প্রয়াণ-পরবর্তী দ্বিশতবর্ষ পেরিয়ে ‘লালনকে চেনা না চেনা’র ডিসকোর্স হাজির করা নিশ্চয়ই সঙ্গত ও যৌক্তিক। যদিও কোনো কোনো প্রশ্নের উত্তর হ্যাঁ বা না’র নৈর্ব্যক্তিকতায় জারি রাখা বিপজ্জনক, নৈয়ায়িক মূল্যায়নের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। অবশ্য এ যুক্তি যে সবসময় টেকে না ধোপে, তাও জানা অনেকের। বরং এর সঙ্গে ‘অটিজম’কে যুক্ত করে এর শক্তি-সামর্থ্য ও শুভকর দিককে করা হয়েছে খর্ব ও প্রশ্নবিদ্ধ। কেননা প্রশ্ন হাজির করা এবং সুলুকসন্ধান করা মানবপ্রবৃত্তির অংশ নয় শুধু, সভ্যতা বিনির্মাণের আবশ্যক অনুষঙ্গ। কারণ প্রশ্নের মাঝেই নিহিত থাকে যুঝে-বুঝে নেয়ার পরম সম্ভাবনা ও জ্যোতির্ময় প্রজ্ঞা। পাথরে পাথরে ঘর্ষণেই কিন্তু সম্ভব হয়েছিল আগুনের আবিষ্কার। আর রবীন্দ্রনাথ তো কায়মনেই বলেছেন, ‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে।’ এ কারণে প্রশ্নকে এড়িয়ে যাওয়া কিংবা আড়াল করার মধ্যে নেই কোনো বাহাদুরি। প্রশ্নের মধ্য দিয়ে ডায়লগে যাওয়া সম্ভব। এছাড়া এ ব্যতিরেকে এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি বিশেষ কোনো তরিকা। ছোট্ট পরিসরের এ লেখায় আমরা প্রশ্ন ও ডায়লগের মিথস্ক্রিয়া ‘লালনকে চেনা না চেনা’র বাস্তবতা করব নিরূপণ ও অনুসন্ধান।

লালন (লালন মানে লালন ও ওর গান) যেহেতু এখনো আমাদের মাঝে রয়েছে ডগমগে রূপে বিরাজিত, তাই বলা যেতেই পারে, লালন আছেন এবং আমরা তাকে চিনেছি। সেই অর্থে অবশ্যই লালন আমাদের চেনা। এ কথা তো সত্যি, লালনের গান এখন ছেঁউড়িয়ার আখড়া থেকে বেরিয়ে, নদীয়ার ভূগোল ছাড়িয়ে ছড়িয়ে গেছে অনেক দূর। লালন এখন বাঙাল মুলুকে তো বটেই, বাঙালির বিশ্ব অভিবাসনের নিমিত্তে পৃথিবীব্যাপীই গেছে ছড়িয়ে। ‘জাত গেল জাত গেল’ আহাজারি এখন শুধু জেলা কুষ্টিয়ায় নয়, মিডিয়াতেও পড়ে আছড়ে। কান পাতলেই শুধু না, বন্ধ রাখলেও ভিজুয়াল মিডিয়ার সুবাদে ফকফকা দেখা যায় লালনের হূদয়তাড়িত নিবেদন, জাত গেল জাত গেল বলে/ একি আজব কারখানা/ সত্য কাজে কেউ নয় রাজি/ সবি দেখি তা না-না-না।/ আসবার কালে কি জাত ছিলে/ এসে তুমি কি জাত নিলে,/ কি জাত হবা যাবার কালে/ সে কথা ভেবে বল না।/ ব্রাহ্মণ চণ্ডাল চামার মুচি/ এক জলেই সব হয় গো শুচি,/ দেখে শুনে হয় না রুচি/ যমে তো কাকেও ছাড়বে না।/ গোপনে যে বেশ্যার ভাত খায়,/ তাতে ধর্মের কি ক্ষতি হয়।/ লালন বলে জাত কারে কয়/ এ ভ্রম তো গেল না।

টেলিভিশন, ইউটিউব দুনিয়ার বদৌলতে শহুরে ড্রয়িংরুমও এখন বেমক্কাই দেখা যায় লালনের হাজিরা খাতা। কিন্তু সেখানে কতটা লালন থাকেন হাজির, সে প্রশ্ন আমরা করি না কখনো।

