার গাড়ি। সুপ্রশস্ত রাস্তার দুধারে ছিল নয়নাভিরাম ঝাউ বীথিকা। শহরজুড়ে ছিল নানা ফল আর সুবৃহৎ বৃক্ষের সাজানো স্বর্গীয় বাগানের মতো উদ্যান। একসময়ের কোলাহলময় ছিমছাম নোয়াখালী শহর, হাজার বছর ধরে তিলে তিলে গড়ে ওঠা তিলোত্তমা এ শহর ২০০ বছর ধরে ভাঙাগড়ার খেলা খেলে শেষবারে যেন হঠাৎই একেবারে এক ঝাপটায় চিরতরে হারিয়ে গেল।

নোয়াখালী শহরের ইতিহাস ভাঙাগড়ার ইতিহাস, সে ইতিহাসের সঙ্গে মিশে আছে জিলা স্কুল। কথায় বলে, ‘ভাঙাগড়া চোরাবালি, তার নাম নোয়াখালী’। এখানকার গত ২০০ বছরের ইতিহাস হচ্ছে ভাঙাগড়ার ইতিহাস। সেই সঙ্গে নোয়াখালী জিলা স্কুলের ইতিহাসকে ভাঙাগড়ার ইতিহাসের অবিচ্ছিন্ন কিংবা পরিপূরক বলা যায়। এ স্কুলের ইতিহাস ধ্বংসাবশেষ থেকে বারবার ঘুরে দাঁড়ানোর ইতিহাস।

শত বছর আগে একটু ঘুরে আসা যাক। জেলার সর্বদক্ষিণের রেলস্টেশন সোনাপুরের মাইলখানেক দক্ষিণে ছিল তখনকার জেলা সদর সুধারাম। সেখানেই ছিল নোয়াখালী জিলা স্কুল। ১৯৪৮ সালের আগ পর্যন্ত বহুবার মেঘনার গর্ভে ঠাঁই নিয়েছে এ স্কুল। ১৯২০ সালে স্কুলটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। জেলা সদর সুধারামের মতো তখনকার জিলা স্কুলও ছিল ঐতিহ্যের, ইতিহাসের ও সর্বোপরি গর্বেরও। এখন তা ঠাঁই নিয়েছে স্মৃতির পাতায়।

নদীভাঙনের ফলে জেলার মতো জিলা স্কুলও বারবার স্থান বদলিয়েছে, ফলে এর প্রথম ১০০ বছরের নথিগুলো মিশে আছে মেঘনার বুকে। জিলা স্কুলের শতবর্ষের ইতিহাস এখনো নিজের গর্ভে রেখে দিয়েছে রাক্ষসী মেঘনা।

১৯২১ সালে সোনাপুরের দক্ষিণে মহব্বতপুর গ্রামের পূর্ব প্রান্তে মন্তিয়ার ঘোনায় নোয়াখালী জিলা স্কুল স্থানান্তর করা হয়। নতুন জায়গায় এবার দুই বছরের বেশি টিকতে পারেনি। সেই নদীভাঙনের ফলে আবারো জিলা স্কুল নদীগর্ভে হারিয়ে যায়। এরপর ১৯২৩ সালের ১ জানুয়ারি জিলা স্কুলকে আরকে জুবিলি স্কুলে স্থানান্তর করা হয়।

আরকে জুবিলি স্কুলের ইতিহাসও কম কৌতূহলোদ্দীপক নয়। রায় রাজকুমার দত্ত বাহাদুর স্কুলটি ১৯১২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন। তখন স্কুলের ছাউনি ছিল টিনের তৈরি। স্কুলে দুই ছাত্র বজ্রাঘাতে মারা গেলে তিনি স্কুলটি পাকা দালান করে দেন। ১৯২৩ সালে জিলা স্কুল এখানে স্থানান্তরিত হলে নতুন স্কুলের নামকরণ করা হয় আরকে জিলা স্কুল।

প্রায় আট বছর জিলা স্কুল এভাবে চলার পর আবারো নদীভাঙনের শিকার হয়। এরপর ১৯৩১ সালে জিলা স্কুল চলে আসে আহম্মদিয়া মাদরাসার প্রভাতি শাখায়। আহম্মদিয়া মাদরাসার প্রভাতি শাখা চলাকালে আবারো নদীভাঙনের কারণে জিলা স্কুলকে বঙ্গবিদ্যালয়ে স্থানান্তর করা হয়।

