সৈয়দ মনজুর মুরশেদ দিনলিপিতে লিখে রেখেছিলেন তার ব্যক্তিগত জীবন, টুকরো ঘটনা। বহুবছর সে ডায়েরি পরিবারের তোরঙ্গে আবদ্ধ হয়ে ছিল। তারপর একদিন তার নাতনি আশনা সেন ধুলো ঝেড়ে তোরঙ্গ খুলে মনজুরের ডায়েরিটি বের করেন। সে ডায়েরিকে অবলম্বন করে আশনা বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী মনজুর-হাসিনা দম্পতির জীবনকাহিনী লিখে ফেলেন। বইয়ের নাম দেন দ্য রাস্টেড ট্রাংক। জয়জিৎ লাহিড়ীর করা এ গ্রন্থের বাংলা রূপান্তর প্রকাশিত হয় পুরনো তোরঙ্গ: এক বিস্মৃত রাজপুরুষের স্মৃতি-ইতিহাস ও বেগম হাসিনা মুরশেদের কাহিনী শিরোনামে। পুরনো তোরঙ্গ থেকে মনজুরের সঙ্গে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাক্ষাৎ ও দেশভাগের অংশটি এখানে গ্রন্থিত হলো—
কবির সাক্ষাৎ: জেলা-র জীবন
১৯২২-এর শুরুতে কেডাস্ট্রাল জরিপের কাজে মনজুরকে সিরাজগঞ্জে (অধুনা বাংলাদেশে) পাঠানো হয়। সেখানে তরুণ অফিসারদের সার্ভে সেটেলমেন্টের কাজ শেখানোর জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ছিল। পুঁথিগত প্রশিক্ষণের পর তাদের হাতে-কলমে কাজ শেখানোর জন্য প্লেন টেবিল সার্ভের কাজে পাঠানো হলো। যথেষ্ট জটিল কাজ। ডিরেক্টর অব ল্যান্ড রেকর্ডস তাদের মূল্যায়ন করবেন। ছয় সপ্তাহ ধরে কঠোর কেডাস্ট্রাল সার্ভে ট্রেনিংয়ের পর তাদের পাঠানো হলো ‘অ্যাটেস্টেশন’-এর কাজে। কেডাস্ট্রাল সার্ভের সময়ে যাদের যাদের নাম রেকর্ড অব রাইটস বা খতিয়ানে নথিভুক্ত হয়েছে, এবার সেগুলো যাচাই করার সময়। স্থানীয় অধিবাসীদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে নথিভুক্ত নামগুলো যাচাই হবে। যেকোনো শাসকের পক্ষেই তার সাম্রাজ্যের যথাযথ পরিমাপ অতীব গুরুত্বপূর্ণ।
ট্রেনিং পর্ব সমাপ্ত হলে ছাড়া পেলেন মনজুর। আলিপুরে নিজের পুরনো কাজে ফিরে এলেন।
এদিকে তখন রাজনৈতিক ক্ষেত্রে দ্বৈত শাসনব্যবস্থা সফল প্রতিপন্ন করার চেষ্টা চলছিল। মুসলিমদের জনপ্রিয় নেতা ফজলুল হককে বাংলা গভর্মেন্টের শিক্ষামন্ত্রীর পদ নিতে রাজি করানো হলো। এ পদে তার স্বল্প সময়কালের মধ্যেই হক সাহেব মুসলিম শিক্ষার জন্য ‘ইসলামিয়া কলেজ’ স্থাপন করেন। ওয়েলেসলি স্ট্রিটের ওপর রাজকীয় স্থাপত্য নিয়ে আজও তা বিরাজমান। বর্তমানে এর নাম ‘মৌলানা আজাদ কলেজ’। ঢাকাতেও তিনি মেয়েদের জন্য ‘ইডেন কলেজ’ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠরত মুসলিম ছাত্রদের জন্য ছাত্রাবাস চালু করেন। হক সাহেব যখন শিক্ষামন্ত্রী, তখন কংগ্রেসের প্রধান নেতা ছিলেন চিত্তরঞ্জন দাশ।
আলিপুরে ডেপুটি কালেক্টর হিসেবে কাজ করছেন মনজুর, কিন্তু বদলির সম্ভাবনাও ঘনিয়ে উঠেছিল। কলকাতায় থিতু হতে চাইছিলেন মনে-প্রাণে, অথচ সচিবালয়ে পোস্টিং পাওয়ার মতো অভিজ্ঞতা বা যোগ্যতা তখনো অর্জন করে উঠতে পারেননি।
ফলে অন্য রাস্তা খোঁজার চেষ্টা করলেন। কলকাতা করপোরেশনের ডেপুটি চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার পদের জন্য বিজ্ঞাপন বেরিয়েছে। করপোরেশন সে সময় কংগ্রেসের দখলে। মনজুরের এক বন্ধুর চিত্তরঞ্জনের বাড়িতে নিয়মিত যাতায়াত ছিল। তারই সঙ্গে একদিন দেশবন্ধুর বৈঠকখানায় হাজির হলেন। কম্পিত বক্ষে অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু ঘরে প্রবেশ করে মনজুরকে দেখেই চিত্তরঞ্জনের চোখে পরিচিতির দীপ্তি উজ্জ্বল হয়ে উঠল। রাঁচি এক্সপ্রেসে তিনিই ছিলেন মনজুরের সহযাত্রী।
সাক্ষাতের কারণ ব্যাখ্যা করে করপোরেশনে আবেদনের ব্যাপারে দেশবন্ধুর পরামর্শ চাইলেন মনজুর। ক্রমে বেশ কয়েকবার সাক্ষাতের পর তাদের সম্পর্ক বন্ধুত্বে পরিণত হলো। চিত্তরঞ্জন তাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোসের সঙ্গে। নেতাজি আবার তার ঘনিষ্ঠ সহকর্মী আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে যোগাযোগ করালেন মনজুরকে। আজাদের সৎ গুণ এবং চোস্ত উর্দুতে মুগ্ধ হলেন মনজুর। তাদের সবার মিলিত আশ্বাস ও উৎসাহে শেষ পর্যন্ত করপোরেশনের পদটির জন্য আবেদন করলেন তিনি। তবে একটা বিষয়ে সবাই সাবধান করলেন তাকে, ‘আগেভাগেই সরকারি চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে বসো না, মুরশেদ।’
