২৮ ডিসেম্বর ক্যান্সার আক্রান্ত অ্যামোস ওজ প্রয়াত হয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে খ্যাতিমান লেখক নাগিব মাহফুজের চেয়েও অনেক বেশি আলোচিত হয়েছেন তিনি। তার নিজ দেশ ইসরায়েলের কাছে তিনি যুগপৎ দেশপ্রেমিক ও বিশ্বাসঘাতক, দেশদ্রোহী।

তার জন্ম ৪ মে ১৯৩৯ সালে, জেরুজালেম শহরের কেরেম আব্রাহাম এলাকায় ইহুদি শরণার্থী নিবাসে। আত্মজীবনীমূলক রচনা ‘ভালোবাসা ও অন্ধকারের একটি গল্প’-তে তার শৈশব নিবাসের বর্ণনা দিয়েছেন:  

 

ভালোবাসা ও অন্ধকারের আস্তানা

একটি ছোট, নিচু সিলিংয়ের একতলা অ্যাপার্টমেন্টে আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। আমার মা-বাবা ঘুমাতেন একটি সোফা বেডে। প্রতিদিন সন্ধ্যায় যখন সোফা ভেঙে বিছানা পাতা হতো, দেয়ালের এক পাশ থেকে অন্য পাশ পুরোটাই ভরে যেত। খুব সকালে পাতা বিছানা যখন গোটানো হতো, একটা অংশ অন্যটার ভেতর দেবে যেত, নিচের প্রকোষ্ঠে লুকিয়ে ফেলা হতো বিছানাপত্তর। তোশকটা টানটান করে পুরোটাকে হালকা ধূসর খোলসের ভেতর ঢুকিয়ে ছড়িয়ে দেয়া হতো এম্ব্রয়ডারি করা কয়েকটি পশ্চিমা কুশন, যেন তাদের রাতের ঘুমের সব সাক্ষ্য গায়েব হয়ে যায়। এভাবেই তাদের বেডরুমটাই আমাদের পড়ার ঘর, লাইব্রেরি, ডাইনিং রুম ও লিভিং রুমের ভূমিকা পালন করত।

এ রুমের ঠিক উল্টোদিকে আমার ছোট্ট সবুজ রুম, এর অর্ধেকটা বড়-পেট একটি ওয়্যারড্রোবের দখলে চলে গেছে। একটি সরু, নিচু, অন্ধকার এবং কিছুটা বাঁকা একটি প্যাসেজ— অনেকটা কারাগার থেকে পালানোর টানেলের মতো এ দুই রুমের সঙ্গে রান্নাঘর ও টয়লেটকে সংযুক্ত করেছে। এমনকি দিনের বেলায়ও লোহার খাঁচায় বন্দি বিষণ্ন ও অর্ধেক আলো দেয়া বাল্ব জ্বালিয়ে রাখা হয়। দুটি রুমের সামনেই একপাটের একটা জানালা, ধাতব পাতে আটকানো। চোখ ট্যারা করে তাকালে পূর্বদিকে ধূলি-ধূসর একটি সরলবর্গীয় বৃক্ষ চোখে পড়ে আর এবড়ো-থেবড়ো পাথরের একটি নিচু দেয়াল।...

এটা আসলে ছিল একটা বেজমেন্ট অ্যাপার্টমেন্ট।

আমাদের বাড়ি ভর্তি বই। বাবা ১৬-১৭টা ভাষা জানতেন এবং রুশ উচ্চারণ ভঙ্গিতে ১১টা ভাষায় কথা বলতে পারতেন। মা কথা বলতেন চার-পাঁচটা ভাষায়, আর জানতেন সাত-আটটা।

 

ইন্তিফাদা বালক

অ্যামোস ওজের বাবা ইয়েহুদা ক্লসনার, মা ফানিয়া মুসম্যান। তিনি নিজেও ছিলেন অ্যামোস ক্লসনার। কিন্তু অভিজাত ভারী ক্লসনার ছেঁটে ফেলে নাম নেন ওজ— অ্যামোস ওজ। ওজ মানে শক্তি।

ইসরায়েলি কথাসাহিত্যিক স্যামুয়েল ইউসেফ অ্যাগনন নোবেল সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন বটে কিন্তু অ্যামোস ওজের ইসরায়েলের খ্যাতি সবাইকে ছাড়িয়েছে। তিনি যুগপৎ ফিকশন ও নন-ফিকশন লিখে গেছেন।

