কলকাতা মেট্রোর কালিঘাট স্টেশনে নেমে মূল রাস্তা ধরে পুব দিকে হাঁটলেই রাসবিহারী এভিনিউ। কিছু দূর গেলে দেশপ্রিয় পার্ক। পার্কের উল্টো দিকে তথা পশ্চিমে ১৮৩ ল্যান্সডাউন রোডের বাড়ি। এখন ল্যান্সডাউন সড়কের নাম ‘শরৎ বসু রোড’।
কলকাতা শহরের অনেক সড়কের নামই বদলে গেছে। যেমন জীবনানন্দের যে পোর্ট্রেট ছবিটি তার সব বইপত্র এবং এখনো সব পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়, সেই ছবিটি প্রিন্ট করা হয়েছিল কর্নওয়ালিশ স্ট্রিটের ‘ডি রতন’ স্টুডিও থেকে, সেই সড়কের নাম এখন বিধান সরণি। জীবনানন্দের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় কেটেছে যে হ্যারিসন রোডে, সেটির বর্তমান নাম মহাত্মা গান্ধী রোড। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত থিয়েটার রোড এখন শেক্সপিয়ার সরণি। তারই ধারাবাহিকতায় ল্যান্সডাউন রোড এখন শরৎ বসু রোড। এই সড়কের বিখ্যাত ১৮৩ নম্বর বাড়িতে জীবনানন্দ থাকতেন, সেটির গায়ে এখন লেখা ‘১৮৩ শরৎ বসু রোড’। বাড়ির সামনের অংশে এখন ‘অশোক স্টোর’ এবং ‘ভূমিসুতা’ নামে দুটি দোকান। গা-ঘেঁষে পশ্চিমে ঢুকে গেছে একটি সরু গলি। কয়েক কদম গেলেই ছোট্ট গেট। গেটের ভেতরে জীবনানন্দের আমলের একটি নিমগাছ (যে গাছটির কথা তার সুহূদদের লেখনীতে বিভিন্ন সময়ে এসেছে) এবং সেই ঐতিহাসিক বাড়ি।
জীবনানন্দ তার উত্থান পর্বের সোনালি সময়ে যেমন ছিলেন এই বাড়ির বাসিন্দা, তেমনি শেষদিকে এসে এই বাড়িতে থাকাটাই তার জন্য এক মস্ত বড় যন্ত্রণার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়, একজন সাবলেট অর্থাৎ উপভাড়াটিয়ার কারণে। ধারণা করা হয়, বাড়ি নিয়ে এ মানসিক চাপ তার ডায়াবেটিস বাড়িয়ে দেয়, উপরন্তু সারাক্ষণ অন্যমনস্ক থাকতেন। সেই অন্যমনস্কতারই ফল ধীরগতির বাহন ট্রামে নিজের পড়ে যাওয়া। সুতরাং কবি ও ব্যক্তি জীবনানন্দকে নিয়ে আলোচনা ১৮৩ ল্যান্সডাউন রোডের এই বাড়ি ছাড়া সম্পূর্ণতই অসম্পূর্ণ।
এই বাড়িতে এখন থাকেন ভারতের প্রখ্যাত চলচ্চিত্র অভিনেত্রী ও বিধায়ক দেবশ্রী রায়। তার জন্মও এই বাড়িতে। গত ২৫ জানুয়ারি আমাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ছয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি এবং তার বড় বোনের জন্ম এ বাড়িতে। ১৯৫৪ সালে কবি জীবনানন্দ দাশের মৃত্যুর পর তারা এ বাড়িতে ওঠেন। এখনো তারা এখানে ভাড়া থাকেন। দেবশ্রী জানালেন, জীবনানন্দ যে ঘরে থাকতেন, তিনি এখন সে ঘরেই থাকেন। এ এক বিস্ময়কর অনুভূতি। বাড়ির সামনে নিম গাছটা এখনো আছে। গরমের দিনে এই গাছের পাতা দিয়ে তারা ‘নিমবেগুন’ রান্না করে খান। তবে বাড়ির ভেতরে ঢোকা কিংবা ছবি তোলার অনুমতি মেলেনি। বললেন, ‘বাড়ির ভেতরে তো সেই এসেন্স পাবেন না। অনেক কিছু বদলে গেছে। দোতলা ও তিনতলাটা আগের মতো আছে। কিন্তু নিচতলাটা আমরা বদলে ফেলেছি।’ জানালেন, বিভিন্ন সময়ে সাংবাদিকরা এই বাড়ির ছবি তুলতে চেয়েছেন, সবাইকে তিনি একই কথা বলেছেন। তার পরও যখন বাড়ির ভেতরটা এবং নিমগাছের ছবি তোলার জন্য যাওয়ার অনুমতি চাইলাম, দেবশ্রী বললেন, ছবি তুলে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে দেবেন। কিন্তু এরপরে বেশ কয়েকবার যোগাযোগের পরও আর সেই ছবি পাওয়া যায়নি।
কীভাবে এই বাড়িতে এলেন
এই বাড়িতে প্রথমে থাকতেন জীবনানন্দের ছোট ভাই অশোকানন্দ দাশ। ১৯৪৩ সালের ২৪ এপ্রিল নলিনী চক্রবর্তীকে বিয়ে করার পরে প্রথমে তারা দক্ষিণ কলকাতার রসা রোডে ‘মোহিনী ম্যানশন’ নামে একটি বাসায় কিছুদিন থাকেন। ওই বাসায়ও জীবনানন্দ এসেছেন। তখন তিনি বরিশাল ব্রজমোহন কলেজের শিক্ষক। অশোক-নলিনী দম্পতি ১৯৪৩ সালের ৪ জুলাই (পত্রালাপ জীবনানন্দ দাশ, প্রভাতকুমার দাস সম্পাদিত) ১৮৩ ল্যান্সডাউন রোডের বাসায় ওঠেন। ১৯৪৭-এ দেশভাগের কিছু আগে বরিশাল থেকে পাকাপাকিভাবে কলকাতায় আসার পরে জীবনানন্দ এ বাসায় এসে ওঠেন। অশোকানন্দ তখন থাকতেন বাড়ির দোতলায়। বাড়িওয়ালা অশোকানন্দের বিরুদ্ধে উচ্ছেদের মামলা করেছিলেন। আবহাওয়া অফিসের কর্মকর্তা অশোকানন্দ ১৯৪৮ সালে দিল্লিতে বদলি হয়ে যান। উচ্ছেদের মামলা কিছুদিন চলার পরে বাড়িওয়ালার সঙ্গে একটা রফা হয় এবং জীবনানন্দকে বাড়ির পেছনের অংশে চারটি ঘর ভাড়া দেয়া হয়। অশোকের দিল্লিতে বদলির পর তার স্ত্রী-পুত্র গিয়ে ওঠেন অদূরেই ১৭২/৩ রাসবিহারী এভিনিউয়ে শ্বশুরের বাসায়। আর জীবনানন্দের ঠিকানা হয় এই ১৮৩ ল্যান্সডাউন রোডের বাড়ি, যেখানে তিনি আমৃত্যু ছিলেন। অর্থাৎ ১৯৪৬-এর শেষ দিক থেকে ১৯৫৪ সালের ১৪ অক্টোবর (দুর্ঘটনার দিন) পর্যন্ত এ বাড়ির বাসিন্দা ছিলেন তিনি।
বাড়িটি কেমন ছিল, এখন কেমন
১৮৩ ল্যান্সডাউন রোডের যে ঘরে জীবনানন্দ থাকতেন, গোপালচন্দ্র রায় (জীবনানন্দের সঙ্গে, জীবনানন্দ, আবদুল মান্নান সৈয়দ সম্পাদিত) সেই বাড়ির বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে: ‘বাড়িটা তিন তলা। ওই বাড়ির একতলায় তিনি থাকতেন। তিনখানা ঘর নিয়ে পৃথক একটি ফ্ল্যাটে। দোতলায় ও তিনতলায় উঠবার সিঁড়ি বাইরে। একতলার ঘরগুলো দক্ষিণমুখো। সঙ্গে বারান্দা। বারান্দার সামনে একটু উঠান। উঠানের পাশ দিয়ে একটা বড় ঝাঁকড়া নিমগাছ, একটা নারকেল গাছ এবং আরো কয়েকটা মাঝারি আকারের গাছ উঠে গেছে। ফলে সমস্ত উঠানটায় এবং ঘরের বারান্দারও অনেকটায় গাছের পাতার বেশ ছায়া পড়ে। খুব নির্জন ও সুন্দর পরিবেশ।’