শুধু কি টেলিভিশন কিংবা ভার্চুয়াল মিডিয়া, প্রিন্ট মাধ্যমেও লালন সরব। বই পাড়ায়

লালনসংক্রান্ত বইপত্রও রয়েছে সটান দাঁড়িয়ে। বেড়েছে লালনপ্রেমী গবেষক, শুভানুধ্যায়ী, অনুরাগীর সংখ্যা। দেশ বিভাজনের সীমারেখা ছাড়িয়ে, কাঁটাতার পেরিয়ে ওপারেও লালন খুঁজে ফিরছেন মনের মানুষ। ছড়িয়ে দিচ্ছেন সুরের আর্তি, বলছেন: মিলন হবে কত দিনে/ আমার মনের মানুষের সনে,/ চাতক প্রায় অহর্নিশি/ চেয়ে আছি কালো শশী,/ হব বলে চরণ দাসী/ ও তা হয় না কপাল গুণে,/ আমার মনের মানুষের সনে। /মেঘের বিদ্যুত্ মেঘেই যেমন/ লুকালে না পাই অন্বেষণ,/ কালারে হারায়ে তেমন/ ঐ রূপ হেরি এ দর্পণে,/ আমার মনের মানুষের সনে।/ যখন ও রূপ স্মরণ হয়,/ থাকে না লোকলজ্জার ভয়,/ লালন ফকির ভেবে বলে সদাই/ (ঐ) প্রেম যে করে সে জানে,/ আমার মনের মানুষের সনে/ মিলন হবে কত দিনে/ আমার মনের মানুষের সনে।

কিন্তু এপার-ওপার, কোনো পারেই লালন তার মনের মানুষ পাননি, মুক্তি মেলেনি, মিলন হয়নি। পরমাত্মাকে উহ্য রেখে ইহজাগতিকতাকে প্রাধান্য দিয়ে আমরা যদি জিজ্ঞাস্য হই লালন মনের মানুষ পেল কিনা, তাহলে কোনো প্রকার দ্বিধা না রেখেই বলা যায়, না, লালন তার মনের মানুষ পায়নি। কারণ আমরা লালনকে চিনতে পারিনি। লালনকে চেনার জন্য, লালনের সিলসিলা বোঝা ও জানার জন্য যে অধ্যয়ন, অনুশীলন, গবেষণা ও অভিনিবেশ দরকার, তার কোনোটাই এখনো নয় দৃশ্যমান। লালনকে নিয়ে যেসব গবেষণা এখন পর্যন্ত উপস্থিত ও অধীত, তা ব্যক্তিলালনকে অনেকখানি করেছে ধোঁয়াশামুক্ত। পাশাপাশি লালনের ছড়ানো-ছিটানো-হারানো-বিলীনপ্রায়-দুষ্প্রাপ্য গানগুলোকে দিয়েছে পুনর্জীবন। সংকলক-সংগ্রাহক ও ব্যক্তিলালনের প্রামাণ্য জীবনীকার হিসেবে নমস্য কাজটি করেছেন আবুল আহসান চৌধুরী। পূর্বসূরিদের লালন গবেষণার বিতর্কিত ও সংশয়িত বিষয়গুলোর খোলনলচে পাল্টে দিয়ে হাজির করেছেন যুক্তিসঙ্গত ও প্রশ্ননির্ভার বিবেচনাগুলো। আহমদ শরীফ, অন্নদাশঙ্কর রায়, সুধীর চক্রবর্তীর মতো বিদ্বত্জনরা লালনবিষয়ক প্রবন্ধাদি মারফত লালন গবেষণায় যুক্ত করেছেন গতি ও নতুন অভিঘাত। ওদের এ প্রয়াস শ্রদ্ধার্হ। এদের বাইরে লালন গবেষেণায় অনেকেই যুক্ত হলেও তারা লালনের জীবন ও গান নিয়ে নতুন কোনো ডিসকোর্স ধরেননি মেলে। এমনকি লালনের গানের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ-মূল্যায়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে দাঁড় করাননি নতুন কোনো তত্ত্বকাঠামো। অথচ লালন ও তার গান নিয়ে লেখালেখির পরিমাণ নয় হ্রস্ব। চর্বিতচর্বণ ও চাপানউতোরের এ ছক্কা হাঁকানোর প্রবণতায় স্পষ্ট যে, লালনকে আজো হয়নি চেনা। কিংবা চেনার যে চর্চা বা স্কুলিং দরকার, তা রয়ে গেছে আরশিনগরের পড়শির মতোই। লালন বলেছেন: বাড়ির কাছে আরশিনগর/ সেথা এক পড়শি বসত করে।/ আমি একদিনও না দেখিলাম তারে।/ গেরাম বেড়ে অগাধ পানি/ নাই কিনারা নাই তরণী পারে।/ মনে বাঞ্ছা করি দেখব তারে/ কেমনে সে গাঁয় যাই রে।/ কি বলবো সেই পড়শির কথা/ তার হস্তপদ স্কন্ধমাথা নাইরে।/ ক্ষণেক থাকে শূন্যের উপর/ ক্ষণেক ভাসে নীরে।/ পড়শি যদি আমায় ছুঁতো/ যম যাতনা সকল যেতো দূরে।/ সে আর লালন একখানে রয়/ তবু লক্ষ যোজন ফাঁক রে।

