এক.
কুছ তো দে, অয় তলৎ এ না ইনসাফ
আহ ও ফরিয়াদ-কি রুখসৎ হি সহি।
(কিছু তো দাও, হে অবিচারের চূড়ান্ত প্রতীক
দীর্ঘশ্বাস ফেলার, মর্মবেদনা জানানোর অনুমতিটুকু অন্তত দাও!)
কার প্রতি এই অনুযোগ ছিল মীর ত্বকী মীরের? প্রেমিকা? ঈশ্বর? নাকি সেই প্রবল প্রতাপশালী নওয়াব, যিনি একদিন তাকে ডেকে এনেছিলেন সাদরে আবার ছুড়েও ফেলেছিলেন দূরে?
রুক্ষ, বিরান, ধূলিময় লক্ষৌ শহরের প্রাণকেন্দ্রে এক প্রাচীন দোতলা ঘুলঘুলিওয়ালা বাড়ি কাম জাদুঘরে পর পর সাজানো আছে আওয়াধ তথা লক্ষৌয়ের নবাবদের বিশালকায় পেইন্টিংগুলো। চিত্রকর্মগুলোর বিশেষত্ব হচ্ছে, এগুলোর বিরাটাকৃতি আর তা এই বিশাল হলরুমে অদ্ভুতভাবে প্রায় ত্রিমাত্রিক আবহ তৈরি করেছে। ডান দিক থেকে তাকালে এক রকম আবার বাম দিক থেকে দেখলে সব ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে। যেন নবাব সাহেবের জুতা, লাঠি, মণিমুক্তা খচিত পাগড়ি জায়গা বদল করে ফেলেছে দর্শকের স্থান পরিবর্তনের সাথে সাথে। লক্ষৌয়ের এই নবাব আসফ উদ দৌলার চিত্রকর্মের বড় নেশা ছিল। আর সব রাজাধিরাজের মতোই পোর্ট্রেট পেইন্টিংয়ের নেশা। নিজের পোর্ট্রেট করার জন্য তিনি সেই ইউরোপ থেকে ডেকে এনেছিলেন জার্মান চিত্রশিল্পী জোহান জোফানির মতো গুণী লোককে, কিংবা ব্রিটিশ মিনিয়েচার শিল্পী হামফ্রেকে, এমনকি এই নওয়াবের নানা পোর্ট্রেট এখনো মিলবে লন্ডনের বিভিন্ন আর্ট গ্যালারি ও মিউজিয়ামে। তো প্রায়ান্ধকার রহস্য ঘেরা সেই জাদুঘরে অশীতিপর এক বৃদ্ধ গাইড লক্ষৌয়ের সবচেয়ে পরাক্রমশালী এই নওয়াবের সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন উর্দুতে। ইনি আউধের নওয়াব সুজা উদ দৌলার পুত্র নওয়াব ই উজির মির্জা আসফ উদ দৌলা। জন্ম ১৭৪৮ সালে। মাত্র ২৭ বছর বয়সে নবাব স্থলাভিষিক্ত হন লক্ষৌয়ের। আওয়াধের নবাবরা ততদিনে ফাইজাবাদ থেকে রাজধানী সরিয়ে এনেছেন এই রুক্ষ মলিন শহরে। নতুন নবাব ছিলেন সৌখিন, বিলাসী, প্রজাপ্রেমী। চিত্রকর্ম ছাড়াও ভালোবাসতেন সূরা আর শায়ের। আর তাই দিল্লি যখন বারবার আক্রান্ত হচ্ছে, কবিরা নিজেদের আর নিরাপদ ভাবতে পারছেন না সেখানে, তখন ইনিই সাদর আমন্ত্রণে সেখান থেকে ডেকে এনেছিলেন উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি মীর ত্বকী মীরকে। উর্দু কবিতা আর গজলেরই পৃষ্ঠপোষকতায় লক্ষৌয়ের আলো-বাতাসে বেড়ে উঠেছিল এক আশ্চর্য উচ্চতায়। কিন্তু বৃদ্ধ যে কথাটি চেপে যান আর ইতিহাস যা আমাদের বলে গেছে তা হলো, এই সমঝদার ও উদার নওয়াব কোনো এক অজ্ঞাত কারণে পরবর্তী সমেয় হেলায় ছুড়ে ফেলেছেন তার প্রিয় কবি মীরকে। ঠেলে দিয়েছেন দূরে। শেষ জীবনটা মীর ত্বকী মীরের কেটেছে নিদারুণ কষ্টে, অবহেলায় আর দারিদ্র্যে। অবশেষে এই মহান কবি একাকী ঘরে অতিরিক্ত ওষুধের প্রতিক্রিয়ায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন ১৮১০ সালের কোনো এক শুক্রবারে। যে কবি মৃত্যুর আগে একদিন লিখে রেখে গেছেন: দুঃখে-কষ্টে-অভিমানে মীর/ দেহ ছেড়ে চলে যায়/ না গেলে দেখত, নতুন জগতে/ মীরকে সবাই চায়!
