একটু আড়ালে গ্রামীণ ছায়ায় নান্দনিক রূপে এখনো চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে নোয়াখালী জেলার সোনাইমুড়ী উপজেলায় অবস্থিত বজরা শাহি জামে মসজিদ। ঐতিহ্যকে ধারণ করা ঐতিহাসিক এ মসজিদ মোগল আমলের অনুপম নির্মাণশৈলীর অপূর্ব এক সাক্ষী। অসাধারণ কারুকার্যে মোড়ানো মসজিদটি এখনো নজর কাড়ে সাধারণ মানুষের। নীলাভ তারকা আর ধবধবে সাদা রূপ মসজিদটিকে করেছে অনন্য। আঙিনাজুড়ে শুভ্রতার নির্মল পরিবেশ নিমেষেই মানুষের মনে প্রশান্তি এনে দেয়।

বাংলাদেশে মোগল আমলের যেসব স্থাপত্য সবার নজর কাড়ে বজরা শাহি মসজিদ তার অন্যতম। দিল্লির শাহি মসজিদের আদলে নির্মিত মসজিদটি সোনাইমুড়ী উপজেলার বজরা বাজার প্রধান সড়কের পশ্চিম পাশে অবস্থিত।

অনেক বিখ্যাতজন আসেন এ মসজিদ দেখতে। বাংলাদেশে দায়িত্ব পালনকালে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মোজেনা সপরিবার এসেছিলেন শাহি মসজিদটি দেখার জন্য। তিনি কারুময় দেয়াল ছুঁয়ে ছুঁয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।

ভারতবর্ষ শাসনকালে মোগল সম্রাট এবং তাদের আত্মীয়, কর্মকর্তারা বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য ইমারত, মসজিদ নির্মাণ করেন। এসব স্থাপনা আজও স্থাপত্য শিল্পের বিরল ও উজ্জ্বল নিদর্শন হয়ে আছে। এর মধ্যে আগ্রার তাজমহল, সেকেন্দ্রা, আগ্রার দুর্গ, দিল্লির লাল কেল্লা ও দিল্লির শাহি জামে মসজিদ অন্যতম। এ দেশে শ্রেষ্ঠত্বে উজ্জ্বল হয়ে আছে বজরার এ শাহি মসজিদ। মোগল সম্রাট মুহাম্মদ শাহের আমলে দিল্লির বিখ্যাত জামে মসজিদের অনুকরণে জমিদার আমান উল্যাহ ১১৫৪ হিজরি সাল, ১১৩৯ বাংলা মোতাবেক ১৭৪১ সালে বজরা শাহি মসজিদ নির্মাণ করেন।

জমিদার আমান উল্যাহ তার বাড়ির সম্মুখে ৩০ একর জমির ওপর উঁচু পাড়যুক্ত একটি বিশাল দিঘি খনন করেন। এ দিঘির পশ্চিম পাড়ে মনোরম পরিবেশে আকর্ষণীয় তোরণবিশিষ্ট প্রায় ১১৬ ফুট দৈর্ঘ্য, ৭৪ ফুট প্রস্থ এবং প্রায় ২০ ফুট উঁচু তিন গম্বুজবিশিষ্ট এ ঐতিহাসিক মসজিদ নির্মাণ করেন। এ মসজিদকে মজবুত করার জন্য মাটির প্রায় ২০ ফুট নিচ থেকে ভিত তৈরি করা হয়। সুদৃশ্য মার্বেল পাথর দ্বারা গম্বুজগুলো সুশোভিত করা হয়। মসজিদে প্রবেশের জন্য রয়েছে তিনটি ধনুকাকৃতির দরজা। মসজিদের প্রবেশপথের ওপর রয়েছে কয়েকটি গম্বুজ। কেবলা দেয়ালে তিনটি কারুকার্যখচিত মিহরাব রয়েছে।

মোগল সম্রাট মোহাম্মদ শাহের বিশেষ অনুরোধে পবিত্র মক্কা শরিফের বাসিন্দা, কারো মতে দিল্লির বাসিন্দা তৎকালীন অন্যতম বুজুর্গ আলেম হযরত মাওলানা শাহ আবু সিদ্দিকী এ ঐতিহাসিক মসজিদের প্রথম ইমাম হিসেবে নিয়োজিত হন। তার বংশধররা যোগ্যতা অনুসারে আজও এ মসজিদের ইমামের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। বর্তমানে প্রথম ইমাম সাহেবের সপ্তম পুরুষ ইমাম হাসান সিদ্দিকী ওই মসজিদের ইমামের দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।

প্রতি শুক্রবার মানতের শিরনি, জিলাপি, মিষ্টির স্তূপ জমে বজরা শাহি মসজিদে। আরো জনশ্রুতি আছে যে এ মসজিদে মানত করলে তাতে শুভ ফল পাওয়া যায়। তাই দেখা যায় যে মনের আশা পূর্ণ করা, বিপদ থেকে মুক্তিলাভ ও দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় অগণিত নারী ও পুরুষ এ মসজিদে শিরনি, জিলাপি, মিষ্টি মানত নিয়ে আসেন।

বজরা শাহি মসজিদে বহু দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এসে নামাজ আদায় করে। ১০ বছর ধরে নারীরাও নামাজ পড়ার সুযোগ পাচ্ছেন এ মসজিদে। বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ১৯৯৮ সালের ২৯ নভেম্বর সরকারি গেজেটে মসজিদটিকে প্রত্নসম্পদ হিসেবে ঘোষণা করে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো মসজিদটি রক্ষণাবেক্ষণের কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ফলে কালের প্রবাহে মোগল স্থাপত্যকলায় নির্মিত এ মসজিদের সৌন্দর্য ম্লান হচ্ছে। বজরা শাহি মসজিদের বর্তমান ইমাম হাসান সিদ্দিকী বলেন, ‘মসজিদের সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য নতুন করে সিরামিক স্থাপন করা হয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে পুরো মসজিদকে আনা হয়েছে সিসি ক্যামেরার আওতায়।’ সোনাইমুড়ীর যেকোনো লোকাল বাস সার্ভিস, সিএনজি অথবা অটোরিকশাযোগে বজরা হাসপাতালের সামনে নেমে রিকশা বা পায়ে হেঁটে ২০০ গজ পশ্চিমে গেলে বজরা শাহি মসজিদে পৌঁছানো যাবে। স্থানীয়দের মতে, সরকার উদ্যোগ নিলে দেশী-বিদেশী পর্যটকের ঢল নামবে এখানে।

 

আনোয়ার বারী পিন্টু : সাংবাদিক