বাস্তবিকই আমরা নানাভাবে নানা মাধ্যমে লালন প্রেমে থাকলেও আমাদের মাঝে রয়ে গেছে লক্ষ যোজন ফাঁক। লালন যেমন বলেছেন, ‘সে আর লালন একখানে রয়/ তবু লক্ষ যোজন ফাঁক রে।’ মুশকিলটা এখানে লক্ষ যোজন ফাঁক হওয়ায় দূরীভূত কিংবা উত্পাটিত লালনকে চেনা হয়নি আমাদের। অথচ লালনকে চেনা জরুরি, লালন যে বিশ্ববিদ্বতসমাজের জন্য কোন মাপের এবং কোন স্তরের আলোকনির্দেশক, তা আমরা আজো পারিনি করতে নির্ণয় ও নিরূপণ। লালনকে এখনো ন্যাড়ার ফকির বলে ভ্রম করা হয়, এ থেকে বুদ্ধিবৃত্তিক জায়গায় আজো হয়নি খুব একটা নড়নচড়ন। লালন প্রেম-নিবেদন, উত্সর্গ ও সংলগ্নতায় তাকে চেনা বা আবিষ্কারের চ্যালেঞ্জের স্থলে রয়েছে ‘লালন’ নামক ব্র্যান্ডের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত ও জাহির করার প্রবণতা। ভাষা মাধ্যমে গান ও সুরের আশ্রয়ে লালন যে দর্শন দিয়েছেন আমাদের। তার গভীরতা ও মর্মার্থ উদ্ধারে আমরা কি নিবেদিত? এ নিয়ে প্রারম্ভিক পর্যায়ের কোনো প্রয়াস-প্রচেষ্টা ও এষণা মিলেছে কি কোথাও? লালন গানে ও সুরে দর্শনের কথা বলেছেন এমনটা হাওয়ায় ওড়া কথন ঘুরপাক খায় লালনীয়দের বারান্দায়। কিন্তু সে দর্শন সংজ্ঞায়নের-বিশ্লেষণের-ব্যাখ্যার-প্রতিতুলনার-সিদ্ধান্তের স্কুল কোথায়? লালন তো নয় শুধুই একজন গীতিকার কিংবা সুরকার। নয় একজন বাউল প্রতিভূ, যদিও আমরা তাকে দিয়ে রেখেছি বাউল সম্রাটের উষ্ণীষ। আমরা মহাত্মা আখ্যাও দিয়েছি ওকে। এ উপমহাদেশে অবিভক্ত ভারতে ও আজকের বিভাজ্য ভারতবর্ষে দুজনই কেবল হয়ে উঠেছেন মহাত্মা। একজন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, অন্যজন লালন। এখন আমরা যদি মোহনদাসকে বিংশ শতকের নায়ক বলি, লালন তাহলে ঊনবিংশ শতকের নায়ক নয় কি? বুদ্ধর অহিংসা বাণী ধারণ করে করমচাঁদ হয়ে উঠলেন অহিংসার বার্তাবাহক। তার জন্মদিনকে শ্রদ্ধা জানিয়ে জাতিসংঘ প্রবর্তন করল অহিংস দিবস। মার্টিন লুথার কিং, নেলসন ম্যান্ডেলা গান্ধীতে অনুপ্রাণিত ও উদ্বুদ্ধ হয়ে হলেন পরবর্তী সময়ের নায়ক। আর আমাদের লালনকেই হলো না চেনা। আমরা হয়ে উঠতে পারলাম না আজো তার মনের মানুষ।