বিশাল বপু, মণিমুক্তা হীরা খচিত জামাকাপড় পরা বিরাট গোঁফওয়ালা নবাবের পেইন্টিংয়ের দিকে চেয়ে ভাবছিলাম কথাটা কত সত্য; আর সত্য কেবল দেখতে পান একজন কবি, শাসকরা নন।
দুই.
৪০০ বছরের প্রাচীন লক্ষৌ শহরে শীত এবার যাই যাই করেও যাচ্ছে না। সন্ধ্যার পর তাপমাত্রা নেমে যায় অকস্মাৎ। গোমতী নদীর তীরে বইতে শুরু করে হিমঠাণ্ডা বাতাস। তার পরও পথে-ঘাটে মানুষের কমতি নেই। শহরের প্রান্তে উঠছে নতুন নতুন অট্টালিকা, সুরম্য সব শপিং মল, মাটির নিচে মেট্রো; ভারতের সবচেয়ে দ্রুত অগ্রসরমান শহর বলে বিবেচিত হচ্ছে উত্তরাখণ্ডের রাজধানী লক্ষৌ। তবু এ শহর তার প্রাচীন গাম্ভীর্য আর ভারিক্কি ভাব হারায়নি। পুরনো লক্ষৌতে যেন এখনো বাতাসে মিশে আছে গজলের দীর্ঘশ্বাস, ক্বাসিদার আর্তনাদ, মহররমের শোকগাথা। দিনের বেলা ঝকঝকে সূর্যের আলোয় শহরের কাইজারবাগ এলাকায় শত বছরের প্রাচীন আর অকল্পনীয় সুন্দর ৬০ ফুট উঁচু রুমি দরোজার এপাশ-ওপাশ থেকে দেখে যেন মুগ্ধতাই কাটে না আমাদের। এই গেট বা দরোজার দুদিক একেবারেই দুই রকম। যেদিকটা বড় ইমামবাড়ার দিকে মুখ করে আছে, তা দেখতে অনেকটা দালানের মতো, সাদাসিধে, সাধারণ দুর্গের গেটের মতো। কিন্তু বিপরীত দিকটা দারুণ কারুকাজ করা। মনে হয় যেন কোনো নওয়াবজাদির গলার মণিহারের ডিজাইন, আর তার লকেটটা ঝুলছে ঠিক মাঝখানে। এই গেট আর তার অদূরে অবস্থিত বড় ইমামবাড়ার স্থপতি কিফায়েতউল্লাহকে নবাব সাহেব নিয়ে এসেছিলেন পারস্য থেকে। কথিত আছে, এই স্থাপনা তৈরি করার পেছনে ছিল ১৭৮৪ সালে দেখা দেয়া এক নিদারুণ দুর্ভিক্ষ। খাদ্যাভাবে এ অঞ্চলের মানুষ সে বছর দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। উদার ও প্রজাবৎসল নবাব তার খাজাঞ্চিখানা খুলে দিয়েছিলেন। কিন্তু সমাজের ভদ্রলোকেরা এভাবে ভিক্ষা নিতে ভারি শরমিন্দা বোধ করছিলেন। নবাব তাই একটা সুরম্য দালান আর তার সাথে মসজিদ তৈরি করতে মনস্থ করলেন। দিনের বেলা প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক পাথর গেঁথে যেটুকু ইমারত তৈরি করতেন, প্রতি চতুর্থ রাতে নগরীর ভদ্রলোকেরা রাতের অন্ধকারে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে সেটুকু ভেঙে ফেলতেন। তাই ইমারত তৈরি আর কখনই শেষ হতো না নবাবের। শেষ হতো না লক্ষৌয়ের অধিবাসীদের এই চলমান চাকরিও। যতদিন না দুর্ভিক্ষের অমানিশা কেটে যায়, নবাব আসফ উদ দৌলা এভাবেই তার প্রজাদের কাজে নিবিষ্ট রেখে ভরণ-পোষণ করেছেন। তার এই বিচক্ষণ ও উদার প্রজাপালনের জন্য তখন লক্ষৌয়ের লোকজনের মুখে মুখে ফিরত এই প্রশংসাবাণী—জিসকো না দে মওলা, উসকো দে আসফ উ দৌলা। যাকে খোদাও কিছু দেন না, তার জন্য আসফ উদ দৌলা তো আছেনই। তো দুর্ভিক্ষ শেষ হলে নবাব কাজ শেষ করতে নির্দেশ দিলেন। নির্মিত হলো আশ্চর্য এক ইমারত। ১৬৪ ফুট লম্বা ও ৫২ ফুট চওড়া চুনাপাথরের তৈরি এ ইমারতের খিলান বা ছাদ দাঁড়িয়ে আছে কোনো বিম ছাড়াই। এ রকম উদাহরণ পৃথিবীতে আর একটিও নেই। এ বিশাল স্থাপনাকে ধরে রেখেছে এর ওপর গড়ে তোলা এক আশ্চর্য গোলকধাঁধা-ভুলভুলাইয়া। সরু সরু প্যাসেজ, করিডোর আর ব্যালকনি দিয়ে তৈরি এই ভুলভুলাইয়া, যাতে প্রবেশের ৪৮৯টি একই রকম দেখতে দরজা বিদ্যমান, কিন্তু বের হওয়ার রাস্তা একটিই। যে কেউ এই আশ্চর্য গোলকধাঁধায় ঢুকে পড়ার পর পথ হারিয়ে হাতড়ে বেড়াবে, যদি না সে বের হওয়ার তরিকা না জানে।
বড় ইমামবাড়ার নিচে জুতা খুলে রেখে চারজনে মিলে গাইডের পিছু পিছু সরু ক্রমেই অন্ধকার হয়ে আসা সিঁড়ি দিয়ে ভুলভুলাইয়ায় প্রবেশ করলাম দুরু দুরু বক্ষে। গাইডের সাহায্য নেয়ার মূল কারণ সপরিবারে ঠিকঠাকমতো বের হয়ে আসার নিশ্চয়তা বোধ করা। আর জুতা খুলে রাখার কারণটা তরুণ গাইডই খুলে বলল। দিনশেষে সূর্য ডোবার আগে ইমামবাড়ার দরজা তালাবদ্ধ করে দেয়ার আগে প্রতিদিন এই জুতা গোনার নিয়ম। জুতা রয়ে যাওয়া মানে নিশ্চয়ই কেউ পথ হারিয়ে আটকে পড়েছে ভুলভুলাইয়ার অলিগলিতে, সমস্ত রাত এভাবেই পথ হাতড়ে বেড়াবে। রক্ষণাবেক্ষণের কাজে নিয়োজিত রক্ষীরা তখন সেই নিখোঁজকে উদ্ধার করতে বিভিন্ন পথ দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করবে। মনে পড়ে গেল সত্যজিত রায়ের বাদশাহি আংটি গল্পে ফেলুদার সাথে ধীরুকাকার সেই সংলাপ: ‘ তাই তো শুনিচি। একবার এক গোরাপল্টন—অনেকদিন আগে—মদটদ খেয়ে বাজি ধরে নাকি ঢুকেছিল ওর ভেতরে। বলেছিল কেউ যেন ধাওয়া না করে। ও নিজেই বেরিয়ে আসবে। দুদিন পর ওর মৃতদেহ পাওয়া যায় ওই গোলকধাঁধার এক গলিতে।’ বুকটা ঢিপঢিপ করলেও ফেলুদার কথাটা আর বিশ্বাস হচ্ছে না এখন। এত ট্যুরিস্ট। এক মানুষ ভুলভুলাইয়ার ভেতরে। সরু সিঁড়ি আর গলি পেরোতে দেয়ালের সঙ্গে গা চেপে অন্যকে যাওয়ার জায়গা করে দিতে হচ্ছে। এত মানুষের মধ্যে হারিয়ে যাওয়ার কোনো আশঙ্কাই নেই। কিন্তু আজব ব্যাপার, কোনোভাবে দলছুট হয়ে গেলেই নার্ভাস লাগছে। একই রকম সব সুড়ঙ্গ আর দরজা। কোন দিক দিয়ে যে এসেছিলাম, আর কোন দিকে যাব, বাঁয়ে না ডানে না সামনে, বোঝা মুশকিল। কখনো সুড়ঙ্গের শেষ কোনো অদৃশ্য মাথা থেকে হালকা সূর্যের রশ্মি এঁকিয়ে বেঁকিয়ে ঢুকেছে, দেখে মনে হচ্ছে ওইটাই বেরোনোর পথ। এ রকমই একটা মোড়ে এসে গাইড ছেলেটি—ভারি মিষ্টি চেহারার আর ভদ্র এক ছেলে—আমাদের জিজ্ঞেস করল, ‘বলুন দেখি এবার কোন দিকে গেলে ভালো হবে? সোজা, বাঁয়ে না ডানে?’ সূর্যের হালকা রশ্মি আসছিল সামনের দিক থেকে। তাই সবাই একযোগে রায় দিলাম, নিশ্চয়ই সোজা। সে হেসে বলল, ‘এজন্যই তো এর নাম ভুলভুলাইয়া। ওই আলো বরং আপনাকে পথ ভুলাবে, নিয়ে যাবে ভুল পথে ভুলিয়েভালিয়ে। আমাদের আসলে যেতে হবে বাঁয়ে!’ বাঁয়ে তাকিয়ে দেখি সরু সুড়ঙ্গ চলে গেছে কয়েক ধাপ সিঁড়ি বেয়ে নিচে, সিঁড়ির নিচটা ঘন অন্ধকার। বাপরে, ছেলেটা না বললে এই পথে নিশ্চয়ই যেতাম না। আবারো বাদশাহি আংটির কথা মনে পড়ল। ছোটবেলায় বহুবার পড়েছি এ বই, আর ভেবে রেখেছিলাম, বড় হয়ে একদিন নিশ্চয়ই লক্ষৌ বেড়াতে যাব। আমার ছেলেমেয়েদেরও প্রিয় গল্প এটা, ওদের প্রায় মুখস্থ। বাদশাহি আংটিকে আরো জনপ্রিয় করেছেন সত্যজিত রায়, সিনেমা তৈরি করে। তো গল্পে ফেলুদা আর তোপসে যখন প্রথমবার ভুলভুলাইয়ায় ঢোকে, তখন তোপসে একেবারে বিহ্বল হয়ে পড়েছিল। তোপসের বর্ণনায়: ‘ সবচেয়ে আশ্চর্য লাগল ভুলভুলাইয়া। এদিক-ওদিক এঁকেবেঁকে সুড়ঙ্গ চলে গেছে। সেগুলো এমন কায়দায় তৈরি যে যতবার একেকটা মোড় ঘুরছি, ততবারই মনে হচ্ছে যেন যেখানে ছিলাম সেখানেই আবার ফিরে এলাম। একটা গলির সঙ্গে আরেকটা গলির কোনো তফাত নেই। দুদিকে দেয়াল, মাথার ওপর নিচু ছাত, আর দেয়ালের ঠিক মাঝখানটায় একটা করে খুপরি। নবাব যখন বেগমদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলতেন, তখন ওই খুপরিগুলোয় পিদিম জ্বলত। রাত্তিরবেলা যে কী ভুতুড়ে ব্যাপার হবে, সেটা বেশ বুঝতে পারছিলাম।’
তোপসের কথা ভাবতে ভাবতে এগলি-ওগলি হাঁটছি তো হাঁটছিই। সুড়ঙ্গ যেন আর শেষ হয় না। আমার মেয়েটা একটু ভীতু স্বভাবের। পেছন থেকে হাতের আঙুল ধরে রেখেছে জোরে। পেছন ফিরে দেখি ছোটনেরও মুখ ফ্যাকাসে। জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে। ওর আবার একটু ক্লোস্ট্রোফোবিয়া ধরনের আছে। বদ্ধ জায়গায়, এমনকি বাড়ির লিফটেও বেশিক্ষণ থাকলে ওর দম বন্ধ হয়ে আসে। বুঝতে পারছি, এখান থেকে বের হতে পারলেই সবার শান্তি। এদিকে গাইড তখন জিজ্ঞেস করছে, ‘বলুন দেখি জনাব, দেয়ালের কি আসলেই কান আছে?’ আমরা ফ্যাকাসে মুখে মাথা নাড়ি, আছে কি?
