১.
সেটা ছিল মধ্য এপ্রিলের তাতিয়ে ওঠা একটা দিনের শুরু।
লিফটের সামনে দাঁড়াতেই সাখাওয়াত সেদিন মহিবুল্লাহকে দেখতে পেল, খোঁচা খোঁচা সাদা-কালো দাড়িতে কাচুমাচু মহিবুল সাখাওয়াতকে কিছু বলতে চাইছিল। কিন্তু ১১টা প্রায় বাজছে; ফার্মগেট, কারওয়ানবাজার, বাংলামোটর সবগুলো পয়েন্টেই নাছোড় জ্যাম পেরিয়ে একটা অপেক্ষারত মিটিংয়ের জন্য সবাইকে বসিয়ে রেখে, তিতিবিরক্ত সাখাওয়াতের সময় ছিল না মহিবুল্লাহর কোনো আকুতি শোনার। সবাই নিশ্চয়ই মিটিংরুমে বসে তাকে শাপশাপান্ত করছে। লিফটের দরজা ১৩ তলায় খুলে যাওয়ার ঠিক আগে মহিবুল্লাহ বলল, ‘স্যার, একটা কথা... ’। সাখাওয়াত বলল, ‘এখন না।’
মহিবুল কুঁকড়ে গিয়ে বলল, ‘জ্বে আচ্ছা, জ্বে, ঠিক আছে।’
রিসিপশনের তাওহিদা আজ কড়া হলুদ রঙের পোশাকে। একবার তাকিয়েই সাখাওয়াতের মনে হলো, চোখে আর কিছু দেখতে পাবে না কয়েক মিনিট। অভ্যাগতদের মাথা ঘুরিয়ে দেয়াই কি তাওহিদার লক্ষ্য? মহিবুল্লাহকে আজ অন্য দিনের চেয়ে অনেক শশব্যস্ত লাগছিল। তবু মিটিংরুমে ঢুকতেই মহিবুল কিংবা তার তুচ্ছ আর্জি অথবা তাওহিদার শর্ষে ফুলের ঘোরসমেত জগতের আর সবই তিনি ভুলে গেলেন।
মার্কেটিংয়ের টি. আর. বরকত অতিরিক্ত ব্যস্ত। আজ তার প্রেজেন্টেশন। এপ্রিলের ১৭ তারিখ, বাইরে গরম দুপুর।
বরকতের মুখ চলছে।
২.
রাত নেমেছে। ঢাকার রাস্তায় শত শত লাইট জ্বালিয়ে গাড়ি ধীরগতিতে চলছে। জানালা দিয়ে দেখলে পোকার মতো লাগে।
শান্তা গুটিসুটি হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে কাবেরীকে বুকের মধ্যে নিয়ে। তাদের দুজনের গায়েই বেগুনি শাড়ি। রঙটা তার পছন্দ নয়, তবু কাবেরীর পছন্দ, তাই। কাবেরীর গালে বড় বেগুনি টিপ। কপাল থেকে গালে নেমে এসেছে। কাবেরীর গালে চুমু দিতেই সে ঘুমের মধ্যেই বলল, ‘বুব্বু।’ সাখাওয়াতকে বুব্বু ডাকে সে। তার কোঁকড়া চুলের ফাঁক দিয়ে দীঘল চোখের রেখা দেখা যায়। বাবা-মা কারো মতো হয়নি কাবেরীর শান্ত চোখ। সেদিকে তাকালেই শান্তি শান্তি লাগে।
খেতে বসে দেখা গেল, কোনো খাবারেই ঝাল দেয়া হয়নি। কাবেরী ঝাল খেতে পারে না, তাই আজকাল কোনো খাবারেই ঝাল দেয়া হচ্ছে না, কেবল মাছ ছাড়া। কাবেরী মাছ খায় না।
ফ্রিজের গায়ে অনেকগুলো বেগুনি রঙের স্টিকার। মাছ আর কাঁচামরিচ খুঁজতে ফ্রিজের দরজা খুলতেই কনুইতে কোমল স্পর্শ। কাবেরী এসে দাঁড়িয়েছে, ‘বুব্বু!’ সাখাওয়াতের মন ভালো হয়ে গেল। অসময়ে উঠলে রাত জাগবে মেয়েটা। তবু।
কাবেরী নতুন আঁকা ছবি দেখায়, ‘এগুলো লৌকা, এইতা আমি’। একেকটা ‘লৌকা’র একেক রঙ, বেশির ভাগই বেগুনি। সাখাওয়াতের হাসি পেল।
৩.