তার শৈশবে ইসরায়েলে ১৪৬টি দেশ থেকে আসা অতিরিক্ত যোগ্যতাসম্পন্ন ইহুদিদের ভিড়ে যোগ্যতা থাকার পরও প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে যান তার বাবা, তিনি হন এক বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিয়ান।

অ্যামোস বাবাকে দেখেছেন স্বৈরাচার হিসেবে, বাসার পরিবেশ কেবল ‘বইবহুল’; মা আত্মহত্যা করেছেন— এ অবস্থায় গৃহত্যাগ করে ট্রাক্টর ড্রাইভার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে কিবুজ খামারে যোগ দেন অ্যামোস এবং জীবনের প্রায় ৩০টি বছর সেখানেই কাটান। 

এর মধ্যে জেরুজালেম হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শন ও হিব্রু সাহিত্যে ডিগ্রি নিয়েছেন। ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে নিজ দেশের সৈনিক হিসেবে যুদ্ধও করেছেন।

তিনিই প্রথম ইসরায়েলি নাগরিক, যিনি পাশাপাশি ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন দুটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। ১৯৬৭-এর যুদ্ধে দখল করা জায়গা ছেড়ে দিতে বলেছেন। তিনি নিজে ছিলেন ইন্তিফাদা শিশু, তার বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে। তাকে ইসরায়েলি লেবার পার্টির সঙ্গে চিহ্নিত করা হতো। বলা হয়ে থাকে, প্রধানমন্ত্রী সিমন পেরেজ তার উত্তরসূরি হিসেবে যাদের নাম বিবেচনা করেছিলেন, অ্যামোস ওজ তাদের অন্যতম।

তিনি মধ্যপ্রাচ্যের সত্যকণ্ঠ হিসেবে ইসরায়েলের বাইরে সমাদৃত, ইসরায়েলে গোড়া ইহুদিদের কাছে নিন্দিত।

 

দুই রাষ্ট্রই সমাধান

‘এ সরকার (ইসরায়েলি) কিংবা পরবর্তী কোনো সরকার, এ ফিলিস্তিনি নেতৃত্ব কিংবা পরবর্তী নেতৃত্ব শেষ পর্যন্ত একটি চুক্তিতে আসবে। আসল সত্য হচ্ছে, কারো কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। আমরা একটি সুখী পরিবার গড়তে পারব না, কারণ কেউই সুখী নয়। তাছাড়া আমরা একটি পরিবার নই। কাজেই আমাদের বিচ্ছিন্ন হতে হবে। আমি জানি না, এজন্য কতদিন অপেক্ষা করতে হবে। আমি জানি না, কী পরিমাণ রক্তের প্রপাত বয়ে যাবে। কিন্তু আমি মনে করি, দুই দিকেরই নীরব সংখ্যাগরিষ্ঠরা অসন্তুষ্ট চিত্তে হলেও দুই রাষ্ট্র সমাধানের আলোকে সমঝোতা করতে তৈরি।’

এতে কোনো পক্ষই সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট হবে না। তিনি বলছেন, ‘তারা (ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি) কি পরস্পরকে বিশ্বাস করে? করে না। দুই রাষ্ট্র সমাধান প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে তারা কি আনন্দে রাস্তায় নাচবে? না, ইসরায়েলও না, ফিলিস্তিনও না। কিন্তু তারা এটা জানে যে এছাড়া সমাধানের আর কোনো বিকল্প নেই। কারণ তাদের কেউই সরে যাবে না।’

মূলত প্যারিস রিভিউতে প্রকাশিত তার সাক্ষাৎকারের অনুবাদের ওপর ভিত্তি করে এ নিবন্ধটি রচিত হয়েছে।

 &dquote;&dquote;

উপন্যাস হচ্ছে বিয়ের মতো

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: আপনার ভ্রমণসূচি তো ভয়ঙ্কর-ঠাসা। তবু আপনি নির্ধারিত বিরতির পর পর বই প্রকাশ করে যাচ্ছেন। আপনার সময়কে ভাগ করেন কেমন করে? বছরের কোন সময়টা এবং দিনের কখন?

