দীপঙ্কর মুখোপাধ্যায়। অনুবাদ: শওকত হোসেন
১৯৬৫ সালের জানুয়ারিতে ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো চলচ্চিত্রে বিপুলভাবে প্রভাবিত হয়ে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও অপর্ণা সেনকে নিয়ে আকাশ কুসুম ছবি নির্মাণে হাত দিয়েছিলেন মৃণাল সেন। ছবির বর্ণনামূলক কৌশল সমালোচকদের দ্বিধাবিভক্ত করে দিয়েছিল। একটি সম্পাদিত জীবনী থেকে জানা গেছে, এদের ভেতর সবচেয়ে বড় সমালোচক ছিলেন সত্যজিৎ রায়।
মৃণাল সেন ওই সময় আশীষ বর্মণের অন্য একটি কাহিনী নিয়ে কাজ করছিলেন। আকাশ কুসুম নামের কাহিনীটি নিম্নমধ্যবিত্ত পটভূমির এক তরুণকে নিয়ে। চটজলদি ধনী হতে চায় সে। কাহিনীতে কিছু পরিবর্তন এনেছিলেন সেন... এভাবে ছবির নায়ক কেবল স্বপ্ন দিয়েই পুরো সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাধা টপকে যাওয়ার ধারণা নিয়ে অসম্ভব সব স্বপ্নের মরিয়া স্বাপ্নিকে পরিণত হয়। কিন্তু শেষতক ব্যর্থ হয়ে শেষ সম্বলটুকুও খোয়ায়।
কিন্তু সমালোচকরা এ ছবি নিয়ে এতটাই কঠোর দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছিলেন যে সেন খানিকটা উদ্বিগ্ন বোধ না করে পারেননি। বিভিন্ন লেখায় ছবির সমালোচনায় আকাশ কুসুমের নায়ক অজয়ের ব্যাপারে বিরক্তি প্রকাশ হতে শুরু করলে ২৫ জুলাই নায়ককে উদ্ধারের দুর্বল প্রয়াস নেয়া হয়েছিল পরিচালকের পক্ষ থেকে। একটা বিজ্ঞাপনে যেমন উল্লেখ করা হয়: ‘ধোঁকাবাজ নয়, কেবলই উচ্চাশা ছিল ওর।’
ওই একই দিনে ছবির সমালোচনায় ইংরেজি দৈনিক দ্য স্টেটসম্যানের ‘সম্পাদক সমীপেষু’ বিভাগে একটা লেখা ছাপা হয়, যা বিতর্কের আগুনে আরো ঘি ঢেলে দেয়।
দ্য স্টেটসম্যানের সমালোচক আলোচনায় ছবিটি সারভেন্তেসের দোন কিহোতের আদলে হাস্যকর কিছু দিয়ে শেষ করলে দর্শকরা হয়তো নায়কের প্রতি কিছুটা সহানুভূতি বোধ করতেন বলে উল্লেখের পরই এ পত্রিকায় পত্রযুদ্ধ শুরু হয়। এ মন্তব্যের জবাবে আশীষ বর্মণ জোর দিয়ে বলেন, এ ধরনের সমাপ্তি রীতিমতো অবিশ্বাস্য ঠেকত। কারণ ‘একটা সমসাময়িক বিষয়বস্তুতে রীতিমাফিক দ্ব্যর্থবোধকতা যোগ করা প্রায় অসম্ভব।’
এ পর্যায়ে আগমন ঘটে সত্যজিৎ রায়ের। মৃণাল সেন স্মৃতিচারণে বলেছেন, সত্যজিৎ রায় তাকে ফোন করে জানান, তিনি বর্মণের লেখার জবাব দিয়ে এ বিতর্কে যোগ দিচ্ছেন। মৃণাল সেন যেন এ ব্যাপারে মনে কষ্ট না পান। আকাশ কুসুম ছবির চিত্রনাট্যকার-কাহিনীকার বর্মণই সত্যজিতের সমালোচনার লক্ষ্যবস্তু হবে বলে মৃণাল সেনকে সত্যজিৎ আশ্বস্ত করলেও তার চিঠি প্রকাশ হওয়ার পর দেখা গেল, তিনি ছবির একেবারে ভিত্তিমূল অর্থাৎ সমসাময়িকতার ওপর সরাসরি আক্রমণ করেছেন। ফলে মৃণাল সেনের পক্ষে আর এ পত্রযুদ্ধ থেকে দূরে সরে থাকা সম্ভব হলো না। আশীষ বর্মণের চিত্রনাট্য ‘কাহিনীর সমসাময়িকতা, ভালোবাসা, ঈর্ষা, ক্ষুধা, আশা কিংবা ভালো জীবনের প্রতি আকাঙ্ক্ষার মতো মৌলিক তাগিদকে নাকচ করে না’ উল্লেখ করে সত্যজিৎ রায়ের চিঠির সরাসরি জবাব দিয়ে একই সময়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে এ বিতর্কে শেষ পর্যন্ত যোগ দেন মৃণাল সেন: সমসাময়িকতার প্রশ্নে চ্যাপলিনকে উদাহরণ হিসেবে হাজির করেন মৃণাল সেন।
কিন্তু আকাশ কুসুম ছবির সমসাময়িকতার প্রতি মৃণাল সেন ও আশীষ বর্মণের ক্রমাগত গুরুত্ব আরোপ, যুক্তি সত্যজিৎ রায়কে আরো ক্ষিপ্ত করে তোলে। এবার তিনি ছদ্ম রসিকতার সব আড়াল ছুড়ে ফেলে দিয়ে খোলাখুলি আক্রমণ চালালেন।
‘আমি যেটা বুঝতে পারিনি, সেটা হলো (নায়কের) আচরণ এবং তার পরিণাম ছবিতে আদৌ কোনো বিশ্বাসযোগ্য সমসাময়িক বিষয় তুলে ধরতে পেরেছে বা ধরেছে কিনা। আকাশ কুসুমে আদৌ কোনো সমসাময়িকতা থেকে থাকলে সেটা উপরিতলে— এর কেতাদুরস্ত বর্ণনা কৌশল ও নগরজীবনের কিছু প্রাণবন্ত ডিটেইলসে। এর বাইরে ছবির সমসাময়িকা কোথায়? নির্মাতার দৃষ্টিভঙ্গিতেই বা সেটা কোথায় আছে?’
এ বিতর্কে পাঠকের কাছ থেকেও বিপুলসংখ্যক চিঠিপত্র আসতে শুরু করেছিল এবং সেসব চিঠির অনেকগুলোতেই সত্যজিৎ রায় সম্পর্কে প্রশংসা ছিল না। অনেকে তাকে ‘গোঁড়া ও অসহিষ্ণু’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, আবার কেউ কেউ সত্যজিতের আক্রমণে ‘বোধগম্য পরোক্ষ প্রতিদ্বন্দ্বিতা’ লক্ষ করেছেন। কথার লড়াই এর পরও থামেনি। মৃণাল সেন আরো একটি প্রতিবাদ নিয়ে হাজির হন। কিন্তু এ আলোচনায় মৃণাল আকাশ কুসুম সম্পর্কে কোনো রকম মন্তব্য না করে নিজেকে কঠোরভাবে চ্যাপলিন প্রসঙ্গে সীমিত রাখেন।
পাঠকদের বিরক্তি, মৃণালের জোরালো প্রতিবাদ সত্যজিৎ রায়ের অবস্থান বা মেজাজে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটাতে পারেনি। তিনি এ পর্যায়ে আর বুনো আর বাজে রসিকতার অবতারণা করেন। ছবিটির আলোচনায় এক ধরনের ক্যারিকেচারের আশ্রয় নিয়ে সত্যজিৎ ছবির সারাংশ করে প্রত্যেক বাক্যে ‘সমসাময়িক’ শব্দটি যোগ করেছিলেন, যেমন ‘নায়ক হোটেলে থাকে, কিন্তু সমসাময়িক সৌভাগ্যক্রমে সম্ভ্রান্ত পরিবারের দৈহিক গুণাগুণের অধিকারী।’ চিঠিটা সত্যজিৎ শেষ করেছিলেন বর্তমানে বিখ্যাত বাক্য ‘আ ক্রো ফিল্ম ইজ আ ক্রো ফিল্ম ইজ আ ক্রো ফিল্ম।’
