১৮৩৭ সালে মোগল সিংহাসনে আরোহণ করেন দ্বিতীয় আকবর শাহের পুত্র মির্জা আবু জাফর। নাম নেন আবু জাফর সিরাজউদ্দিন মোহাম্মদ বাহাদুর শাহ গাজি; বাহাদুর শাহ জাফর নামেই যিনি ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন। যে মোগলদের পশ্চিমা দুনিয়াতেও ঈর্ষার চোখে দেখ হতো, সে দিন আর তখন নেই। মোগল সাম্রাজ্যের সূর্য তখন অস্ত যাচ্ছে। ১৮০৩ সালেই মোগলদের রাজধানী দিল্লির দখল নিয়ে নিয়েছিল ব্রিটিশরা। সম্রাট কেবল নামে সম্রাট। তখন লোকমুখে প্রচলিত ছিল—

‘শাহ আলমের রাজ

দিল্লি থেকে পালাম’

১৮১৩ সালে সম্রাটকে দেয়া ঐতিহ্যবাহী নজরও বন্ধ হয়ে গেল। মোগলদের মুদ্রা তৈরি বন্ধ ও ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে মুদ্রা থেকে মোগল সম্রাটের মুখাবয়ব বাদ দেয়া হলো। সম্রাট তখন ব্রিটিশ হুকুমতের পেনশনভোগী এক অক্ষম মানুষ।

বাহাদুর শাহ জাফর এমনই এক পরিস্থিতিতে সিংহাসনে বসেছিলেন। মোগলদের ক্ষমতা নিঃশেষ হয়ে গেলেও শিল্প-সংস্কৃতিতে এক অভূতপূর্ব জাগরণ দেখা গেল। সম্রাট নিজে কবি ছিলেন আর তার দরবারের আসরে তখন বসতেন মির্জা গালিব, শেখ ইব্রাহিম জাক ও মোমিন খান মোমিন। এছাড়া দরবারের পৃষ্ঠপোষকতায় আরো অনেক কবির উত্থান দেখা যাচ্ছিল। এ সময়ই এই কবিদের হাতে বিকশিত হচ্ছিল উর্দু ভাষা, যার প্রকৃত নাম রেখতা।

১৮৫৭ সালে শুরু হয় সিপাহি বিদ্রোহ। আধুনিক ইতিহাসবিদরা পরবর্তীতে যাকে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম বলে অভিহিত করেছেন। এই বিদ্রোহ দুনিয়ার ইতিহাসে সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরে বৃহত্তম বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহের গুরুত্বপূর্ণ বিবরণী পাওয়া যায় বাহাদুর শাহ জাফরের ঘনিষ্ঠ কবি মির্জা আসাদুল্লাহ খান গালিবের কলমে। প্রাচীন ফারসিতে কুহেলিকা আচ্ছাদিত রীতিতে লিখেছিলেন দস্তঁবু। গলিবের সেই লেখা সমকালীন পণ্ডিতদের পক্ষেও বোঝা দুরূহ ছিল। যাহোক, গালিবের দস্তঁবু বাদে বাহাদুর শাহ জাফরের দরবারের আরেক তরুণ কবি বিদ্রোহের নামচা লিখেছিলেন, যা পরবর্তীতে বই আকারে প্রকাশিত হয়। ১৮৫৭ সালে বিদ্রোহের ঘটনাপঞ্জি সম্রাটের দরবারের মধ্যে এবং আশপাশে থেকে প্রত্যক্ষ করেছিলেন তরুণ কবি সৈয়দ জহিরউদ্দিন হুসাইন জহির দেহলভী। সেসময় তার বয়স মাত্র ২২। সে হিসাবে তার জন্মসাল ১৮৩৫। জহিরের পরিবার কয়েক প্রজন্ম ধরে মোগল দরবারের বিভিন্ন পদে নিযুক্ত ছিল। তার পিতামহ মির ইমাম আলী শাহ ছিলেন তার সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ক্যালিগ্রাফার। খোদ বাহাদুর শাহ জাফর ছিলেন তার ছাত্র। আট বছর বয়স থেকেই কিলা-ই-মোয়াল্লা বা লাল কেল্লায় জহিরের যাতায়াত শুরু। দরবারের রীতিনীতির সঙ্গে ছোটবেলা থেকেই তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন। তিনি বাহাদুর শাহ জাফরের কাছে ক্যালিগ্রাফির পাঠ নিয়েছিলেন। কবিতা লেখা শিখতে গিয়েছেন মির্জা গালিবের কাছে। তবে তার ওস্তাদ ছিলেন শেখ ইব্রাহিম জাক। যদিও তার কবিতায় মোমিন খান মোমিনের কাব্যরীতির প্রভাব দেখা যায়। বাহাদুর শাহের দরবারে তাকে দারোগা-ই-মাহি-মারতিব হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। অর্থাত্ তিনি ছিলেন মোগল সাম্রাজ্যের মাছের প্রতীকের দায়িত্বপ্রাপ্ত। তার উপাধি ছিল রাকিম-উদ-দৌলা সৈয়দ জহিরউদ্দিন হুসাইন খান দারোগা-ই-কুজবেগি। কাজের অংশ হিসেবে দরবারের বাইরে সম্রাটের যেকোনো উপস্থিতিতে জহির তার সঙ্গে থাকতেন। আর অন্যান্য দিনে তিনি ঝারোখা দর্শন ও দরবারের নিয়মিত সভায় উপস্থিত থাকতেন। জহিরের লেখা কাব্য ১৮৫৭ সালে বিদ্রোহের সময় ধ্বংস হয়ে যায়। তবে পরবর্তীতে লেখা কবিতাগুলো কিছু কিছু প্রকাশিত হয়েছে। তার প্রকাশিত প্রথম দিওয়ানটির নাম গুলিস্তা-ই-সুখান। ১৯১১ সালের মার্চে জহির শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