অ্যামোস ওজ: প্রথম বিধান হচ্ছে, যখন আমার বই বিয়ানোর অবস্থা তখন সফর না করা। যখন আমি লিখছি, আমি দেশের বাইরে যেতে চাই না। এমনকি দেশের ভেতরেও না; বরং আমি নিজেকে বাধ্য করি, যাতে বছরে তিন-চারবারের বেশি বেরোতে না হয়। এটা যে সবসময়ই কাজ করে এমন নয়, তবে এটাই আমার প্যাটার্ন। আর আমার দিনটা শুরু করি ভোর ৬টায়, শীত-গ্রীষ্ম যা-ই হোক, মরুভূমিতে ৪০ মিনিট হাঁটাহাঁটি দিয়ে।

প্রশ্ন: মরুভূমিতে কি কখনো তুষারপাত হয়?

ওজ: হ্যাঁ, প্রতি বছরে একবার, দুদিন করে। সে সময় মরুভূমি পাড়ি দেয়া উটের মুখের অভিব্যক্তি আপনাকে দেখতে হবে। তখনই আমি বুঝতে পারি শব্দের সত্যিকারের মানে। এমনকি তুষারপাত না হলেও শীতকালে কনকনে ঠাণ্ডা, ঝড়ো বাতাস যখন গোটা শহরটাকে ঝেটিয়ে মরুভূমিতে ফেলতে চায়, সেই প্রভাতে জায়গাটা বড্ড বুনো। কেবল হাঁটাহাটির মধ্যেই বস্তুর অনুপাত ঠাহর করা যায়। পরে যদি আমি সকালের খবরের কাগজে পড়ি কোনো রাজনীতিবিদ এ কথা বলেছেন, কেউ বলেছেন সে কথা— আমি জানি এসব কখনো হবে না। আমি জানি এ কথা তারা চিরকাল ধরেই বলতে থাকবেন।&dquote;&dquote;

আমি কফি খাই, আমার রুমে ফিরে আমি, আমার ডেস্কে বসি এবং অপেক্ষা করতে থাকি— তখন আমি পড়ছি না, গান শুনছি না, টেলিফোন ধরছি না। আমি তখন লিখি— কখনো একটি রম্য, কখনো একটি প্যারাগ্রাফ, ভালো কোনো দিনে আধপাতা। কিন্তু আমি এখানে প্রতিদিন ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা কাটাই। সকালটা অনুৎপাদশীল হলে অপরাধ  বোধ করি, বিশেষ করে আমি যখন কিবুজে ছিলাম, এ বোধটা বেশি হতো। সেখানে সবাই কাজ করছে, মাঠে লাঙল চালাচ্ছে, দুধ দোহাচ্ছে, গাছ লাগাচ্ছে। এখন মনে হয় আমার কাজটা দোকানদারের মতো। আমার কাজ দোকান খুলে বসে থাকা এবং খদ্দেরের জন্য অপেক্ষা করা। যদি কাউকে পাই— সকালটা ফলবান, যদি না পাই— বেশ তো আমার কাজ আমি করে যাচ্ছি। কাজেই অপরাধবোধ কেটে গেছে। আমি দোকানদারের রুটিনটা ধরে রাখি। চিঠি, ফ্যাক্স, ফোন এসবের জবাব দেয়ার কাজটা করি লাঞ্চ কিংবা ডিনারের আগের ১ ঘণ্টায়।

সম্ভবত কবি ও গল্পলেখকরা ভিন্ন প্যাটার্নে কাজ করতে পারেন। কিন্তু উপন্যাস রচনা অত্যন্ত সুশৃঙ্খল একটি কাজ। কবিতা লেখা একটা হঠাৎ প্রেমের মতো, এক রাতের ব্যাপার। ছোটগল্প হচ্ছে রোমাঞ্চ, একটি সম্পর্ক। কিন্তু উপন্যাস হচ্ছে বিয়ে, এতে একজনকে ধূর্ত হতে হবে, সমঝোতার পথ খুঁজে বের করতে হবে এবং আত্মবিসর্জন দিতে হবে।

অ্যামোস ওজ থাকেন আরাদ নামের ছোট্ট শুকনো মরু শহরে, সেখানে সন্ধ্যা কেমন কাটে। উত্তেজনাপূর্ণ নৈশজীবন তো এখানে থাকার কথা নয়, এমনকি রোদেলা বিকাল যেদিন, সেদিনও শহর দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ে। তিনি বললেন, এটা বিশ্বাসই হতে চাইবে না যে এ ছোট্ট জায়গাটি কত চিত্তাকর্ষক— তিনটি রেস্তোরাঁ, তিনটি ব্যাংক, একটি আনকোরা নতুন শপিংমল, একটা চুল কাটার সেলুন, একটা বইয়ের দোকান। সম্প্রতি এখানে অতিরিক্ত যোগ্যতাসম্পন্ন রুশ ইহুদিদের গণ-আগমন ঘটছে। আমরা বলে থাকি, রাশিয়া থেকে এসেছেন কিন্তু হাতে বেহালা নেই এমন কেউ যদি থেকে থাকেন, তাহলে ধরে নিতে হবে তিনি একজন পিয়ানোবাদক। আমাদের এখানে চমৎকার কনসার্ট হয়ে থাকে।