আজ লিফটে উঠে সাখাওয়াত মহিবুল্লাহকে খুঁজল, কিন্তু পেল না। তাওহিদাকে জিজ্ঞেস করতে গিয়েও করল না। তাকে দেখে অনেকক্ষণ সময় লাগল চিনতে। সবুজ রঙের চুলে তাকে ইউক্রেনের লোকদের মতো লাগছে। সেটা লাগুক, কিন্তু কেন ইউক্রেনের কথাই মনে হলো? হলিউডের ছবিতে এমন কাউকে দেখার কারণে?
তাওহিদা নরম হেসে বলল, ‘স্যার, মহিবুল্লাহকে খবর দেব।’
৪.
কাবেরীর জ্বর। শান্তা কয়েকবার ফোন দিয়েছে। সাখাওয়াত একটু চিন্তিত। শান্তা উদ্বিগ্ন হলেও সহজে অফিসে ফোন দেয় না। তার মানে, জ্বরটা বেশি।
বেলিকে রাখা হয়েছে সারা দিন কাবেরীকে সঙ্গ দিতে। তাকে ফোন দিয়ে শুনলেন কাবেরী কয়েকবার বমি করেছে। ওপাশের ডেস্কে রহমত আলি আর রিসিপশনিস্ট তাওহিদা খুব হেসে হেসে কথা বলছে, তার লাল চুল হালকা হালকা উড়ছে। খুব সুখী মনে হচ্ছে তাদের। আকাশে তাকালে কয়েকটা চিলের দেখা পাওয়া যায়। এই গরম দুপুরে ফিকে নীল আকাশের তলায় সেগুলো চক্রাকারে ঘুরছে। অনেক নিচে খেলনার মতো নিশ্চল গাড়ির দল।
তার ব্যবসায়িক বন্ধু লিও বারবার ফোন দিচ্ছে, মেসেজ দিয়েছে, ‘হ্যালো, অ্যাবডুল্লা, আর ইউ দেয়ার?‘
৫.
মে মাস। প্রচণ্ড গরম। এক পশলা বৃষ্টি হয়ে ঢাকাকে আরো কুিসত, আর্দ্র গরম করে তুলেছে। দৃশ্যের পর দৃশ্যে অসহনীয় নগরের ছবি। ক্ষুধার্ত মানুষ গাড়ির জানালায় টোকা দেয়। ধূলিমলিন শিশুদের হাতে কালচে লাল গোলাপ। গালাগালিরত ড্রাইভার আর মোটরসাইকেলের পাশে নির্বিকারে থুথু ফেলা আর জলবিয়োগে ব্যস্ত মানুষের দল।
লিফটে একেক জনের শিফট। মহিবুল্লাহকে অনেক দিন দেখা যাচ্ছে না। তার বদলে জলিল মিয়া নামের কেউ আছে। লিফট থামার আগে মনে পড়ল একটা ফাইল রয়ে গেছে। বলরাম ছুটে গেল আনতে। সাখাওয়াত লিফটে উঠে দেখল, মহিবুল আছে। সে বলল, ‘আপনারে একটা কথা বলতে চাই।’
‘বলো।’
মহিবুল বলল, ‘আপনারে নিয়া একটা স্বপ্ন দেখচি। মাসখানেক আগে। তহন বলতে চাইসিলাম, আমনে ব্যস্ত আসিলেন।’
‘হুমম, কী স্বপ্ন?’
মহিবুল বলল, ‘দ্যাকলাম, আপনে আর এট্টা ছুডো মেয়ে লঞ্চে উঠতেছেন, সদরঘাট। আপনি লঞ্চে উঠতে গিয়া পইরা গেলেন, লগে হেও। আপনে কুনোরহমে উডলেন, কিন্তুক মাইয়াডারে উডাইতে পারেন নাই, খুউব চ্যাশটা কইরলেন।’
‘তারপর?’