এ লড়াই ক্রমেই আরো প্রলম্বিত ও বড্ড বেশি ব্যক্তিগত রূপ নিতে শুরু করে। দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকা তখন এ পত্রযুদ্ধের যবনিকা টানার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তবে ইতি টানার আগে মৃণাল সেন ও আশীষ বর্মণকে তাদের চূড়ান্ত বক্তব্য দেয়ার জন্য অনুরোধ জানানো হয়। মৃণাল সেন আর সত্যজিৎ রায়কে আক্রমণ যেমন করেননি, তেমনি ছবির পক্ষেও আর কোনো সাফাই গাননি: সত্যজিৎ রায়ের চিঠির ক্যারিকেচার ও সারাংশের কথা উল্লেখ করে তিনি লেখেন: এমনকি হ্যামলেটকেও ভূত-রহস্য-প্রেম-বিশ্বাসঘাতকতা-অজাচারের বিভিন্ন পর্বসমতে রাজপ্রাসাদের একটা হত্যাকাণ্ডের কাহিনী হিসেবে সারাংশায়িত করা সম্ভব, হ্যামলেটেও কিছু খুনখারাবি শেষে নায়িকা উন্মাদ হয়ে আত্মহত্যা করে এবং নায়কও আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছে।
তবে এ পত্রযুদ্ধের বা আকাশ কুসুম ছবি নির্মাণের পর প্রকৃতপক্ষেই সত্যজিৎ রায়কে ঠিক কোন জিনিসটা মৃণাল সেনের ওপর এমন ভয়াবহ আক্রমণ চালাতে প্ররোচিত করেছিল, সেটা এখনো রহস্যাবৃতই রয়ে গেছে। শুধু আকাশ কুসুমের থিমের প্রতিই তার বিতৃষ্ণার বিষয়টি বোঝা কঠিন। কেননা সত্যজিৎ স্বয়ং সাত বছর আগে ওই একই ধরনের বিষয়বস্তু নিয়ে ছবি করেছিলেন। সত্যজিৎ তারপরশ পাথরে সব ধাতু সোনায় রূপান্তরকারী জাদুর পাথর পেয়ে একজন নিম্নবেতনভুক কেরানি কীভাবে রাতারাতি ধনী হয়ে যায়, এবং তার জীবনধারা, সামাজিক অবস্থান ও মূল্যবোধ নাটকীয়ভাবে পাল্টে যায়, সেটাই তুলে ধরেছিলেন।
কিন্তু গূঢ় কারণ যা-ই হোক, আকাশ কুসুম সম্পর্কিত চিঠিপত্রে একটা জিনিস সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ হয়েছে: প্রকাশ্য বিতর্কে সত্যজিৎ রায়ের মৃণাল সেনের বিরুদ্ধে তলোয়ার চালানোয় এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে এ গুণী মানুষটি অন্তরে মৃণাল সেনের প্রাসঙ্গিকতা ঠিকই উপলব্ধি করেছিলেন। বাংলা চলচ্চিত্র জগতে, যেখানে তিনি পথের পাঁচালীর পর থেকেই অপ্রতিদ্বন্দ্বী অধিপতি হয়েছিলেন, অবশেষে তিনি মৃণাল সেনের মতো শক্তি দেখানোর কেউ একজন আবির্ভূত হয়েছেন, সেটা বুঝতে সক্ষম হয়েছিলেন।
১৯৬৫ সালের ১৩ অক্টোবর দ্য স্টেটসম্যান আনুষ্ঠানিকভাবে আকাশ কুসুম বিতর্কের সমাপ্তি ঘোষণা করে উল্লেখ করে, এ বিষয়ে আর কোনো চিঠি ছাপা হবে না। ওইদিন সন্ধ্যায় ফিল্ম সোসাইটির একটা প্রদর্শনী ছিল। অডিটোরিয়ামে সত্যজিৎ রায় ও মৃণাল সেন মুখোমুখি হন। সত্যজিৎ কিছুটা আমুদে সুরেই মৃণাল সেনকে জিজ্ঞেস করেন, ‘ব্যাপারটা শেষ হয়ে গেল, খুব দুঃখজনক! এভাবে বন্ধ করে দিলেন কেন? আরো বহু চিঠি লিখতে পারতাম আমি!’