বিদ্রোহের বিবরণী নিয়ে জহিরের লেখা বইটি সিপাহী বিদ্রোহের ইতিহাস এবং শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের জীবনী সম্পর্কে জানার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এটি মোগল দরবারের একজন প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণী। আর লেখক ছিলেন সম্রাটের ঘনিষ্ঠ। বাহাদুর শাহ জাফরের বিচারের সময় ব্রিটিশরা তার বিরুদ্ধে দিল্লিতে নিরীহ ইংরেজ নারী ও শিশুদের হত্যার অভিযোগ এনেছিল। কিন্তু জহিরের লেখায় পাওয়া যায় তিনি বিদ্রোহীদের হাত থেকে ইংরেজ নারী-শিশুদের বাঁচাতে চেষ্টা করেছিলেন। উপরন্তু দিল্লি শহরে সিপাহিদের কর্মকাণ্ডে তিনি অসন্তুষ্টও হয়েছিলেন।

জহির দেহলভী সিপাহি বিদ্রোহের স্মৃতিকথা লিখেছিলেন তার মৃত্যুশয্যায়, উর্দু ভাষায়। এক বন্ধুর অনুরোধে তিনি এই লেখা শুরু করেন। বিদ্রোহের বিবরণীর পাশাপাশি জহিরের এই রচনা উর্দু ভাষার প্রথম আত্মজীবনীগুলোর একটি। জহিরের বইটি ১৯১৪ সালে লাহোরে প্রথম প্রকাশিত হয়। শুরুতে এটি পরিচিত ছিল তারাজ-ই-জহিরি নামে। পরবর্তীতে তা দাস্তান-ই-গদর নামে বিখ্যাত হয়ে ওঠে। সম্প্রতি মূল উর্দু থেকে বইটি প্রথমবারের মতো ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। অনুবাদ করেছেন দিল্লির ইতিহাস লেখক, অনুবাদক রানা সাফভি। ইংরেজি অনুবাদটি দাস্তান-ই-গদর: দ্য টেল অব দ্য মিউটিনিটি নামে প্রকাশিত হয়েছে। ফলে সিপাহি বিদ্রোহ নিয়ে আগ্রহী গবেষক ও পাঠকদের জন্য এই জরুরি বইটি পাঠ সহজ হয়ে গেছে।

জহিরের এই স্মৃতিকথায় বিদ্রোহের সব ঘটনার বিবরণ নেই। একমাত্র তিনি যা দেখেছেন ও বিশ্বস্ত সূত্রে শুনেছেন শুধু তা-ই তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন। যেমন— বাহাদুর শাহ জাফরের বিচারের বিষয়টি তিনি উল্লেখ করেননি। এত বড় ঘটনা নিশ্চয়ই তার অজ্ঞাত ছিল না। এর পেছনে দুটি কারণ থাকতে পারে বলে মত দিয়েছেন রানা সাফভি। এক. হতে পারে জহির বিচারের সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন না, তাই বিষয়টির উল্লেখ করেননি। আবার এটাও হতে পারে ইংরেজদের রোষানল থেকে নিজের পরিবারকে নিরাপদ রাখতেই তিনি জাফরের বিচারের বিষয়টি নিজের লেখায় উহ্য রেখেছিলেন।

জহিরের লেখা ব্রিটিশদের পক্ষঘেঁষা। তিনি দিল্লির জীবনযাত্রায় ব্যাঘাত ঘটানো ও লুটপাটের জন্য পুরবিয়াদের দায়ী করে তাদের নিন্দা করেছেন। সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের প্রতি সহানুভূতিশীল হলেও সিপাহিদের প্রতি জহিরের কোনো ভক্তি ছিল না।

বাহাদুর শাহ জাফর গ্রেফতার হওয়ার কিছুদিন পর জহির প্রাণ বাঁচাতে দিল্লি ত্যাগ করেন। বেরিলিতে পৌঁছে ভুল বোঝাবুঝিতে স্থানীয় এক সেনা কর্মকর্তা ব্রিটিশদের চর সন্দেহে জহিরকে কামানে বেঁধে উড়িয়ে দিতে যাচ্ছিলেন। কপাল গুণে জহির বেঁচে যান। সেই রোমাঞ্চকর কাহিনী সিনেমাকেও হার মানায়!

