টুমকি

 

কপাল টোকা আর দেবো না

তোমার দুখী কপালজুড়ে

অনেক শুয়ে থাকব আমি

পড়লে মনে নিজ কপালে

টোকা দিও

আমার কথা পড়লে মনে

 

আমার কথা রাখবে মনে

এমন দিব্যি দিইনি আমি

দিয়েছিলাম অনেক আগে

যখন তুমি উনিশ কুড়ি

 

দিন গিয়েছে চোখের জলে

কপাল টোকা আর দেবো না

এখন যদি খোঁজ আমায়

হয়তো পাবে আমার চিঠি

হয়তো আমি খুঁজলে আরো

পেতে পারি তোমার হাতের

একটি দুটি তিনটি চিঠি।

 

যে চিঠিতে লিখেছিলে

মন ভালো নেই

সপ্তাহ দুয়েক

কি যে করি একা একা

 

এক্কা দোক্কা

খেলতে গিয়ে কবে কখন

দিয়েছিলাম কপাল টোকা

চোখের ভাসা লুকিয়ে ছিলে

লিখি আমার দু’চোখ জুড়ে

 

অভিমানী বলেছিলে

পাড়ার ছেলে আবু হোসেন

সুযোগ পেলে তাকিয়ে থাকে

একনাগাড়ে আমার দিকে

আবুর ছায়া ঘুরে বেড়ায়

আমার ছায়ার পিছে পিছে

 

ঠিক হয়েছে বিয়ে আমার

যেতে হবে অচেনা এক লোকের সাথে

আসবে নাকি পালকি নিয়ে

যেতে হবে, চলে যাব

নাম শুনেছি আগে

তিনি নাকি

তিন বিঘা আর বুড়িমারির প্রভাবশালী

 

আজ সকালেই খবর এল ঢাকায় নাকি

শেখ সাহেবের ভাষণ শুনেই

পাক বাহিনীর মিলিটারি

আগুন দিয়ে লোক মেরেছে

পরশু রাতে রাজারবাগে

 

তোমার কথা ভেবে ভেবেই

রাত কেটেছে একলা জেগে

জানি আমি,

তুমি এখন ঢাকায় থাকো

কোন এলাকায়

হয়নি জানা, হয়তো হবে

নয়াটোলা, মালিবাগে

 

ভয় জমেছে বুকের নিচে

কাকের মুখে কখন যেন

শুনব আমি, আমার তুমি

ঠাঁই নিয়েছ অচিনপুরে।

 

আমার সেদিন

দু’চোখ ভয়ে জড়িয়ে এল

অনেক দিনের পুরনো স্মৃতি

যে স্মৃতিতে আমরা ছিলাম

কপাল টোকা খেলার ছলে।

 

দিন গিয়েছে রাতের কাছে

এক পা, দু পা তিন পা করে

ঢাকা থেকে পালিয়ে গেলাম

আগরতলার

ট্রেনিং ক্যাম্পে

একাত্তরের রণাঙ্গনে

 

এক সকালে, দুই হুজুরে

ভেবেছিলাম ভাবব নাকো

তোমার কথা রোজ বিকেলে

প্রেমিক যে জন, সে জন জানে

যায় না ভোলা অতীত স্মৃতি

 

কপাল টোকা খেলতে গিয়ে

পাড়ার ছেলে আবু হোসেন

আমায় ডেকে বলেছিলেন,

মনে রাখিস লিলি বেগম

আমার হবে যে কোনো দিন

 

আগরতলায় নীল নগরীর

একটি ছেলে বলল আমায়

 কাছে ডেকে

তোদের বাড়ি পুড়িয়ে দিল

আবু হোসেন। হোসেন নাকি

যোগ দিয়েছে আলবদরে

আবুর হাতে হাত রেখেছে

হরিতলার কাশেম মিয়া।

দাঁড়িয়ে আছে সকাল থেকে

লিলি বানুর বাপের বাড়ির

চারদিকে

একটু বাদে পুড়িয়ে দেবে

রাজাকার আর আবু মিয়া

মহাসুখে।

 

কপাল টোকার খেলার উঠোন,

সেই শুনেছি লিলির নাম

পুরনো স্মৃতি উঠল জেগে

ঠিক তখনি ঠিক করেছি

বুকের আগুন ঢেলে দেবো

আবু মিয়ার চোখের মাঝে

 

আগরতলার ট্রেনিং ক্যাম্প

রইল আমার পিছে পড়ে

নিকষ কালো আঁধার রাতে

পালিয়ে এলাম দোহারপাড়ায়

 

সেদিন ছিল শনির রাহু

আমার আগে এবং পিছে

আলবদর আর রাজাকার লুকিয়ে ছিল

মোল্লাবাড়ির বাঁশ বাগানের নিকষ কালো অন্ধকারে

হঠাত্ শুনি একটি মেয়ে

বলছে কেঁদে আবু হোসেন

দোহাই তোমার...

পরেরটুকু আর শুনিনি।

 

অট্টহাসির অন্তরালে হারিয়ে গেল

লিলি বানুর অনেক কথা

তেড়ে এল বদমাইশের

কণ্ঠস্বর উচ্চলয়ে

 

লিলি বানু, কোথায় তোর আজিজ মিয়া,

শালা নাকি

মুক্তিযুদ্ধে নাম দিয়েছে

আগরতলায়

নাগাল পেলে দেখিয়ে দেবো

কপাল টোকা কয় প্রকারের

দিয়ে দেবো চিরতরে

রাইফেলের কুদো দিয়ে

বুঝিয়ে দেবো কপাল টোকা খেলার স্বাদ

 

কাঁদল যখন সেই মেয়েটি তখন দেখি

জোনাকগুলো কাঁদল একা

নিভিয়ে দিল নীলের আলো

ঠিক তখনি

আবু হোসেন ভীষণ জোরে

একটি দুটি তিনটি টোকা

দিতেই শোন আমার লিলি

চুপসে গেল, এক নিমেষে

 

তখন শুনি আরেক কথা

বলল হেঁসে আবু হোসেন

কপাল টোকা এক্কা দোক্কা এখন থেকে

খেলবি তুই আমার সাথে

লিলি আমার প্রিয়তমা।

 

শুনি হঠাত্ আরেক কথা

আজিজ শালা কোথায় গেল

কাছে পেলে দেখিয়ে দিতাম

লিলি আমার চোখের মণি।

 

ঠিক তখনি রাইফেলের তপ্ত সিসা ছুড়ে দিলাম

আবু হোসেন আর ফেরেনি

দোহারপাড়ায়।

 

আমার লিলি আর ফেরেনি

ফিরবে না আর কোনোদিন

কেউ দেবে না কপাল টোকা

আমার ভাঙা কপালজুড়ে।