শব্দ ও ছবি জুড়ে দিয়ে গল্প বলাটা নতুন নয়। বরং বলা যায়, এ চর্চা বহু শতাব্দী পুরনো। তবে কমিক এসেছে শতবর্ষ আগে পত্রিকার পেছনের পাতায় থাকা ফিলার থেকে। বিশ শতকের শুরুর দিকে দুনিয়া কিছু অসাধারণ গল্প পেয়েছিল কমিক স্ট্রিপের মাধ্যমে। তবে এটা বিশ্বাস করাটা নিশ্চয়ই আজকের দিনের মানুষের জন্য কঠিন হবে। এখনকার পত্রিকায় কমিক স্ট্রিপ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। কিন্তু পত্রিকার এ কমিক স্ট্রিপই জন্ম দিয়েছিল কমিক বুকের। পরবর্তী সময়ে কমিক বুকের কাছে কমিক স্ট্রিপ তার রাজত্ব হারায়। এ দুই মাধ্যমের গুরুত্ব ও পার্থক্যটা একটু খোলাসা করা যাক।
কমিক স্ট্রিপ নামের শিল্পমাধ্যমটি যাত্রা করেছিল পত্রিকায় দ্য ইয়েলো কিড নামের স্ট্রিপটির মাধ্যমে। এর শিল্পী ছিলেন আরএফ আউটকল্ট। এটি ১৮৯৫ সালে প্রকাশিত হয়েছিল আমেরিকার তখনকার সবচেয়ে বড় সংবাদপত্র জোসেফ পুলিত্জারের নিউইয়র্ক ওয়ার্ল্ডে। দ্য ইয়েলো কিডই দুনিয়ার প্রথম সংবাদপত্র স্ট্রিপ হিসেবে স্বীকৃত এবং এটাই প্রথম সফল সাপ্তাহিক কমিক স্ট্রিপ। এর জনপ্রিয়তা পত্রিকার সার্কুলেশন অনেক বাড়িয়ে দিয়েছিল। দ্য ইয়েলো কিড নামটিই ‘ইয়েলো বা হলুদ সাংবাদিকতা’ নামের জন্ম দিয়েছিল। একই সঙ্গে এটিই প্রথম স্ট্রিপ, যেটি সফলভাবে বাণিজ্যিকীকরণ করা হয়েছিল।
১৮৯০ থেকে বিশ শতকের শুরুর সময়টা আমেরিকার সংবাদপত্রের জন্য ছিল ঠোকাঠুকির সময়। পাবলিশিং জগতের ম্যাগনেট জোসেফ পুলিত্জার ও তার প্রতিদ্বন্দ্বী উইলিয়াম র্যান্ডলফ হার্স্টের মধ্যে শত্রুতামূলক সম্পর্ক ছিল। পুলিত্জারের পত্রিকায় প্রকাশ শুরু হওয়ার দুই বছর পর আউটকল্ট তার দ্য ইয়েলো কিড হার্স্টের নিউইয়র্ক জার্নালে নিয়ে যান। হার্স্ট তখন রোববারের বিশেষ এক সাময়িকী বের করেছিলেন এবং কিড স্ট্রিপ সেখানেই প্রকাশিত হয়েছিল। পরবর্তী কমিক স্ট্রিপের জন্য প্রতিযোগিতা ততদিনে শুরু হয়ে গিয়েছিল। এর ফলস্বরূপ দেখা মেলে আউটকল্টের বাস্টার ব্রাউন, জর্জ ম্যাকমেনাসের দ্য নিউলিওয়েডস, উইনসর ম্যাককের লিটল নেমো ইন স্লাম্বারল্যান্ড ও বাড ফিশারের দারুণ সফল মুট অ্যান্ড জেফ। শুরুর দিকে কমিক স্ট্রিপগুলো সংবাদপত্রের পুরো প্রস্থজুড়ে থাকত। রোববারের স্ট্রিপগুলো আরো বেশি জায়গা নিত। ট্যাবলয়েড সাইজের কিছু পত্রিকা পুরো পাতাজুড়েই স্ট্রিপ ছাপত, প্রতি স্ট্রিপ প্রায় এক বর্গফুট জায়গা পেত। সে সময়ে স্ট্রিপগুলো পত্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে থাকত। এরপর পত্রিকাগুলো কমিকের জন্য একটি নির্দিষ্ট পাতা বরাদ্দ করে। তারপর অ্যাডভেঞ্চার স্ট্রিপ যেমন— এডগার রাইস