তাহলে এটি ভারতীয় সংগীতের সমার্থক হয়ে দাঁড়াল কীভাবে?
অস্তিত্বের ২৩০ বছরের মেয়াদে জন্ম নিয়ে মরে ফের বেঁচে ওঠা একটা বাদ্যযন্ত্রের কাহিনী এটি। হারমোনিয়ামের ধারণা গড়ে উঠেছিল ইউরোপে। কিন্তু আজ বিপুলভাবে এশিয়ায়, বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশে এর অবস্থান যে অনেকেই ভুলক্রমে একে ভারতীয় বাদ্যযন্ত্রই ভেবে বসেন।
কোনো একটি ধারণা বা উদ্ভাবনের অতীতে গিয়ে সঠিকভাবে তার সূচনাবিন্দু বের করা কঠিন। তবে কোথাও তো শুরু করতে হবে। হারমোনিয়ামের প্রটোটাইপের নকশা করেছিলেন কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিশ্চিয়ান গটলিয়েব ক্রাতজেনস্টাইন নামে সংগীতের নন, বরং শারীরবিদ্যার এক অধ্যাপক। একজন একাডেমিক হিসেবে ক্রাতজেনস্টাইন মানবশরীরে বিদ্যুতের প্রভাব সম্পর্কে গবেষণা করেছিলেন। বিশ্বাস রয়েছে যে, মেরি শেলি তার গবেষণায় এতটাই বিমোহিত হয়ে পড়েনে যে, অ্যধাপক ধ্রুপদী উপন্যাস ফ্রাংকেনস্টাইনের অন্যতম অনুপ্রেরণায় পরিণত হন। তিনি এমনকি গল্পের বৈজ্ঞানিকের নাম হিসেবে তার পদবি পর্যন্ত গ্রহণ করেছিলেন।
ফরাসি সংযোগ
প্রফেসর ক্রাতজেনস্টাইন মোটেই কোনো দানব সৃষ্টি করেননি। একেবারেই উল্টো তার সৃষ্টি। শারীরবিদ্যার পরীক্ষা-নিরীক্ষার অবসরে ক্রাতজেনস্টাইন সংগীত নিয়ে মেতে থাকতেন। উলম্ব পাইপের মতো দেখতে চীনা ফ্রি-রিড বাদ্যযন্ত্র শেঙ তাকে মুগ্ধ করে রেখেছিল। বেশ কয়েক শতাব্দ আগেই মার্কো পোলো ইউরোপে শেঙকে পরিচিত করেছিলেন। ১৭০০-এর দশক নাগাদ বেশ উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় ইউরোপে আমদানি হচ্ছিল শেঙ। সেগুলোরই একটা কোপেনহেগেনের পথ হয়ে ক্রাতজেনস্টাইনের দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছিল।
প্রফেসর সাহেব ওটার ফ্রি-রিডের পাশাপাশি স্ফটিকস্বচ্ছ সুর ও নেপথ্যের পদার্থবিদ্যায় পুলকিত বোধ করেছেন। ১৭৭৯ সালে সেন্ট পিটার্সবার্গের একাডেমি অব সায়েন্স অর্গানের ‘ভোক্স হুমানা’র মতো একটি বাদ্যযন্ত্রে স্বরবর্ণের ধনি গঠনের জন্য পুরস্কার ঘোষণা করে। ক্রাতজেনস্টাইন ফ্রি-রিড লাগানো একটা ছোট নিউমেটিক অর্গান তৈরি করে একাডেমিতে প্রদর্শন করে পুরস্কার বগলদাবা করেন।