আমি কখনো কখনো ডিনারের পর এখানে এসে থাকি, দিনের বেলা যা লিখেছি পড়ে শোনাই। নির্মমভাবে কোনো লেখা বাতিল করে দিই, পরদিন আবার নতুন করে শুরু করি। কখনো কখনো আমি নিজেই বেরোই, আমাদের স্থানীয় সংসদে গিয়ে বসি, এটা আসলে ক্যাফে, কয়েকটি বেঞ্চ; এখানে মানুষ জীবনের অর্থ, ইতিহাসের গুরুত্ব ও ঈশ্বরের প্রকৃত ইচ্ছে নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করে। এখানে আমার সময় বেশ কেটে যায়।

 &dquote;&dquote;

ঐশ্বরিক ভাষার লেখক

প্রশ্ন: কেমন করে লেখেন? হেমিংওয়ের মতো দাঁড়িয়ে ডেস্কে, না বসে? হাতে লিখে নাকি ওয়ার্ড প্রসেসরে?

ওজ: আমি হাতে লিখি। আমার ডেস্কের যন্ত্রটা (ওয়ার্ড প্রসেসর) লেখাটা তৈরি করার জন্য নয়, টাইপ করার জন্য। বহুবছর ধরে আমি বহনযোগ্য টাইপরাইটারে চূড়ান্ত খসড়াটি টাইপ করেছি, যাতে অন্যরা পড়তে পারে। এখন ওয়ার্ড প্রসেসরে আমি এ কাজটাই করি। এতে আমি সম্পাদনার কাজও করি না, যা কিছু পুনর্লিখন সবই হাতে করা। অনেক খসড়ার পর আমি চূড়ান্তটাই টাইপ করি। আমার বেলায় ওয়ার্ড প্রসেসর একটি টাইপরাইটার ছাড়া আর কিছুই নয়, এখানে শুধু ভুল সংশোধনের কাজটি হয়। আমি আমার রুমে হাঁটাহাটি করি, ডেস্কের পাশে দাঁড়াই, একটা বাক্য লিখি আবার হাঁটি, ডেস্ক ও টেবিলের এদিক-ওদিক করি।

প্রশ্ন: হিব্রু কেন বেছে নিলেন? দাপ্তরিক ভাষা?

ওজ: আমি কখনো হিব্রু বেছে নিইনি। হিব্রু ভাষাতেই আমার জন্ম হয়েছে। জন্মসূত্রেই হিব্রু আমার ভাষা। হিব্রুতেই আমি স্বপ্ন দেখি, হাসি এবং অভিশাপ দিই। অনেকবার বলেছি, ভাষার ব্যাপারে আমি অন্ধ ভক্ত, এমনকি আমাকে যদি দেশ ছেড়েও যেতে হয় আমি এ ভাষার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে পারব না। আমার দেশের জন্যও যেসব অনুভূতি সম্ভবত আমার নেই, তার সবই ভাষার জন্য রয়েছে।&dquote;&dquote;

প্রশ্ন: দ্বিতীয় কারণটি কি এই যে, হিব্রু পবিত্র ভাষা, এ ভাষায় ধর্মগ্রন্থ নাজেল হয়েছে? সৃষ্টিকর্তা কথা বলেন এ ভাষায়, যেমন বলেন আরবি কিংবা সংস্কৃত ভাষায়ও। এ ভাষার ব্যবহার একদিকে চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে দায়িত্ব। তবে আধুনিক হিব্রু তো মাত্র শতবর্ষ পুরনো, বিয়ালিকের মতো কবি ও অন্য লেখকদের আবিষ্কার এ ভাষা। আপনি তো ইংরেজিতেও লিখতে পারতেন?