‘জি জনাব, সে হেসে বলে, সত্যি আছে। এই গলি-ঘুপচির দেয়ালে কান পেতে শুনুন। এভাবে নয়, চোখ বন্ধ করে।’
নিরেট পাথর দেয়ালে কান চেপে ধরি। ঠাণ্ডা, শক্ত। কই, কিছু তো শোনা যায় না। চোখ খুলে দেখি ছেলেটা নেই। চমকে উঠি আমরা, ওমা, গেল কোথায়! তখনই দেয়ালের একেবারে পেটের ভেতর থেকে শুনতে পেলাম একটা ফিসফিস কণ্ঠ, ‘আমি কিন্তু অনেক দূর চলে এসেছি। সোজা গলিটা দিয়ে ২০ কদম এগিয়ে এসে তারপর বাম দিকে ঘুরুন। তাহলেই আমাকে পাবেন!’
সত্যিই তাই। বাপরে! আত্মারাম খাঁচাছাড়া হয়ে গিয়েছিল প্রায়। ছেলেটা হাসে, ‘দেখলেন তো, দেয়ালেরও কান আছে! সে সময় বেগমরা খেলতে খেলতে হারিয়ে গেলে এই সিস্টেমে পরস্পরকে খুঁজে পেতেন। দেয়ালের গায়ে মুখ লাগিয়ে ফিসফিস করে জানান দিতেন কে কোথায় আছেন। দূর থেকে অন্যরা শুনতে পেত তা। ভেবে দেখুন মজাটা।’
ভেবে দেখলাম। স্রেফ মজা আর তামাশার সখ মেটানোর জন্য কত শত বছর আগে তৈরি হয়েছে এই আশ্চর্য জিনিস। নবাব সাহেব আর তার স্থপতির কল্পনাশক্তির প্রশংসা করতেই হয়। ভুলভুলাইয়ার অলিগলি পেরিয়ে অবশেষে আপনাকে বেরিয়ে আসতে হবে বড় ইমামবাড়ার ছাদে। আর অমনি গোটা লক্ষৌ শহর তার সমস্ত ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, স্থাপত্য আর কাব্যের সৌন্দর্য নিয়ে হাজির হবে চোখের সামনে। সারি সারি খিলানের ফাঁক দিয়ে যেন ঝলমল করে উঠল দৃষ্টিনন্দন আসফ মসজিদ, রুমি দরোজা, ইমামবাড়ার অসামান্য বাগানের সৌন্দর্য। আর নানা রঙের জাফরি কাটা আলো এই অপূর্ব দৃশ্যকে করে তুলল আরো আকর্ষণীয়। হলুদ ম্লান আলোয় বিকেলটা আশ্চর্য লাবণ্যময় হয়ে উঠল যেন।
তিন.
রাতের লক্ষৌ যেন কবি মীরের রূপসী তবায়েফ। সেই তবায়েফ, যার রূপ-গুণের পাশাপাশি প্রাজ্ঞতা আর শিষ্টাচারও আকর্ষণীয়। যে কিনা মননশীলতা আর সৃষ্টিশীলতায় ভরপুর। আজ সন্ধ্যায় আমাদের উদ্দেশ্য প্রায় ১০০ বছরের প্রাচীন উপমহাদেশের বিখ্যাত ভাটখাণ্ডে সংগীত ও নৃত্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের পরিবেশনায় কথক নৃত্যের পরিবেশনা দেখা। লক্ষৌ ঘরানার কথক নৃত্যই বর্তমানে উপমহাদেশে সবচেয়ে জনপ্রিয়। মোগলদের পর লক্ষৌয়ের নবাবদের পৃষ্ঠপোষকতায় লালিত হয়েছে ভারতীয় নৃত্যের এই অন্যতম ধারা। কথক নৃত্যে অভিনয়টাই মুখ্য। চোখ ও মুখভঙ্গির কারুকাজ এর অন্যতম অনুষঙ্গ। এতে একটা পূর্ণাঙ্গ কাহিনী থাকে। যেন কোনো কথক বা কাহিনীকার সেই কাহিনী বলে যাচ্ছেন নানা মুদ্রার মধ্য দিয়ে। শোনা যায় ঈশ্বরী প্রসাদ নামে উত্তর প্রদেশের এক কৃষ্ণভক্ত চালু করেন এই ঘরানা। একদিন কৃষ্ণ তাকে স্বপ্নে দেখা দেন ও নৃত্যের মধ্য দিয়ে তাকে ভক্তি জানাতে নির্দেশ করেন। ঈশ্বরী ছিলেন ভক্তি আন্দোলনের গোড়ার দিকের মানুষ। তার পরে বংশের ছয় প্রজন্ম ধরে অতিবাহিত হয় নৃত্যের এই ধারা। রাধা ও কৃষ্ণ এর