অন্যরাও একই ধরনের যন্ত্র বানানো শুরু করেন। ভিয়েনায় আন্তন হেইকল ফ্রি-রিডময় ফিশারমোনিকা নামে একটা কিবোর্ড বাদ্যযন্ত্র তৈরি করেন। জন গ্রিস আবিষ্কার করেন সেরাফাইন, ধাতব রিডের ওপর দিয়ে বাতাস প্রবাহিত করলে সংগীত সৃষ্টি করত সেটা। এ ধরনের বাদ্যযন্ত্র এখন জাদুঘরের সামগ্রীতে পরিণত হয়েছে।
গ্যাব্রিয়েল জোসেফ গ্রিনিয়ে অর্গি এক্সপ্রেসিফ (প্রকাশক অর্গান) উদ্ভাবন করেছিলেন, তার রিডযন্ত্রটির বিস্তৃত আওতা ছিল এবং স্বরের ওঠা-নামা তুলে ধরতে পারত। ফ্রান্সের আলেক্সান্দার ডিবেইন গ্রিনিয়রে বাদ্যযন্ত্রটিকে আরো উন্নত করে ১৮৪০ সালে পেটেন্ট করে এর নাম রাখেন হারমোনিয়াম।
হারমোনিয়াম ছোট আকারের অর্গানের মতো, পায়ে চালানো হাঁপরের সাহায্যে একটি চাপ সমতাকারী বাতাস ধারকের ভেতর দিয়ে হাওয়া ঢোকানোর ফলে ধাতব রিডগুলোয় (এক প্রান্তে আটকানো) কম্পন সৃষ্টি করে। বিভিন্নভাবে আওয়াজ নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। হাঁটু দিয়ে চালানো ভালভের সাহায্যে, বাতাস ধারককে পাশ কাটিয়ে যেতে দেয়ার সুযোগ করে দেয়া কিবোর্ডের ওপর বসানো গতিরোধকের সাহায্যে এবং হাঁপর চালাতে প্রযুক্ত শক্তি দিয়ে।
ইউরোপীয়রা যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানোর সময় অভিযোজিত দেশে হারমোনিয়ামকে পরিচিত করে তোলে এবং অচিরেই ম্যাসন অ্যান্ড হেমলিন ও এস্টি অর্গান কোম্পানির মতো আমেরিকান প্রতিষ্ঠানগুলো বাদ্যযন্ত্রটির উত্পাদন শুরু করে। ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দের গোড়ার দিকে হারমোনিয়াম জনপ্রিয়তার তুঙ্গে পৌঁছে গিয়েছিল। ব্যয়বহুল পাইপ অর্গান কেনার মতো সাধ্য ছিল না যাদের, সেসব ছোট ছোট গির্জা ও সিনাগগ এগুলো খুবই পছন্দ করত।
হাতবদল
হারমোনিয়াম ওজনের দিক থেকে অর্গানের চেয়ে হালকা ও আকারে ছোট বলে পরিবহন ছিল সহজতর। পথে ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা ছিল কম। এ কারণে বহু মোটামুটি সচ্ছল পরিবারই লিভিং রুমের জন্য এর ফরমাশ দিয়েছিল। পিয়ানোর মতো তাপ ও আর্দ্রতা হারমোনিয়ামের অতটা ক্ষতি করতে পারত না। ফলে এশিয়া, আফ্রিকা ও ক্যারিবিয়ানে পাশ্চাত্য শক্তিগুলোর ট্রপিক্যাল কলোনিগুলোয় এগুলো পাঠানো জুতসই ছিল।
পশ্চিমা ধ্রুপদী সংগীতজ্ঞরা বিশেষ করে হারমোনিয়ামের কথা মাথায় রেখেই বিভিন্ন সুর বাঁধতে শুরু করেছিলেন। এদের ভেতর ছিলেন বোহেমীয় কম্পোজার আন্তোনিন দভোরাক, জার্মান কম্পোজার সিগফ্রিড কার্গ-এলার্ট, ফরাসি কম্পোজার লুই ভিয়ের্নে, রুশ কম্পোজার দিমিত্রি শোস্তাকোভিচ ও আমেরিকান কম্পোজার উইলিয়াম বার্গসমা। অনেকে যেমন বিশ্বাস করে থাকেন, বেলজীয় কম্পোজার সিজার ফ্র্যাঙ্কের সংগ্রহ ল’অর্গানিস্তে পাইপ অর্গান নয়, বরং হারমোরিয়ামের জন্যই রচিত ছিল।
