[লেখক পরিচিতি: আমেরিকান গল্পকার, শিশুসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক। জন্ম ১৯৫৮ সালে, টেক্সাসে। পড়াশোনা, বেড়ে ওঠা শিকাগো-ওক ফরেস্ট-কলোরাডোয়। সিরাকাস বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রিয়েটিভ রাইটিং বিষয়ে অধ্যাপনা করছেন। লেখালেখির শুরু আশির দশকে। রাশান লেখকদের দ্বারা যেমন অনুপ্রাণিত হয়েছেন, তেমনি আমেরিকান লেখকদেরও দ্বারস্থ হয়েছেন নানা অনুষঙ্গে। লেখকদের তালিকাটাও বেশ সমৃদ্ধ— গোগল, পুশকিন, চেকভ, মার্ক টোয়েন, হেমিংওয়ে, শেরউড, রেমন্ড কার্ভার প্রমুখ। নিজের লেখালেখিকে একসময় অবজেক্টিভিজম বা ‘উদ্দেশ্যবাদী’ ঘরানার অভিধা দিলেও সময়ের সঙ্গে সেটি পাল্টে গিয়ে ‘নব্য রক্ষণশীলতা’র সঙ্গে সাজুয্য রাখছে। সম্প্রতি উপন্যাস লিংকন ইন দ্য বার্দোর জন্য জিতেছেন ২০১৭ সালের ম্যান বুকার প্রাইজ। এছাড়া ঝুলিতে রয়েছে ‘ন্যাশনাল ম্যাগাজিন অ্যাওয়ার্ড, ওয়ার্ল্ড ফ্যান্টাসি অ্যাওয়ার্ড ফর বেস্ট শর্ট স্টোরি, পিইএন অ্যাওয়ার্ড ইত্যাদি।]

 

যেকোনো শহরের ঘরবাড়ি বিন্যাসের মধ্যে যে ছন্দ থাকে, ঠিক সেই ছন্দকে অটুট রেখে আমাদের ব্লকের শেষ দুটো বাড়ির দখলদার দুজন বিধবা, যাদের স্বামী পূর্ব ইউরোপের জাতিগত দাঙ্গায় মারা গেছে। বাবা ওদের ‘বোহেমিয়ান’ ডাকতেন। বাবা অবশ্য ধবধবে সাদা চামড়ার কাউকে দেখলেই ওই ডাক ছাড়তেন। তার নজরে যখনই একজন ভবঘুরে পড়ত, তখনই চেক ভাষা থেকে ইংরেজিতে ঢুকে পড়া এ শব্দটির এক বিকৃত রূপ বের হতো মুখ দিয়ে। যা-ই হোক, বিধবাদের কেউই চেক প্রজাতন্ত্রের ছিলেন না, আদতে শান্ত প্রকৃতির, ভদ্র। বাবার এসব টিপ্পনীতে কান না দিয়ে আলতো করে এড়িয়ে যেতেন।

মিসেস পোলটয়, শক্তপোক্ত গড়নের ভবঘুরে, যুদ্ধের সময়টা কাটিয়েছেন একটা ঘুপচি মতো জায়গায়, পাঁচ চাচাতো ভাইবোনের সঙ্গে আলু ছিলতে ছিলতে। ফলে বদ্ধ পরিবেশে আটকাবস্থায় থেকে থেকে তার মেজাজ-মর্জি হয়ে উঠেছিল খিটখিটে, খাবারদাবারের প্রতি অতিশয় আগ্রহীও। ধরুন, ওনার কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আপনি কিছু একটা খাচ্ছেন, দেখবেন নির্নিমেষে তিনি আপনার দিকে তাকিয়ে আছেন, খাবারের শেষ অংশটুকু গলাধঃকরণ করা পর্যন্ত। পোলটয় সবসময় কালো রঙের জামাকাপড় পরেন। তিনি মনে করেন, ক্যাথলিক গির্জাগুলো একেকটা সাজানো গোছানো পতিতালয়, গরিবের রক্ত চোষাই যার কাজ। তিনি এও মনে করেন, আমেরিকা ছিল বখে যাওয়া শিশুদের মতো, যার জন্ম অনন্ত দুঃখের সাগরে। আমরা শিশুরা খেলার সময়, বলটা বেমক্কা তার পাচিলের ভেতর ঢুকে পড়লেই সেটা তিনি বাড়ির পেছনের আঙিনায় যে খোদলটা আছে, সেখানে আটকে রাখতেন।