বারোজের টারজান (উল্লেখ্য আশির দশকে বাংলাদেশে দৈনিক ইত্তেফাকে এক সময় নিয়মিত টারজান কমিক স্ট্রিপ প্রকাশিত হত, বাংলায় অনুূদিত হয়ে), লি ফকের ম্যানড্রেক দ্য ম্যাজিশিয়ান, হ্যারল্ড গ্রের লিটল অরফান অ্যানি, চেস্টার গল্ডের ডিক ট্রেসি ও মিল্টন ক্যানিফের টেরি অ্যান্ড দ্য পাইরেটস কমিক বুকের জন্য পথ পরিষ্কার করে দেয়। এ অ্যাকশন স্ট্রিপগুলো বের হয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে। এগুলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত চলছিল। পাল্প উপন্যাসের জনপ্রিয় চরিত্র ফ্যান্টম যাত্রা করেছিল পত্রিকার কমিক স্ট্রিপ হিসেবেই। লি ফক ১৯৩৬ সালে এর যাত্রা করেন।
প্রথম কমিক বুক প্রকাশিত হয় ১৯২৯ সালে। এটা ছিল ডেল পাবলিশিংয়ের দ্য ফানিজ। মূলত কিছু কমিক পাতা স্ট্যাপল করে একটা ট্যাবলয়েড সংবাদপত্রের মধ্যে গুঁজে দেয়া হয়েছিল। এরপর ১৯৩৫ সালে ফেমাস ফানিজ: আ কার্নিভাল অব কমিকস নামে একটি কমিক বই উলওর্থ’স ডিপার্টমেন্ট স্টোরে বিতরণ করা হয়। এটাই প্রথম কোনো স্বতন্ত্র কমিক বুক। প্রথম কমিক বই যেটাই হোক না কেন, আমেরিকান কমিকের জন্ম কমিক বুকস ১০১-এর মাধ্যমে।
১৯৩৮ সালের জুনে কমিক বুকের ইতিহাস চিরতরে বদলে যায়। এ সময় অ্যাকশন কমিক সিরিজে আবির্ভাব ঘটে এক সুপারহিরোর— সুপারম্যান। সুপারম্যানের সৃষ্টি হয়েছিল জেরি সিগেল ও জো শাস্টারের হাত ধরে। সুপারম্যান কমিক বইটির সাফল্য এমন ছিল যে যাত্রার এক বছরের কম সময়ের মধ্যে সংবাদপত্রে স্ট্রিপ চালু হয়। সংবাদপত্রে সুপারম্যানের এ স্ট্রিপ চলেছিল প্রায় তিন দশক ধরে। সুপারম্যানের গল্প, আঁকা ছিল সিগেল ও জো শাস্টারের। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত তারা নিজেরাই এ কাজ করে গেছেন। কিন্তু যুদ্ধের সময় তাদের যুদ্ধের নানা কাজেও যুক্ত হতে হয়।
১৯৩৮ সালে শুরু হয় কমিক বুকের স্বর্ণযুগ। আগেই বলা হয়েছে, এ বছরই আবির্ভাব ঘটে সুপারম্যানের। এর এক বছরের কম সময়ের মধ্যে ডিটেক্টিভ কমিকসে যাত্রা করে ব্যাটম্যান। মার্ভেলের ক্যাপ্টেন আমেরিকা ও ডিসির ওয়ান্ডার উইম্যান প্রাকাশিত হয় ১৯৪১ সালের। ১৯৩৮-৪০-এর দশকের মধ্যভাগ পর্যন্ত সময়ে কমিক বুকের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেতে থাকে। বর্তমানে মাসে জনপ্রিয় কমিক বুকগুলোর বিক্রি গড়পড়তা এক লাখ কপি আর ১৯৪০-এর দর্শকের শুরুতে সুপারম্যান, ব্যাটম্যান ও ক্যাপ্টেন মার্ভেল টাইটেলের বইগুলো একেকটি মাসে বিক্রি হতো ১৫ লাখ কপি। কিন্তু বিশ্বযুদ্ধের পর পরিস্থিতি বদলে গিয়েছিল। এ সময় আমেরিকায় সুপারহিরো কমিকের বিক্রি ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়। অনেক টাইটেলের প্রকাশনাই বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৫০-এর মধ্যভাগে কমিক বুকের ভাঙা হাটে আবার নতুন আলোড়ন ওঠে। এ সময় অনেক সিরিয়াস বিষয়— অপরাধ, রোমান্স, ওয়েস্টার্ন ও হরর, সায়েন্স ফিকশন নিয়ে কমিক বুক তৈরি হতে শুরু করে। তবে এ সময় পর্যন্তও সুপারম্যান, ব্যাটম্যান, ওয়ান্ডার উইম্যানের মতো চরিত্রগুলো তাদের পাঠক ধরে রেখেছিল। একই সময়ে কিন্তু অনেক সুপারহিরোর মৃত্যুও ঘটেছিল। অপরাধ নিয়ে তৈরি কমিকগুলোর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি অনেককে উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল। এ পরিপ্রেক্ষিতে ফ্রেডরিখ ওয়ার্টহ্যাম কমিকের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেন। ড. ওয়ার্টহ্যাম ছিলেন একজন মনস্তত্ববিদ। তিনি কিশোর অপরাধের সঙ্গে কমিক বুকের সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছিলেন। ক্যাপিটল হিলে ড. ওয়ার্টহ্যাম কমিকের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন, একই সঙ্গে তিনি লিখেছিলেন সিডাকশন অব দি ইনোসেন্ট নামে একটি বই। এর পরিপ্রেক্ষিতে কমিকস ইন্ডাস্ট্রিতে তৈরি হয় সেলফ সেন্সরিং একটা বডি; কমিকস কোড অথরিটি বা সিসিএ। সিসিএর আইন প্রায় সব অপরাধ, হরর ও ডার্ক ফ্যান্টাসি কমিকসের প্রকাশনা বন্ধ করে দেয়। নয়তো তাদের এমন কাটাছেঁড়া করে যে সেগুলো আর পাঠকদের কাছে আকর্ষণীয় ছিল না। নতুন এসব নিষেধাজ্ঞার কারণে এইস, এভন, ফিকশন হাউজ ও মেইনলাইনের মতো প্রকাশনা হাউজগুলো কমিকস প্রকাশ বন্ধ করে দেয়। প্রকাশনা ইসি কমিকস তাদের কমিক বুক ম্যাডকে ম্যাগাজিন সাইজে রূপান্তর করে। কারণ ম্যাগাজিন সাইজ কমিক সিসিএর আইনের আওতায় পড়ত না। অবশ্য বর্তমানে সিসিএর তেমন কোনো প্রভাব নেই। বড় প্রকাশনাগুলো এখন আর সিসিএ মেনে চলে না। মার্ভেল কমিকস ২০০১ সালে সিসিএকে পুরোপুরি ত্যাগ করেছে। ডিসিও একই কাজ করেছে। তবে সংশ্লিষ্টরা একমত যে সিসিএ পুরো কমিকস শিল্পকে দীর্ঘমেয়াদের ভয়ানক ক্ষতি করেছিল।
যা হোক, ১৯৫০-এর দশক পুরোটাই খারাপ গেছে তেমনটা নয়। ১৯৫৬ সালে জুলি শোয়ার্টজ কমিকসের রুপালি যুগের সূচনা করেন। এটা শুরু হয় শোকেজ (ডিসি)-এর মাধ্যমে। শোয়ার্টজের সম্পাদনায় ডিসি অনেক ক্ল্যাসিক চরিত্রকে পুনরায় তুলে আনে। সে সময়ের অনেক চরিত্রই এখনো টিকে আছে। বর্তমানে ডিসি কমিকসের অনেক চরিত্রই সেই রুপালি যুগের সৃষ্টি।