মহিবুল চোখ নামিয়ে বললো, ‘এ পরযনতোই।’
সাখাওয়াত লিফটের জিরোতে প্রেস করে বলল, ‘মহিবুল্লাহ, খুব খারাপ স্বপ্ন দেখেছ।’
মহিবুল ‘জ্বে’ বলে অন্যদিকে তাকাল।
‘আর কি দেখেছ?’
‘আর কিছু না।’
‘ও।’
বলরাম ফাইল নিয়ে ফেরত এসেছে। সাখাওয়াত যেতে যেতে কয়েক সেকেন্ড মনে করার চেষ্টা করল, মহিবুল কি ‘মেয়েটা‘ পানিতে পড়ে গেছে বলেছে? নাকি ‘বাচ্চাটা’? মনে পড়ল না।
৬.
জুনের ১১। কাবেরীর সারা গায়ে র্যাশ উঠেছিল। এখনো সেগুলো যায়নি। তার গায়ের চামড়া কালো পোড়া রঙ হয়ে গেছে। তার উজ্জ্বল শান্ত চোখ আরো উজ্জ্বল দেখায়। তার মা শান্তা মাখন, তেল, নানা রকম জল দিয়ে চেষ্টা করেও এবং নানা উপদেশ, আদেশ মেনেও আগের রঙ ফেরাতে পারছে না। ইন্টারনেটের কিংবা তার আম্মার প্রাচীন অভিজ্ঞতার ঝুলিও ব্যর্থ।
আবার সব কিছু করাও যায় না। বাপভক্ত কাবেরী তার বুব্বুকে সবই বলে দেয়। অপরাজিতার লতায় কয়টা নতুন কুঁড়ি, ভূতের কেন দাঁত নেই, বিড়াল কেন মাঝরাতে কাঁদে কিংবা ইনক্রেডিবল হাল্ক অথবা ডুবলু বুড়ি রহস্য বুব্বুর কাছে। এবার শান্তা বেড়ানোর কথা বলে রাঙ্গামাটি যাবে। পাহাড়ি মানুষের কাছে এক চিকিৎসার খবর আছে।
৭.
নৌকা হালকা দুলছে। নদীর পানিতে বিকালের বিদায়ী লালচে আলো। ছইয়ের নিচে কাবেরী বসে আছে। ঠিক পাশে বেগুনি রঙের শাড়ি পরা, হাতে শাখা পরা দুই হাতে টুংটাং শব্দে কেউ একজন কাবেরীকে ভাত খাইয়ে দিচ্ছে। পাশেই মহিবুল, মহিবুল কাবেরীকে একটা গল্প বলছে, আর কাবেরী মাথা দুলাচ্ছে। তার হাসিতে নৌকা দুলে উঠছে। মনে হচ্ছে বেগুনি শাড়ির মেয়েটি কাবেরীর কাছের কেউ, মহিবুলও। মেয়েটি কাবেরীকে কিছু বলতেই কোথায় যেন বেজে ওঠে টুং টুং টুং আর কাবেরী হেসে ওঠে। কেঁপে ওঠে নৌকাও। সাখাওয়াত দেখে নৌকার দেয়াল লম্বা হয়ে গেল, ছাদে সাদা আলো। মহিবুল তার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। এটা আসলে নৌকা না। এটা একটা লিফট। ১৩ নম্বর বাটন জ্বলছে। মহিবুল বলে, ‘‘স্যার, কাবেরী মা’রে উডাইতে পারছিলেন ছার?’’ সাখাওয়াত ভাবল নিশ্চয়ই স্বপ্ন এটা। ঠিক তাই। লিফটে বাঁশি বাজার কথা না। দূর মরুভূমির নিঃস্ব মেষবালকের বাঁশির সুর এখানে আসবে কী করে? আবার কেমন একটা গন্ধ। বিকট কাঁচা ইলিশের।
তার অ্যালার্ম বাজছে। জুনের আরেকটা দিনের শুরু। বাতাসে আষাঢ়ের গন্ধ। জানালার ওপাশে আলো নেই। দিনের বেলায় নগরীর আকাশ অন্ধকার করা মেঘ নেমেছে। কেউ একজন গান শুনছে পাশের বাসায়, ‘তু মুঝে শরমায়ে, তু মুঝে শরমায়ে..।’ কড়া ইলিশ ভাজার গন্ধ বাতাসে।
সাখাওয়াত চোখ মেলেই মেয়েকে খুঁজল। নাহ, তারা রাঙ্গামাটি গেছে। মনেই ছিল না।
৮.