অন্যদিকে মিসেস হোপানলিস্কি, ছিপছিপে গড়নের হাসি-খুশি মানুষ। শিশুদের জন্য নানা রকমের খেলনা বানাতেন। একদিন ওর কাছ থেকে আধখেচড়া বানানো একটা কুকুরছানা নিয়েছিলাম। ওটা টুপির ওপর গেঁথে বাসায় ঢুকতেই মা বললেন, ‘তোর ওই অচল সিকিটা যেখান থেকে এনেছিস, সেখানেই ফেরত দিয়ে আয়। এহ্ কি এক রাজাবাদশার খেলনা রে!’ মায়ের কাছে শরণার্থী শিবির, গণহত্যা, ২০ বছর আগের সেই রেলপথের গোড়াপত্তন সবকিছুই ধোঁয়াশার মতো, ভারী ত্রিপলে ঢাকা ওয়াগন যেন। একদিন মিসেস হোপানলিস্কি যখন জানালেন যে, একদা তাদের পরিবারও বেশকিছু ক্রীতদাসের মালিক ছিল, মা নড়েচড়ে বসলেন। মায়ের মনে এক ধরনের ছক কাটা ছিল, এ তথ্যে সেটা ভেস্তে গেল খানিকটা। যানকারলোর পেছন দিকে আমরা একটা গ্যারেজ ভাড়া নিয়েছিলাম, বাবার আসলে খেলাধুলার সরঞ্জামের ব্যবসা ছিল, যা তিনি ততদিনে সাবড়ে দিচ্ছেন বলা যায়। তার ন্যাশনাল ফুটবল লিগের ‘এনএফএল’ মার্কা হেলমেটটাও ততদিনে ঝরঝরে হয়ে পড়েছে। স্কুল থেকে ফেরার পথে প্রায়ই দেখতাম, আমাদের দোকানটার ঝাপ ফেলা। দেখতাম, এক পঙ্গু পৃথিবীতে বেনিয়ে দেলমোনিকোর নকল পা বল নিয়ে মাঠজুড়ে দৌড়ে বেড়াচ্ছে। ওই অচল সিকির বদলায় মিসেস হোপানলিস্কিকে একটা প্লাস্টিকের স্যুভেনির দিয়েছিলাম। জিনিসটা পেয়ে তিনি বলেছিলেন, চিরদিন সেটা জানালার চৌকাঠের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখবেন। এক সপ্তাহ না যেতে না যেতেই তিনি সেটা এলিজাবেথ দ্য রাকুনকে দিয়ে দিয়েছিলেন। আমি কিছু মনে করিনি। রাকুন তো আমার বয়সীই। তাছাড়া তার তেমন কোনো খেলনাও ছিল না। বজ্জাত কেল্ট ভাইয়েরা ওকে রাকুন নামে ডাকত। কারণ ওর চোখের কোল দুটো ছিল বালিশের মতো ডুমো ডুমো, অনিদ্রার ফসল। রাকুনের বাবা-মা সারাক্ষণ ঝগড়া করত। ভোর থেকে শুরু করে গভীর রাত অবধি। মাঝে মধ্যে দেখা যেত, অন্তর্বাস পরা অবস্থায়ই উঠানের মধ্যে ওরা খিস্তিখেউড়ে মেতে উঠেছে। আর এ দুর্ভোগের সঙ্গে লড়তে লড়তেই কিনা রাকুনের মেরুদণ্ডটা বাঁকা হয়ে গিয়েছিল! কেল্ট ভাইয়েরা যখন ওকে ‘রাকুন’ বলে ডাকত, হাত দুটো কচলাতে কচলাতে ওদের জাপটে ধরার জন্য এগিয়ে যেত সে। আসলে ওইটুকু বয়সে এমন ডাকনামে ভূষিত হয়ে কারোর মনোযোগে পড়া তো সে-ই প্রথম! মাঝে মধ্যে ওর মনে হতো, যদি একটা দ্রুতগামী গাড়ির নিচে পড়ে সে মরে যেত, তাহলে পরের জন্মে সত্যি সত্যি একটা রাকুন হয়ে জন্মগ্রহণ করে কেল্ট ভাইদের কামড়ে দিয়ে পাগল বানিয়ে ফেলত।

মিসেস হোপানলিস্কি বলতেন, ‘কখনই অন্যের ক্ষতি করতে চাইবে না। তুমি তো বেশ লক্ষ্মী একটা শিশু।’ তার ইংরেজি বাচনভঙ্গি প্রায় আমাদেরই মতো, সাধারণ আর পরিষ্কার।

রাকুন বলত, ‘রাকুন, মানে একটা লক্ষ্মী রাকুন?’

‘উঁহু, প্রভুর এক সুন্দর সৃষ্টি।’

‘হ্যাঁ। ঠিক বলেছ। তাহলে সেই রাজকন্যার গল্পটা আবার শোনাও।’