আর জীবনানন্দ নিজে যে ঘরটিতে থাকতেন, তার বর্ণনা দিচ্ছেন পূর্ণেন্দু পত্রী (জীবনানন্দ, আবদুল মান্নান সৈয়দ সম্পাদিত, পৃষ্ঠা ২৮৩): ‘একেবারে পশ্চিমের ঘরে থাকতেন তিনি। একটা সিঙ্গেল খাট, টেবিল আর কিছু বইপত্রসহ তার এই ঘরটি বড় প্রিয় ছিল। বারান্দায় ইজিচেয়ারে বসে লিখতেন, পত্রবহুল নিমগাছের ছায়ায় আলো-অন্ধকারের স্তব্ধপ্রায় খেলার মধ্যে নিজের নীরবতা বেশ মানানসই হয়ে উঠত।’
সমর চক্রবর্তী লিখছেন, ‘ঘরটা ছিল অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন, একটু বেশি রকমভাবেই গোছালো। যতদূর মনে পড়ে বইয়ের কোনো শেলফ ছিল না। মেঝের উপর খবরের কাগজ পেতে তার উপর বইগুলো ছিল, অসংখ্য বই, কিন্তু এলোমেলোভাবে নয়। ফ্যাকাশে লাল রঙের দেয়াল, তাতে কোনো ছবি ছিল বলে মনে পড়ে না। পায়ের দিকে একটা ক্যালেন্ডার, কচি ডালে কয়েকটা পাটল পাতা, দুটি পাখি মুখোমুখি বসে আছে।’
জীবনানন্দের সময়েও নিমগাছটি যে খুব ঝাঁকড়া ছিল, তা জানা যাচ্ছে গোপালচন্দ্র রায়ের স্মৃতিকথায়। তবে আজকের মতো নিশ্চয়ই এটি তখন এত বড় ছিল না। সুহূদ অশোক মিত্র (আপিলা-চাপিলা, পৃষ্ঠা ১০৪) লিখছেন, ‘একদিন, বর্ষার ম্লান সন্ধ্যা, রাসবিহারী এভিনিউর প্রায় মোড়ে ল্যান্সডাউন রোডের গলিতে তাঁর একতলার ফ্ল্যাটের বহির্দুয়ার দিয়ে সদ্য ঢুকেছি, হঠাৎ আমাকে টেনে এক কোণে, নিচু নিম গাছের ডালের আড়ালে, নিয়ে গেলেন, কানে-কানে তাঁর অস্ফুট প্রশ্ন: আচ্ছা আপনি কি জানেন বুদ্ধদেববাবুর নাকি পঞ্চাশ হাজার টাকার ফিক্সড ডিপোজিট আছে? বুদ্ধদেবের আর্থিক অবস্থা তখন কিন্তু আদৌ ভালো নয়, কিন্তু জীবনানন্দ এতটাই তিমিরে অবগাহিত, যে অলীক লোকপ্রবাদও তাঁর কাছে ধ্রুব সত্য বলে প্রতিভাত।’
তরুণদের আনাগোনা
এই বাড়িতে নিয়মিত যাতায়াত ছিল ‘ময়ূখ’ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত তরুণদের; পরবর্তীকালে যারা জীবনানন্দের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজনে পরিণত হন। এই ময়ূখের সূত্র ধরেই ভূমেন্দ্র গুহর মতো একজন প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ জীবনানন্দের জীবনে আসেন, যার উদ্যোগেই মূলত মৃত্যুর পরে জীবনানন্দের কালো ট্রাংকের ভেতর থেকে সোনার খনি বের হয়ে আসে।