ষাটের দশকে কমিকসের বাজারে চাঙ্গাভাব দেখা যায়। স্বর্ণযুগের সেই দিন ফিরে না এলেও রুপালি যুগ চলছিল। নতুন নতুন কমিকস প্রকাশিত হচ্ছিল। ছাপায় অ্যাটলাস কমিকস মার্ভেল কমিকসে রূপান্তরিত হয় এবং একগুচ্ছ নতুন শিরোনামের কমিকস যাত্রা করে— ফ্যান্টাসটিক ফোর, দি অ্যাভেঞ্জারস, হাল্ক ও স্পাইডারম্যান।
১৯৭০-এর দশকে মার্ভেল ডিসির কাছ থেকে এক নম্বরের আসনটি নিয়ে নেয়। তবে মার্ভেলের মান হ্রাস পাচ্ছিল। জ্যাক কিরবি মার্ভেল ছেড়ে ডিসিতে যোগ দেন। সেখানে তিনি তৈরি করেন দ্য ফোর্থ ওয়ার্ল্ড।
১৯৮০-এর দশক কমিকের জগতে নতুন নতুন প্রকাশকের আবির্ভাব ঘটে। নতুনদের মধ্যে ছিল ক্যাপিটাল কমিকস (নেক্সাস ও ব্যাডজার), প্যাসিফিক কমিকসসহ (দ্য রকেটিয়ার, গ্রু ও জ্যাক কিরবির ক্যাপ্টেন ভিকটরি) আরো অনেকে। আশির দশকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বছর ছিল ১৯৮৬।
আমেরিকার কমিকবুকের বাজার মূলত দুটি প্রকাশনা দ্বারা শাসিত; ডিসি ও মার্ভেল। পাঁচ-ছয় দশক ধরে তারা আমেরিকার কমিক বইয়ের বাজারে আধিপত্য করছে। ডিসির ঝুলিতে আছে সুপারম্যান, ব্যাটম্যান অ্যান্ড রবিন, ওয়ান্ডার উইম্যান, অ্যাকুয়াম্যান, ফ্লাশ, গ্রিন ল্যান্টার্ন, গ্রিন অ্যারো, হকম্যান, দি অ্যাটম। আর মার্ভেলের আছে স্পাইডারম্যান, দি ইনক্রেডিবল হাল্ক, দ্য ফ্যান্টাস্টিক ফোর, ক্যাপ্টেন আমেরিকা, দি এক্স ম্যান, ডেয়ারডেভিল, দ্য মাইটি থর, আয়রনম্যান। তবে ডিসি ও মার্ভেলের বাইরেও আরো কিছু কমিক চরিত্র অনেক জনপ্রিয়তা পেয়েছে, যেমন— স্পন ও হেলবয়। কমিক বুকের সবচেয়ে দুই বড় আইকন সুপারম্যান ও স্পাইডারম্যান দুই ভিন্ন কোম্পানির। ডিসি ও মার্ভেলের আবির্ভাব হয়েছিল ১৯৩০-এর দশকে। তবে শুরু থেকে বিভিন্ন রকমের কাঠামোর মধ্য দিয়ে রূপান্তরিত হয়ে বর্তমান চেহারায় পৌঁছেছে। সে সময় ডিসির নাম ছিল ন্যাশনাল পিরিয়ডিক্যাল পাবলিকেশনস বা ন্যাশনাল কমিকস। এদের ডিটেক্টিভ কমিকস নামের জনপ্রিয় সিরিজ থেকেই ডিসি নামটি গ্রহণ করা হয়। সে সময় ডিসির সবচেয়ে জনপ্রিয় চরিত্রগুলো ছিল সুপারম্যান, ব্যাটম্যান ও ওয়ান্ডার উইম্যান। এদের কাছাকাছি ছিল ফ্লাশ, গ্রিন ল্যান্টার্ন ও হকম্যানের মতো চরিত্রগুলো। আর মার্ভেলের শুরুতে ছিল টাইমলি কমিকস।
কমিকসের দুনিয়ায় এর লেখক ও আঁকিয়ে শিল্পীরা সবসময়ই এক প্রকাশনা থেকে অন্যটিতে চলে গেছেন। তারা বেশি সুবিধা, কাজের স্বাধীনতার জন্যই এ রকমটা করেছেন এবং করেন। এ শিল্পীদের অনেকে বিখ্যাত হয়েছেন, কেউ কিংবদন্তি মর্যাদা পেয়েছেন। ডিসির সাফল্যের পেছনে ছয়জন শিল্পীর অবদান সবচেয়ে বেশি— জেরি সিগেল ও জো শাস্টার সুপারম্যানের স্রষ্টা, ব্যাটম্যানের স্রষ্টা বব কেন ও বিল ফিঙ্গার এবং ওয়ান্ডার উইম্যানের স্রষ্টা উইলিয়াম মার্সটন ও এইচজি পিটার। এদের