ট্র্যাজেডি হলো, লালন ও রবীন্দ্রনাথ একই শতকের হওয়ায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সম্ভবত পুরো মনোযোগ লালন পাননি। যেভাবে পেয়েছিলেন, লালন সিলসিলার আরেক মহাপুরুষ কবীর। রবীন্দ্রনাথের অনুপ্রেরণায় ও প্রযত্নে ক্ষিতিমোহন সেনের মতো ব্যক্তিত্ব নিবেদিত হয়েছিলেন কবীর অনুসন্ধান ও অধ্যয়নে। সেই কবীর, যার বাণী ও জীবনকর্মে মুগ্ধ হয়ে মাও সে তুং বলেছিলেন, আমি যদি চারজনকে ভালোবাসি, তাহলে তার একজন কবীর। আমরা জানি, শুধু ক্ষিতিমোহন সেন নয়, রবীন্দ্রনাথের অভিভাবকত্বে, আকাঙ্ক্ষায় অনেকেই সে সময় বিবিধ বিষয়ে গবেষণা করেছেন, সংগ্রাহকের ভূমিকা পালন করেছেন। ‘মহাভারতের সমাজ’ নিয়ে সুখময় শাস্ত্রীর যে আভিধানিক অবদান, তার নেপথ্যে তো ছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথই। এ কারণেই এ প্রসঙ্গের অবতারণা যে রবীন্দ্রনাথ লালনের গানের খাতা করেছিলেন সংগ্রহ, ভারতবর্ষ পত্রিকায় লালনের গান করেছিলেন প্রকাশিত, হির্বাট বক্তৃতায় লালনকে করেছিলেন উল্লেখ ও মূল্যায়ন। এতদ্বিধ ঋণ স্বীকার ও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেও বলতে হয়, তার প্রযত্ন ও দিকনির্দেশনায় লালনকে চেনার জন্য যদি কেউ হতেন নিবিষ্ট, তাহলে হয়তো আজকে আর লালন ততটা অচেনা থাকতেন না, যতটা রয়েছেন আজো।

তার পরও লালনকে প্রথমবারের মতো পাদপ্রদ্বীপের আলোয় নিয়ে এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথের আবিষ্কৃতি সেই লালনের কথা ও সুরের ঐন্দ্রজালিক আলোকায়নে তাকিয়ে শুধু বিস্ময় ও বিমুগ্ধ হলেই চলবে না। লালনকে চেনার জন্য যা যা করার, তা-ই করা প্রয়োজন ও জরুরি। দার্শনিক লালনের ওপর আমরা ন্যাড়ার ফকির বলে যে তকমা লাগিয়েছি, ওরা গুহ্যধর্ম চর্চা ও সাধনা করে বলে যে দেয়াল, আড়াল ও উপেক্ষার লাল সালু ঝুলিয়ে রেখেছি, তা করতে হবে দূর। লালনকে হবে চিনতে, অন্যদের হবে চেনাতে। বিশ্বপাঠশালায় যত বেশি ছড়িয়ে দেয়া যাবে লালনদর্শন, তত বেশি হবে মঙ্গল পৃথিবীর, কল্যাণ হবে আমাদের। লালন বলেছেন, ‘পণ্ডিত কানা অহংকারে/ মাতবর কানা চোগলখোরে/ সাধু কানা অন বিচারে/ আন্দাজে এক খুঁটি গেড়ে চেনে না সীমানা কার।’ আমরা কানার দলে নাম না লিখে খুলে বসি আজ লালনীয় স্কুল আর লালনকে চিনি এবং চেনিয়ে দিই বিশ্বমাঝে।

 

লেখক: গবেষক ও সাংবাদিক