‘বেশ, আমার তো আপনার মতো সমর্থক বা লোকবলের কোনোটাই নেই’— জবাব দিয়েছিলেন মৃণাল সেন। ‘আমি নেহাতই একা, তবে নিশ্চিত থাকতে পারেন, আপনার সব চিঠিরই জবাব আমি দিতাম।’
আকাশ কুসুম ছবির এ ঘটনা দিয়েই মোটের ওপর পরবর্তী সময়ে তাদের দুজনের সম্পর্ক নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল। হালকা চালের রসিকতার আড়ালে ওরা কার্যত পরিণত হন আগন্তুকে। পরে নানা সময়ে তারা পরস্পরের প্রতি আনুষ্ঠানিক ও ভদ্র থেকে গেছেন; এমনকি ঘনিষ্ঠ মহলেও— বিরল ক্ষেত্রে— তারা পরস্পরের কাজ সম্পর্কে কথা বলেছেন।
কলকাতার চিত্রামোদীরা প্রায়ই বলেন, সত্যজিৎ রায় ও মৃণাল সেনের ভেতর স্রেফ দুটি বিষয়ে মিল আছে— উচ্চতা ও গায়ের রঙ। স্পর্শকাতর শিল্পী হওয়ায় দুজনই সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহ ও প্রবণতায় প্রভাবিত ছিলেন, কিন্তু চূড়ান্ত পণ্য পুনশ্চ এবং মহানগেরর মতোই রীতিমতো ভিন্ন ধারার ছিল। সুদীর্ঘ পেশাগত জীবনে বেশ কয়েকবারই ব্যাপারটা ঘটেছে: আধুনিক যুবসমাজের বিভিন্ন সমস্যা তাদের প্রতিবন্ধী ও সাক্ষাত্কার নির্মাণে অনুপ্রাণিত করে; ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ বাইশে শ্রাবণ এবং অশনি সংকেত নির্মাণে এবং কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিক্রিয়া ছিল কোরাস ও হীরক রাজার দেশে।
১৯৮০-এর দশকে বলতে গেলে তারা যেন পারস্পরিক সায়েই অবস্থান বদলান। গীতিময়, নিগূঢ়, সংযত সত্যজিৎ রায় ক্রমেই চাঁছাছোলা ও উচ্চকণ্ঠ হয়ে ওঠেন এবং এমনকি নিজের দর্শন তুলে ধরতে বর্ণনামূলক কৌশলও বাদ দেন। অন্যদিকে বরাবর বিভিন্ন চটক তৈরি ও উচ্চকণ্ঠ হিসেবে পরিচিত মৃণাল সেন সহসা নীরব ও অন্তর্মুখী হয়ে পড়েন।
এখনকার প্রজন্মের পক্ষে এটা বিশ্বাস করা প্রায় অসম্ভব ঠেকবে যে এ দুজন ভীষণ ভিন্ন চরিত্রের মানুষ এককালে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। সত্যজিৎ রায় মৃণাল সেনের চ্যাপলিন বইয়ের প্রচ্ছদ এঁকে দিয়েছেন এবং মৃণাল সেন সত্যজিৎ রায়ের লেক টেম্পল রোডের বাড়ির নিয়মিত অতিথি ছিলেন। এখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনা করতেন তারা। অপরাজিতা ছবি দেখে মৃণাল সেন অভিভূত হয়েছিলেন। মৃণাল এটিকে রায়ের সেরা ছবি মনে করতেন। কিন্তু পরিহাসমূলকভাবে