ফলে তিনি আবারো শুরু করতেন, রাজকুমারী কী করে নিজের উঠানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখেছিল রাজকুমারের কাণ্ডকীর্তি, নিজের জন্মদাগ সে সাদা চকের গুঁড়ো দিয়ে ঢেকে দিয়েছিল। মাঠে বীজ বপনের গন্ধটা তার নাকে এসে ধাক্কা দিয়ে গেলে রঙচঙা পাতলুনের এক লোক কাঠের সাঁকোটার ওপর দিয়ে শূকরটাকে টেনে এনেছিল, ওটা ছিল তার কার্পেথিয়ানে মানুষ হতে পশুতে রূপান্তরের আগ মুহূর্ত, একদল ক্রুদ্ধ সৈন্যের নিছক ব্যক্তিখেয়ালের বলি। রাতের বেলায় সৈন্যরা তাকে শিকল দিয়ে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখত। কখনো কখনো স্রেফ মজা লুটতে সৈন্যরা ওকে বন্দুকের নল তাতিয়ে ছ্যাঁকা দিত। সেজন্যই সে সবসময় হাঁটু অবধি লম্বা মোজা পরত। তিন বছর পর সে তার শিশুদের খুঁজতে এসেছিল গাঁয়ে, শিশু কবরস্থানে। শিশুগুলো স্বল্পায়ু হলেও ছিল বিস্ময়কর উপহার। ওদের ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রভুর ওপর সে একবারের জন্যও নাখোশ হয়নি। একটা খসে পড়া তারা, কিন্তু কেউ যদি সেই তারাটাকে খসে পড়তে নাও দেখে, তাহলেও কি তার আনন্দে খামতি হবে? সেই খসে পড়া তারাটির উজ্জ্বলতা মিসেস পোলটয়ের প্রতি আমাদের ঘৃণার রেশ বাড়িয়ে দেয়। গাছের তলায় শিকলে বাঁধা পড়ে থাকার সঙ্গে একটা আলুকে ছয় ভাগ করে খাওয়ার কি কোনো তুলনা চলে? গুচ্ছের ভাইবোনদের সঙ্গে হইহল্লা করা আর কারোর নিজের শিশুদের খুন হওয়াটাকে মেলানো যায়?

সেই গ্রীষ্মে আমি দশে পা রাখলাম। আমি আর রাকুন দুজনই বাসাবাড়ির লক্ষ্মণ রেখা পেরোতে শুরু করেছি। আমরা যোগ দিলাম আর্ট সিমিনিয়াকের সঙ্গে। সম্প্রতি কেল্ট ভাইদের লেমনেড পানের জন্য নিমন্ত্রণ করে ফেলেছিল সে ভুলক্রমে। যদিও লেমনেড দূর অস্ত, আর্টের মা আর গ্রেট লেকের এক নাবিক সিমিনিয়াকদের পেল্লায় রোদ বারান্দাটা দখল করে রেখেছিল পুরোটা সকাল।

নতুন এ ত্রিপক্ষীয় বন্ধুতা বেশ চলছিল, গ্যাংওয়েতে দমাদম লম্ফঝম্প, দস্তানা ছাড়াই আগডুম বাগডুম খেলা, পাড়ার কচিকাঁচাগুলোর পেছনে লাগা থেকে শুরু করে নানাবিধ বাঁদরামি।

মোজার্টের ওদিকটায় থাকত ফাঁপা এডি। বয়স ১৭, দেখতে মোটাসোটা, সহজ-সরল। খালি হাতে বাদামের খোসা সে ভাঙতে পারত, তবে তার আগে সেটা ওর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলতে হতো যে ‘ভাঙো’। একবার কে যেন ওর শার্টের পেছনে ‘ফাঁপা’ শব্দটা লিখে জুড়ে দিয়েছিল। সে ওই অবস্থায়ই পাড়াময় ঘুরে বেড়ায়। আর সেই থেকেই ‘ফাঁপা এডি’ নামের ছাপ্পাটা লেগে যায়। এডি দাবি করত যে, সে সপ্তাহের সাতদিন সাত রকমের পাখি দেখতে পায়। সে তালিকায় এমনকি হ্যালোইন পাখি, ক্রিসমাস পাখিও আছে!

একদিন দেখি, পাখি দেখার আশায় এডি জবুথবু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বললাম, ‘আজ কোন পাখি দেখলে?’

‘পার্টি বার্ড। ওদের লেজ থেকে লম্বা লম্বা ছুরির ফলা বেরিয়ে আছে।’

‘তোমার বাড়িতে কোনো অনুষ্ঠান হতে যাচ্ছে?’ আর্ট জানতে চাইল।

স্বলাজ কণ্ঠে এডি জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, পরিকল্পনা আছে একটা।’

‘তোমার বাবা জানে ব্যাপারটা?’

‘না, মানে এখনো জানে না।’

এডি বাড়িতে গোপনভাবে আমাদের না জানিয়ে একটা অনুষ্ঠান করতে যাচ্ছে, যা আমাদের কাছে সম্পূর্ণ অনৈতিক মনে হলো। প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে ওকে আমরা ব্যতিব্যস্ত করে তুললাম। সাব্যস্ত হলো অনুষ্ঠানটা হবে এডিদের গ্যারেজে। পুরনো জঞ্জাল যা আছে, সব ঝেঁটিয়ে বাইরে এনে রাখবে এডি। মেঝে নিশ্চয়ই তেল-কালিতে মাখামাখি। সেক্ষেত্রে এডির কাজ হবে ভেজা ন্যাকড়া দিয়ে ঘষেমেজে পরিষ্কার করা। গানবাজনার বেলায় এডি না হয় ট্রাম্পেটটাই বাজিয়ে দিল!

‘শালা পোঁদ পাকা, তুমি ট্রাম্পেটে কোন বালের সুরটা বাজাবে?’ সিমিনিয়াক একপাক ঝাঁজিয়ে নিল।

‘না, ওই, কিছু বাজাব না। এমনিই ঠোঁট ছুঁইয়ে রাখব আর কি। ঠিক আছে?’