পুরো লাইমলাইট ঝলমল করার এ সময় দুই এমনকি তিন কিবোর্ডঅলা হারমোনিয়ামও তৈরি হয়। ওগুলোর বড় আকারের হাঁপরের প্রায়ই বাদ্যযন্ত্রী যথারীতি ফুট পেডাল চালানোর সময় একটা লিভারের সাহায্যে বাড়তি পাম্পের কাজে একজন সহকারীর প্রয়োজন পড়ত।
টক্সিডো ও ইভনিং গাউন, হীরা ও শ্যাম্পেইনের মতো বনেদি চেহারা লাভ করেছিল হারমোনিয়াম। কিন্তু অ্যাপালাশিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকান লোকগীতি হারমোনিয়াম গ্রহণ করায় সে ধারণা ভণ্ডুল হয়ে যায়। বাদ্যযন্ত্রটি বিপুলভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠায় দেশাত্মবোধক গানেও এটা ব্যবহার করা হয়েছে।
স্ক্যান্ডিনেভিয়া, বিশেষ করে ফিনল্যান্ডের লোকসংগীতের ক্ষেত্রে হারমোনিয়াম একটি গুরুত্বপূর্ণ বাদ্যযন্ত্র হয়ে দাঁড়ায়। ঊনবিংশ শতাব্দের মাঝামাঝি নাগাদ বাদ্যযন্ত্রটি ইউরোপ এলাকা থেকে উধাও হয়ে গেলেও ১৯৮০-এর দশক পর্যন্তও বহু স্ক্যান্ডিনেভীয় ব্যান্ড ও স্কুলের অ্যাসেম্বলির অনিবার্য অংশ রয়ে গিয়েছিল। ফিনল্যান্ডের সমসাময়িক কম্পোজার মিলিয়া ভিলিয়ামা ও তিমো আলোকোতিলা হারমোনিয়ামের সদ্ব্যবহার অব্যাহত রেখেছেন।
বিংশ শতাব্দের গোড়ার দিকে বাদ্যযন্ত্রটির পতনের সূূচনা হয়। সংগীতের ক্ষেত্রে রুচি বদলের মানে ছিল ঘরে ঘরে এটা আর জনপ্রিয় বাদ্যযন্ত্র ছিল না। ১৯৩০-এর দশকে আবিষ্কৃত ইলেকট্রনিক অর্গানই ছিল শেষ আঘাত। চকচকে নতুন জিনিসটার পাইপ অর্গানের মতোই সংগীতের আওতা ও সুরের মান এবং হারমোনিয়ামের মতো আকার ও দাম ছিল। এমনকি আরো ভালো, হারমোনিয়ামের চেয়ে অনেক বেশি রোধক ছিল এর। এবং পাম্প করার জন্য কোনো হাঁপরের অস্তিত্ব ছিল না।
এছাড়া মামলামুখী আমেরিকায় পেটেন্ট আইন ভূমিকা রাখতে শুরু করেছিল। হারমোনিয়াম উত্পাদনকারীরা তাদের বাদ্যযন্ত্রের অ্যাকশন মেকানিজমের পেটেন্ট করতে পারত বলে এ খাতে নামা বিভিন্ন কোম্পানিকে নতুন কিছু জুড়ে দিতে হতো বা বর্তমান কোনো কিছুর তাত্পর্যপূর্ণ পরিবর্তন ঘটাতে হতো। এমনকি সেটা সামান্য একটা ক্র্যাংক বা শ্যাফট হলেও। এবং এমআইডিআই সাউন্ড সিস্টেম নিয়ে আধুনিক ইলেকট্রনিক কিবোর্ড অস্তিত্ব পাওয়ার পর হারমোনিয়ামের জন্য শোকসংগীত গাওয়ার সময় এসে গিয়েছিল।