পরশ পাথর পছন্দ করতেন না। সত্যজিৎ রায়কে সে কথা বহুভাবেই বলেছেন তিনি। বাইশে শ্রাবণ সম্পর্কে তেমন একটা ভালো ধারণা ছিল না সত্যজিৎ রায়ের। তবে পরে তিনি মত পাল্টান। ১৯৬৫ সালে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব চলার সময় জুরি বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনের সময় মৃণাল সেনকে সত্যজিৎ তার কয়েকজন বন্ধুকে বাইশে শ্রাবণ দেখাতে ছবিটার একটি বিশেষ প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করতে বলেছিলেন।
এ প্রেক্ষাপটেই আকাশ কুসুম নিয়ে সত্যজিৎ রায়ের অবস্থানের কারণে মৃণাল সেন গভীর কষ্ট পেয়েছিলেন। কিন্তু কখনো নিজের ওই মনোভাব প্রকাশ করেননি। পুরনো উষ্ণতা হারিয়ে গেলেও সবকিছু ঠিক আছে দেখানোরই চেষ্টা করেছেন তিনি। তাই পরের ছবি মতিরা মনীষা দেখার জন্য সত্যজিৎ রায়কে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। ছবিটা রায়ের ভালো লাগে এবং সেটা তিনি প্রকাশ্যে উল্লেখও করেন। প্রায় ১০ বছর পর ওকা ঊড়ি কথা’র প্রশংসায়ও উচ্চকণ্ঠ ছিলেন তিনি।
কিন্তু রায় মৃণাল সেনের ভুবন সোম পছন্দ করেনিন। ‘আমাদের ছবি, তাহাদের ছবি’ বইয়ে সেটা খোলাসা করে উল্লেখ করেছেন তিনি।
বইটি বেরোনোর পর ক্যালকাটা উইকলির তরফ থেকে তাদের কলামে বইটির সমালোচনা লেখার অনুরোধ পান মৃণাল সেন। প্রাথমিক দ্বিধা কাটিয়ে রাজি হন সেন। ভুবন সোম সম্পর্কে সত্যজিৎ রায়ের সমালোচনার কথা উল্লেখ করে তিনি লেখেন:
সমালোচকরা অনুকূল মন্তব্য করেছেন, দর্শকরা পছন্দ করেছেন, দর্শক ও সমালোচকরা একে অফবিট হিসেবে বিবেচনা করেছেন। বোধগম্যভাবেই আমরা খুশি...যেমনই হোক, দৃষ্টিভঙ্গির এক ধরনের নতুনত্বের কারণে ভুবন সোম গৃহীত হয়েছে বলেই বলছে লোকে। এটাই যথেষ্ট। সমালোচনাটি ‘তার বই, আমার কথা’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল। বেশকিছু কমিটি, ফিল্ম সেমিনার এবং এই অন্যান্য কিছু প্ল্যাটফর্মে একসঙ্গে কাজ করার সুবাদে জীবনের শেষ দশকে মৃণাল সেনের সঙ্গে সত্যজিৎ রায়ের ভালো দেখাসাক্ষাৎ ঘটে। কিন্তু তাদের শীতল ও আনুষ্ঠানিক সম্পর্কে তাতে এতটুকু পরিবর্তন আসেনি।