বাইরে অসংখ্য লেখক, আঁকিয়ে, সম্পাদক যুগ যুগ ধরে ডিসি কমিকের সাফল্যের অংশীদার হয়ে আছেন। তবে সুপারম্যান, ব্যাটম্যান ও ওয়ান্ডার উইম্যান ছাড়া ডিসি কমিক আজকের দিন পর্যন্ত টিকে থাকতে পারত না। অন্যদিকে মার্ভেলের ছিল হোলি ট্রিনিটি: স্ট্যান লি, জ্যাক কর্বি ও স্টিভ ডিটকো। স্ট্যান, জ্যাক ও স্টিভের তৈরি করা ঘরে যারা কাজ করেছেন, তারা সবাই এ তিন মহারথীর কাজের তলায় হারিয়ে গেছেন।
এবার যদি কমিকভক্তদের উদ্দেশে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়া হয় যে কে সেরা— ডিসি নাকি মার্ভেল? তাহলে নিশ্চয়ই অনেকে অস্বস্তিতে পড়ে যাবেন। হয়তো দুদিকেই আছে আপনার পছন্দের কোনো সুপারহিরো। কমিক বুকস ১০১: দ্য হিস্ট্রি, মেথডস অ্যান্ড ম্যাডনেস গ্রান্থের লেখকদ্বয় ক্রিস রেয়ল ও স্কট টিপটন লিখেছেন, ‘শিশু বয়সে আমাদের সঙ্গী ছিল মার্ভেল। আর জুনিয়র হাই স্কুলে আমাদের বেশির ভাগ বরাদ্দ খরচ হতো ডিসি কমিকসের পেছনে। এরপর হাই স্কুলে মার্ভেল প্রবলভাবে ফিরে আসে। কিন্তু কলেজ জীবন আবার জয়ী হয় ডিসি। বর্তমানকালে এসে একটা সাধারণ মূল্যায়ন করলে বলতে হয়, ডিসির নজর আছে ইতিহাসে এবং এর চরিত্রগুলোর আত্মীয়দের দিকে। অন্যদিকে মার্ভেল নির্ভর করে সাময়িক এবং বড় কোনো থিমের ওপর। অনেকটা ঘটনানির্ভর স্টোরিলাইন। তবে সদা পরিবর্তনশীল কমিক বুক ব্যবসায় এ ধরনের মূল্যায়ন যেকোনো সময়েই বদলে যেতে পারে।’
আবার তাকানো যাক কমিকের স্রষ্টাদের দিকে। আমেরিকার কমিকের সবচেয়ে প্রভাবশালী নামটিকে খুঁজতে গেলে নিঃসন্দেহে তার উত্তর হবে— স্ট্যান লি। ফ্যান্টাস্টিক ফোর, দ্য হাল্ক, দ্য স্পাইডারম্যান, দ্য মাইটি থর, ডক্টর স্ট্রেঞ্জ, দ্য এক্স-মেন, আয়রন ম্যান, দি অ্যাভঞ্জারস— এরা সবই স্ট্যান লির সন্তান। সবারই আবির্ভাব ঘটেছে লির মাথা থেকে। অবশ্য অনেকে বলেন এসব সৃষ্টিতে লির সহযোগী জ্যাক করবি ও স্টিভ ডিটকো তাদের যথাযথ মূল্যায়ন পাননি। কথাটা হয়তো মিথ্যা নয়। যাহোক, ডিসির তুলনায় মার্ভেলের নায়করা পাঠকদের কাছে বেশি জীবন্ত, কারণটা বোধহয় তাদের সংলাপ। স্পাইডারম্যানের রসবোধ কিংবা উদ্বেগ পাঠককে ছুঁয়ে যায়। স্ট্যান লি তার কাজে অনেক শিল্পী ও সহলেখকদের সহায়তা পেয়েছেন নিশ্চয়, যেমন তাদের মধ্যে আছেন করবি, ডিটকো, জিন কোলন, জন রমিটা, জন বাসেমাসহ আরো অনেকে; কিন্তু এটা অনেকেই জানেন না যে বেশ কয়েক বছর স্ট্যান লি মার্ভেলের পুরো কমিক দুনিয়ার ভার একাই কাঁধে বয়ে বেড়িয়েছেন। ডজনখানের চরিত্রকে তিনি নিজ কলমে পাঠকদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। লিই প্রথম ‘মার্ভেল ইউনিভার্স’ নামে একটা দুনিয়া তৈরি করেছিলেন, যা ছিল কমিকের ইতিহাসে প্রথম। এবং পরবর্তীতে ডিসিসহ অনেক কমিক প্রকাশকই এ ধারণাকে অনুকরণ করেছে।