সৈয়দ জহিরউদ্দিন হুসাইন জহির দেহলভী দাস্তান-ই-গদরের শুরুতে বলেছেন, ‘কাউকে অপমান বা সমালোচনা করা আমার উদ্দেশ্য নয়। আবার কারুর গুণকীর্তন করাটাও আমার লক্ষ্য নয়। আমি কোনো প্রশংসা, পুরস্কার কিংবা প্রতিদান চাই না।...আমি যা দেখেছি তার সরল, সত্য বিবরণী দিয়েছি।... আমার লেখার রীতি যদি আজকের দিনের প্রতিষ্ঠিত রীতির চেয়ে ভিন্নও হয়, তাহলেও আমি পরোয়া করি না। আমি শুধু আমার লেখার উদ্দেশ্যর প্রতি সত্ থাকতে চেয়েছি।’

জহির নিজে যা দেখেছেন তাই লিখেছেন। অন্যদিকে বাহাদুর শাহ জাফরের দরবারের কর্মচারী হওয়ায় নানা ধরনের খবর তার কাছে আসত। বিদ্রোহ চলাকালে তিনি যেমন নিজের দেখা ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন, তেমনি আশপাশ থেকে শোনা খবরেরও উল্লেখ করেছেন। তবে গালগপ্পোকে তিনি পাত্তা দেননি। তার কথায়, ‘ঘটনার সময় মানুষের কাছে যা শুনেছি, তা লিপিবদ্ধ করেছি। সেগুলোকে আমি বদলাইনি। এ সময়ে যেসব ঘটনা ঘটেছে এবং আমি নিজে যা দেখেছি, সেগুলোকে বিশ্বস্ততার সঙ্গে লিখে রেখেছি।

যা কিছু ভুল, তা বিবরণদাতাদের।

 

বিদ্রোহের সময় যা যা ঘটেছে, তার সবকিছুরই আমি বিবরণ দিয়েছি। বাজারের গুজবের ওপর নির্ভর করিনি।’

দাস্তান-ই-গদরের নির্বাচিত কিছু অংশের অনুবাদ—

 

আসন্ন ধ্বংসযজ্ঞের বার্তা

চার মাস পরে মহাবিদ্রোহ আমাদের মাথায় ভেঙে পড়ল। ব্রিটিশরা আমাদের সব সহায়-সম্বল নিয়ে গিয়েছিল। একটা আংটিও অবশিষ্ট ছিল না। পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া সম্পদসহ আমাদের আরো যা কিছু লুটপাট হয়েছিল, তার মূল্য ৪০ হাজার রুপির বেশি। শাহজাহানাবাদ ত্যাগ করার সময় তারা এই লুটপাট চালিয়েছিল। তারা এমন সব অমূল্য জিনিসপত্র নিয়ে গিয়েছিল, যা আর কখনই পাওয়া সম্ভব নয়। তারা আমার পূর্বপুরুষদের হাতে লেখা কোরআন-ই-মাজিদের ২০টি কপি নিয়ে গিয়েছিল। এর মধ্যে সাতটি কপি ছিল আমার পিতার হাতে লেখা। আমাদের বাড়িতে থাকা অমূল্য সব বই লুট হয়ে গিয়েছিল, ধ্বংস করা হয়েছিল। এসব বইয়ের মধ্যে ছিল তারিখ-ই-রাওজাত আল-সাফা, তারিখ-ই-ফিরিশতা ও শাহনামা। এসব বই ৩০০ রুপি দিয়ে আমার জন্য বাবা কিনে এনেছিলেন।

 

মোগল সাম্রাজ্যের অবস্থা

মোগল সাম্রাজ্যের যেদিকেই তাকাবেন, দেখতে পাবেন তাদের ভিত্তিগুলো বেরিয়ে এসেছে, এগুলো একেবারে ভগ্নদশায় পতিত হয়েছে। সম্রাট কেবল নামেই শাসন করছেন। হিন্দুস্তানের সবচেয়ে ছোট রাজার সমান ক্ষমতাও তার আর নেই। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সম্রাটকে মাসে ১ লাখ রুপির সামান্য ভাতা দিত। তবে সম্রাটের দরবারে যে আভিজাত্য আর জাঁকজমক আছে, তা আর কোথাও দেখা যায় না।

 

সম্রাটের কাব্য প্রতিভা

হজরত বাদশাহ ছিলেন একজন অসাধারণ কবি ও দক্ষ ভাষাবিদ। এমন কোনো বাকপ্রণালি ছিল না, যা তিনি জানতেন না। তার কবিতা পাঁচটি দিওয়ানে সংকলিত হয়েছে। তিনি ছিলেন মরহুম শাহ নাসির ও খানকানি-ই-হিন্দ শেখ ইব্রাহিম জাকের শিষ্য। 

 

মিরাটে বিদ্রোহের সূচনা (মে, ১৮৫৭)

পাখি মিষ্টি সুরে ঈশ্বরের স্তুতি গাইছে। হজরত জিল্লে-ই-সুবহানি খালিফা উর রাহমানি মোহাম্মদ বাহাদুর শাহ নামাজ শেষ করে ঝারোখায় বসে ছিলেন। হুজুর হাকিম আহসানউল্লাহ খানকে নির্দেশ দিলেন বিদ্রোহীদের পরিচয় এবং তারা কোথা থেকে আসছে, তা জানতে। তাছাড়া তারা কেন দিল্লি এসেছে, তাও জিজ্ঞেস করতে নির্দেশ দিলেন।

&dquote;বিদ্রোহীদের 

বিদ্রোহী সেনাদের বক্তব্য

‘হুজুর জাঁহাপনা! আপনি দীর্ঘজীবী হোন! আপনি বিশ্বাস ও দুনিয়ার সম্রাট। ঈশ্বর আপনাকে ২২টি প্রদেশের শাসনক্ষমতা দিয়েছেন। পুরো ভারতবর্ষ আপনার অধীন। হিন্দুস্তানের সব মানুষ আপনার প্রজা।’ এটাই ছিল তখন বিদ্রোহীদের ঘোষণাপত্রের কথা।

 