এরই মধ্যে বরিশালে বদলি হলো তার। সেখানেই খবর পাচ্ছিলেন বিরোধী দলের তরফে জোরদার চেষ্টা চলছে যাতে তার আবেদন খারিজ হয়। অকস্মাৎ বজ পাতের মতো দেশবন্ধুর মৃত্যুর খবর এল। দার্জিলিংয়ে স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারে গিয়েছিলেন। সেখানেই মৃত্যু।
করপোরেশনের চাকরি হয়তো হলো না, কিন্তু নেতাজি সুভাষ ও মৌলানা আজাদের অমূল্য বন্ধুত্ব লাভ হলো তার। মনজুরের বাড়িতে নিয়মিত আসা শুরু করলেন সুভাষ। তারপর দুজনে একত্রে যেতেন আজাদের বাড়ি। সেখানে দুই মহান ব্যক্তিত্বের আলোচনা মুগ্ধ হয়ে শুনতেন মনজুর। স্বরাজ, স্বাধীনতা, ভারতের ভবিষ্যৎ ও তার উদ্দেশ্য নিয়ে আবেগময় বিতর্কে ডুব দিতেন তারা। ধর্ম, সম্প্রদায় নির্বিশেষে সবাই তখন স্বাধীন ভারতের স্বপ্নে বিভোর। যুবসমাজকে উদ্বুদ্ধ করে পূর্ণ স্বরাজের উদ্দেশ্যে তাদের চালনা করায় উৎসাহী ছিলেন সুভাষচন্দ্র। বহু বছর পরে রহস্যময় পরিবেশে মৃত্যু হয় তার।
মনে করা হয়, প্লেন দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলেন নেতাজি। বিদেশযাত্রার ঠিক পূর্বদিন বেশ কয়েক ঘণ্টা মনজুরের সার্কাস রেঞ্জের বাড়িতে কাটিয়েছিলেন তিনি।
বরিশালের বাখরগঞ্জ জেলা তখন অপরাধ আর অপরাধী-অধ্যুষিত এক অঞ্চল। জেলাশাসক মিইএন ক্ল্যান্ডি। অতিরিক্ত জেলাশাসক হ্যারল্ড গ্রাহাম। চটপটে, উদ্যমী। ফৌজদারি মামলাগুলো তিনিই দেখভাল করতেন। মনজুরের মূল কাজ তার সঙ্গেই। খর্বাকৃতি, শক্তসমর্থ মি. গ্রাহাম সর্বদা ফিটফাট থাকতেন। এমনকি বাটন হোলে ফুল লাগাতেও ভুলতেন না কখনো। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ হিসেবে তিনি মন্দ ছিলেন না। তার আচরণ ভদ্র ও বন্ধুত্বপূর্ণ। বিদ্যুৎ গতিতে ফাইলের কাজ সারতেন। সকালে ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত অফিসে। লাঞ্চের পর থেকে দ্বিতীয়ার্ধের কাজ সারতেন বাড়ি থেকে।
প্রথম দিনেই মনজুরের টেবিলে একটি ফৌজদারি কেস এসে পৌঁছল। ফাইলের ওপর বড় বড় অক্ষরে Section 302 of the Indian Penal Code লেখা। অর্থাৎ হত্যার অভিযোগ। বিস্ময়ের ভাব কাটিয়ে সংশ্লিষ্ট করণিককে বললেন, বিবদমান দুই পক্ষকে হাজিরার নোটিস পাঠান। শিগগিরই তার অফিসকক্ষে হাজির হলো সবাই। বাদী, বিবাদী, উকিল, দালাল আর কর্মহীন দর্শকের দল। শেষোক্ত দলটি বিনে পয়সায় বিনোদনের মজা নিতে জুটেছে। একেবারে হিন্দি ফিল্মের আদালত দৃশ্য। সবশেষে অস্ত্রধারী কনস্টেবলরা হাতকড়া পরিহিত অপরাধীকে হাজির করল। দীর্ঘ, বলিষ্ঠ, দাড়িওয়ালা সেই ব্যক্তির বিরুদ্ধে ঠাণ্ডা মাথায় খুনের অভিযোগ আছে। ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে মনজুরকে শুধু দেখতে হবে যে প্রাথমিকভাবে অভিযোগটার সত্যতা আছে কিনা। দ্রুততার সঙ্গে তা নির্ধারণ করে তিনি কেসটা ফৌজদারি আদালতে হত্যার বিচারের জন্য পাঠিয়ে দিলেন। এরপর অন্যান্য কাজের চাপে ঘটনাটার কথা ভুলেই গেলেন তিনি।
এরই মধ্যে আরো কিছু অল্পবয়সী সহকর্মীর উৎসাহে জেলার মৃতপ্রায় অফিসার্স ক্লাবে প্রাণসঞ্চার হয়েছে। তৈরি হয়েছে টেনিস ক্লাব। নিয়মিত অশ্বারোহণ শুরু করেছেন মনজুর, কাজের খাতিরে নয়, মূলত অবকাশ যাপন আর শরীরচর্চার উদ্দেশ্যে। সারা দিন বদ্ধ অফিস ঘরে কাজের পর বন্ধুদের সঙ্গে খোলা হাওয়ায় অশ্বারোহণের মতো প্রফুল্লকর অভিজ্ঞতা আর হয় না। এদিকে হ্যারল্ড গ্রাহামের বদলির আদেশ প্রকাশিত হলো। তার স্থলাভিষিক্ত হবেন এইচ ডব্লিউ লিন এক প্রাণচঞ্চল, উষ্ণ আইসিএস। গ্রাহামকে প্রথামাফিক বিদায় জানানোর জন্য এক বিকালে তার বাংলোয় পৌঁছলেন মনজুর। কিন্তু সময় নির্বাচনে ভুল হয়েছিল। গ্রাহাম তখন প্রবল ক্রোধান্বিত। থ্যাবড়া নাকওয়ালা এক ব্যক্তির উদ্দেশে বাছা বাছা বিশেষণ বর্ষণে ব্যস্ত—‘তুমি শালা আছে, তুমি বদমাশ আছে, তুমি হারামি আছে, তুমি বোকা আছে...।’ গ্রাহামের বাংলা বাক্যবাণ ফুরিয়ে এল। অসহায় ব্যক্তিটিকে দেখে মনে হলো যেকোনো মুহূর্তে জ্ঞান হারাবে। গ্রাহাম এবার ঘুরে তার ডেস্কের মধ্যে কিছু খুঁজতে লাগলেন। ড্রয়ার খুলে ফাইল হাঁটকিয়ে বইপত্র সরিয়ে অবশেষে পেলেন ঈপ্সিত বস্তুটি—একটি ক্ষুদ্র ডায়েরি।
পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে গ্রাহামের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল—‘শালা, তুমি আর ভি আছে—তুম পুঙ্গির পুত ভি আছে।’
মনজুরকে কষ্ট করে হাসি চাপতে হচ্ছিল। দেশজ গালাগালির ভাণ্ডারে ‘পুঙ্গির পুত’ বলে কোনো শব্দ হয় না। গ্রাহামের ডায়েরি তাকে ভুল তথ্য দিয়েছে।
একদিন সন্ধ্যায় টেনিস ক্লাব থেকে ফিরে মনজুর দেখলেন টেবিলে ‘আর্জেন্ট’ লেখা একটা খাম পড়ে আছে। পাঠিয়েছেন জেলাশাসক মি. ক্ল্যান্ডি। চিঠির সুর দুঃখবোধক। পরদিন ভোরে মনজুরকে সেন্ট্রাল জেলে পৌঁছতে হবে। এক ফাঁসির উইটনেস হতে হবে। চিঠির সঙ্গে একতাড়া সরকারি নথি। রাতে আর ঘুম এল না তার।
পরদিন ৪টার সময়ে সাইকেল বের করলেন মনজুর। ভয়ার্ত সেই ভোরে, নিজের ভয়ানক কর্তব্য সম্পাদন করতে বিবেকের বিরুদ্ধেই সজোরে পেডাল ঘোরালেন। অপরাধীকে মৃত্যু পরোয়ানা শোনানোর দায়িত্ব তার। সশস্ত্র কনস্টেবলরা শৃঙ্খলবদ্ধ বন্দিকে নিয়ে এল। স্বল্প দূরত্বে দাঁড়িয়ে সে তীক্ষ চোখে মনজুরের দিকে তাকিয়ে। এক চকিত হিমশীতল মুহূর্তে তাদের দৃষ্টি মিলিত হলো। স্তম্ভিত মনজুরের চিনতে অসুবিধা হয়নি। এই সেই অপরাধী, যাকে প্রথম দিনেই তার সামনে আনা হয়েছিল। বধ্যমঞ্চে তোলা হলো বন্দিকে। মস্তক আবৃত হলো কালো কাপড়ে। অনুচ্চ কম্পিত কণ্ঠে পবিত্র কোরআনের পঙিক্ত আবৃত্তি করতে লাগল সে। নিখুঁত উচ্চারণ। সেই সব আরবি শব্দ মনজুরের শিরদাড়ায় হিম স্রোত বইয়ে দিল। প্রার্থনা শেষ হলো এক সময়ে। একটু একটু করে এগোচ্ছে ঘড়ির কাঁটা। মনজুর অনুভব করলেন বন্দির হূদস্পন্দনের সঙ্গে তাল রেখে বেড়ে চলেছে তার পাঁজরের শব্দও। সহসা সশব্দে সরে গেল বন্দির পায়ের তলার তক্তা, দড়ি থেকে নিজের গহ্বরে ঝুলে পড়ল দেহ।
বিবিধ আনুষ্ঠানিক সরকারি কাজের জন্য আরো কিছুক্ষণ থেকে যেতে হলো তাকে। মরদেহ পরীক্ষা করে বন্দির মৃত্যু সম্বন্ধে নিশ্চিত হয়ে ডেথ সার্টিফিকেটে দস্তখত করলেন সিভিল সার্জেন্ট। মনজুরকে প্রতিদস্তখত করতে হলো। পূর্বপরিকল্পিত সমাপ্তি। মৃত্যু নাকি মনুষ্য নিয়ন্ত্রণের বাইরে। সব সময় নয়।
বেশ কিছুদিন রাত্রে ঘুম ভেঙে যেত মনজুরের। মৃত শরীরটির পেশির কম্পন তিনি ভুলতে পারেন না। সেই কষ্টকর দৃৃশ্য রাত-দিন তাড়া করছিল তাকে।
ওজন কমতে শুরু করল। চিকিৎসকের পরামর্শে বরিশাল থেকে বদলির দরখাস্ত করলেন তিনি। এই আবেদন যে শারীরিক কারণে, সে কথা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বোঝাতে বেগ পেতে হয়েছিল মনজুরকে। বরিশাল ছাড়ার আগে হাসিনার সঙ্গে একবার দেখা হলো। বাখরগঞ্জ ছেড়ে কলকাতায় চলে আসবে সে। হাসিনার মায়ের অনুরোধে তাকে স্টেশনে ছাড়তে গিয়েছিলেন মনজুর। দূর থেকে ওয়েটিং রুমে কালো বোরখায় ঢাকা চেহারাটি দেখতে পেলেন। পাশে একটা বাচ্চা। ভিড় ঠেলে এগোলেন মনজুর। ‘কেমন আছ? অনেক দিন পরে দেখছি তোমায়... ,’ এটুকু বলতেই যে হাঁপিয়ে উঠলেন।
খুব ভালো আছি, ভাইজান, ঘুরে দাঁড়িয়ে উজ্জ্বল মুখে উত্তর দিলেন হাসিনা। জিনিসপত্র গুছিয়ে নিলেন একটা ছোট্ট বাদামি চামড়ার সুটকেস আর হালকা কিছু হাতব্যাগ।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে মনজুর দেখলেন ট্রেন আসার সময় হয়ে গেছে। অল্প সময়ের স্টপেজ। লাগেজ নিয়ে ভিড় ঠেলে প্লাটফর্মের দিকে এগোলেন তারা। আগত ট্রেনের তীব্র হুঁইসেল শোনা গেল। গাড়িতে তুলে দিয়ে হাসিনাকে হাত নেড়ে বিদায় জানালেন তিনি। হাঁসফাঁস করে চলতে শুরু করল ট্রেন। অপসৃয়মাণ ট্রেনের শেষ বগিটি যতক্ষণ দেখা গেল, ততক্ষণ তাকিয়ে রইলেন মনজুর। খুব দ্রুত চুকে গেল বিচ্ছেদ পর্ব, কিন্তু বুকের গভীরে এক অচেনা ব্যথা, অজানা বিরহ অনুভব করলেন। এক অগোছালো দুশ্চিন্তা—হাসিনার মূক দৃষ্টি কি কিছু বলতে চাইছিল?