অর আজ ঢাকার বাইরে কাজ ছিল। এমন একটা ব্যস্ত দিনের সামনেও তার ঘুম পাচ্ছে। গাড়িতে বসেই মনে হচ্ছে, সবকিছু কেমন দূরে চলে যাচ্ছে, বেশি ঘুম পেলে এমন হয়। কড়া কফির কাজ কেবল ক্লান্তিকে বাড়ানো তখন।
লিফটের সামনে দাঁড়িয়ে এখানে অপেক্ষার আগেই দরজা খুলে গেল। সামনে মহিবুল দাঁড়িয়ে আছে। মহিবুলের ঢাকায় থাকার কথা না? সে কাতরভাবে বলল, ‘স্যার, পারুল আমারে বিশ্বাস পায় না। কয়, আমি বাচ্চারে বেইচা দিছি।’
সাখাওয়াত কথা বলার চেষ্টা করে। ঠোঁট নড়ছে না। মহিবুল বলে চলে, ‘বউডা কান্দে খালি স্যার।’
সাখাওয়াত বলে, ‘সব টাকা তো তোমাকে দিয়েছি মহিবুল।’ লিফটের ইমারজেন্সি কল বাটন খুঁজে পাওয়া যায় না। অনন্ত কাল লিফট চলছে। দম দম দম শব্দ হচ্ছে।
মহিবুল একটু হিংস্র হয়ে ওঠে, চোখ রাঙিয়ে বলে ওঠে, ‘হুনেন না? বউডা কান্দে, কান্দে, কান্দে.. ।’ কেমন ঘাম, বিড়ি, পান-জর্দা, আর মাছের মেশানো একটা ঘ্রাণ আসে। নাকি শ্যাওলার? মহিবুলের কোমর থেকে পা অব্দি শ্যাওলা পেঁচানো, খুব বড় বড়। শামুক, আর আঁশটে গন্ধ পানি ঝরে পড়ে সেখান থেকে। পায়ের তলায় কেমন এঁটেল মাটি, পা ঢুকে যাচ্ছে পাকেচক্রে, টেনেও তোলা যায় না। খুব খারাপ লাগে।
কেউ একজন ঠকঠক করে আওয়াজ করে, মহিবুলের দাড়িতে কচুরিপানা মাখা, বলেই চলেছে, ‘বউ কান্দে, কান্দে.. ।’ সাখাওয়াতের ঘুম ভেঙে যায়। সাভার পৌঁছে গেছেন। উহ, মাথাটা ধরে গেছে তার।
৯.
রিসিপশনে ঢাউস একটা ফুলের তোড়া। তাওহিদা সেটার সঙ্গে সেলফি তুলছে। মনে হয়, কোনোটাতেই ফুলের চেয়ে নিজেকে বেশি সুন্দর লাগছে না। বারবার ছবি নিয়ে যাচ্ছে। ভয় হয় সারাক্ষণ মোবাইলের ওপর উপুড় হয়ে থাকায় তার ঘাড়টাই না খুলে পড়ে।
আজ মহিবুলকে পাওয়া গেল। দুপুরে অফিসে ডেকে তাকে সাখাওয়াত একটা খাম দিল। বলল, ‘তোমার জন্য আরেক জায়গায় ভালো চাকরির ব্যবস্থা করেছি।’ তোমার টাকা সব আগেই শোধ দেয়া হয়েছে। তবু এই খামে আরো ৫৫ আছে।
মহিবুলের চোখ, যা কিছুটা যেকোনো শিশু কিংবা কাবেরীর মতোই ফ্যালফেলে এবং এ মুহূর্তে তাকিয়ে আছে নিস্পৃহ হয়ে তারই দিকে, সেদিকে তাকিয়ে সে হঠাৎ বলে, ‘তোমার কি আর কোনো সন্তান আছে?’ বলার সঙ্গেই তার মনে হলো, ‘আর কোনো’ বলতে সে নিজে কী বোঝাচ্ছে?