বন্দিদের হত্যা

একদিন বেশ সকাল সকাল আমি বাড়ি থেকে কেল্লায় গেলাম; নকরখানার মধ্য দিয়ে পৌঁছলাম দিওয়ান-ই-আমে। সেখান থেকে আমি হাকিম আহসানউল্লাহ খানের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম, উদ্দেশ্য ছিল হুজুর কোনো নির্দেশ দিয়েছেন কিনা তা জানা। তাই জাফরি দরজা এড়িয়ে খানসামানি দরজা দিয়ে প্রবেশ করলাম। মেহতাব দরজা দিয়ে কিছুটা এগিয়ে দেখতে পেলাম, পুরবিয়ারা বন্দিদের বাগানের বাইরে নিয়ে আসছে।

‘এদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছ?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।

‘আমরা এদের কেল্লার বাইরে নিয়ে যাব। তাদের অন্য কোথাও রাখা হবে’— তাদের একজন জবাব দিল।

‘অনুগ্রহ করে তাদের এখান থেকে সরিয়ে নিয়ো না। কারণ এটা আমাদের চুক্তির বরখেলাপ করা হবে’— আমি প্রতিবাদ জানালাম।

কিন্তু তারা আমার কথা শুনতে চাইলেন না। আমার মাথায় দুশ্চিন্তা ভর করল যে, তারা কোনো অসত্ করতে যাচ্ছেন। তাই দ্রুত আহসানউল্লাহ খান সাহেবের কাছে ছুটে গেলাম। তাকে বললাম, ‘খান সাহেব, যা কিছু ঘটছে, সেগুলো কি আপনি জানেন?’

‘কী’— তিনি জানতে চাইলেন।

‘ওই উচ্ছৃঙ্খল সেনারা বন্দিদের সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমার আশঙ্কা হচ্ছে যে, তারা বন্দিদের হত্যা করবে। অনুগ্রহ করে তাদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করুন।’

আহসানউল্লাহ খান জবাবে বললেন, ‘আমি কী করতে পারি?’

আমি বললাম, ‘খান সাহেব, এটা আমাদের আনুগত্যের একটা পরীক্ষা। আপনি যদি সম্রাটকে বাঁচাতে চান, তাহলে বিদ্রোহীদের সঙ্গে আলোচনা করুন এবং বন্দিদের বাঁচান। মনে রাখবেন, অন্যথায় ব্রিটিশরা দিল্লিকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেবে।’

আহসানউল্লাহ খান জবাব দিলেন, ‘মিয়া, তোমার বয়স অনেক কম। এ রকম পরিস্থিতিতে মানুষ আলোচনা বা যুক্তির কথা শোনে না। সে তার কাজের পরিণতি সম্পর্কে ভাবে না। এখন যদি তুমি তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাও, তাহলে তারা প্রথমে আমাদের হত্যা করবে এবং তারপর বন্দিদের হত্যা করবে।’

আমি বললাম, ‘তাও ভালো যে, সেক্ষেত্রে আমরা অল্প কয়েকজন মরব। অন্তত বাদশাহের সাম্রাজ্য তো বেঁচে যাবে।’ এটা বলে আমি সেখান থেকে দেওরহিতে ফিরে এলাম।

খাজা-সারার মাধ্যমে আমি সম্রাটকে একটি বার্তা পাঠালাম যে, হুজুর যে বন্দিদের তার বিশেষ হেফাজতে রেখেছিলেন, তাদের পুরবিয়ারা নিয়ে গেছে। সম্রাট তাত্ক্ষণিকভাবে হাকিম আসাদুল্লাহ খানকে ডেকে পাঠালেন, যাতে তিনি বন্দিদের জীবন বাঁচাতে ব্যবস্থা নিতে পারেন।

কিছুক্ষণ পরে আসাদুল্লাহ খান তাসবিহখানায় এলেন এবং হুজুরের সামনে হাজির হলেন।

সম্রাট নির্দেশ দিলেন: ‘কর্মকর্তাদের ডেকে তাদের সঙ্গে আলোচনা করুন এবং বন্দিদের জীবন বাঁচান।’

হাকিম জবাব দিলেন, ‘যা আপনার ইচ্ছা।’ দিওয়ান-ই-খাস থেকে বেরিয়ে তিনি এলেন। সম্ভবত তিনি বিদ্রোহী কর্মকর্তাদের ডাকতে কয়েকজন লোককে পাঠালেন।

হঠাত্ দেখলাম, ভরা বন্দুক কাঁধে ফেলে দুই কোম্পানি সৈন্য লাল পুর্দা দরজা দিয়ে এগিয়ে আসছে। দিওয়ান-ই-খাসে প্রবেশ করেই তারা আমাদের ঘিরে ফেলে বন্দুক তাক করল। আমরা সবাই আল্লাহর কাছে প্রর্থনা করছিলাম আর কলেমা পড়ছিলাম। আমরা সেখানে সব মিলিয়ে ১০-১২ জন ছিলাম এবং আমরা আশঙ্কা করছিলাম, যেকোনো সময় আমাদের গুলিতে উড়িয়ে দেয়া হতে পারে। কয়েক মুহূর্ত তারা সেভাবেই দাঁড়িয়ে রইল। তারপর দুজন সওয়ার লাল পুর্দার বাইরে একটি লাল পতাকা ওড়াল। এটা ছিল অস্ত্র নামিয়ে সেখান থেকে চলে যাওয়ার জন্য অন্য সওয়ারদের প্রতি নির্দেশনা।