ভারতে দ্বিতীয় জীবন
তাই কি ছিল? পৃথিবীর উল্টো পাশে ভিন্ন এক কাহিনীর জট খুলছিল।
হারমোনিয়ামের সহজ বহনযোগ্যতা (অর্গান, হার্পিসকর্ড ও পিয়ানোর সাপেক্ষে) এবং তাপ প্রতিরোধের ক্ষমতার মানে ছিল ব্রিটিশরা বাদ্যযন্ত্রটিকে তাদের বিভিন্ন কলোনির বাসাবাড়ি ও গির্জার জন্য রফতানি করতে পারছিল। এভাবে বেশকিছু ইউরোপীয় হারমোনিয়াম ভারতে পৌঁছে যায় এবং ভারতীয় সংগীতজ্ঞদের নজরে পড়ে।
তেমনই একজন সংগীতজ্ঞ ছিলেন দ্বারকানাথ ঘোষ। কলকাতার একটি অন্যতম নেতৃস্থানীয় বাদ্যযন্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ছিল তার দ্বারকানাথ অ্যান্ড সন্স। ১৮৭৫ সালে ইউরোপীয় হারমোনিয়ামের অর্ধেক আকারের ভারতীয় হ্যান্ড-হারমোনিয়ামের নিজস্ব ভাষ্য বের করেন তিনি। কিবোর্ডের নিচে পায়ে চালানো হাঁপরের জায়গায় এটার কিবোর্ডের পেছনে হাতে চালানো হাঁপরে পাম্প করা হতো।
হারমোনিয়ামের এ নয়া অবতার অনেক বেশি স্থায়ী, কম তৈরি ব্যয় এবং রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত সহজ ছিল। অভ্যন্তরীণ মেকানিজমও সহজীকরণ করে ভারতীয় ধ্রুপদী সংগীতের জন্য মানানসই করে তুলতে ড্রোন স্টপ যোগ করেন ঘোষ।
পরবর্তী সময়ে একটা স্কেল বদলানোর মেকানিজম যোগ করা হয়। এছাড়া ভারতীয় সংগীতজ্ঞরা প্রথাগতভাবে সংগীতানুষ্ঠানের সময় মেঝেতে বসতেন, তো পরিবর্তিত হারমোনিয়াম জমিনে রেখেই বাজানো যেত। তবে এমন অভিযোজনকে সম্ভব করে তোলা মৌলিক পার্থক্যটা ছিল এই: পাশ্চাত্য সংগীত ধ্বনিনির্ভর এবং ভারতীয় সংগীত সুরনির্ভর। সুতরাং এক হাতে হাঁপর চালিয়ে আরেক হাতে সুর তোলা খুবই সম্ভব। কিবোর্ডের ওপর দুই হাত ব্যবহারের দরকার পড়ে না। ভারতবর্ষ নিজস্ব হারমোনিয়াম উত্পাদন শুরু করে এবং ১৯১৫ সাল নাগাদ বাদ্যযন্ত্রটি বিশ্বের নেতৃস্থানীয় উত্পাদকে পরিণত হয়।
বহিরাগতের চিহ্ন নিয়ে যেকোনো আগন্তুকের মতোই হারমোনিয়ামকে বহু ভারতীয় বাদ্যযন্ত্রী সন্দেহের সঙ্গে গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু গণপত রাও ও গোবিন্দ তেম্বের মতো সুপরিচিত পারফর্মাররা তাদের ধ্রুপদী সংগীতানুষ্ঠান ও মারাঠি অপেরায় যুক্ত করলে ঈর্ষাভরা সমীহ লাভ করে। এরপর রাজনীতি এ গ্রহণযোগ্যতাকে ব্যাহত করে।
বেসুরো সুর