ওজ: না, পারতাম না। হিব্রু ভাষায় আমি ভাবি, শুনি, হাসি এবং রমণ করি। এটা আমার অস্তিত্বের অংশ। তবে আপনি ঠিকই বলেছেন। মুখের ভাষা হিসেবে এটা প্রাচীন গ্রিক কিংবা লাতিনের মতোই মৃত। এ ভাষায় প্রাচীন সাহিত্য আছে, মধ্যযুগীয় সাহিত্য আছে কিন্তু এখন তা আর প্রতিদিনের জন্য চালু নেই। এ ভাষার ব্যবহার হতো ধর্মীয় আচারে, বিভিন্ন দেশের ইহুদিদের মধ্যে পাণ্ডিত্যপূর্ণ ভাববিনিময় ও আদান-প্রদানে। মধ্যযুগে মুসলিম শাসিত স্পেনে বসবাসকারী ইহুদিরা হিব্রু ভালোবাসতেন এবং উচ্চনিনাদের কবিতা লিখতেন। অবশ্য নিত্যদিনের কথাবার্তায় তারা হিব্রু ব্যবহার করতেন না।

কাজেই শতবর্ষ আগে থেকে এখানে হিব্রুর পুনরুজ্জীবন ঘটতে থাকে, তবে তা কোনো আদর্শিক সিদ্ধান্তের কারণে নয়। আর তা করাও সম্ভব নয়। কোনো যুক্তি কিংবা সিদ্ধান্ত হঠাৎ করে কানাডিয়ানদের কোরিয়ান কিংবা জাপানি ভাষায় কথা বলা শুরু করাতে পারবে না। হিব্রুর পুনরুজ্জীবন প্রাপ্তির কারণটি ভিন্ন, যখন পৃথিবীর সব জায়গা থেকে ইহুদিরা জেরুজালেমে এল, একমাত্র হিব্রুই ছিল তাদের কমন ভাষা। প্রাচ্যের ইহুদিদের মুখের ভাষা আরবি, পারসি, তুর্কি কিংবা লাতিনো, আর ইউরোপীয় ইহুদিরা কথা বলত ইদ্দিশ, রুশ ও পোলিশ ভাষায়। একটি মাত্র ভাষা, যা ব্যবহার করে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারত, তা হচ্ছে হিব্রু। রাস্তাটা কোন দিকে জানতে, বাড়ি কিংবা দোকান ভাড়া নিতে তাদের প্রার্থনার বইটি ছিল হিব্রুতেই।&dquote;&dquote;

কিন্তু আমার বেলায় হিব্রু পুনরুজ্জীবনের প্রথম ঘটনাটি ঘটে যখন ক্লাসের ফার্স্ট বয় ফার্স্ট গার্লকে হিব্রুতে বলে, ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি।’ নাকি এ কথাটি মেয়েটিই ছেলেটিকে বলেছে? ১ হাজার ৭০০ বছর এমন বাক্যালাপ হয়নি। আমি আশা করব ছেলেটি ও মেয়েটি তাদের পথ খুঁজে পেয়েছে এবং বাকি জীবন সুখে কাটিয়েছে, এটা তাদের প্রাপ্য। কারণ তারা ভাষার পুনর্জন্ম ঘটিয়েছে। তার পরও যদি হিব্রুতে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকর্ম না থাকত, এ পুনরুজ্জীবনের ঘটনাটি ঘটত না। বিস্ময়কর হচ্ছে, এ ভাষার বহু ধরনের আধুনিক সংবেদনশীলতা। বেইলিক, ব্রেনার, ব্লেনডেলে, ভার্ডিচেকস্কি— এসব নামের কোনো মানে আপনার কাছে বা পাঠকের কাছে নেই কিন্তু আমি তাদেরই কাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে আছি।

অন্যদিকে হিব্রু হচ্ছে আগ্নেয়গিরির মতো, যেন এলিজাবেথীয় ইংরেজি। আমি এ কথা বলতে চাইছি না যে, আমাদের কবিরা সবাই শেক্সপিয়র; বরং ভাষাটিই আগ্নেয়গিরির মতো উদিগরণ হচ্ছে। আর এটা সারা ক্ষণই ঘটছে। কাজেই হিব্রুতে লেখালেখি করা একটি বিস্ময়কর চ্যালেঞ্জ।