কিছুক্ষণ পর একজন বার্তাবাহক এসে খবর দিল যে, ‘বন্দিদের হত্যা করা হয়েছে।’ খবরটি শোনার পর আমি যে দুঃখ পেয়েছিলাম, তা ভাষায় প্রকাশ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমার নিজের পুত্র মারা যাওয়ার সময় যেমন কষ্ট পেয়েছিলাম, তেমনটাই অনুভব হচ্ছিল এ শিশুদের হত্যাকাণ্ডের খবর শুনে। আমি এ পাথর হূদয় নিষ্ঠুর মানুষগুলোর কথা ভেবে অবাক হচ্ছিলাম, তারা কী করে এসব নিষ্পাপ শিশু আর নারীদের হত্যা করল।

&dquote;বিদ্রোহীদের

শান্তিতে শোক পালনের জন্য আমি বাড়ির উদ্দেশে রওনা হলাম। নকরখানার দরজা পার হওয়ার সময় দেখলাম, বন্দিদের মরদেহগুলো ডান দিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এ মৃত্যু আর বিনাশের দৃশ্য আমি সহ্য করতে পারছিলাম না। রুমাল দিয়ে মুখ ঢেকে সেখান থেকে সরে গেলাম। বাইরে ঘোড়া নিয়ে আমার চাকর দাঁড়িয়ে ছিল। ঘোড়ায় চড়ে বিক্ষিপ্ত মন নিয়ে বাড়ি ফিরে এলাম। মুখে বিপন্নতার ছায়া দেখে আমার বাবা জিজ্ঞেস করলেন, ‘সবকিছু ঠিক আছে? তোমাকে এমন বিপন্ন দেখাচ্ছে কেন?’

আমি তাকে সেই ভয়াবহ ঘটনা বর্ণনা করলাম। পুরো ঘটনা শুনে আমার বাবাও দুঃখ পেলেন। এমনকি এখনো যখন আমি সেই নির্মম ঘটনাটির কথা স্মরণ করি, তখন আমার চোখে জলের ধারা নেমে আসে। ঘটনার পর বেশ কয়েক দিন আমি শোকাতুর ছিলাম। এ ঘটনার পর পুরবিয়ারা শহরে রাজত্ব করতে শুরু করল। তাদের আদেশ-নির্দেশের তালিকাটা বড় হতে থাকল: আন্ধের নগরি ছুপাত রাজা (বোকাদের রাজত্বে দুর্বৃত্তের শাসন)।

শহরের অধিবাসীদের অবস্থা শোচনীয় হয়ে উঠল। কারণ ন্যায়বিচার পাওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। তারা এ অভূতপূর্ব, অনাকাঙ্ক্ষিত সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে ঈশ্বরের সহায়তা চাইল। আমরা শান্তি পাব এবং শহরের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হবে তখনই, যখন এ অত্যাচারীরা শহরে ছেড়ে যাবে।

ব্রিটিশ, শহরের দোকানপাট ও স্থানীয় জনসাধারণকে লুটে নিয়ে ব্রিদোহীরা এরই মধ্যে যথেষ্ট ধন-সম্পদের মালিক হয়ে গিয়েছিল। এত নগদ অর্থ রাখার জায়গা না থাকায় তারা অর্থকরীকে স্বর্ণমুদ্রায় রূপান্তর করে এবং নিজেদের কোমরে বেঁধে রাখে। এ রকম অবস্থায় স্বর্ণমুদ্রার দাম পড়ে গেল। একটা স্বর্ণমুদ্রার মূল্যমান মাত্র ৩০ রুপিতে গিয়ে ঠেকল। অন্যদিকে শহরের মানুষ ক্ষুধায় মরতে লাগল, কর্মশালাগুলো বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কারুশিল্পী ও লেখকরা অলস সময় কাটাতে লাগলেন।

 

হুমায়ুনের সমাধিতে সম্রাট

এবার শহরে ব্রিটিশ সেনাদের প্রবেশ নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ উপস্থাপন করব। লাহোরি দরজার হাবিলদার যখন খবর দিল যে, ব্রিটিশ সেনারা লাহোরি দরজার দিকে এগোচ্ছে, তখন প্রকৃতপক্ষে ব্রিটিশরা আক্রমণ শুরু করে দিয়েছে। সিয়া বুর্জে কোনো মানুষ না দেখে ব্রিটিশরা মই দিয়ে তাতে চড়ে বসল। তারা সিয়া বুর্জে ওঠার পর কাছাকাছি প্রাচীরে থাকা পুরবিয়া সেনারা লাফিয়ে নেমে পালিয়ে গেল। লাহোরি দরজার প্রাচীরে অবস্থান করা সেনারা ও বুর্জের ওপর থাকা গোলন্দাজরাও পালিয়ে গেল। শহরের বাইরে অবস্থান করা ভারতীয় সেনারা সেখানেই রয়ে গেল। শহরের প্রাচীরে অবস্থান করা সেনারা পালিয়ে গিয়ে তাদের সঙ্গে যোগ দিল।