নাকি এ তার মনের ভুল? বাড়ি ফিরে বদলির কাগজপত্র নিয়ে বসলেন তিনি।
সৌভাগ্যক্রমে দরখাস্ত মঞ্জুর হলো। বীরভূম সেটলমেন্টের অন্তর্গত মুর্শিদাবাদে পোস্টিং হলো তার। হেড কোয়ার্টার বহরমপুর। এই স্থান পরিবর্তনের সুফল ফলল। অচিরেই দ্রুত উন্নতি হলো তার স্বাস্থ্যের। এরই মধ্যে স্ত্রী প্রথম কন্যাসন্তানের জন্ম দিয়েছেন। কলকাতায় ইউরোপিয়ান অ্যাসাইলাম লেনের পৈতৃক বাড়িতেই রয়েছেন তিনি। ঘন ঘন যাতায়াতের চেষ্টা করছিলেন মনজুর। আর মনে মনে অপেক্ষা করছিলেন সেই দিনের, যেদিন জেলা পোস্টিংয়ের মেয়াদ শেষ হয়ে কলকাতার সচিবালয়ে বদলির সুযোগ আসবে তার সামনে।
বহরমপুর থেকে সাইথিয়া। সেখান থেকে বোলপুর। ক্রমাগত বদলি তাকে শেষ পর্যন্ত বিশ্বকবির আস্তানায় এনে ফেলল।
সুরুলের কাছে শ্রীনিকেতনে তখন কবির তত্ত্বাবধানে স্বেচ্ছাসেবকরা গ্রাম পুনর্গঠনে ব্যস্ত। মাটির বাড়ি, খড়ের চালা, গাছে ঘেরা স্নিগ্ধ জলাশয় আর রাঙা মাটির পথ প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে প্রকৃতির পরিচর্যায় রত মানুষজন। সব কর্মকাণ্ড পরিচালনার ভার শ্রীযুক্ত কালীমোহরবাবুর ওপর। সেটলমেন্ট অফিসার হিসেবে বোলপুরে মনজুরের যে ক্যাম্প ছিল, সেখানে কালীমোহরবাবুর নিত্য যাতায়াত। রবীন্দ্র কাব্যজগতে তিনিই মনজুরের প্রথম পথপ্রদর্শক। এর আগে এই বিশাল কাব্যভাণ্ডারের খোঁজ রাখতেন না তিনি। কিন্তু কালীমোহনবাবু দৃঢ় সংকল্প বাংলা কাব্যজগতের সঙ্গে মনজুরের পরিচয় তিনি ঘটাবেনই। শব্দগুলোকে অনুভব করার চেষ্টা করুন, মুরশেদ সাহেব। কবির লেখা এসব পঙিক্তই বাংলা সাহিত্যের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছে। শুনুন ভালো করে, ক্রমাগত চেষ্টা করছিলেন কালীবাবু। প্রথম দিকে মনজুর খুব উৎসাহী ছিলেন না। কিন্তু একদিন সব বদলে গেল। বিকালে স্নান সেরে বসেছেন, কালীবাবু শুরু করলেন ‘পতিতা’। ঝনঝন করে বেজে উঠল তার গলা, এক আত্মবিশ্বাসী আবৃত্তিকারের প্রত্যয়ে। কবিতাটির বিষয়বস্তু, উচ্চারণ, দৃশ্যকল্প—সব কিছু মিলিতভাবে স্পর্শ করল মনজুরকে। কাব্যের লয়বদ্ধ ছন্দ এক অন্য ভাবজগতে তুলে নিয়ে গেল, নিমেষে।
‘অসাধারণ’, মৃদু স্বরে স্বীকার করলেন তিনি। আর এই একটি মাত্র কবিতার অভিঘাতে সেই ক্ষণটি থেকে রবীন্দ্রভক্তে পরিণত হলেন। উদগ্রীব হলেন কবির সঙ্গে দেখা করতে। কালীমোহনবাবুর মাধ্যমে কবির কাছে পৌঁছল সেই বার্তা।
মজার ব্যাপার হলো, রবীন্দ্রনাথও ঠিক সেই সময়েই খোঁজখবর নিচ্ছিলেন। প্রতিদিন গোধূলির পরে ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ পাচ্ছিলেন তিনি। অশ্বারোহীর পরিচয় জানার ইচ্ছা হচ্ছিল তার। আসলে সরকারি কাজ সেরে দিনান্তে মনজুরই ফিরতেন তার বাড়ির পাশ দিয়ে। পরবর্তী সপ্তাহে সাক্ষাত্কার নির্দিষ্ট হলো। কালীমোহনবাবুর সঙ্গে কবি-সমীপে। উপস্থিত হলেন মনজুর। চায়ের সঙ্গে নানা খাদ্যবস্তু সহযোগে অতিথি সত্কার করলেন রবীন্দ্রনাথ। দু-চার ঘণ্টা কেটে গেল বিভিন্ন আলোচনায়। মনজুর বিনীতভাবে জানতে চাইলেন ফার্সি কবি হাফিজ শিরাজির কোনো কবিতা রবীন্দ্রনাথ অনুবাদ করেছেন কিনা। কারণ শিরাজির একটি কবিতার সঙ্গে কবির একখানি কবিতার সাদৃশ্য পেয়েছেন তিনি। প্রত্যুত্তরে স্মিত হেসে কবি জানালেন, যদিও তার এক পূর্বপুরুষ ফার্সি জানতেন, কিন্তু ওই ভাষায় তার নিজের জ্ঞান শূন্য। মনজুর বুঝলেন মহৎ মনের গতিপথ প্রায়ই সদৃশ হয়।
সেই দিন থেকে কবির আশ্রমে নিয়মিত হাজিরা দিতে শুরু করলেন মনজুর। এক প্রগাঢ় একাত্মতা তৈরি হলো কবির সঙ্গে। অন্য দিকে রবীন্দ্রনাথেরও মনজুরের প্রতি পিতৃব্যসুলভ এমন এক ভালোবাসা তৈরি হলো, যাতে সময় ছাপ ফেলতে পারেনি। পরবর্তী কালে সচিবালয়ে কর্মরত অবস্থায় কবির এক উষ্ণ আমন্ত্রণপত্র পান তিনি। শান্তিনিকেতনে যাওয়ার আহ্বান। সে চিঠি সম্ভবত রবীন্দ্রনাথের লেখা শেষ চিঠিগুলোর একটি। পত্রটি সযত্নে সংরক্ষণ করেছিলেন মনজুর।