এই তরুণরা জীবনানন্দের ১৮৩ ল্যান্সডাউন রোডের বাড়িতে গিয়েই মূলত তার প্রতি মোহাবিষ্ট হন। ময়ূখের সম্পাদক জগদিন্দ্র মণ্ডলের সঙ্গে আমার কথা হয় গত মাসের শেষদিকে। বয়সের ভারে ন্যুব্জ। থাকেন দক্ষিণ কলকাতায়। তার ‘কবিতা নিয়ে ভাবনা ও কয়েকজন কবি’ গ্রন্থেও ১৮৩ ল্যান্সডাউন রোডের বাড়ির স্মৃতিচারণ রয়েছে। লিখেছেন, ‘ময়ূখ পত্রিকা বের করতে গিয়ে তখন স্বাভাবিকভাবেই আমরা তখনকার নামী কবিদের কাছে কবিতা চাইতে যেতাম। তাতে অধিকাংশই আমাদের উৎসাহ দিতেন না। মনে হতো আমাদের যাওয়ায় তার কিছুটা সময় নষ্ট হলো। কিন্তু জীবনানন্দ ছিলেন এর ব্যতিক্রম। ময়ূখের প্রথম দুটি সংখ্যার প্রকাশমান দেখে এত খুশি হলেন, আমাদের কবিতাপ্রীতি দেখে এত আনন্দিত হলেন যে, নিজে থেকে কবিতা দিলেন আসন্ন পরবর্তী সংখ্যায় ছাপার জন্য। আমরা ওই বয়সে জীবনানন্দে আকৃষ্ট হয়েছিলাম ওঁর কবিতার সাহিত্য-গুণ বুঝে নয়, আকৃষ্ট হয়েছিলাম ওঁর কবি-ব্যক্তিত্বের সহজ-সরল-উদার মানসিকতায়। বাইরে বৈষয়িক জীবনে প্রায় অপ্রতিষ্ঠিত, প্রাতিষ্ঠানিক সাহিত্য ব্যক্তিত্বের দ্বারা বিরূপভাবে সমালোচিত, দারিদ্র্যলাঞ্ছিত কেবল কবিতামগ্ন প্রাণমহিমায় আমরা ওই বয়সে ওঁর প্রতি শ্রদ্ধায় মায়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছিলাম।’
ভূমেন্দ্র এই বাড়ির স্মৃতিকথায় জীবনানন্দর স্ত্রী ও ছেলেমেয়ের সম্পর্কে সামান্য যা লিখেছেন, তাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ: ‘জীবনানন্দের বাড়িতে আমি কোনোদিন চা খেয়েছি, মনে করতে পারি না। জীবনানন্দর স্ত্রীকে দেখছি, ব্যস্ত মানুষ, দেখা হতেই সামনে থেকে সরে গেছেন; তাঁর সঙ্গে জীবনানন্দর মৃত্যুর আগে কোনোদিন কথা বলা হয়নি। মেয়ে মঞ্জুশ্রী আমার বয়সী বা আমার চাইতে সামান্য বড়, পরে কথঞ্চিৎ মৃদু আলাপ-পরিচয় হলেও, সে পর্যায়ে, দেখা হলে, পারস্পরিক সামান্য হাসি বিনিময়ের চেয়ে বেশি কথাবার্তা তাঁর সঙ্গেও আমার হয়নি। ছেলে রঞ্জু নিজের মনে একা; তাঁর চলায়-ফেরায়, হঠাৎ করে ঘরে ঢুকে হঠাৎ করে বেরিয়ে যাওয়ায়, হঠাৎ বাবার বা পিসির কাছে এসে কথা বলতে শুরু করে কথা শেষ না করতে না পারায় বোঝা যেত যে, তাঁর কৈশোর-যৌবন-গ্রন্থি-সমাবৃত পৃথিবীতে কোথাও একটা অচিরাচরিত গিঁট পড়ে গেছে, তাঁর মানিয়ে নিতে কষ্ট হচ্ছে।’
এই বাসায় তরুণদের আসা-যাওয়ার বিষয়ে জীবনানন্দের স্ত্রী লাবণ্য দাশও (মানুষ জীবনানন্দ, পৃষ্ঠা ৬৪) লিখেছেন: ‘তাঁর এক লাইন কবিতা পাবার আশায় আমাদের ল্যান্সডাউন রোডের বাড়িতে প্রতিদিন দলে দলে ছাত্রছাত্রীকে আসতে দেখেছি। সকলে কিন্তু হাসিমুখেই ফিরে যেত। কিছু বললেই উত্তর দিতেন, এরাই তো আমাদের ভবিষ্যতের আশা-ভরসা। এদের ভিতর দিয়েই তো আমি বেঁচে থাকব। এদের কি ফেরাতে পারি?’