আপনি বলেছেন, হিব্রু ঐশ্বরিক প্রকাশের ভাষা। আপনি ঠিক বলেছেন। ক্যাথিড্রালে একটি চেম্বার মিউজিক বাজানোর কথা ভাবুন, আপনাকে এর শ্রুতিগুণ ধরে রাখার জন্য খুব সতর্ক হতে হবে নতুবা অনাকাঙ্ক্ষিত প্রতিধ্বনি সৃষ্টি হবে। আপনাকে এমন শব্দ বেছে নিতে হবে, যার ভাবসূচক ও অতিন্দ্রীয় অর্থ রয়েছে; যা দিয়ে মা-বাবা ও সন্তানের মধ্যে পকেট মানির যে বিরোধ, তার ব্যাখ্যা করা যায়। আপনি ত্রাণকর্তা ইসাইয়া কিংবা স্তোত্র কিংবা সিনাই পর্বত আনতে চান না। কাজেই আপনি সবসময় মাইন ক্ষেত্রে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছেন। কখনো যদি আপনি একটি বিস্ফোরণ ঘটাতে চান তাহলে সহজেই তা করতে পারেন— গদ্যবাক্যের মাঝখানে একটি ভারী শব্দ বসিয়ে দেয়া। হিব্রু নিয়ে আমার মধ্যে একটি অনভূতি কাজ করে, আমি একটি বিস্ময়কর সংগীতবাদন যন্ত্র নিয়ে আছি।&dquote;&dquote;

অ্যামোস ওজ মনে করেন, ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে হিব্রুর জন্য একাডেমি প্রতিষ্ঠা জরুরি ছিল— প্রথমে একটি কমিটি, তারপর একাডেমি অব হিব্রু ল্যাংগুয়েজ। এর কাজ প্রয়োজনীয় টার্মিনোলজি সৃষ্টি করা, অবশ্যই ভাষাকে নিয়ন্ত্রণ করা নয়। আমি তো বলেছিই, এ ভাষা হচ্ছে উদিগরণরত জ্বালামুখের মতো।

অ্যামোস ওজের ঘরের ভাষা, মা-বাবার ভাষা

অ্যামোজ ওজ বলছেন: আমার বাবার আদিবাস ইউক্রেনের ওডেমা। তারপর লিথুয়ানিয়ার ভিলনিয়াসে অভিবাসী হন, তখন এটা ছিল পোল্যান্ডের অংশ। আমার মা ইউক্রেনেরই। তাদের ভাষা ছিল রুশ কিংবা পোলিশ। জেরুজালেমে হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার সময় তাদের সাক্ষাৎ। আমার বাবা ১৬টি ভাষা জানতেন এবং ১০টি ভাষায় কথা বলতেন। আমার মাও সাত-আটটি ভাষা জানতেন। তারা যখন চাইতেন, আমি তাদের কথোপকথন না বুঝি তখন রুশ ভাষা ব্যবহার করতেন। এছাড়া সবসময় একমাত্র হিব্রু ভাষা ব্যবহারের ওপরই জোর দিতেন। তাদের ভয় ছিল, আমি যদি কোনো ইউরোপীয় ভাষা শিখি, আমি হয়তো ইউরোপে যেতে প্রলুব্ধ হতে পারি। তারা মনে করতেন, এটা ইহুদিদের জন্য একটা ভয়ঙ্কর আত্মঘাতী ব্যাপার। তাদের নিজেদের মধ্যে একসময়ের উত্তাল প্রেমের পর যুগপৎ ভালোবাসা ও ঘৃণার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তারা ইউরোপকে পছন্দ করতেন কিন্তু ইউরোপ তাদের লাথি মেরে বের করে দিয়েছিল। তারা একেবারে সঠিক সময়ে ইউরোপ ছেড়ে আসতে পেরেছিলেন নতুবা আমি আজ বসে আপনাদের সঙ্গে কথা বলতে পারতাম না।

শৈশব ও যৌবনের পাঠ&dquote;&dquote;

শতবছর আগের হিব্রু লেখকদের কারো কারো কথা তো আমি বলেছি, অনেকেই ছিলেন নিজেদের বাধ্য করা অনুবাদক। তাদের অনেকের জন্য প্রেরণা জুগিয়েছেন, উনিশ শতকের এমন মহান রুশ লেখকদের তারা অনুবাদ করেছেন। জার্মান, ফরাসি, ইংরেজি ও স্ক্যান্ডিনেভীয় লেখকদেরও তারা অনুবাদ করেছেন। আমি বাতিকগ্রস্তের মতো তাদের লেখা পড়তাম, আমার আর কিছু করার ছিল না। আমার বয়স যখন নয় কিংবা ১০ বছর, আমি প্রাচীন ইসরায়েল রাজত্বের গৌরবগাথা নিয়ে রচিত জায়োনিস্ট গ্রন্থাবলি পড়েছি। তখন আমি ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী হয়ে উঠি, আমি নষ্ট রিফ্রিজারেটর ও ভাঙা মোটরসাইকেলের টুকরো দিয়ে আন্তঃমহাদেশীয় রকেট ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করি। আমার এ রকেটের গন্তব্য ছিল বাকিংহাম প্রাসাদ। তারপর রাজার কাছে আমার চিঠি যাবে, তাতে বলা হবে: হয় আমার দেশ থেকে বেরিয়ে যাও, নতুবা তোমাকে উড়িয়ে দেব। ব্রিটিশের বিরুদ্ধে আমি হয়ে উঠি ইন্তিফাদা শিশু। আমি ব্রিটিশ সৈন্যদের দিকে পাথর ছুড়ে মারি এবং চিৎকার করি: তোমরা বাড়ি ফিরে যাও। আমার শৈশবের পাঠ জাতীয়তাবাদী ধরনের, তৃতীয় বিশ্বের স্বাধীনতা যুদ্ধের উদ্দীপনার।