মেয়েদের ক্ষেত্রে, অনুষ্ঠানে নিশ্চয়ই মেয়েরাও আসবে; কেননা এডি ড্রেক রেস্টুরেন্টে কাজ করে আর সেই সুবাদে সে এদের অনেককেই চেনে, তো দায়িত্বটা ওরই। খাবার, অনুষ্ঠানে নিশ্চয়ই খাবারের বন্দোবস্তও থাকবে, পুডিং তো অবশ্যম্ভাবী।

রাকুন বলল, ‘তুমি তো ড্রেক রেস্তোরাঁরই মাল। খাবার নিয়ে আর কিসের ভাবনা!’

‘তা তো বটেই। পুডিং আর অন্যান্য খাবার কী করে জোগাড় করতে হয়, সেটা আমার ওপর ছেড়ে দাও।’

এর কিছুক্ষণ বাদেই সে মিসেস পোলটয়ের দরজায় ঘণ্টি বাজাল এবং কিছু সহযোগিতা করার জন্য অনুরোধ জানাল। পোলটয় পাল্টা জানতে চাইলেন, ‘কী  বিষয়?’ এডি পুনরায় বিষয়টি জানাল। পোলটয় মাফ চাইলেন। এডি মিসেস পোলটয়ের দিকে ফাঁকা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে আবারো সহযোগিতা চাইল। পোলটয় গজরাতে গজরাতে বললেন, ‘মানে মানে কেটে পড়ো।’ এডি নাছোড়বান্দা। সে হয়তো কোনোভাবে জেনেছিল যে, সাহায্য-সহযোগিতা চাইতে গেলে সোফার এক কোণে বসে কাঁচুমাচু ভঙ্গিতে চাইতে হয়। ফলে সে ঘরে ঢুকে সোফায় বসে ধীরে-সুস্থে ব্যাপারটা বোঝাতে চেয়ে, ঘরে ঢুকতে ধ্বস্তাধ্বস্তি শুরু করল। এসবের মধ্যে দরজার হুড়কোয় ওর বড়সড় মাথাটা ঠুকে গেলে রক্তারক্তি কাণ্ড হয়ে যায়। মিসেস পোলটয় চিত্কার করে বললেন, ‘মানুষের সঙ্গে বাস করতে হলে ভদ্রতাটা জানতে হয়।’

১০ মিনিটের মাথায় এডি সিনিয়র মানে এডির বাবাকে মিসেস পোলটয়ের আঙিনায় দেখা গেল। বাগাড়ম্বর স্বভাবের এক ক্ষয়াটে দর্জি।

‘তা সিঁড়ির ওপর এই খেলাটা কখন খেলা হলো?’

‘ও তো শুনছেই না! আমি ওকে বারবার করে বলছি যে পারব না। তবু সে জোর করে ঘরে ঢুকে পড়তে চাইছিল।’

‘সসম্মানেই বলছি, যেকোনো ব্যাপারে সঙ্গে সঙ্গে আমার ছেলের প্রতিক্রিয়া দেখাতে সমস্যা হয়।’

‘তাহলে এমন বোধবুদ্ধিহীন ছেলেকে ঘরে বেঁধে রাখলেই পারো।’

‘আজ পর্যন্ত এডি কখনই কারোর ক্ষতির কারণ হয়নি।’

‘আমি আমারটা বুঝি। পরেরবার এলে পুলিশ ডাকব।’

কিন্তু গলাধাক্কা খাওয়ার পরও ফাঁপা এডি দমে যাওয়ার পাত্র ছিল না।

পরদিন ফের মিসেস পোলটয়ের চিত্কার, ‘যা এখান থেকে।’ ৩ ডলারে একটা খালি কোল্ড ক্রিমের বোতল বেচতে এসেছে এডি!

‘আমাদের অনেক ধরনের নাশতা কিনতে হবে। তাছাড়া যদি মদটদও কিনতে হয়... যদিও পান করা বারণ আমার। পান করলেই আমার নাচের তাল গুলিয়ে যায়।’ বলেই দরজার হাতল ধরে মদ খাওয়ার পর কেমন নাচে, সেটা একপাক নেচে দেখাল।

‘দয়া করে বেরিয়ে যাও এক্ষুনি।’

পাছা দুলিয়ে কাঁদো কাঁদো স্বরে এডি নকল করল, ‘দয়া করে বেরিয়ে যাও এক্ষুনি।’

পোলটয় থানায় ফোন লাগালেন। সাধারণত লেফটেন্যান্ট ব্রুস্কি বেশ খোশমেজাজে এডিকে এটা-ওটা জিজ্ঞেস করেন। যেমন— আজ কোন পাখি দেখা গেল? দিনের বেলায় এমন কোনো পাখি পাওয়া যাবে কি, যে তাকে এবং তার দলকে একটা ফ্রি রাইড দেবে ইত্যাদি। কিন্তু এবারে বিধি বাম। দক্ষিণ উপকূল থেকে বদলি সৈন্য এসেছে এ সপ্তাহে। একদল আর্মেনীয়। ওরা এসেই এডির হাতে হাতকড়া পরিয়ে চ্যাংদোলা করে পুলিশ ভ্যানে তুলে নিল। এডি তখন বলছিল যে, সে আজ একটা নিঃসঙ্গ চঞ্চুহীন পাখি দেখেছে।