১৯০৫ সালে ব্রিটিশদের বাংলাকে পূর্ব ও পশ্চিম বাংলায় বিভাজন জাতীয়তাবাদী স্বদেশী আন্দোলনের সূচনা ঘটায়। এর অন্যতম দিক ছিল, ব্রিটিশ সবকিছুই বর্জন ও ভারতীয় পণ্য গ্রহণ করতে হবে। এবং হারমোনিয়াম (ব্রিটেন নয়, বরং ইউরোপীয় মহাদেশেই এর সূচনা ঘটার কথা ভুলে যান) পরিণত হয় নিশানায়।
হারমোনিয়াম-পূর্ব আমলে সারেঙ্গি বাদকরা ভারতীয় কণ্ঠশিল্পীদের সঙ্গ দিতেন। মানবীয় কণ্ঠের কাছাকাছি বলা হলেও সারেঙ্গি বাদন আয়ত্ত করা কৌশলগতভাবে কঠিন ছিল এবং প্রতিটি রাগের ক্ষেত্রেই নতুন করে টিউন করতে হতো। এছাড়া ঐতিহাসিকভাবে পতিতাবৃত্তি ও উদ্দীপক সংগীতের সঙ্গে সম্পর্কিত থাকায় কোনো কোনো পারফর্মার একে বর্জন করেছিলেন।
কণ্ঠশিল্পীদের সঙ্গত দেয়ার জন্য পছন্দের বাদ্যযন্ত্র হিসেবে হারমোনিয়াম সারেঙ্গির জায়গা দখল করে নিতে শুরু করে। কিন্তু জাতীয় পরিচয়ের রাজনীতি ও ‘বিদেশী’ হিসেবে হারমোনিয়ামে অবমূল্যায়নের কারণে (যদিও দ্বারকানাথ ঘোষ নামে একজন বাঙালিই এর ভারতীয়করণ করেছিলেন) পুরনো সারেঙ্গিই ফের আনুকূল্য পায়। পতিতাবৃত্তি ও ব্যভিচারের কলুষ বিদায় নিয়েছিল। পুরনো সারেঙ্গি ভারতীয় হওয়ায় নোংরা খুদে বিদেশী হারমোনিয়ামের চেয়ে নন্দিত হয়ে ওঠে।
হারমোনিয়ামের সীমাবদ্ধতাও ছিল। ভারতীয় সংগীতের প্রায় বারো উপস্বরের মাত্রা পাশ্চাত্য সংগীতের প্রায় কাছাকাছি হলেও দুটির ভেতর লক্ষযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। স্বরের ভারতীয় ধারণা বিশেষ কোনো শব্দের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, বরং ছায়া ও দ্যোতনার চিত্রবিচিত্র সম্ভাবনার বৈশিষ্ট্যের আওতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
কোনো কিবোর্ড যন্ত্রই স্বরের এ চাহিদা পূরণ করতে পারবে না; কেবল একটি সুর বাজানোর পরই অন্য একটা সুর বাজাতে পারে। এভাবে হারমোনিয়াম বীণা বা সেতারের মতো করে মীঢ় বা গমক তৈরি করতে পারত না। সুতরাং হারমোনিয়াম ভারতীয় ধ্রুপদী সংগীতের ক্ষেত্রে অতিজনপ্রিয় কম্পন অলঙ্কার তৈরি করতে পারে না। দুটো ভিন্ন ভিন্ন রাগে কোনো একটি স্বরের সূক্ষ্ম সুর পার্থক্য রয়েছে; হারমোনিয়াম কার্যকরভাবে এগুলো তুলে আনতে পারে না বলে সংগীতজ্ঞরা দাবি করেছেন।