জীবনের শেষ দিনগুলোয় মৃণাল সেনের বিরুদ্ধে আরেক দফা কঠোর আক্রমণ শানান সত্যজিৎ রায়। যদিও এটা বলা যেতে পারে, ব্যাপারটা জানাজানি হোক, এমনটা চাননি তিনি। পুরনো বন্ধু ও সুপরিচিত সমালোচক চিদানন্দ দাশগুপ্তের কাছে লেখা এক চিঠিতে তিনি তথাকথিত আর্ট ফিল্মের নির্মাতারা দেশে দর্শকদের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরির চেয়ে বরং বিভিন্ন বিদেশী চলচ্চিত্র উৎসবে হাজির হতেই বেশি পছন্দ করেন। উল্লেখ করে বলেছিলেন, ‘এদের কেউই, এমনকি মৃণালও, গল্প বলার কায়দা জানেন না।’
১৯৯১ সালের জুনে সত্যজিতের ব্যক্তিগত বন্ধুকে লেখা এ ব্যক্তিগত চিঠিটি অক্টোবরে রায়ের অনুমতি ছাড়াই এক জাতীয় দৈনিকে ফাঁস হয়ে যায়। কিন্তু ততদিনে সত্যজিৎ রায় অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তার দিন ফুরিয়ে আসার ব্যাপারটা গোপন কিছু ছিল না। এ অপ্রত্যাশিত অভিযোগে মৃণাল সেন স্পষ্টই আহত হয়েছিলেন। কিন্তু নিজেকে সামলে রেখেছিলেন। পত্রিকাসহ বিভিন্ন ব্যক্তির তরফ থেকে তাগিদের ফলে শেষে ভীষণ মর্যাদাপূর্ণ একটি উত্তরও দিয়েছিলেন মৃণাল:
সত্যজিৎ রায়ের মানসিক শান্তি বিনষ্ট হতে পারে ভেবে আমি তার ছবির নান্দনিকতা ও বর্ণনার কৌশল নিয়ে কোনো বিতর্কে প্রবেশ করতে চাই না। স্বাস্থ্যগত কারণে প্রতিদিনের ওষুধপথ্যের পাশাপাশি মানসিক শান্তি বড্ড বেশি দরকার তার।
কিন্তু সত্যজিৎ রায়ের ওই চিঠি নিয়ে তাকে আর জিজ্ঞেস করার কোনো সুযোগ ছিল না। কারণ ১৯৯২ সালের ২৩ এপ্রিল চিঠিটা ঝড় তোলার বড়জোর ছয় মাসের মাথায় মারা যান তিন।
সত্যজিৎ রায়ের অসুস্থতার পুরো সময় মৃণাল সেনরা রায়ের পরিবারের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ বজায় রেখেছেন। শোকাবহ ঘোষণা প্রচারের পর সবার আগে নার্সিং হোমে হাজির হন তারা। শেষকৃত্য পর্যন্ত মৃণাল সেনকে ফাঁকা দৃষ্টিতে ঘুরে বেড়াতে দেখা গেছে। প্রায় দুই দশক আগে সত্যজিৎ রায়কে তার নিঃসঙ্গতা সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলেন। সহসা সেই একই নিঃসঙ্গতা গ্রাস করে নিয়েছিল মৃণালকেও। সেদিনের সেই উত্তপ্ত এপ্রিল অপরাহ্নে সত্যজিৎ রায়ের মরদেহের পাশে দাঁড়িয়ে চিরদিনের জন্য রায়ের সুঠাম অবয়ব হারিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে মৃণাল বুঝতে পেরেছিলেন, এখন আর তাকে আরো উঁচু চূড়া স্পর্শ করার জন্য অনুপ্রেরণা, উৎসাহ ও উসকানি দেয়ার মতো আর কেউ রইল না।