হাতকড়া সজোরে আঁটাতে আঁটাতে এক আর্মেনীয় সৈন্য বলল, ‘শয়তানের বাচ্চা, তোমাকে থানায় নিয়ে আজ একটা চঞ্চু দেব।’

একটা কলকলে নদীর সব তরলতা নিয়ে এডি আমাদের দলে শামিল হয়েছিল। রাকুন, আর্ট আর আমি এডিদের সেলাইঘরের দিকে ঝেড়ে দৌড় লাগালাম। দোকানটা মার্কুইয়ের ওদিকে, পড়ো পড়ো, ব্যবসার সলতেটা টিমটিমে। আমাদের দেখামাত্রই এডি সিনিয়র সিঙ্গার সেলাই মেশিনটা চালানো থামিয়ে দিলেন। সিঁড়িঘরের কাছ থেকে একের পর এক জান্তব চিত্কার শোনা গেল।

এডি সিনিয়র তার রক্তাক্ত হূদয় আর হাসিতে আটখান হয়ে আছে এমন মুখের আদলঅলা এডির একটা ছবি নিয়ে হাসপাতালমুখো রওনা দিলেন। হাসপাতালের বিছানায় থ্যাতলানো মুখের এডিকে পাওয়া গেল, হাতে হাতকড়া, স্যালাইনের সূচ ফোঁটানো, ফোঁটা ফোঁটা স্যালাইন চলছে। কোনো এক আর্মেনীয়রই কাজ। ৩০০ ডলার জরিমানায় এডির জামিন রফা হলো। মুখ্য বিচারক তার আদেশনামায় বললেন, ‘এ বয়সের একটা ছেলের পক্ষে জেলখানা জায়গাটা শোভন নয়। সুতরাং তিন মাস অ্যানস্টনে কাটিয়ে আসাটাই ওর জন্য সবচেয়ে সহজ। আমার পক্ষে এর চেয়ে কম সাজা ধার্য করা সম্ভব নয়।’

কিশোর সংশোধন কেন্দ্রটা ছিল অ্যানস্টনে, লাল ইটের তৈরি সাবেকি আমলের একটা বাড়ি, বাড়িটা কাঁটাতারের বেড়ায় ঢাকা। শিকাগোর সব নচ্ছাড় ছেলেপিলেদের শায়েস্তা করতে এখানেই পাঠানো হতো। ‘নচ্ছাড়’ এই অর্থে যে, সেসব ছেলেপিলে যারা মা-বাবা-ভাইদের শত ঠ্যাঙানিতেও বাগে আসেনি, যাদের ‘ভালো ছেলে’ হওয়ার সম্ভাবনা হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। অ্যানস্টন-ফেরত প্রায় প্রতিটি ছেলেই স্ব স্ব এলাকায় দারুণ জনপ্রিয়! যা অন্য ছেলেপিলেদেরকে তাদের পদাঙ্ক অনুসরণে প্রলুব্ধ করে। একজন তার মায়ের প্রেমিককে খুন করেছিল টিনের ঢাকনা খোলার ধাতব পাত মেরে, একজন তার নিজের চোখের পাতা কেটে ফেলেছিল...

ফাঁপা এডি অ্যানস্টনে ঢুকেছিল ডিসেম্বরে, ফিরে এল মার্চে।

এডি যেদিন ফিরে এল, এডিকে স্বাগত জানাতে এডি সিনিয়র প্রতিবেশী সব বাচ্চাকে নিজেদের আঙিনায় জড়ো করলেন। এডির বিপর্যস্ত হাল নিয়ে কেল্ট ভাইদের কোনো মজা করার ফুরসত ছিল না, এমনই বদখত অবস্থা! নাকটা আর জায়গামতো নেই, সামান্য সরে গেছে। ঝুলফি থেকে একটা তেরছা কাটা দাগ চিবুক বরাবর। ওর কাছাকাছি ঘেঁষতেই হাত তুলে থামিয়ে দিল। প্লেটে করে কেক খেতে দিলে, প্লেটটা হাত পিছলে পড়ে গেল, চেঁচিয়ে বলল,  ‘আমাকে একা থাকতে দাও।’

আমাদের সহজাত শয়তানি এবার একটা অভীষ্ট লক্ষ্য খুঁজে পেল। কেল্টদের নেতৃত্বে আমরা মিসেস পোলটয়ের বাড়ির হোসপাইপ কেটে দিলাম, বেজমেন্টের জানালা বলপয়েন্টের কালিতে ফর্দাফাঁই করে দিলাম, বাজার আনার ট্রলিটা ধাক্কা মেরে কাছের নোংরা ডোবাটায় ফেলে দিয়ে তামাশা দেখার জন্য মুখিয়ে রইলাম।