এভাবে ব্রিটিশ সেনারা শহরে প্রবেশ করল আর যারা বাইরে ছিল, তারা সেখানেই রয়ে গেল। শহরে এখন শুধু স্থানীয় জনগণ। সব পুরবিয়া (বিদ্রোহী সেনা) পালিয়ে গিয়েছিল। লাহোরি দরজা থেকে দিল্লি দরজা পর্যন্ত শহরময় ব্রিটিশ সেনারা ছড়িয়ে পড়েছিল। পাহাড়গঞ্জ থেকে জেলহাইজ পুরো এলাকা তারা ঘিরে ফেলেছিল। সন্ধ্যা নাগাদ ব্রিটিশ সেনারা বিভিন্ন বাড়িতে ঢুকে স্থানীয়দের হত্যা করা শুরু করল। পুরো শহর জনশূন্য হয়ে পড়ল। দোকানপাট বন্ধ। মানুষের ঘরে খাবার ছিল না। অনেকে ক্ষুধায় মরতে লাগল। বিপন্ন শহরবাসী তাদের নারী ও শিশুদের নিয়ে সব সম্পদ পেছনে ফেলে শহর ছাড়তে লাগল। এ রকম চলল তিনদিন। তৃতীয় দিন সন্ধ্যায় সম্রাট কেল্লা ত্যাগ করে হুমায়ুনের সমাধিতে চলে গেলেন।

সর্বহারা মানুষের কষ্ট, ঘরের বাইরে কোনোদিন পা না রাখা নারীদের পর্দার বাইরে আসার বেদনা, ক্ষুধার্ত শিশুদের কান্না যে কারুর চোখে পানি আনবে। যিনি এ দৃশ্য দেখেছেন, একমাত্র তার পক্ষেই এ বেদনা অনুভব করা সম্ভব।

‘কেয়ামতের চেয়ে এ যন্ত্রণা কম নয়

আল্লাহ যেন এমন দৃশ্য আর না দেখান।’

 &dquote;হুমায়ুনের

বিদ্রোহী সেনাদের পিছু হটা

পরদিন সকাল ৯টার মধ্যে শহরের বাইরে অবস্থান করা বিদ্রোহী সেনাদের গোলাগুলি ফুরিয়ে যায়। এরপর অনিশ্চয়তার মধ্যে তারা তাদের তাঁবু গুটিয়ে তল্পিতল্পা নিয়ে স্থান ত্যাগ করে।

বিদ্রোহীদের কর্মকর্তা সম্রাটের কাছে গিয়ে তাকে অনুরোধ করে বলেন, ‘হুজুর, অনুগ্রহ করে আমাদের সঙ্গে চলুন। আমরা এখানে যুদ্ধে হেরে গেছি। আমরা অন্য কোনোখানে নতুন যুদ্ধক্ষেত্র খুলে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব।’

সম্রাট জবাব দিলেন, ‘আমি তোমাদের সঙ্গে যাব না। তোমরা আমার ঘরবাড়ি উজাড় করে আমার প্রজাদের ধ্বংস করতে এসেছিলে। আর সেটা তোমরা করেছ। আমার ভাগ্যে যা লেখা ছিল, তা হয়েছে এবং আরো যা লেখা আছে, তা সামনে ঘটবে। তোমরা যেখানে পারো চলে যাও।’
বিদ্রোহীরা অনুরোধ করতে থাকল, কিন্তু সম্রাট সাড়া দিলেন না। একসময় তারা চলে গেল।

সম্রাটের বন্দি হওয়া

পরদিন দিল্লি দরজা খুলে গেল। সন্ডার্স সাহেব (অন্য সব ঐতিহাসিক বিবরণীতে এই ইংরেজ কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করা হয়েছে মেজর হাডসন। খুব সম্ভবত তখন দিল্লির কমিশনার সি. বি. সন্ডার্সের সঙ্গে জহির হাডসনকে গুলিয়ে ফেলেছিলেন।)  সম্রাটকে বললেন, ‘সম্রাটের সম্মানে, অকৃতজ্ঞ বাঘিয়া ফৌজকে শহর থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে। এবার তারা তাদের শাস্তি পাবে। শহর এখন ফাঁকা। হুজুর, অনুগ্রহ করে শহরে ফিরে চলুন, যাতে সেখানে আবার মানুষজনের বসবাস শুরু হয়।’

বাদশাহ বললেন, ‘ফিরে গিয়ে আমি কী পাব? শহরের সঙ্গে আমার আর কী সম্পর্ক রয়েছে? আমাকে আমার পূর্বপুরুষের সমাধিতেই থাকতে দিন, যেন আমি একটু শান্তি খুঁজে পাই। আমার সঙ্গে আপনাদের যা করার, তা এখানেই করুন। আমাকে সেখানে নিয়ে কেন অপমান করতে চান? আমি আপনাদের উদ্দেশ্য বুঝি।’

মৌলভি রজব আলী সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বললেন, ‘এমন ধরনের চিন্তা মাথায় আনবেন না। দয়া করে আমাদের সঙ্গে চলুন। বেগম সাহেবা নওয়াব জিনাত মহলও আমাদের সঙ্গে থাকবেন।’

এবারো সম্রাট ‘না’ করলে হয়তো তাকে সমাধি ছেড়ে যেতে হতো না। কিন্তু দুর্ভাগা বাদশাহ ‘বিসমিল্লাহ’ বলে তার হাওদায় উঠে সমাধি ত্যাগ করলেন।

জিনাত মহল তার পালকিতে উঠলেন। সম্ভবত তরুণ শাহজাদা জওয়ান বখত ও শাহ আব্বাসও তার সঙ্গে ছিলেন। তবে এ বিষয়ে আমি পুরোপুরি নিশ্চিত নই।