স্ট্যান লির সেরা গল্প কোনগুলো? লির তৈরি করা শত শত কমিক গল্পের মধ্য থেকে সেরা গল্প বেছে নেয়াটা কেবল কঠিন নয়, হয়তো বেশ কঠিন। ক্রিস রেয়ল ও স্কট টিপটন কয়েকটি নাম অবশ্য পাঠকদের দিকে ছুড়ে দিয়েছেন— দ্য অ্যামেজিং স্পাইডারম্যান#৩৯-৪০ (আগস্ট-সেপ্টেম্বর ১৯৬৬)-এ প্রকাশিত ‘দ্য স্পাইডারম্যান আনমাস্কড’? নাকি ফ্যান্টাস্টিক ফোর#৪৮-৫০ (মার্চ-মে ১৯৬৬)-এ প্রকাশিত ‘দ্য গ্যালাক্টাস সাগা’? দি অ্যাভেঞ্জারস#৪ (মার্চ ১৯৬৪)-এ ‘দ্য রিটার্ন অব ক্যাপ্টেন আমেরিকা’? ক্রিস ও স্কট এ নামগুলোর দিয়ে সঙ্গে এটাও বলেছেন লির সেরা কাজ নির্ণয় করাটা সহজ নয়।
কমিক সৃষ্টির পাশাপাশি কমিকের প্রচার ও জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির জন্য স্ট্যান লি সবসময় সচেষ্ট ছিলেন। মার্ভেলের কমিকসকে তিনি সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে পাঠকের হাতে তুলে দিতেও শ্রম দিয়েছেন। স্ট্যান লির জমানা শুরুর আগে ভক্তরা কমিকসের ভক্ত হতো এর রঙচঙা চরিত্র ও বাহার দেখে। কিন্তু স্ট্যান লি চরিত্রের গল্পে পাঠককে আকর্ষণ করেন। লি সবসময় কমিকসের শেষে চিঠিপত্রের বিভাগটি মনোযোগ দিয়ে পড়তেন এবং মজাদার সব জবাব দিতেন, সঙ্গে তার সহকর্মীরাও। মার্ভেল কমিকসের ক্রেডিট লাইনে এর সৃষ্টিকর্তাদের নামেও লি নিজেদেরকে দর্শকদের সামনে ঘরের মানুষ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন, যেমন ‘রাসকেলি’ রয় টমাস, জ্যাক ‘দ্য কিং’ করবি, ‘স্টার্ডি’ স্টিভ ডিটকো। লি ‘‘স্ট্যান লি’জ সোপবক্স’’ নামে চিঠিপত্রের পাতায় একটি কলাম তৈরি করেছিলেন, যেখানে তিনি কমিকস নিয়ে লিখতেন। তিনি এমনভাবে পাঠকদের সম্পর্কিত করে লিখতেন যে তারা মনে করতেন তারাও মার্ভেল পরিবারেরই সদস্য। এ কলামের শেষে স্ট্যান লি ‘এজালসিয়!’ (আরো ভালো!) নামে স্বাক্ষর করতেন, এটা ছিল মার্ভেলের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ডিসি’র উদ্দেশে ভদ্র এক চ্যালেঞ্জ। লি পাঠককে সবসময় বোঝাতে চেয়েছেন মার্ভেলই কমিকের সত্যিকার দুনিয়া। তিনি ডিসির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে ব্যক্তিগত করে ফেলেছিলেন, যদিও এ শত্রুতায় তিনি কখনো অভদ্র আচরণ করেননি। ষাটের দশকে মার্ভেল ফ্যান ক্লাব মেরি মার্ভেল মার্চিং সোসাইটির দেখাশোনাও লি নিজেই করতেন।