বঙ্গবিদ্যালয়ের ইতিহাসও চমকপ্রদ। ধারণা করা হয় বঙ্গবিদ্যালয় হচ্ছে নোয়াখালীর প্রথম স্কুল। প্রসন্ন মহাজন স্কুলটির জন্য ভূমি দান করেন। শুরুতে স্কুলটির নাম ছিল ইন্দ্রচন্দ্র মধ্য ইংরেজি স্কুল। পরবর্তী সময়ে বঙ্গবিদ্যালয় নোয়াখালী হাইস্কুলের সঙ্গে একাত্ম হয়ে পড়ে। বঙ্গবিদ্যালয়ে বেশকিছু বছর চলার পর ১৯৪৮ সালে আরেকবার নদীভাঙনের ফলে জিলা স্কুল চলে আসে কেরামতিয়া মাদ্রাসায়।

১৯৫৩ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছর চলতে থাকে এভাবে। একই বছরের শেষদিকে জিলা স্কুলকে নিয়ে আসা হয় বর্তমান স্থানে। এরপর আর নদীভাঙনের কবলে পড়েনি জিলা স্কুল।

ভাঙাগড়ার ইতিহাস কিন্তু এখানেই শেষ হয়নি। এবার আর নদীভাঙনে নয়, ১৯৫৮ সালে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে জিলা স্কুল বিধ্বস্ত হয়। এর ১২ বছর পর ১৯৭০ সালে আবারো প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে জিলা স্কুল সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়। পরবর্তী সময়ে একই স্থানে আবার নতুনভাবে গড়ে তোলা হয় স্কুলটি। বারবার প্রতিকূলতার শিকার হয়েও থেমে যায়নি জিলা স্কুলের অগ্রযাত্রা। প্রতিবার ধ্বংসাবশেষ থেকে জন্ম নিয়ে লিখেছে নতুন ইতিহাস।

বর্তমানে নোয়াখালীর প্রাণকেন্দ্র মাইজদী শহরের ঠিক মধ্যখানে ৭ দশমিক ৩৮ একর জমিজুড়ে অবস্থান করছে ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি ও পরিবেশের অপরূপ এক মেলবন্ধন নোয়াখালী জিলা স্কুল।

স্কুলের অডিটোরিয়াম থেকে শিক্ষক মিলনায়তন পর্যন্ত দীর্ঘ গাছগুলো ছায়া হয়ে সঙ্গী হয় জেলার এ গৌরবময় প্রতিষ্ঠানটির। শিক্ষক মিলনায়তনের কোল ঘেঁষে বেড়ে ওঠা কৃষ্ণচূড়া গাছ লাল হয়ে বৃদ্ধি করে শহীদ মিনারের সৌন্দর্য। ক্লাসরুমের পেছনের সুবিশাল পুকুর, প্রধান শিক্ষকের পরিত্যক্ত বাসভবনের ইতিহাস, সাইকেল স্ট্যান্ডের পাশের বটগাছটার নিচে নববর্ষ উদযাপন এবং পাশে জেলার আরেক ইতিহাসের সাক্ষী নোয়াখালী জেলা জামে মসজিদ বহুগুণে বৃদ্ধি করেছে জিলা স্কুলের গুরুত্ব।

ছাত্র-শিক্ষকদের মেলবন্ধনে আজও দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে যাচ্ছে স্কুলটি। বিগত কয়েক দশকে সব পরীক্ষায় পাসের হার ও জিপিএ ৫ প্রাপ্তিতে জেলায় অন্যতম শীর্ষে অবস্থান করে আসছে নোয়াখালী জিলা স্কুল। সহশিক্ষা কার্যক্রমে নোয়াখালীর সবার চেয়ে এগিয়ে নোয়াখালী জিলা স্কুল, যা অন্যান্য স্কুলের জন্য ঈর্ষণীয়। দিবা ও প্রাতঃ দুই শাখার ক্লাস শুরু হওয়ার আগে শরীরচর্চা কার্যক্রমে ছাত্রদের পাশাপাশি সব শিক্ষক অংশ নিয়ে একসঙ্গে জাতীয় সংগীতে কণ্ঠ মেলান।