সবাই যখন দিল্লি দরজার কাছে পৌঁছলেন, তখন সন্ডার্স সাহেব সবাইকে থামতে বললেন। তিনি সবার উদ্দেশে বললেন, ‘বাবা লোগ, তোমাদের সবার শহরে ঢোকা সমীচীন হবে না। ব্রিটিশ সেনারা সারা শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে দাঙ্গার আশঙ্কা আছে। তোমরা সবাই এখানেই থাকো। শহরে একটা ব্যবস্থা করতে পারলে তোমাদের সবাইকে ডাকব।’ তিনি সম্রাটের দেখভালের জন্য ৮৪ জন বয়স্ক মানুষকে বাছাই করলেন। সম্রাটকে শহরে নিয়ে রাখা হলো লাল কুনে জিনাত মহলের প্রাসাদে। অন্যদের অস্ত্র ত্যাগ করতে বলা হলো, নতুবা তাদের বিদ্রোহী বলে গণ্য করা হবে। সবাই তাদের অস্ত্র সমর্পণ করলেন।

শহরে সরকারের তরফ থেকে নির্দেশ জারি করা হয়েছিল যে, যার কাছে অস্ত্র পাওয়া যাবে, তাকেই অপরাধী ও বিদ্রোহী হিসেবে বিবেচনা করা হবে। শহরের সব মানুষ অস্ত্র সমর্পণ করল। কারণ ব্রিটিশদের মোকাবেলা করার সাহস তাদের ছিল না। আর সে রকম কিছু করলেও কোনো ফল হতো না। সাধারণ মানুষ দরজা বন্ধ করে চুপচাপ ঘরে বসে ছিল। বাজারে এমনকি একটা পাখিও উড়তে দেখা যায় না।

 &dquote;

তৈমুর বংশীয় শাহজাদাদের হত্যাকাণ্ড

লম্বা কাহিনী এবার সংক্ষেপে বলি। সম্রাটকে শহরে ফিরিয়ে নেয়ার পরদিন সন্ডার্স সাহেব অশ্বারোহী সেনাদের একটি দল নিয়ে হযরত নিজামুদ্দিনের দরগায় গেলেন।

মির্জা ইলাহি বক্সের সহায়তায় সন্ডার্স সাহেব তৈমুর বংশীয় ৩০ জন শাহজাদাকে গ্রেফতার করেন, যাদের মধ্যে ছিলেন বাদশাহের পুত্র, নাতি ও জামাই। এদের সবাইকে দিল্লির দেয়ালের বাইরে নিয়ে হত্যা করা হলো। তিনি তাদের কর্তিত মস্তক সম্রাটের কাছে পাঠালেন।

 

শান্তিপ্রিয় জনগণের ওপর গণহত্যা

শহরের ভেতরে থাকা জনগণের পরিণতি এবার বর্ণনা করব। এ বেচারারা ভেবেছিল, ব্রিটিশরা তাদের রক্ষাকর্তা হবে। কারণ তারা সবসময়ই তাদের প্রতি অনুগত ছিল। তারা অকৃতজ্ঞ ফৌজ-ই-বাঘিয়ার শহর ছাড়ার জন্য দিন-রাত প্রার্থনা করেছে। তারা হূদয় দিয়ে ব্রিটিশ সরকারের শুভানুধ্যায়ী ছিল।

ব্রিটিশ সেনারা শহরের বাড়িঘরে পাইকারি ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে তাদের বিজয় উদযাপন করল। তারা খালি বাড়িঘরে ঢুকে লুটপাট চালায়। ঘরে নারী-পুরুষ যে কাউকে পেলেই তলোয়ারের মাথায় বিদ্ধ করে।

আমি শুনেছি যে, এ মহল্লা থেকে ১ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেফতার করে তাদের সবাইকে রাজঘাট দরজা থেকে নদীর দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেখানে তাদের গুলিতে উড়িয়ে দেয়া হয়। মরদেহগুলো নদীতে ছুড়ে ফেলা হয়।

নারীরা তাদের শিশুদের নিয়ে ঘর থেকে দৌড়ে বেরিয়ে এসে কুয়ায় ঝাঁপিয়ে পড়লেন। কুচা চেলার (বর্তমান চাঁদনী চকের চাঁদনী মহল) কুয়াগুলো মরদেহে পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল।

আমার কলম আর চলছে না। এসব নিয়ে আর লেখার সাহস আমার নেই। ব্যক্তিগতভাবে এসব অনুসন্ধানের সাহস আমার নেই। মানুষের কাছে যা শুনেছি, তা-ই আমি লিখেছি। দোষ-ভুল যা থাকবে, তা বিবরণদাতাদের।

নারী-পুরুষরা শহরের বাইরে বিতাড়িত হওয়ার পরে সক্রিয় হয়ে উঠল গুপ্তচররা। কিছুদিন আগে যারা অকৃতজ্ঞ বাঘিদের পক্ষে কাজ করেছিল, তারা এবার টাকার জন্য ব্রিটিশদের পক্ষে যোগ দিল। তারা ব্রিটিশদের লুকিয়ে থাকা স্থানীয় মানুষ ও সম্পদের খোঁজ দিত এবং এর ফলে ব্রিটিশরা সেখানে লুটপাট চালাত। একজন মানুষের সন্ধান দিলে তারা ২ রুপি পেত। অনেক শহরবাসীকে ব্রিটিশরা ফাঁসি দিয়েছিল এ গুপ্তচরদের সহায়তায়।