লেখা, সম্পাদনা ও প্রকাশনার বাইরে অনেকগুলো মার্ভেল কমিকস ফিল্ম, টেলিভিশন শো এবং ভিডিও গেমে স্ট্যান লি ক্যামিও দর্শন দিয়েছেন। লি মার্ভেলের সভাপতি, প্রকাশক এবং শেষমেশ চেয়ারম্যান ইমেরিটাস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আশির দশকে স্ট্যান মার্ভেলের প্রকাশক হিসেবে ক্যালিফোর্নিয়া চষে বেড়িয়েছেন। কমিকসের প্রকাশনার পাশাপাশি তিনি হলিউডে মার্ভেল হিরোদের পদার্পণের পেছনেও কাজ করেছেন। মার্ভেলের চরিত্রগুলো নিয়ে অ্যানিমেটেড সিরিজ, টেলিভিশন শো এবং বড় বাজেটের সিনেমা তৈরিতে বিরাট ভূমিকা ছিল স্ট্যান লির। কমিক বুক নিয়ে স্ট্যান লির একটা নিজস্ব এবং গুরুতর মত আছে, যেটা উল্লেখ ছাড়া এ শিল্প নিয়ে আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। লি বলেছেন—
‘‘আমি খুব গুরুতর একটা বিষয় আলোচনা করতে চাই। বিষয়টা নিয়ে আমি বহু বছর ধরেই মর্মপীড়ায় ভুগছি এবং সবার সঙ্গে এ বোঝাটা হালকা করে নিতে চাই। বিষয়টা হল ‘কমিক বুক’ শব্দ দুটি নিয়ে। হ্যাঁ, আমি শব্দ দুটিই বলব। কারণ সবাই উচ্চারণ করেন বা লেখেন ‘কমিক বুক’, এখানে দুটি শব্দ রয়েছে। কিন্তু আমি বলব ‘কমিক বুক’ বলতে বোঝায় কৌতুক বা ‘কমিক্যাল’ বই। তাই আমি একাই এক শব্দে কমিক-বুক বলার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি। কমিক-বুক একটি জেনেরিক নাম এবং এটা একটা শব্দই হবে।”
ধরুন একটা কমিক বই পলিব্যাগে সিল করা এবং তার হলোগ্রাফিক প্রচ্ছদ জ্বলজ্বল করছে, সঙ্গে আছে একটা ট্যাটু, তাহলে কী এ প্যাকেটটা কিনবেন? উত্তরটা ‘হ্যাঁ’ হলে সময়টা নব্বইয়ের দশকের শুরুর কাল। নব্বইয়ের দশকের আঁকিয়ে শিল্পীরাই কমিক-বুকের দুনিয়া শাসন করেছেন। কমিক ছিল তখন ভিজ্যুয়াল মিডিয়ামের অন্যতম উপাদান। এ শিল্পীরাই কমিক ব্যবসাকে পুরোদমে রসদ জুগিয়েছেন। এ আমলে মার্ভেল এবং ডিসি উভয়ই কিছু জনপ্রিয় টাইটেলের লিমিটেড এডিশন প্রচ্ছদ তৈরি করে ব্যবসায়িক সাফল্য অর্জন করে। জিম লির এক্স-মেনের প্রথম ইস্যুটি ৮০ লাখ কপি বিক্রি হয়েছিল। এর কারণ কি কমিকটির অসাধারণ গল্প ও আর্ট; নাকি ছয়টি ভিন্ন প্রচ্ছদ? উত্তর হবে উভয়ই। এখন প্রকাশকরা ভাবলেন ভিন্ন ভিন্ন প্রচ্ছদ করায় যদি প্রথম সংখ্যাটা এত বেশি বিক্রি হয়, তাহলে পরবর্তী সংখ্যাগুলোতেও এমন সাফল্য পাওয়া যাবে। সমস্যাটাও এই ভাবনা থেকে শুরু হয়। কমিকের প্রচ্ছদে ক্রোমিয়াম ফয়েল-স্ট্যামড ছবি ব্যবহার শুরু হয়। আরো ছিল অন্ধকারে জ্বলে এমন প্রচ্ছদ। এভাবে মার্ভেল ও ডিসি উভয়ই চেয়েছিল একই কমিকের ভিন্ন ভিন্ন প্রচ্ছদ, যেন ভক্তরা কিনতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। গল্প ও চরিত্র তখন কম মনোযোগ পেতে শুরু করে। এতে কমিকের ভক্তদের একটা বিরাট অংশ নিজেদের বঞ্চিত ভাবতে শুরু