বিএনসিসি, স্কাউটিং, রেড ক্রিসেন্ট ফাংশন, ক্রীড়া (ক্রিকেট, ফুটবল, ব্যাডমিন্টন), বিতর্ক, স্কুল মডেল ইউনাইটেড নেশনস, বিজ্ঞান মেলা, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় কর্মসূচি, শিক্ষা সফর নিয়মিত হয়ে থাকে। ক্রীড়া, স্কাউটিং, বিএনসিসি, রেড ক্রিসেন্ট এবং বিতর্কে জেলা ছাড়িয়ে বিভাগীয় ও জাতীয় পর্যায়ে অংশ নিয়ে আসছে জিলা স্কুলের ছাত্ররা। বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় জিলা স্কুলের বিশাল মাঠ অলিম্পিকের মাঠের মতো রূপ ধারণ করে। অলিম্পিকের মতো এখানেও মশাল হাতে একজন শিক্ষার্থীকে মাঠ প্রদক্ষিণ করানো হয়।

জিলা স্কুলের শিক্ষার্থীরা শিক্ষাজীবন শেষ করে দেশকে সেবা করার মহান ব্রত নিয়ে এগিয়ে চলে। এ স্কুলের উল্লেখযোগ্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়েছেন ভারতীয় উপমহাদেশে কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব কমরেড মুজফফর আহমদ, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হক, অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষাবিদ মোজাফফর আহমদ, আবদুল হালিম, প্রখ্যাত সাংবাদিক এবিএম মূসা, ভারতের বিধানসভার সাবেক সদস্য অধ্যাপক রাজকুমার চক্রবর্তী, অ্যাডভোকেট জিতেন্দ্রকুমার সেনগুপ্ত, অম্বিকাচরণ রক্ষিত, কবি ফরহাদ মজহার, সাবেক সচিব মরহুম সা’দত হোসেন, সাবেক সচিব ও রাষ্ট্রদূত এ এইচ মোফাজ্জল করিম, ড. আইনুন নিশাত, শিশুসাহিত্যিক শাহজাহান কিবরিয়া, আহমদ নজীর প্রমুখ।

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, সত্যাগ্রহ-স্বদেশী আন্দোলন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে নোয়াখালী জিলা স্কুলের ছাত্ররা অগ্রগামী। তাদের জোরদার আন্দোলন, ঐকান্তিক নিষ্ঠায় সব আন্দোলনে মুখ্য ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়। রজনী গাঙ্গুলি নামে একজন হেডমাস্টার ছিলেন এ স্কুলে। তিনি নিজ হাতে সুতা কেটে কাপড় বুনতেন। এ স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র সত্যরঞ্জন বসু কৃষ্ণনগর-শিবপুর রাজনৈতিক মামলায় যাবজ্জীবন দীপান্তর দণ্ডে দণ্ডিত হয়েছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে কাঠের রাইফেল দিয়ে জিলা স্কুলের মাঠে প্রশিক্ষণ শুরু হয়। পৃথিবীর মানচিত্রে ‘বাংলাদেশ’ নামটি স্থান পাওয়ার ক্ষেত্রে জিলা স্কুলের ছাত্রদের অবদান কম ছিল না। মাহমুদুর রহমান বেলায়েত (বিএলএফ প্রধান), এ কে আযাদ (আযাদ কমিশনার), একরামুল হক প্রমুখ তাদের অন্যতম। ৩০ লাখ শহীদের তালিকায় অহিদুর রহমান অহিদ, জসিম উদ্দিন, ক্যাশ সরকার, বিশ্বেশ্বর দেসহ জিলা স্কুলের আরো শিক্ষার্থীর নামও রয়েছে।

দেশের সংকটাপন্ন অবস্থায় সবসময় এগিয়ে এসেছে জিলা স্কুলের শিক্ষার্থী ও কর্তৃপক্ষ। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে নোয়াখালীতে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিল জিলা স্কুলের ছাত্ররা। করোনাভাইরাস আতঙ্কে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে এ স্কুলের মাঠ ব্যবহূত হয়েছে অস্থায়ী কাঁচাবাজার হিসেবে। মর্যাদা আর গৌরবে এভাবেই যুগ যুগ ধরে বুক পেতে রয় নোয়াখালী জিলা স্কুল।

 

হাবীব ইমন: কবি ও সাংবাদিক