প্রধান চরিত্র। পরবর্তী সমেয় লক্ষৌয়ের নবাবদের দরবারে প্রস্ফুটিত হওয়ার কারণে এর সাথে ফিউশন ঘটে যায় মুসলিম স্টাইলের। নাচের পোশাক বদলে যায়, শাড়ির বদলে আসে ঘাঘরা বা গারারা, সিল্কের পাজামা, আসে বড় পাতলা কাপড়ের ওড়না বা দোপাট্টা। সুফি নৃত্যের আদলের সাথেও ঘটে যায় এর মিলন। রাধা-কৃষ্ণ ছাড়া কালিদাসের শিব-পার্বতী কিংবা মালতী-মাধব উপাখ্যান নিয়েও রচিত হয় এর কাহিনী। পরবর্তী সমেয় শম্ভু মহারাজ, বিরজু মহারাজদের হাতে বিশ্বব্যাপী আদৃত ও বিখ্যাত হয় লক্ষৌ ঘরানার কথক। তো শহরের অন্যতম বৃহৎ ইন্দিরা গান্ধী মিলনায়তনে ভাটখাণ্ডে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই অনবদ্য পরিবেশনা ঘণ্টাব্যাপী বুঁদ করে রাখল যেন আমাদের। কথকের নিয়ম অনুযায়ী স্টেজের এক পাশে ঢোল, তবলা, সারেঙ্গি ইত্যাদি নিয়ে উপবিষ্ট ছিলেন বাদকেরা, সঙ্গে কণ্ঠশিল্পীরাও। আর স্টেজের ডান দিকে রঙিন ঘাঘরা পরা একদল গোপী কুঞ্জবনে রাধার সাথে নেচে চলেছেন কৃষ্ণর অপেক্ষায়। অবশেষে কৃষ্ণ এলেন, যেন আনন্দের ফোয়ারা ছুটল চারদিকে। মিলনের আকুতি, অভিমান, এক ঈশ্বরীয় প্রেম—সবকিছু মিলে নৃত্যশিল্পীরা এক অদ্ভুত আবহ তৈরি করলেন মিলনায়তনজুড়ে। নাচের মাঝখানে একজন কথক মাইক্রোফোন নিয়ে দু-একটা কথাবার্তাও বলে চলেছিলেন, দিচ্ছিলেন ছোট ছোট ফুটনোট। যিনি বলছিলেন, তিনি এ বিভাগের অধ্যাপক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য শ্রুতি সাডলিকার। এখানে বলে রাখি, ভাটখাণ্ডে মিউজিক ইনস্টিটিউট বা বিশ্ববিদ্যালয় প্রায় ১০০ বছরের পুরনো। উপমহাদেশজুড়ে রয়েছে এর নামডাক। দূর-দূরান্ত, এমনকি প্রাচ্যের বাইরে থেকেও এখানে পড়াশোনা করতে আসে ছাত্রছাত্রীরা।
মনোমুগ্ধকর কথক নাচ দেখে বেরিয়ে এলাম আলো ঝলমলে একুশ শতকের লক্ষৌয়ে। যাকে ডাকা হয় গজল, শায়েরি আর তেহজিবের নগরী নামে। ঝকঝকে রাস্তা দিয়ে সাই সাই করে ছুটে চলেছে দামি দামি সব গাড়ি, পথের দুই ধারে নয়নাভিরাম আলোকসজ্জা, উঁচু সিনেপ্লেক্সের সামনে পোস্টারে বর্শা হাতে ঝাঁসির রানী ঘোড়ার পিঠ থেকে চেয়ে আছেন ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে। অভিজাত সব রেস্তোরাঁর সামনে থেমে আছে গাড়ি, হজরতগঞ্জ বাজারে লক্ষৌ চিকেনকারির দোকানে গিজগিজ করছে মানুষের ভিড়। কে আর মনে রেখেছে এই নগরীর খুদা এ সুখন (কাব্যেশ্বর) মীর ত্বকী মীরের কবরের ওপর দিয়ে চলে গেছে রেললাইন, নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে তার ব্যর্থ অপমানিত অবহেলিত হূদয়। তবু এ শহরের আকাশে বাতাসে ভেসে বেড়ায় তার গন্তব্য খুঁজে ফেরা আর না পাওয়ার দীর্ঘশ্বাস:
হর কদম পর থি উসকি মনজিল লেক
সরসে সওদা এ জুসতুজু নহ গয়া।
(প্রতি পদক্ষেপে ছিল মনজিল, কিন্তু
খুঁজে বেড়ানোর পাগলামিটা মাথা থেকে গেল না।)