বিচ্ছেদ
দেশভাগ সবার জন্যই কষ্টকর ছিল। কারো কাছে তা বয়ে এনেছে মৃত্যুসংবাদ, কেউ হয়েছে বাস্তচ্যুত, ঠাঁইনাড়া। পেছনে ফেলে আসা স্বজনদের সঙ্গে ছেদ পড়েছে সম্পর্কে। মানচিত্রের ওপর সীমানা এঁকে দেয়ার মতো সামান্য একটা কাজের ফলে কত বিশৃঙ্খলা, কত বিক্ষোভ আর কী বিপুল শত্রুতার সূত্রপাত! হিন্দুরা পূর্বদিক সম্বন্ধে সচেতন হলো, যেদিক থেকে সূর্য ওঠে। মুসলিমরা পশ্চিম সম্পর্কে, যেদিকে মক্কা। হিংসার দায়ভাগ নেয়ার লোক পাওয়া গেল না। কিন্তু দোষারোপ করার লোক অজস্র। ব্রিটেনের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল পলিসি’ ধিক্কৃত হলো বা সাধারণ ভাবে হিন্দু সম্প্রদায় বা সাধারণ ভাবে মুসলিম সম্প্রদায়। এমনকি কেউ কেউ শিখদেরও দোষ দিলেন। কেউ কেউ এই বিপুল বিপর্যয়কে ‘স্বাধীনতার মূল্য’ হিসেবে নস্যাৎ করলেন। কিন্তু যারা ব্যক্তিগতভাবে স্বজন হারালেন কিংবা চোখের সামনে তাদের অত্যাচারিত বা আহত হতে দেখলেন, দেখলেন নিজের পরিবারকে নিঃশেষ হয়ে যেতে, তাদের কাছে যে এই ‘মূল্য’ অত্যধিক বেশি লেগেছিল, সন্দেহ নেই। অথচ এই সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্তের শরিক তাদের করা হয়নি। কেউ শোনেইনি তাদের মতামত।
স্বাধীনতার মূল ধারণাটিকেই প্রশ্ন করতে শুরু করলেন মনজুর। স্বাধীনতা মানে কি শুধুই স্বায়ত্তশাসন? নাকি বস্তু ও মানসিক জগতে ব্যক্তির একান্ত পরিসর? নাকি তা ভৌগোলিক ভূখণ্ড পুনরুদ্ধার, যা মানুষ নিজের জন্য খেয়ালখুশিমতো কেটে নিতে পারে?
মনজুরের নিজের পরিবারেও দেশভাগের প্রভাব সরাসরি পড়ল। তাদের ছেলে তনভির শেষ অবধি পূর্ব পাকিস্তানে থাকাই মনস্থ করেন। মনজুর বুঝলেন এরপর থেকে সন্তানের সঙ্গে কদাচিৎ দেখা হবে তাদের, তা-ও বিশেষ নজরদারির মধ্যে। মেয়ে লামিয়াও তার স্বামী-সন্তানসহ ঢাকায় চলে গেল। চাচাতো, খালাতো ভাই-বোন, তাদের মা-বাবা, গুরুজন, বন্ধু-পরিজন, প্রায় সবাই চলে গেলেন পূর্ব পাকিস্তানে।
কিন্তু মুসলিম সম্প্রদায়ের এই সাধারণ স্রোত ও মতের বিপ্রতীপ অবস্থান নিলেন মুরশেদ দম্পতি। পীরসাহেবের ইতিবাচক ইঙ্গিত পেয়ে ভারতে থেকে যাওয়াই মনস্থ করলেন তারা। অন্য সব রাজনৈতিক নাটককে ঢেকে দিয়েছিল ১৯৪৬-এর হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা। এই বারুদের স্কুপে যারা অগ্নিসংযোগ করে, সেই বিচ্ছিন্নতার কারবারিদের মূল উদ্দেশ্য ছিল ভবিষ্যৎ দশকের স্মৃতিতে যেন ঘৃণার আগুন প্রজ্বলিত থাকে, ক্ষতের বেদনা যেন শুকিয়ে না যায়। দাঙ্গাকারীরা নিজ নিজ স্লোগান তুলত, ‘বন্দে মাতরম’ বা ‘আল্লা হো আকবর’, ‘নারা-এ-তকবির’ ইত্যাদি। রাষ্ট্রের অঙ্গপ্রত্যঙ্গে বিষ ছড়িয়ে পড়ে গ্যাংগ্রিনে পরিণত হয়। যারা সেই হত্যালীলা প্রত্যক্ষ করলেন, তাদের মনে অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি শত্রুতার বীজ রোপণ হলো, চিরতরে। পরবর্তী প্রজন্মকে জাতপাত এবং ধর্মীয় প্রবণতা, তারা কিছু পরিমাণে হস্তান্তরিত করে গেলেন। যদিও এই নতুন প্রজন্ম সে ঘটনা দেখেনি। মনজুরদের পাঙায় দাঙ্গা হয়নি বটে কিন্তু এলাকাটা দেশত্যাগীদের সিল্করুট হয়ে দাঁড়াল। প্রতিদিন শিশুরা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে এই সারিবদ্ধ যাত্রা দেখত। এই যাত্রায় আবার দেখা হওয়ার সম্ভাবনা অতিক্ষীণ।
‘ফের কবে দেখা হবে?’ বিদায়ের মুহূর্তে এ প্রশ্নটাই পুনঃ পুনঃ উচ্চারিত হতো। উত্তর সবার অজ্ঞাত।