ধীরে ধীরে বসন্তকাল এগিয়ে এল। খনি এলাকাটা পুরোদস্তুর সরগরম হয়ে উঠল। সূর্যটা তাতিয়ে উঠলে আমাদের জানালাগুলো খরখরে হয়ে উঠত। বেলা ৩টার রোদ সবচেয়ে বখাটে। রাকুন, আর্ট আর আমি মিলে পুরনো জাহাজের ফেলে দেয়া কার্ডবোর্ড দিয়ে একটা দুর্গ মতো বানিয়েছিলাম। একদিন দুর্গে আশ্রয় নিয়ে বেলা ৩টায় বখাটেটাকে যখন মোকাবেলায় ব্যস্ত, দেখি ফাঁপা এডি এদিকেই এগিয়ে আসছে। হাবভাব দেখে মনে হচ্ছিল যেন রসিক নাগরের সঙ্গে দেখা করতে বেরিয়েছে!

এডি যে মানসিক আঘাত পেয়েছিল, সেটি আমাদের তার প্রতি মায়াটা যেন আরো বাড়িয়ে তুলেছে।

খনির লাগোয়া রাস্তাটা ধরে মিসেস পোলটয় বাড়ির দিকে ফিরছিলেন। হাতে নতুন একটা বাজারের ট্রলি।

‘দেখো, শুয়োরটা আসছে। এডি, মনে আছে নিশ্চয় এই শুয়োরটাই তোমার দুঃখের কারণ।’ রাকুন চালিয়াতি শুরু করেছে।

আর্টও যোগ দিল, ‘ওরা ঠিক কী কী করেছে তোমার সঙ্গে? খুব ভুগিয়েছে?’

‘না। তেমন কিছু না। ওদেরকে শুধু এইটাই বলতাম— আমাকে একা থাকতে দাও। ওরা যে সবসময় আমার কথা শুনত তেমনও নয়। বুঝতে পারছ? মাঝে মধ্যে পালের গোদাটা এসে বলত— এডি সোনা, তোমার মেশিনটা একটু তুলে ধরো বাপু, আমরা দেখতে চাই!’

প্রায় সন্ধ্যায় আমরা তিনজন মিসেস হোপানলিস্কির আঙিনায় ঢুঁ মারতাম। মিসেস হোপ আমাদের মজার মজার কুকি খাওয়াতেন আর পোলটয়ের হয়ে মাফ চাইতেন। বলতেন, দোষ আসলে পোলটয়ের নয়, পোলটয়ের অন্তরটা ছোট। তিনি মানে মিসেস হোপ যেমন জীবনে অনেক কিছু দেখেছেন, জেনেছেন, বুঝেছেন, পোলটয় জীবনে তেমন কিছুই দেখেননি তো! সব দেখে-শুনে-বুঝে তার হূদয় যেমন বড় হয়ে গেছে, পোলটয়েরটি তেমন নয়...এসব। গল্প শোনাতেন। জানো, আমি একবার গোয়েরিংকে দেখেছি, একবার আইনস্টাইনের বক্তৃতা শুনেছি। যুদ্ধের সময় একটা শহরে আটকা পড়েছিলেন, শহরে আগে থেকেই হাজারো ভীতসন্ত্রস্ত বাসিন্দা, সারারাত বোমারু বিমান বোমা ফেলে গেছে বিরামহীন। সকালে দেখলেন একদল রক্তাক্ত-আহত মানুষ রাস্তায় রাস্তায় সাহায্যের জন্য হামাগুড়ি দিচ্ছে, যেন সাক্ষাত্ জোম্বি!

‘তখন তুমি কী করলে!’ রাকুন জানতে চাইল।

‘সেটা জানা এখন আর জরুরি কিছু নয়, বাছা।’

তারপর এল সেই দুর্যোগের দিন। ছয় জেলার সব কয়টা ফুটবল টিমের জন্য শোল্ডার প্যাড সরবরাহের কাজ পেল বাবা। মা-বাবা দুজনেই এ কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। বাবা মাকে কথা দিলেন, কাজটা ঠিকঠাক সমাধা হয়ে গেলে জ্যামাইকায় নৌ-ভ্রমণে নিয়ে যাবেন। আমাদের প্রতিবেশীদের মধ্যে কারোরই তখন পর্যন্ত নৌ-ভ্রমণের অভিজ্ঞতা হয়নি। জ্যামাইকা তো দূর-অস্ত, অনেকে উইসকনসিনও যায়নি! কিন্তু যে দুর্যোগটার কথা বলছিলাম সেটা হলো, আমাকে ওই সময়টা মিসেস পোলটয়ের জিম্মায় থাকতে হয়েছিল। আমাদের ঘরের পরিবেশ ছিল কিছুটা ভোঁতা রকমের। বিষয়টা পরিষ্কার করি। ধরুন, কোনো একটা প্রশ্ন করলেন কাউকে, সেটার ঝটতি কোনো উত্তর আশা করাটা আপনার বোকামি। আপনি প্রশ্ন করেই যাবেন, করেই যাবেন। উত্তর পাবেন না। যদি পানও হলফ করে বলছি, সেটা সোজাসাপ্টা নয়। তবু আমি মাকে জিজ্ঞেস করতে লাগলাম, ‘মিসেস পোলটয়ই কেন?’ বারবার একই উত্তর পেয়ে গেছি, ‘ওখানেই বরং মজায় কাটবে।’

‘দাদিমা তো আছেনই বাসায়!’