মহিবুল বলে, ‘না, স্যার। একটাই বাচ্চা আমার বউয়ের। তাও তার বাপ হইলেন আপনি।’ সাখাওয়াতের ইচ্ছা হয় ওকে একটা থাপ্পর দিয়ে ফেলে দিতে।
মহিবুল বলে, ‘বউডা খুব কান্দে। কয়, জীবনে আর কিছু চায় না, মাইয়ারে না দ্যাকলে মারা যাইব। আমারে দ্যাকলে থুথু দেয়। বিশ্বাস করতে চায় না।’ সাখাওয়াতের মনে হয়, তার নিঃশ্বাস চুরি হয়ে গেছে। মহিবুল বলল, ‘হে কয়, ডাক্তররা অর পেটে বীজ বসাইল, হেইডা আমার ছিল না। হৈলে ব্যাচতে পারতাম না। কয় ডাক্তর অরে জাদুটোনা করছে।’
সাখাওয়াত তো জানে, মহিবুলের স্ত্রী পারুল কাবেরীর সারোগেট মাদার। কিন্তু কথাটা মনে রাখার কথা ছিল না মহিবুল আর তার স্ত্রীর। মহিবুল শর্ত ভঙ্গ করেছে। চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে, মেয়ের বিষয়ে কথা বলছে, স্বপ্ন দেখছে।
তার চেয়েও সে বেশি চিন্তিত কাবেরীর গাঢ় চোখ নিয়ে। এ চোখে তাকালে মনে হয় অন্য কেউ চেয়ে আছে। ২৮০ দিন শরীরে বহনের বিনিময়ে যথাযোগ্য মূল্য দেয়ার পরও পারুল ‘মা’ হয়ে উঠছে। এটা শর্তভঙ্গ। শুধু তার পেট ভাড়া নেয়া হয়েছিল, মাতৃত্ব নয়।
মহিবুল আরো কথা বলে। সে মন দিতে পারে না।
বেগুনিরঙা শাড়ি পরা হাসপাতালের মেয়েটার হাতে সেদিন ছোট্ট বাচ্চাটিকে তুলে দেয়া হলো। হ্যাঁ, কিছুই ভোলেনি সে। প্রথম সন্তানের জন্ম। সেদিনও এমন বৃষ্টি ছিল।
কিন্তু কি হচ্ছে! প্রথম মা হওয়ার সব কল্পনা, সাধ, শঙ্কা কি পারুল নয় মাসে জড়িয়ে দিয়েছে কাবেরীর মধ্যে? কিন্তু এর সম্ভাবনা খুবই কম। এসব বিষয়ে আগেই জেনেছে সাখাওয়াত। কিন্তু তবু কাবেরীর বিশেষ কিছু পছন্দ মন থেকে তাড়াতে পারে না সে। ও কেন এমন বেগুনি রঙ নিয়ে অবপেসসড!