মনজুরকে উচ্চপদাধিকারীরা অনেকেই তখন চলে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। পাকিস্তানের নতুন সরকারে সচিব, এমনকি মুখ্য সচিব পদে যোগদানেরও প্রস্তাব ছিল তার কাছে। কিন্তু ততদিনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন তিনি, ‘হাসিনা, আমার থেকে যাওয়াই ভালো। আমার হূদয় এবং ভিটেমাটি, দুই-ই এখানে। আমার হূদয় তুমি আর ভিটেমাটি বলতে এই বাড়ি। এ ছেড়ে কোথায় যাব আমি? আমাদের সুখী দাম্পত্য জীবনের স্মৃতি ছড়ানো ১১, সার্কাস রেঞ্জ ছেড়ে যাওয়া ঠিক হবে না। তুমি কী বলো?’ সংসারের অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হাসিনাই নিতেন। কিন্তু এক্ষেত্রে স্বামীর মতই চুপচাপ মেনে নিলেন তিনি। কোনো দ্বিতীয় চিন্তা বা অনুতাপ ছাড়াই।
‘জান্, আমাদের পীর-ও-মুর্শিদও তা-ই বলছেন। এটাই আমাদের ঘর। বাস্তু বিনিময়ের এই রাজনীতি আমাদের জন্য নয়। আমি সুখী। যখন পারব, দেখা করতে যাব পূর্ব পাকিস্তানে...।’ মনজুরের সিদ্ধান্তে হাসিনা খুশি, কিন্তু সেই সুখ যেন দ্বিখণ্ডিত এক অনুভূতি। পুরনো সঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার বেদনা মিশে গেছে তাতে।
বছর গড়িয়ে চলল। স্বাধীনতা, দেশভাগ, নতুন সংবিধানের কাঠামো সবই সয়ে যেতে থাকল ধীরে ধীরে। দিগন্ত পরিবর্তিত হয়ে গেছে চিরদিনের জন্য। নতুন দেশের প্রশাসন চালানোর জন্য নিজেকে সংহত করলেন মনজুর। সদ্য স্বাধীন দেশের প্রথম ব্যাচের আইএএস হলেন তিনি। পরে পশ্চিমবঙ্গ কাডারের আইএএস অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট। পুরনো সিস্টেমে ব্রিটিশ আইসিএসদের সঙ্গে কাজ করে অভ্যস্ত তিনি। মানিয়ে নিতে অসুবিধা হচ্ছিল। পরিবর্তন স্বাস্থ্যকর, কিন্তু তাতে অভ্যস্ত হতে সময় লাগে। তাছাড়া তিনি তখন কর্মজীবনের আসল সময় পেরিয়ে এসেছেন।
হাসিনা তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ১৯৫০-এর শেষ অবধি চালিয়ে গেলেন। শেষদিকে অবশ্য উপদেষ্টা হিসেবে। ক্রমেই তার জন্য খবরের কাগজের বরাদ্দ কালি ধূসর হতে থাকল। শেষ পর্যন্ত অবসরের সিদ্ধান্ত নিলেন হাসিনা। যদিও পরামর্শের জন্য তার দরজা অবারিত থাকত। ড. বিধানচন্দ্র রায় প্রায়ই হাসিনার উপদেশের জন্য তার দ্বারস্থ হতেন। তুলনামূলক আয়াশে কেটেছিল তাদের পঞ্চাশের দশক। ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে যাওয়ায় বাড়ির দায়িত্ব ছিল কম। ১৯৫৭-এ সম্পূর্ণ অবসর নেন হাসিনা। মহিলাদের শিক্ষা, শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্য তার দীর্ঘ লড়াই শেষ হলো। শেষ হলো স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসনের সংগ্রাম। শেষ হলো শান্ত মর্যাদায় ও সত্যের সন্ধানে জীবনযাপনের যুদ্ধ। অবসরের পর হাসিনার মধ্যে নতুন গুণাবলির প্রকাশ দেখলেন মনজুর। আরো গাঢ় হলো বন্ধুত্ব। যেন দুই সহদার্শনিক। মিলিত জীবনের প্রকৃত মাধুর্য কী, তা প্রথমবার অনুভব করলেন তিনি। সকালের সংবাদপত্র আর রেডিও শোনার মধ্যবর্তী সময়গুলো শুধু কাটিয়ে দেয়া নয়, এক সাধারণ সত্তার মধ্য দিয়ে সময়কে ভাগ করে নেয়া। হাসিনার মাতৃত্ববোধকেও নতুনভাবে আবিষ্কার করলেন মনজুর। সন্তানদের প্রয়োজনে কখনো শক্তি ও সাহসের উৎস হয়ে দাঁড়াচ্ছেন, আবার যখন তারা জোরালোভাবে সৃষ্টিশীল হয়ে উঠতে চাইছে, হাসিনা তখন পুরোপুরি নিষ্ক্রিয়। এক সহজাত নৈতিক বোধ কাজ করত তার মধ্যে। বিভ্রান্ত মুহূর্তে ন্যায়ের পথ বেছে নিতে পারতেন বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে। ফলত দেশভাগের ব্যথা ও ক্ষত সত্ত্বেও নিজেদের মধ্যে এক অপূর্ব পূর্ণতা খুঁজে পাচ্ছিলেন মনজুর-হাসিনা। মনজুরের আইএএস পর্ব যান্ত্রিক, কিন্তু মসৃণভাবে অতিবাহিত হলো। নতুন পরিচিতির সঙ্গে সঙ্গে পুরনো ব্রিটিশ আইসিএসদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করছিলেন তিনি। ইংল্যান্ডের সচিবালয়ে কর্মরত এসব বন্ধুর সঙ্গে বেশ কিছুকাল পত্রালাপ চালিয়ে গেলেন, কিন্তু ক্রমে ভৌগোলিক দূরত্ব অন্তরায় হয়ে দাঁড়াল। পঞ্চাশের দশকের শেষ নাগাদ আর কারো সঙ্গেই যোগাযোগ রইল না।