‘দাদিমার শরীরটা ভালো নয়।’

‘তাহলে মিসেস হোপানলিস্কি?’

বাবা ঘরররত্ করে বিশ্রীভাবে নাক টানলেন।

‘সেটি হচ্ছে না।’

‘কিন্তু কেন?’

‘কারণ, চুপ রও!’

ইস্টারের ঠিক পরদিনই হাতে ছোট্ট সবুজ সুটকেসটা ঝুলিয়ে পোলটয়ের বাড়িমুখো রওনা দিলাম।

রাতের বেলায় ঘুমের ঘোরে আমার আতঙ্কিত হওয়া, মাঝে মধ্যে বিছানায় মুতে দেয়াও বিচিত্র নয়। রাতবিরেতে বিছানায় পা ছোড়াছুড়ি তো আকসার ঘটনা। মা কি সেসব জানিয়েছে? সন্দেহ হলো। আমার সন্দেহ প্রথম রাতেই প্রমাণিত হলো। আমাকে চেঁচিয়ে উঠতে দেখে মিসেস পোলটয় বিহ্বল হয়ে জানতে চাইলেন, ‘কী ব্যাপার!’

‘হিসু করে দিয়েছি।’ লজ্জায় এতই কুঁকড়ে গিয়েছিলাম যে, বিছানা ছেড়ে উঠতেও যেন ভুলে গেছি।

‘ও...হিসু। কার পায় না! আমারও পায়। হিসু হিসু হিসু। আমি তো প্রায়ই স্বপ্নে দেখি, একটা মাছ আমার গায়ে হিসু করে দিচ্ছে!’

কি আশ্চর্য! একটুও বিরক্ত না হয়ে তিনি বিছানার চাদরটা পাল্টে দিলেন। বলতে লাগলেন, ‘আমার মা হয়তো এখনো আধা ঘুমে থাকেন। আমিও তো বিছানায় হিসু করতাম। মা বলেছেন, কেবল আমার বিয়ে হওয়ার পরই নাকি তিনি শান্তিতে ঘুমাতে পারেন।’ বিছানাটা ফের পরিপাটি করে দিয়ে তিনি আমাকে ডাকলেন। আমি উঠে পড়লাম।

বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে রইলেন পোলটয়। কিছু একটা বলতে চাইছেন।

‘বাইরে, তোমরা আমাকে নিয়ে কী বলাবলি করো, সেসব আমি জানি। এডির প্রতি আমার আচরণটা অন্যায় হয়েছে। কিন্তু জানো, বহুবছর আগে এ রকমই একটা মাথামোটা ছেলের সঙ্গে বাজে অভিজ্ঞতা আছে আমার। তুমি ওসব বুঝবে না। কিন্তু আমার কাছে আমি যা করেছি, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা আছে। আমি খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। আর ওই ভয়টা এমনি এমনিই নয়।’

একটানা কথাগুলো বলে নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন তিনি। ঘরটা হালকা আলোয় ডুবে আছে।

‘বুঝেছ? বুঝতে পারছ আমি কি বলতে চাইছি?’

‘ইয়ে, হ্যাঁ, পারছি কিছুটা।’

‘বেশ। তাহলে এডিকে বুঝিয়ে বলো। তাকে বলো আমি সত্যিই দুঃখিত। তোমার বন্ধুদেরও বলতে পারো। আমার মনে হয়, তোমার বুদ্ধিশুদ্ধি ভালোই। সেজন্যই তোমাকে বলা।’

আমার ভেতরে কী একটা জেগে উঠল যেন! এর আগে কাউকে বলতে শুনিনি (কিন্তু আমি আগে থেকেই জানতাম) যে আমার জ্ঞানগম্যি ভালো। আমাকেও তবে লোকে বিশ্বাস করে...ভাবতে পারে আমাকে দিয়ে কাজ হবে!

পরদিন ছিল শনিবার। মিসেস পোলটয় স্যুপ বানালেন। আমরা কিছু খুচরো খেলা খেললাম টেবিলে বসেই। এই যেমন কাটাকুটি, শব্দজব্দ, ধাঁধা মেলানো ইত্যাদি। বেশকিছু বানান শেখালেন। বিকালের দিকে মিসেস হোপানলিস্কি আমাদের খোঁজ নিতে এলেন।

‘কী খবর...সব ভালো?’

‘হুম ভালো। ছোড়াটাকে সারাদিন কিছুই খেতে দিইনি।’

মিসেস হোপ আমাকে উদ্দেশ করে বললেন, ‘তুমি বলো, সব ঠিকঠাক?’