এসবই হারমোনিয়ামবিরোধী বাহিনীর ব্যবহারের অস্ত্রে পরিণত হয়। বাদ্যযন্ত্রের খোদ নামটাই সুর তুলতে এর নকশা করা হয়েছে বোঝায়। সুর ও তন্ত্রী ধরতে যুগপত্ দুই বা ততোধিক চাবিতে চাপ দিতে হয়। এটা অশুভের যন্ত্র, চিত্কার করে বলেছে শুদ্ধবাদীরা, ভারতীয় সংগীতের ক্ষতি ডেকে আনবে এমন ফ্রাঙ্কেনস্টাইন সুলভ দানব।
অল ইন্ডিয়া রেডিও (সে সময় ভারতে বাণিজ্যিক বেতার সম্প্রচারের ক্ষেত্রে একচেটিয়া দাপট ছিল এর) ১৯৪০ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত এর বেতার তরঙ্গে যন্ত্রটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। এখন সমবেত সংগীতে হারমোনিয়াম অংশ হিসেবে হারমোনিয়ামের অনুমোদন থাকলেও একক হারমোনিয়াম বাদন এখনো নিষিদ্ধ রয়েছে।
ক্রমবর্ধমান গ্রহণযোগ্যতা
গোড়ার দিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে বাদ্যযন্ত্রটি খুবই প্রিয় ছিল। বহু গানের সুরারোপে তিনি এটি ব্যবহার করেছেন। তবে পরে কেবল এর সংগীতবিষয়ক সীমাবদ্ধতার কারণে বিরূপই হয়ে ওঠেননি, বরং সোজাসাপ্টা এর নিন্দা করে শান্তিনিকেতনের আবাসিক বিদ্যালয়ে এর ব্যবহার পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছেন।
কিন্তু হারমোনিয়াম মোটেই অনুরাগীবিহীন ছিল না। পণ্ডিত ভীম সেন, ওস্তাদ গোলাম আলী খান ও বেগম আখতারের মতো ভারতীয় ধ্রুপদী সংগীতের রথী-মহারথীরা গান গাওয়ার সময় সঙ্গী হিসেবে হারমোনিয়ামকেই বেছে নিয়েছিলেন। হারমোনিয়ামের সমৃদ্ধ বিরামহীন একটা সুর ছিল, যা একমাত্র বেহালাবাদকই অকম্পিত হাত ও নিপুণ ছড়ি নিয়ন্ত্রণের সাহায্যে তাল মেলাতে পারতেন। এছাড়া রাজনীতিকেই দোষারোপ করা উচিত— সঠিক পরিবেশ গঠন ও গায়কের ভেতর থেকে সেরাটা বের করে আনার ক্ষেত্রে বাদ্যযন্ত্রটি সবচেয়ে বেশি জুতসই ছিল না?
হারমোনিয়ামের অন্য ভালো দিকও ছিল। সন্দেহাতীতভাবে সারেঙ্গি বা বেহালার চেয়ে এটা আয়ত্ত করা ঢের সহজ ছিল। সমবেত সংগীতের ক্ষেত্রে এটা ছিল অনন্য। গোটা কনসার্ট হলকে ভরিয়ে তোলার পক্ষে যথেষ্ট জোরালো এবং সংগীত ও গানের মৌলিক বিষয়গুলো বিদ্যার্থীদের জানানোর একটা মূল বাদ্যযন্ত্রে পরিণত হয়েছিল। হিন্দু ও শিখ গোষ্ঠীগুলো পারকাশনের ছন্দের জন্য তবলা বা ঢোলক এবং প্রায়ই ঘণ্টা ও ঝাঁজ ব্যবহার করে দ্রুতই এটিকে তাদের ভক্তিমূলক গানের (ভজন, কীর্তন, ধুন, শাবাদ) সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছিল।