উপভাড়াটিয়ার যন্ত্রণা
ভাড়ার বোঝা কমাতে এই বাড়িতে জীবনানন্দ তিন দফায় তিনজনকে সাবলেট বা উপভাড়াটিয়া করেছিলেন। এর মধ্যে মেজর মজুমদার নামে একজন ১৯৪৭-৪৮ সালে ছয় থেকে সাত মাস (অনন্য জীবনানন্দ, ক্লিন্টন বি সিলি, পৃষ্ঠা ৩২৫)। এরপর অমল দত্ত নামে একজন। অমল দত্তর সঙ্গে জীবনানন্দের একটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। জীবনানন্দের মৃত্যুর পরে তিনি ঊষা নামে একটি পত্রিকার জীবনানন্দ সংখ্যায় তার স্মৃতিচারণও করেন। বস্তুত চল্লিশের দশকের শুরুতে নিরুক্ত পত্রিকার মাধ্যমে তাদের পরিচয়। অমল দত্ত ওই পত্রিকায় লিখতেন। কিন্তু অমল দত্তও আর্থিক অনটনের কারণে বাসাটা ছেড়ে দেন এবং জীবনানন্দ ১৯৫০-৫১ সালে সুরুচি মজুমদার নামে এক বিধবা নারীকে সাবলেট দেন (পত্রালাপ জীবনানন্দ দাশ, প্রভাতকুমার দাস, পৃষ্ঠা ১৯১)। সুরুচি মজুমদার ছিলেন হিন্দুস্তান ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী স্বনামখ্যাত নলিনীরঞ্জন সরকারের আস্থাভাজন, তদানীন্তন হিন্দুস্তানের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার আত্মীয়। যদিও সুরুচি মজুমদার আদৌ ওই কর্মকর্তার আত্মীয় কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বাসায় প্রায় প্রতি রাতেই তিনি উচ্চ স্বরে গান বাজাতেন। বাসায় নানা লোকজনের আনাগোনা ছিল। হইহল্লার কারণে জীবনানন্দ বিরক্ত হয়ে ওঠেন। তার সুহূদদের স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, প্রায় রাতেই বিরক্ত হয়ে জীবনানন্দ বাসা থেকে বেরিয়ে উল্টো দিকে দেশপ্রিয় পার্কের বেঞ্চিতে গিয়ে বসে থাকতেন। ফলে ওই নারীকে বাসা থেকে বের করার জন্য জীবনানন্দ নানাজনের সঙ্গে পরামর্শ করেছেন, এমনকি আইনজীবীর কাছেও গিয়েছিলেন।
গোপালচন্দ্র রায় (জীবনানন্দের সঙ্গে, জীবনানন্দ, আবদুল মান্নান সৈয়দ সম্পাদিত) জানাচ্ছেন, এক রোববার সকালে রসা রোডে চাঁদমোহন চক্রবর্তী নামে এক প্রবীণ ও ভালো উকিলের কাছে তিনি জীবনানন্দকে নিয়ে গিয়েছিলেন। সব শুনে উকিল বললেন, ‘আপনি সাবলেট করেছেন আর ও যখন আপনাকে ভাড়া দেয়, তখন ওকে তোলা মুস্কিল। আপনি ওর কাছ থেকে ভাড়া না নিলে ও মনি অর্ডার করবে। আপনি মনি অর্ডারের টাকা না নিলে ও কোর্টে জমা করবে। তাই ও নিজে থেকে চলে না গেলে ওকে তোলা দায়। তবে পাড়ার লোকজন দিয়ে ভয় দেখিয়ে যদি তুলতে পারেন। না হলে তোলা মুস্কিল।’ এ অবস্থায় ভাড়াটে গুণ্ডাদের সাহায্য নেয়া যায় কিনা, জীবনানন্দ সে কথাও ভেবেছেন (জীবনানন্দ দাশ, প্রভাতকুমার দাস, প্রথম সংস্করণ, পৃষ্ঠা ১০১)।