‘আমি ঠিক আছি।’

‘বলছ?’ কণ্ঠে সামান্য অবিশ্বাস।

‘হুম।’

তারপর তিনি পোলটয়ের দিকে এমন একটা দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন, যার একটাই মানে দাঁড়ায়— ছেলেটার যদি কিছু হয় তাহলে তোমাকে দেখে নেব।

‘বোকা মেয়েলোক। দূর হও এখান থেকে।’

মিসেস হোপ চলে গেলেন।

আমরা আবারো খেলায় মন দিলাম। এবারে শব্দজট। যখনই মিসেস পোলটয় কোনো একটা শব্দ বাগে আনতে পারতেন না, সমানে নিজ হাতের ওপর গুঁতো মেরে যেতেন। তবে সেটা সজোরে নয়। অনেকটা লোক দেখানো। বিষয়টা যে আমি লক্ষ করছি, সেটা একবার চোখাচোখি হলো, হলে পড়ে আমরা দুজনেই হেসে দিলাম।

চুপচাপ খেলে যেতে লাগলাম।

একসময় নীরবতা ভাঙলেন পোলটয়। ‘ওই মেয়েলোকটা প্রচুর মিথ্যা কথা বলে। তুমি নিশ্চয় জানো না। সে বলে বেড়ায়, আমি আর ও নাকি একই শহর থেকে এসেছি।’

‘হুম। ঠিক শুনেছেন।’

‘ডাহা মিথ্যা কথা। এমনিতে ওর আচার-আচরণ খুব অমায়িক কিন্তু ওই মিথ্যা কথা বলার বাতিকটা সাংঘাতিক। ওর জন্ম তো ওই স্কোকিয়েতে। আমেরিকায়ই তার গোটা জীবন কেটেছে। তোমার মনে হয় না যে, ও বেশ ভালো ইংরেজি বলে, তোমাদের মতোই?

সপ্তাহজুড়ে মিসেস পোল নানা পদের সসেজ, নুডলস, আলু দিয়ে তৈরি প্যানকেক খাওয়ালেন। আমরা দুজন, শুয়োরের মতো ঘোঁত ঘোঁত করে মজাদার খাবারগুলো গিলতাম। স্কুল থেকে ফিরলে চা আর কেক খেতে দিতেন। রাতে প্রয়োজনে আমার বিছানার চাদর পাল্টে দিতেন টুঁ শব্দটি ছাড়া। একদিন নিজের বিছানায়ও শুতে দিলেন।

মা-বাবা ফিরলেন দিন কয়েকের মধ্যেই। জ্যামাইকা থেকে আমার জন্য একটা সুন্দর টুপি আনলেন। থিতু হয়েই ঘোষণা দিলেন, মিসেস হোপানলিস্কি একজন ডাহা মিথ্যুক। মিথ্যুক ও ছিটিয়াল। তার বলা কথায় একবিন্দুও সত্য নেই। গবলেট করপোরেশনে মিসেস হোপ ক্যাশিয়ারের চাকরি করতেন কিন্তু সেখানে চুরির দায়ে ধরা পড়েন। ধরা পড়েই গল্প ফাঁদেন যে, ওটা একটা ভুল আর ভুলটা হয়েছে প্রধান কার্যালয়ে। যখন প্রধান কার্যালয় থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা  করতে একজন ব্যবস্থাপক এলেন, তখন নতুন আরেক গল্প ফাঁদেন। কেসটা তখন এফবিআইয়ের তদারকিতে, তিনি এফবিআইকে একটা ভুয়া চিঠি দাখিল করলেন। চিঠিটা লিখেছিল জনৈক ক্রেতা ‘লেডি বার্ড জনসন’। কিন্তু সেখানেই শেষ ধরাটা খান। কারণ একে তো হাতের লেখার সঙ্গে হোপানলিস্কির লেখার অদ্ভুত মিল, তাছাড়া ‘জনসন’ বানানটাও ভুল করে ‘জনশন’ লেখা!

এই করে করে আরেকটা বসন্ত কড়া নাড়ল। খনির আশপাশে গাছগুলোয় নতুন নতুন পাখির বাসা বোনা হতে লাগল। আমরা সোত্সাহে সেসব বাসা গুলতির নিশানায় পেড়ে ফেলছি, পেছনের উঠানে এরই মধ্যে একটা চিকন নদী বইয়ে দিয়েছি আমরা। সেই নদীতে জুতার বাক্সে তৈরি নৌকাগুলো গোত্তা মেরে টাল খেয়ে খেয়ে চলে। রাকুন কেরোসিন কাঠের তিনটা পলকা তক্তাকে জুড়ে দিয়ে বিমান বানিয়েছে। সেই বিমান আবার নৌকায় চড়ে নৌ-ভ্রমণে বেরোয়। কখনো কখনো রাকুনের পোষা কুকুর সেঙ্গুলির বিষ্ঠা কুড়িয়ে এনে নৌকায় দিয়ে দিই। সেঙ্গুলির বিষ্ঠাভরা নৌকা নদীর চড়াইয়ে গিয়ে কাত হয়ে যায়, তখন বিষ্ঠার দলাটা ঝপাত্ করে জলে পড়ে হারিয়ে গেলে আমরা উল্লাসে মেতে উঠি।

* রাকুন: উত্তর আমেরিকার ভালুকসদৃশ একটি প্রাণী। মাংসাশী। (অনুবাদকের সংযোজন)