তারপর আমি রুশ লেখকদের আবিষ্কার করি, বিশেষ করে দস্তয়েভস্কি, তলস্তয়, সর্বোপরি শেখভ। আমি অনুভব করতাম শেখভ জেরুজালেমে আমাদের কোনো প্রতিবেশী অঞ্চল থেকে উঠে এসেছেন, কেউ কখনো সেই ছোট পক্ষাঘাতগ্রস্ত সংস্কারকদের লেখায় তুলে আনেননি, যারা তার মতোই ভারী শব্দ ব্যবহার করেছেন। তিনজন আমেরিকান লেখক আমার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন: হারমান মেলডিল, শেরউড অ্যান্ডারসন ও উইলিয়াম ফকনার— এটি আমার পছন্দের নাম। আমি আমেরিকান লেখকদের প্রশংসা করি, তবে এ তিনজনকে আলাদাভাবে বিবেচনা করি।

সন্ত্রাসী ও লেখক

কখন তার লেখক হয়ে ওঠা? বাকিংহাম প্রাসাদে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের পর?&dquote;&dquote;

অ্যামোজ ওজ বললেন, দুটি কাজের মধ্যে কোনো বিরোধ ও বৈপরীত্য ছিল না। আমি সন্ত্রাসী হতে পারতাম এবং লিখতাম। আমার বাবা অবিশ্বাসী আলবিয়ন (ইংলিশদের পুরনো নাম)-দের যত বাজে গালাগাল সম্ভব দিয়ে অবৈধ আগুনঝরা পেম্পফ্লেট বর্ণনা করতেন। শেলি, কিটস আর বায়রন থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে প্রমাণ করতেন ব্রিটিশরা কতটা শঠ ও অন্যায়কারী। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন ভীষণ ইংরেজ প্রেমিক। একটি ঘটনা তার ইংরেজ প্রেমের প্রমাণ দেবে:

১৯৪৭ সালের একদিন কারফিউ ছিল, শুরু হলো বাড়ি বাড়ি তল্লাশি। ইহুদি আন্ডারগ্রাউন্ড পার্টির লোকজন কিছু মলোটোড ককটেল আমাদের বাড়িতে লুকিয়ে রাখার জন্য বাবাকে অনুরোধ করে। এটা খুব ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। সন্ত্রাসী কাজের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। আমাদের অ্যাপার্টমেন্টটি ছোট এবং হাজার হাজার বইয়ে ঠাসা, দম বন্ধ হয়ে আসার অবস্থা। বাবা ককটেলগুলো বইয়ের তাকে কিছু বইয়ের পেছনে লুকিয়ে রাখলেন। আমরা যাতে ভুলবশত কোনো দুর্ঘটনা না ঘটিয়ে ফেলি সেজন্য আমাদেরও জানিয়ে সতর্ক করে রাখলেন।