ক্লিন্টন বি সিলি (অনন্য জীবনানন্দ, পৃষ্ঠা ৩০৭) লিখছেন, ‘এই ভাড়াটে জীবনানন্দের কাছে একটা বাতিকের মতো হয়ে দাঁড়ায়; তিনি শেষে চেয়েছিলেন, সেই ভাড়াটে মহিলা বাসা ছেড়ে দিক, অথবা তার বদলে তিনি নিজেই ছেড়ে দেবেন।’
১৯৫৩ সাালের ২০ মে সুরজিৎ দাশগুপ্তকে লেখা চিঠিতে (পত্রালাপ জীবনানন্দ দাশ, প্রভাতকুমার দাস, পৃষ্ঠা ২২৩) লিখেছেন: ‘বাড়ি নিয়ে বড্ড বিপদে আছি। আজকাল ভাড়াও দিচ্ছে না। কোথাও চলে যেতে পারলে নিস্তার পেতাম। কিন্তু ঘর খুঁজে পাচ্ছি না।’ মাস তিনেক পরে ওই বছরের ১৪ আগস্ট সুরজিৎকে লেখা আরেকটি চিঠিতেও সেই একই অস্বস্তির কথা: ‘এ বাড়ি যত তাড়াতাড়ি ছেড়ে দিতে পারা যায় ততই ভালো। কিন্তু ঠিকমতন বাড়ি পাচ্ছি না কোথাও।’ মৃত্যুর পাঁচ মাস আগে ১৯৫৪ সালের ১৭ মে সঞ্জয় ভট্টাচার্যকে লেখা চিঠিতে লিখলেন, ‘আপনারা কি কবিরসাহেবকে (চতুরঙ্গ পত্রিকার সম্পাদক এবং পরবর্তীকালে সচিব হুমায়ুন কবির) আমার কথা বলেছিলেন? বাড়ি নিয়ে বড় মুস্কিলে আছি। তারাশঙ্কর বাবুর সঙ্গে দেখা করব? এসব বিষয় নিয়ে আপনাদের সঙ্গে গিয়ে আলোচনা করতে পারি। কিম্বা আপনি চিঠি লিখেও জানাতে পারেন। খুব জরুরি।’
বোন সুচরিতা দাশও দাদার জন্য নানা জায়গায় বাড়ি খুঁজেছেন। সুচরিতা তখন কলকাতা শহর থেকে বেশ দূরে তমলুকের একটি স্কুলের শিক্ষক। ছুটিতে কলকাতায় এলে উঠতেন দাদার বাসায়। বাড়ির যন্ত্রণা প্রসঙ্গে তিনি লিখছেন (কাছের জীবনানন্দ, ময়ূখ জীবনানন্দ সংখ্যা, পৌষ-জ্যৈষ্ঠ ১৩৬১-৬২), ‘এই বাড়িতে থাকা যখন দুরূহ হয়ে উঠলো কেবলই বাড়ি খুঁজছেন তিনি। ছুটিতে এলে আমাকে নিয়ে কত যে বাড়ি দেখিয়েছেন, তার শেষ নেই। প্রায়শই পছন্দ হয়নি। এমন বাড়ি খুঁজতেন যেখানে আছে আকাশের অবারিত আলোর প্রবেশ, উজ্জ্বল তৃণতরঙ্গের প্রাঙ্গণ। একটু কাঁচা মাটির সান্ত্বনা থাকা চাই, যেখানে খালি পায়ে বেড়ানো চলবে।’ সুচরিতা জানাচ্ছেন, শান্তি নিকেতনে মেজদার (অশোকানন্দ দাশ) এক টুকরো জমি ছিল। সেখানে দাদার (জীবনানন্দ) জন্য একটা কটেজ বানিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কলকাতার ধারেকাছেই থাকার জন্য তার ইচ্ছা ছিল। ফলে সুচরিতা তার পিতৃতুল্য দাদার জন্য কলকাতার আশপাশেই জমি খোঁজা শুরু করেছিলেন। এ রকম একটি জমির ব্যাপারে কথাবার্তায় বলার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু তার আর প্রয়োজন হয়নি। কারণ ওই খোঁজ নেয়ার আগেই জীবনানন্দ পৃথিবী ছেড়ে চলে যান।
এখানে জীবনানন্দ নেই
সবুজে মোড়ানো বরিশালের প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং সর্বানন্দ ভবনের সঙ্গে ল্যান্সডাউনে রোডের এই বাড়ির একটা তুলনামূলক চিত্র এঁকেছেন বীতশোক ভট্টাচার্য। ‘বরিশালের সর্বানন্দ ভবনে তার ছাওয়া-ঘরটিতে কল্পনাপ্রতিভার প্রতিসরণ ঘটত অপেক্ষাকৃত সহজে, কলকাতার ল্যান্সডাউনের বাসার পরিবেশ শারীরিক স্বাচ্ছন্দ্যের কিছুমাত্র নাগরিক সুবিধার বিনিময়ে সে আত্মিক প্রসারের পথ রুদ্ধ করে দিল। তাই জীবনানন্দের বিচ্ছিন্নতার বোধ তাঁকে একাকী করে রেখে গেল প্রগতির মিছিলে পথহাঁটা মানুষজনের থেকে দূরে।’
১৮৩ ল্যান্সডাউন রোডের বাড়ির বর্তমান বাসিন্দা দেবশ্রী রায় অবশ্য বলছেন, তিনি এই বাড়িতে থাকতে পেরে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করেন, কিন্তু জীবনানন্দের কিছুই এই বাড়িতে নেই; বাড়ির গায়ে ১৮৩ নম্বর লেখা ছাড়া। শুধু নিমগাছটি বড় হয়েছে। এখনো কাটা পড়েনি। হয়তো গ্রীষ্মকালে এখানের বাসিন্দারা এর পাতা দিয়ে ‘নিমবেগুন’ রান্না করে খান বলে। কিন্তু জীবনানন্দের মতো একজন কবি যে বাড়িতে কাটালেন জীবনের শেষ আটটি বছর, সেই বাড়ির অন্তত একটি কক্ষও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সংরক্ষণ করা হবে না, তা খুবই দুঃখজনক।
সমরেন্দ্র সেনগুপ্তরও (কবিতীর্থে, বিভাব, জীবনানন্দ স্মরণ সংখ্যা, পৃষ্ঠা ৬৭৩) এই একই আক্ষেপ। ‘ল্যান্সডাউন রোডের বাড়িতে জীবনানন্দের কোনো আলাদা স্মৃতিফলক নেই। আমি একাধিকবার বাড়ির মালিককে বলেছি। কোনো লাভ হয়নি। আমরা স্মৃতিসৌধ গড়ে তুললেও সাধারণত পরে তার কোনো রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করি না। মূর্তির নামে, কতগুলো বিশ্রী পুতুল গড়ে শুধু পাখিদের বিষ্ঠাত্যাগের সুযোগ দিই।’