প্রচুর সময় হাতে পেয়ে সামাজিক যোগাযোগ বাড়ালেন মনজুর। হাসিনা বেশি সময় কাটাতে লাগলেন সন্তানদের সঙ্গে। তারা তখন বড় হয়ে উঠেছে। সন্ধ্যেগুলো কেটে যেত বই পড়ে। বহু বছর ধরে লাইব্রেরিতে পড়ে থাকা বইগুলোর সদ্ব্যবহার করতে শুরু করলেন দুজনে। মনজুর ফিরলেন তার যৌবনের ভালোবাসায়—ফার্সি কাব্য ও সাহিত্যে। তাদের হিন্দু বন্ধুরাও আসতেন। রবি ঠাকুর, আমীর খসরু, রুমি, জামি প্রমুখের কাব্য নিয়ে আলোচনা হতো। মতবিনিময় হতো উপনিষদ, সুফিবাদ ও অদ্বৈত বেদান্ত নিয়েও। শেষ বিচারে প্রকৃত সত্য চূড়ান্ত, তার গতিপথ যত সর্পিল আর দীর্ঘই হোক না কেন। যুদ্ধের অসারতা আর ধ্বংসাত্মক অবশেষ নিয়েও কথা বলতেন তারা। বোধহীন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং তার পরিকল্পকদের ধিক্কার জানাতে কসুর করতেন না।
মনজুর লিখে গেছেন বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তার স্ত্রীর শরীর থেকে এক ‘নূর’-এর নিঃসরণ দেখেছেন তিনি—এক পরম জ্যোতির বিচ্ছুরণ। হাসিনার অগ্রগতি ছিল সহজাত। কোনো চেষ্টা ছাড়াই যেন এক মহাজাগতিক শক্তির সঙ্গে বার্তা-বিনিময় চলত তার। এ বিষয়ে স্ত্রীকে কোনো দিন কিছু বলেননি, কিন্তু মনে মনে তাকে অদ্ভুতভাবে মান্য করতে শুরু করলেন মনজুর। যেন হাসিনার মাধ্যমে কোনো উচ্চতর সত্যের সন্ধান পাবেন তিনি, কোনো মহত্তম প্রেম। সে এমন এক ভালোবাসা, যা অধিকারবোধ, হিংসা বা স্বার্থপরতা দ্বারা শৃঙ্খলিত নয়। অথচ সুফি সাহিত্যে বর্ণিত ‘ইশ্ক’ দ্বারা পরিপূর্ণ। ‘ভালোবাসার মাধ্যমে কখনো চরম আনন্দ পেয়েছ তুমি?’ একবার প্রশ্ন করেছিলেন হাসিনাকে।
‘তোমার প্রশ্নের গতিপথ কোন দিকে, জানো?’ আমি কোনো দিন ভালোবাসাকে মাপতে চাইনি, তাই বলতে পারব না। কিন্তু কাকে ভালোবাসার কথা বলছ তুমি? বিস্মিত হলেন হাসিনা। ‘হয়তো কোনো বস্তুকে। তবে তার মাধ্যমে কোনো মহত্তর বিশ্বজনীন ভালোবাসায় পৌঁছনো। একটা ভক্তির অনুভূতি, কিন্তু কারো মাধ্যমে। ইশ্ক।’
প্রায় অট্টহাস্যে ফেটে পড়ার উপক্রম হলো হাসিনার। আসলে সেই মুহূর্তে গভীর কিছু নিয়ে আলোচনার মুডে ছিলেন না। ‘হায় রে, একজন দেখছি পুরো মজনু হয়ে গেছে। তোমার ভালোবাসা ভবিষ্যতের জন্য জমিয়ে রাখো। যখন বুড়ি হয়ে আর হাঁটাচলা করতে পারব না, তখন কাজে লাগবে। ইশেকর আসল পরীক্ষা হবে সেটা।’ অসমাপ্ত কাজ শেষ করতে উঠে পড়লেন হাসিনা। তবে যেতে যেতে ঘুরে দাঁড়িয়ে ছুড়ে দিলেন, ‘আর হ্যাঁ, ভালো কথা, আমি যদি একই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করি তোমাকে? তুমি কি কোনো ব্যক্তির মাধ্যমে সেই শ্রদ্ধার অনুভূতির সন্ধান পেয়েছ?’
মনজুর জবাব দিলেন না। জবাবের জন্য অপেক্ষাও করলেন না হাসিনা। কিছু প্রশ্ন, উত্তরের অপেক্ষা করে না।
সেই দিনটা অন্যান্য দিনের থেকে আলাদা ছিল না। উর্দুতে লেখা পীর-ও-মুর্শিদের জীবনী পড়ছিলেন হাসিনা। সিদ্ধপুরুষ, মৌলানা মুর্শিদিনা হজরত সৈয়দ শা মুর্শিদ আলি আলকাদেরির ঘটনাবহুল জীবন নিয়ে রচিত বইটির নাম ‘তাজিফিরাত-উল-মৌলা’। সেই পবিত্র জীবনীর কাব্যময় ভাষা তাদের দুজনকে উচ্ছ্বসিত করত। মাগরিবের প্রার্থনা শেষে ঘণ্টাখানেক পাঠ করতেন হাসিনা। সোফায় বসে তন্ময় হয়ে শুনতেন মনজুর। শুনতে শুনতে উপলব্ধি করতেন বিরহ আর বিচ্ছিন্নতার কারণেই প্রেমের প্রয়োজন। উপরওয়ালার প্রতি ভালোবাসা এই বিরহকে অতিক্রম করে অসম্পূর্ণকে সম্পূর্ণ করে। পাঠরত হাসিনাকে দেখতে ভালো লাগত মনজুরের। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তার সৌন্দর্যও পরিণত হয়েছে। চোখের পাশে হালকা ভাঁজ, মুখমণ্ডলের পেশিতে অল্প শিথিলতা। পড়া থামিয়ে মনজুরের দিকে তাকালেন তিনি, ‘দ্বিতীয় খণ্ড শেষ হতে আরো ২২ পাতা বাকি। এগোব?’