করে। অন্যদিকে অনেকে লিমিটেড এডিশনের প্রচ্ছদ করা কমিক কিনতে আগ্রহী ছিলেন, তাদের কাছে এগুলো ছিল সংগ্রহযোগ্য আইটেম যা ভবিষ্যতে অনেক দামে বিক্রি করা যাবে। কিন্তু সাধারণ পাঠকের সংখ্যা কমতে শুরু করে। বিক্রিও কমে। যেসব কমিক আগে ১০-২০ লাখ বিক্রি হতো, সেগুলোর বিক্রি নেমে আসে কয়েক লাখে। এতে কমিকের অনেকে ছোট প্রকাশকরা প্রকাশনা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হন।
এরপর প্রকাশকরা নড়েচড়ে বসেন। আবার কমিক লেখকদের গুরুত্ব দেয়া শুরু হয়। মার্ভেল ও ডিসি উভয়ই গল্পের দিকে মনোযোগ দেয়। সুপারহিরোদের বাইরে কিছু স্বাধীন ছোট ছোট গ্রাফিক নভেল কমিককে তার হারানো স্থান ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে; বিশেষত সিরিয়াস পাঠক যারা সুপারহিরোদের নিয়ে প্রকাশকদের নানা ফন্দিফিকিরে বিরক্ত হয়ে পড়েছিলেন, তারা আবার কমিকের দিকে নজর ফেরান।
গত বছরের ১২ নভেম্বর স্ট্যান লি প্রয়াত হয়েছেন। এর আগে এ সহস্রাব্দে বিদায় নিয়েছেন আরো অনেক জনপ্রিয় কমিক শিল্পী— মাইক ওয়েরিংগো, ডেভ স্টিভেনস, জনি ক্রেগ প্রমুখ। কমিকের সুপারহিরোরা এখন বড় পর্দার ছবিতে দর্শক মাতাচ্ছেন। এ ডিজিটাল মাধ্যমের জনপ্রিয়তা ছাপা কমিকসকে বেশ চাপে ফেলেছে। প্রকাশকরা তাই এখন ডিজিটাল কমিকসে মনোযোগ দিচ্ছেন। কমিকস বিশেষজ্ঞদের অনেকে মনে করেন এ নতুন সহস্রাব্দে সুপারম্যান অনেক বেশি মানুষ হয়ে গেছে। ব্যাটম্যান ও গ্রিন ল্যান্টার্ন খুব একটা বদলায়নি। সুপারহিরোদের জগতে অনেক নতুন চেষ্টা থাকলেও শেষমেশ সেই পুরনো গল্পের ধাঁচেই ফিরে গেছে। বিশেষজ্ঞরা একটা বিষয়ে সবাই নিশ্চিত— কমিকস তৈরি করা, এর বিপণন এবং ব্যবসা সবই বদলাতে যাচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে পরিবর্তিত হয়ে কমিকস বুক টিকে থাকবে নাকি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে।
বাংলাদেশেও ইংরেজি কমিক বুকের ব্যাপক জনপ্রিয়তা গেছে সত্তর-আশির দশকে। শুরুতে এসব বই ছেলেমেয়েরা সংগ্রহ করত ঢাকার বিভিন্ন পুরনো বইয়ের দোকান থেকে। পরে অনেকে সরাসরি ডিসি ও মার্ভেল কমিক নতুনই সংগ্রহ করা শুরু করে। বিশ্বব্যাপী কমিক বুকের ধারাবাহিকতায় বিশ্বখ্যাত হাস্যরসের ম্যাগাজিন ম্যাডের অনুকরণে বাংলাদেশে আত্মপ্রকাশ করে উন্মাদ, পরে কার্টুন। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন দৈনিকে কমিক স্ট্রিপও প্রচার শুরু হয়। তবে এখন পত্রিকায় কমিক স্ট্রিপের প্রকাশ বন্ধ হয়ে গেছে।
সূত্র : কমিক বুকস ১০১: দ্য হিস্ট্রি, মেথডস অ্যান্ড ম্যাডনেস, ক্রিস রেয়ল ও স্কট টিপটন
হিস্টরি অব কমিকস, টেলর রামসে