‘কয়, মাইয়াডা মাছ খাইতে পারে না। হে প্যাডঅ থাকত, মুই মাছ হাইতে হারতাম না, বউডা কয়।’ মহিবুলের কথায় সম্বিত ফিরে পেয়ে সে বলে, ‘কি বললে?... আচ্ছা কি যেন স্বপ্ন দেখেছিলে?’ মহিবুল যখন এ স্বপ্নটার কথা বলেছিল, তখনই প্রথম কাবেরী অসুস্থ হয়।
‘আচ্ছা, ওই স্বপনডা?’ মহিবুল কিছুক্ষণের জন্য চুপ হয়ে যায়, তারপর বলে, ‘কুনোদিন স্বপন দেহি না। মাইয়ার মা...।’ সাখাওয়াত অধৈর্য হয়ে বলেন, ‘মেয়ে মেয়ে করবে না।’
মহিবুল বলে, ‘হে খালি স্বপ্ন দেখে। আসলে আমি না, হেই দেকসিল। আমারে কয়, বাচ্চাডার সারা গায়ে গুটা উডছে, সাদা চামড়া পুইরা কালা হয়ে গেছে। একটা লোক তারে হাত ধইরা তুলতে চায়, পারে না।’
সাখাওয়াতের রাগ লাগে। একটু ভয়ও। আর এই ভয় পাওয়ার ব্যাপারটা রাগটাকে আরেকটু উসকে দেয়। ‘গোপনীয়’ লেখা খামটা মহিবুলের হাতে তড়িঘড়ি করে দিয়ে সে বলে, ‘নতুন চাকরিতে জয়েন করো কাল। এখানে আর আসতে হবে না।’
আশ্চর্য মহিবুল টাকাটা খুব শান্তভাবে নেয় এবং বেরিয়ে যায়। ওহ, তাহলে টাকাগুলোর জন্যই এত কিছু! তার স্বস্তি লাগে। অনেকটা সময় অন্ধকার অফিসে ঝিম মেরে থাকার পরে, স্কুল-কলেজের ঘনিষ্ঠ বন্ধু রুবাইয়াতের সঙ্গে ফোনে কিছুক্ষণ কথা বলে এবং বহুদিন পর একটা গান শুনে অফিস থেকে বের হয় সাখাওয়াত। তাওহিদা বেরোনোর আগে তাকে একটা খাম দেয়। খামের ওপর লেখা ‘গোপনীয়’ শব্দটা পড়তে পড়তে সাখাওয়াত ভাবে তাওহিদা আজ এত উজ্জ্বল একটা বেগুনি জামা পরেছে!
গাড়িতে যেতে যেতে ভিডিও কলে শান্তাকে পাওয়া গেল। উচ্ছ্বসিত সে, ‘জানো কয়েক দিন ধরে এখানকার পাহাড়ি একটা ওষুধ ওকে খাওয়াচ্ছি। গোটাগুলি একটু কমেছে।’ পাশ থেকে কাবেরী বলে, ‘বুব্ব।’
১০.
পারুলকে অনেকবার দেখলেও তার মুখ সোজাসুজি কোনোদিন দেখেনি সাখাওয়াত। তবু আজ দেখামাত্র চিনতে দেরি হলো না।
সাখাওয়াত আজ আরেকটা খাম নিয়ে জীয়ন্তপুর এসেছে। মহিবুলের কথা ভুল ছিল। পারুল এবং মহিবুলের আরো দুটি সন্তান হয়েছিল। এর মধ্যেই এক জুনে বরিশাল থেকে ঢাকাগামী লঞ্চে ওঠার সময় পা ফসকে মহিবুলের ছোট ছেলেটা পানিতে পড়ে যায়। মহিবুল ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে ওঠাতে পারলেও নিজে আর উঠতে পারেনি। এলাকার লোকে বলে, ‘মহিবুল্লায় হাপশায় গেসিল।’
সাখাওয়াতকে শরবতের গ্লাস দিয়ে বারান্দায় চৌকি থেকে দূরে বড় ঘোমটা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে মহিবুলের বউ। এখন তার বয়স হয়েছে। বড় ঘোমটার নিচ থেকে সে খুব কম কথা বলে, তাকিয়ে থাকে বেশি। পারুল বলে, ‘মাইয়াডার চামড়া সারছে নি?’ সাখাওয়াত একটু চমকে ওঠে। তারপর বলে, ‘হ্যাঁ।’ ভারী চশমার মধ্য দিয়ে তাকিয়ে সে দেখে উত্তরটা শোনার সময় পারুলের গাঢ় সবুজ ঘোমটাখানা একটু সরে যায়, কোঁকড়া রুপালি চুলের ফাঁকে মায়াবী দীর্ঘ চোখের এ নারী কাবেরীরই বৃহৎ কলেবর—গর্ভধারিণী। জ্বলজ্বল করে যে চোখ দুটি চেয়ে আছে সাখাওয়াতের দিকে, সেই চোখ তার খুব চেনা।