এশার নামাজের সময় হয়ে যাচ্ছিল। শিশুরা বাজার-দোকান থেকে ফেরার আগেই প্রার্থনা সেরে নিতে চাইছিলেন মনজুর। তাই বললেন, ‘এখন আর নয়। বাকিটা পরে হবে। আগে নামাজ পড়ে নিই। দাঁড়াও, আমি মাদুর বের করছি...।’
বই বন্ধ করে পাশে শোয়ার ঘরে ঢুকলেন হাসিনা। দিনের শেষে নামাজ পড়ার জন্য বাইরেই থাকলেন মনজুর। প্রার্থনায় হাসিনার সময় কিছু বেশি লাগত। কারণ বাগদাদের সিদ্ধ পুরুষ সম্বন্ধীয় ‘ওয়াজিফা’ বা ‘কাসিদা-শরিফ-এ-ঘোসিয়া’ থেকে আবৃত্তি করতেন তিনি। প্রার্থনা চলাকালীন হঠাৎ গোঙানির মতো শব্দ পেলেন মনজুর। শোয়ার ঘরে ছুটে গিয়ে দেখেন নামাজের মাদুরের ওপর ‘সেজদা’র ভঙ্গিতে পড়ে আছেন হাসিনা। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তার। তড়িঘড়ি ডাক্তারকে ফোন করলেন। এরই মধ্যে পুত্র তনভির এসে গেছে। দুজনে ধরাধরি করে খাটে শোয়ালেন তাকে। নিশ্চল শুয়ে রইলেন হাসিনা। তখন আর প্রাণ নেই তার। মৃত্যু নিষ্ঠুর, আদিম। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে প্রিয় সঙ্গীর সঙ্গে যাত্রা শেষ হয়ে গেল মনজুরের। শোকাহত, বিপর্যস্ত অবস্থায় মনে পড়ছিল হাসিনার মুখে শোনা সেই লাইন দুটি, Type of the wise who soar, but never roam; True to the kindred points of Heaven and Home.
দ্রুত শেষযাত্রার ব্যবস্থা করল ছেলেমেয়েরা। প্রথামাফিক দেহটিকে গোসল করানো হলো। মনজুরের মনে হলো হাসিনার নিষ্কলুষ আত্মার আর কোনো স্নানের প্রয়োজন নেই। সত্যসন্ধানী হাসিনা ছিলেন শুভ বোধের প্রতিমূর্তি। জীবনে ন্যায়ের পথ থেকে বিচ্যুত হননি কোনো দিন।
১৯৬৩ সালের ৬ জানুয়ারি। সেই দিন থেকে নিজের অদৃষ্টের সঙ্গে লড়াই শুরু হলো মনজুরের।
১৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৬৫
দু-বছরের অধিক হয়ে গেছে প্রিয়তমাকে হারিয়েছি। ট্র্যাজেডি জীবন ও মৃত্যু, দুইয়েই থাকতে পারে। আমার ট্র্যাজেডি হলো বেঁচে থাকা। ইচ্ছার বিরুদ্ধে ফুসফুসে বাতাস গ্রহণ। চতুষ্পার্শ্বের ধোঁয়ার জাল আমাকে অতীতের ধোঁয়াশায় ফিরতে সাহায্য করে। মাঝে মাঝেই হাঁপানির টান ওঠে। ফুসফুস ভর্তি কালিঝুলি আর দুঃখ। কোনো এক সমান্তরাল ব্রহ্মাণ্ডে বাস করছে। আমার প্রিয়া, হাসিনা। দুই সমান্তরাল রেখার মতো আমরাও কোনো দিন অসীমে গিয়ে মিলব। আমি অপেক্ষা করতে রাজি। দুঃখের সঙ্গে বোঝাপড়ার জন্য এ লেখা। দুঃখের মতো অনুভূতির সঙ্গে মানিয়ে নেয়া কষ্টকর। আমি সত্যিই দুঃখবোধ করছি তো? এই শূন্যতা... বিচ্ছেদকে মেনে নেয়ার এই হতাশা কি অক্ষমতা? আমি বরং সিগারেটের সঙ্গে খেলা করি। ওরাই আমার বন্ধু। আমার প্রতিটা মুহূর্ত বাঁচতে সাহায্য করছে। একটার প্রজ্বলিত শেষাংশ থেকে আরেকটা ধরিয়ে নিচ্ছি। জীবনের হিসাব মেলাতে বসে দেখছি আমি আদতে একজন অ্যাংলোফিল। ব্রিটিশ বন্ধুদের মিস করি আমি, তাদের সঙ্গ চাই। যদিও আমরা এখন মধ্য-মেধার যুগে বাস করছি, তবুও এমন নয় যে আমি পুরনো দিনে ফিরতে চাইছি। এত কাল শুধুই দর্শক হয়ে কাটালাম। দর্শক ও প্রতিবেদক। একজন যুদ্ধ-সাংবাদিক যেভাবে ঘটে যাওয়া ঘটনার নির্মোহ বিবরণ দিয়ে চলেন, আমার ভূমিকা যেন তা-ই। নিজস্ব মতামত নেই। তনভির পূর্ব পাকিস্তান থেকে যখনই দেখা করতে আসে, ওকে পুলিশে রিপোর্ট করতে হয়। এটা লজ্জার। আমি কোনো মানচিত্রে বিশ্বাস করি না। জরিপের কাজ করতে গিয়ে বুঝেছি ভৌগোলিক অবয়বের কোনো প্রাকৃতিক সীমারেখা নেই। তবু তাকে বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত করি আমরা। ‘আব্বা, তোমার সকালের চা,’ টেবিলে কাপ রেখে বেরিয়ে গেল আতিয়া। কয়েক চুমুক পান করলাম। এক কাপ চায়েরও সঙ্গী প্রয়োজন। কাল কিছু হান্টলি পামার বিস্কিট কিনব।