দিল্লি ত্যাগ

আমরা চার-পাঁচদিন বরফখানায় কাটিয়ে দিলাম। সেখানেই শুনতে পেলাম যে রাজকীয় নিরাপত্তারক্ষীদের দলনেতা মির নওয়াবকে ব্রিটিশরা ফাঁসিতে ঝুলিয়েছে। খবরটা শুনে আমরা সবাই ভীত হয়ে পড়লাম। নওয়াব হামিদ আলী খান সাহেব আমার মাকে বললেন, ‘এই ছেলেদের আর এখানে থাকা উচিত হবে না। তাদেরকে এখান থেকে দূরে কোথাও পাঠিয়ে দিন। ব্রিটিশরা কাউকে জীবিত রাখবে না। আপনি-আমি বুড়ো হয়ে গেছি, আমাদের নিয়ে চিন্তা নেই।’ এটা আমার আরো আগেই করা উচিত ছিল। আমি বাবাকে গিয়ে বললাম, ‘নওয়াব সাহেব ঠিক বলেছেন। এখন যা সময়, তাতে আমাদের সব ভাইয়ের উচিত এখান থেকে চলে যাওয়া।’ বিসমিল্লাহ বলে খাজা সাহেবের নাম নিয়ে আমি বেরিয়ে পড়লাম।

 

বিপর্যয় (পানিপথ ছাড়িয়ে বেরিলি)

একদিন সকালে আমি আরেক দিল্লিওয়ালা জং বাজ খানকে (সম্রাটের অশ্বারোহী বাহিনীর সদস্য) নিয়ে বেরিলি বাজারে গেলাম। এক মুসলিম দোকানির কাছে গেলাম জুতা কিনতে।

&dquote;&dquote;দোকানি জিজ্ঞেস করল, ‘আপনারা কোথা থেকে এসেছেন?’

আমি জবাব দিলাম, ‘দিল্লি’।

সে বলে উঠল, ‘তোমরা সব ভীতুর দল! দিল্লিকে দখল হতে দিয়ে এখন পালিয়ে এসে সাহায্য চাইছ।’

আমি চুপ করে থাকলাম কিন্তু জং বাজ খানের শরীরে মোগল রক্ত বইছে, তার ওপর তিনি উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি দোকানিকে বললেন, ‘পুত্র, চিন্তা করো না। ব্রিটিশরা এখানেও আসবে আর তখন তুমি তোমার স্ত্রীর আঁচলের তলায় গিয়ে লুকাবে।’ জং বাজের এ কথা শেষ হতে না হতেই দোকানি চিত্কার করে আমাদের দেখিয়ে আশপাশের মানুষকে বলতে লাগল, ‘বন্ধুরা তাড়াতাড়ি আসুন। এরা ব্রিটিশদের চর।’

আমাদের দুজনকে শিকল দিয়ে বেঁধে স্থানীয় কেল্লায় নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে আমাদের জেনারেল সাহেবের সামনে হাজির করে বলা হলো, ‘এরা ব্রিটিশদের চর। এবার দেখুন জেনারেল সাহেবের ন্যায়বিচারের নমুনা! তিনি অভিযোগ শুনেই নির্দেশ দিলেন, ‘এদের কামানের মাথায় বেঁধে গোলা দিয়ে উড়িয়ে দাও।’ সঙ্গে সঙ্গে আমাদের কামানের মাথায় বাঁধা হলো। কামানে বারুদ ভরে বেরিলির গভর্নর নওয়াব খান বাহাদুর খানের কাছে খবর পাঠানো হলো যে দুজন ব্রিটিশ চর আটক করা হয়েছে এবং তাদের উড়িয়ে দেয়ার জন্য তার নির্দেশ প্রয়োজন। আমরা তখন কলেমা পড়ে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছি। কিন্তু আল্লাহ সর্বশক্তিমান। তিনি অজানা উত্স থেকে সহায়তা পাঠান এবং আমাদের নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করলেন।  হঠাত্ আমরা দেখলাম একদল লোক সাদা পোশাক পরা একজন ব্যক্তির নেতৃত্বে কেল্লা থেকে বেরিয়ে আসছে। সোনালি ঘোড়ায় চেপে মাথায় সাদা পাগড়ি পরিহিত মানুষটি আমাদের দিকেই এগিয়ে আসছিল। তিনি এসে ভিড় সরিয়ে দিতে সিপাহিদের নির্দেশ দিলেন। তিনি জং বাজের কাছে গিয়ে বললেন, ‘আরে, জং বাজ! তুমি এখানে এলে কীভাবে?’

জং বাজ বললেন, ‘আমাকে না দেখে আমার সঙ্গীকে দেখো।’

অশ্বারোহী আমাকে দেখেই লাফিয়ে ঘোড়া থেকে নেমে আমাদের বাঁধন কেটে দিলেন। তারপর আমাদের নিয়ে গেলেন জেনারেলের কাছে। জেনারেলকে ভর্ত্সনা করে তিনি বললেন, ‘তোমরা বাদশাহের প্রাসাদ ধ্বংস করেছ, দিল্লি ধ্বংস করেছ, দিল্লির জনগণকে শেষ করেছ, তাও তোমাদের শিক্ষা হয়নি। আরে, তারা বাদশাহের কর্মচারী। ব্রিটিশদের হাত থেকে বাঁচতে পালিয়েছেন। তারা গুপ্তচর নন! কোনো তদন্ত ছাড়াই তুমি তাদের মৃত্যুদণ্ড দিয়ে দিলে।’ আমাদের সেই রক্ষাকর্তার নাম ছিল মির ফাতেহ আলী।