খ্রিস্টানরাও পিছিয়ে ছিল না। আমেরিকান ও ইউরোপীয়রা যেমন এককালে গির্জা সংগীতের জন্য একে কাজে লাগিয়েছিল, ঠিক তেমনি ভারতীয় ভাষায় শ্লোক গাইতেও এটা ব্যবহার করেছে। হারমোনিয়াম সেই সপ্তম শতকের ইসলামের সুফি তরিকার ভক্তিমূলক গান কাওয়ালির প্রধান এবং অনেক সময় একমাত্র বাদ্যযন্ত্রে পরিণত হয়। হারমোনিয়াম এখন যুক্তিসঙ্গতভাবেই ভারতীয় উপমহাদেশের চারটি ধর্মীয় ঐতিহ্যের ভক্তিমূলক গানের একটি বাদ্যযন্ত্র হিসেবে সুনাম লাভ করেছে।
বিরোধিতা সত্ত্বেও হারমোনিয়াম সংগীতের ব্যাপক বিস্তারে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে: সমগ্র ভারত বর্ষের গ্রামীণ লোকসংগীত, গজল (সংগীতায়োজন করা উর্দু কবিতা), কত্থক, ঠুমরি ও খেয়াল। এমনকি ভারতীয় চলচ্চিত্র শিল্পও উন্মুক্ত হূদয়ে হারমোনিয়ামকে আলিঙ্গন করেছে। হারমোনিয়াম জনপ্রিয় বিনোদনের একটি বাদ্যযন্ত্রে পরিণত হয়েছে।
বৈশ্বিক পুনরাবির্ভাব
ইউরোপীয় হারমোনিয়াম এর বস্তুগত উপযোগিতার দিক থেকে মৃত ও বিলুপ্ত হয়ে গেছে। কেবল অ্যান্টিক শপ, জাদুঘর ও বাদ্যযন্ত্র সংগ্রাহকদের বাড়িতেই এর দেখা মেলে। এখনো কবর থেকে মাঝেসাঝে সামান্য সাড়া তোলে এটা। বিটলস ‘দ্য ইনার লাইটস’, ‘ডক্টর রবার্ট,’ ‘উই ক্যান ওয়ার্ক ইট আউট,’ ‘ক্রাই বেবি, ক্রাই’, ‘রকি র্যাক্কুন’সহ তাদের বহু গানেই এটি ব্যবহার করেছে। লিস হ্যানিগান তার অ্যালবাম ‘সি স’, পিঙ্ক ফ্লয়েড ‘দ্য ফাইনাল কাট’ ও কুইন ‘তিও তারিওতে/ লেট আস ক্লিং টুগেদার’-এ এর পূর্ণ সদ্ব্যবহার করেছেন।
আগেই যেমন উল্লেখ করা হয়েছে, ঊনবিংশ শতাব্দ বিংশ শতাব্দে বাঁক নেয়ার মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রে ইউরোপীয়দের অভিবাসনের বিপুল ধারা ইউরোপীয় হারমোনিয়ামকে আমেরিকায় পরিচয় করিয়ে দেয়। সেখানে এটি বিস্মৃত হওয়ার আগে বিকাশ লাভ করেছিল। একইভাবে ভারতীয় হারমোনিয়ামও বিংশ শতাব্দের প্রথমভাগে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছে যায়, কিন্তু ১৯৫০-৬০-এর দশকের এশীয় অভিবাসনই একে জনপ্রিয় করে তুলেছিল।
নারী অধিকার, বর্ণ সম্পর্ক ও ভিয়েতনাম যুদ্ধের মতো বিভিন্ন বৈসাদৃশ্য উপাদানে ইন্ধন লাভ করা একটি প্রতিষ্ঠানবিরোধী আন্দোলন আমেরিকান কাউন্টারকালচারেরও সময় ছিল সেটা। বিপুলভাবে ইসকন নামে পরিচিত কৃষ্ণ সচেতনতা গড়ে তোলার লক্ষ্যে সোসাইটি ফর কৃষ্ণ কনশাসনেসের প্রতিষ্ঠাতা বিবেকানন্দ স্বামী প্রভুপদ গোড়ার দিকের বছরগুলোয় অ্যালেন গিন্সবার্গের মতো বিটনিকদের সাহায়তা পেয়েছিলেন।
ততদিন হারমোনিয়াম ভক্তিমূলক সংগীতের প্রতিষ্ঠিত বাহনে পরিণত হওয়ায় ইসকন সদস্যদের এর ব্যবহার সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বিটনিক ও হিপ্পিরা বাদ্যযন্ত্রটির প্রতি আকৃষ্ট হয়। গিন্সবার্গ অবিরাম এটি বাজাতেন। ১৯৬৮ সালের সেপ্টেম্বরে রক্ষণশীল লেখক ও ধারাভাষ্যকার উইলিয়াম এফ বাকলি জুনিয়রের ‘ফায়ারিং লাইন’ টেলিভিশন শোয় এটা বাজিয়ে হরে কৃষ্ণ মন্ত্র গাওয়ার ঘটনাটি বিখ্যাত হয়ে আছে।
তবে প্রতিভাবান কিছু মানুষ একে ভারতীয় সংগীতের বাহন হিসেবে আরো বেশি কাঙ্ক্ষিত করে তুলতে নতুন নতুন পরিবর্তন যোগ করার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ায় হারমোনিয়ামের বিবর্তন এখনো অব্যাহত রয়েছে। ইউরোপীয় সংগীতের সঙ্গে মানানসই করে তুলতে চীনা ধারণাকে অভিযোজিতকারী ডক্টর ক্রাতজেনস্টাইনের বিস্মৃত পদচিহ্ন অনুসরণ করে সংগীতের ক্ষেত্রে নিজের উদ্দীপনাকে ধারণ করতে একটি ফার্মাসিউটিক্যাল করপোরশনের চাকরি থেকে ইস্তফা দেয়া আরেক ডাক্তার বৈদ্যধর ওকে নামে এক ফার্মাকোলজিস্ট ভারতীয় ধ্রুপদী সংগীতের প্রয়োজনীয় ১২টি শ্রুতি বাজানোর ক্ষমতাসম্পন্ন একটি হারমোনিয়াম উদ্ভাবন করেন।
পাশ্চাত্য সংগীত যেখানে সপ্তম মাত্রা (সি-ডি-ই-এফ-জি-এ-বি, কিংবা জনপ্রিয় বুলিতে ডো-রে-মি-ফা-সো-লা-তি) এবং পুনরাবৃত্ত স্বরগ্রামভিত্তিক, ভারতীয় ধ্রুপদী সংগীত সাত সুরের চলমান মাত্রা (সা-রে-গা-মা-পা-ধা-নি) এবং পাশাপাশি উপস্বরসহ উপস্বরের চেয়ে ক্ষুদ্রতর আনতি প্রয়োগ করে থাকে। ওকে ৭৫ বছর ধরে হারমোনিয়াম প্রস্তুতকারী একটি প্রতিষ্ঠানের কারুশিল্পীর সঙ্গে কাজ করে চাবির নিচে নব যুক্ত করে প্রয়োজনীয় মাইক্রোটোন তৈরির ক্ষমতাশালী একটি বাদ্যযন্ত্র তৈরি করেন, যেগুলো টেনে অতিরিক্ত রিড ক্রিয়াশীল করা যায়। ঠাকুর খুব সম্ভব কবর থেকে হেসেছেন।
অন্য উদ্ভাবকরাও ব্যস্ত রয়েছেন। পণ্ডিত বিশ্বদেব বেদী হারমোনিয়ামকে স্বরমণ্ডলের সঙ্গে একীভূত করেন এবং তার শিষ্য পণ্ডিত মনোহর চিমোতি নকশা উদ্ভাবন করেন। চিমোতি এ নতুন বাদ্যযন্ত্রটির নাম রাখেন সম্বাদিনি।
স্থবির যেকোনো কিছুই মৃত্যুবরণ করে। বিবর্তিতটি টিকে থাকে। নতুন নতুন রূপের ভেতর দিয়ে হারমোনিয়াম একবিংশ শতাব্দের পথ ধরে এগিয়ে যাবে বলেই মনে হয়।