ব্রিটিশরা এল— সে ঘটনার স্মৃতি এখনো আমার মনে জীবন্ত। ওপর থেকে হাঁটু পর্যন্ত তোলা খাকি মোজা। এ দুয়ের মাঝখানে প্রকাশিত হয়েছে পায়ের অংশ, আল্পস পর্বতের তুষারের মতো সাদা। তাদের অফিসার ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী এবং আমাদের অসুবিধার জন্য বারবার ক্ষমা চাইছিলেন— ততক্ষণে সৈন্যরা তল্লাশি শুরু করে দিয়েছে। আমরা তখন আতঙ্কিত। যে লোক এত বইপত্রের মধ্যে ডুবে থাকে, তিনি কি আর সন্ত্রাসী হতে পারেন— এমন ভেবে সৈন্যরা কোনো রকম একটা তল্লাশি চালিয়ে গেল। তারা যখন বেরিয়ে যাচ্ছে, অফিসার বাবার বইপত্র নিয়ে কিছু মন্তব্য করলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, ইংরেজ লেখকদের ইন্টারেস্টিং বইপত্র নেই? তাতেই আমার বাবা হুমড়ি খেয়ে পড়লেন। কী বলতে চান, স্যার? অবশ্যই আমাদের ইংরেজি বই আছে। তারপর একটার পর একটা ইংরেজি ধ্রুপদ বই শেলফ থেকে টেনে বের করতে শুরু করলেন। আমি ও আমার মা ভয়ে পাথর হয়ে রইলাম— বাবা হয়তো বিস্ফোরকের কথা ভুলে গেছেন। হয়তো বই টানতে গিয়ে হঠাৎ করে বের করে ফেলবেন; বইয়ের বাহাদুরি দেখাতে গিয়ে বিস্ফোরণও ঘটিয়ে ফেলতে পারেন। যে কারণে সে যাত্রা আমরা রক্ষা পেয়েছি তা হলো, তিনি বিস্ফোরকগুলো উনিশ শতকের রুশ নৈরাজ্যবাদ ও সন্ত্রাস বিষয়ক বইপত্রের পেছনে রেখেছিলেন— বাকুনিন, নেচায়ের ক্রাপোটকিন, দস্তয়েভস্কি প্রমুখের বই।

লেখালেখির শুরুটা

অ্যামোস ওজ বললেন, আমি তো সবসময়ই লিখেছি, পাঁচ বছর বয়সে বর্ণমালা শেখার পর থেকেই। আমি ছোট ছোট গল্প আবিষ্কার করতাম, যখন আমি কিবুজে (ইসরায়েলের কৃষি খামারভিত্তিক সমাজতান্ত্রিক ধাঁচে যৌথ সম্প্রদায়, প্রথম কিবুজ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯০৯ সালে; বর্তমানে কিবুজের সংখ্যা ২৯০) থাকতাম, যখন সেনাবাহিনীতে কাজ করতাম তখনো লিখেছি। আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়া মুহূর্ত সেটিই, যখন আমি সচেতনভাবে বুঝতে পারি যে আমার জন্ম হয়েছে লেখার জন্য, তখনই আমি লেখক হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমি যখন তুলার জমিতে কাজ করতাম, সে সময় লেখা কবিতা ও ছোটগল্প প্রকাশিত হলে তা বেশ সমাদৃত হয়। কাজেই খামারের কাজ থেকে সপ্তাহে একদিন ছুটি নিয়ে লেখালেখি করতে চাই— এ আবেদন করলাম।

যে কেউ দাবি করে বসতে পারে, সে লেখক বা শিল্পী এবং কায়িক পরিশ্রম থেকে মুক্তি চাইতে পারে। কে সত্যিকারের শিল্পী এবং নয়, সে সিদ্ধান্ত নিতে হবে একটি কমিটিকে। তারা যদি বলেন, ওজকে সপ্তাহে একদিন কাজ থেকে অব্যাহতি দেয়া হলো, তাহলে অন্য আবেদনকারীকে প্রত্যাখ্যান করবেন কেমন করে? সেখানে একজন বৃদ্ধ ছিলেন, এখন আমার যে বয়স, তিনিও তখন প্রায় একই বয়সী; হতে পারে এ তরুণের মেধা আছে, হয়তো সে ভবিষ্যতের তলস্তয়।

কিন্তু এখন তো সে অনেক ছোট। ৪০ বছরে পৌঁছা পর্যন্ত সে মাঠে কাজ করতে থাকুক, তারপর সে লেখার মতো কিছু পাবে। সৌভাগ্যবশত তার পরামর্শ নাকচ হয়ে যায়। আমাকে বলা হয়, সপ্তাহে একদিন লেখালেখি করার জন্য ছুটি পাব, কিন্তু অন্য সময় দ্বিগুণ খেটে এর শোধ দিতে হবে। আমি তা-ই করেছি। কিন্তু আমি কি করতে যাচ্ছি, তা আমার কাছে স্পষ্ট— মাঠে যতক্ষণ কাজ করেছি, যে গল্পটি আমি লিখতে যাচ্ছি, তা আমার মাথায় তৈরি হয়েছে। লেখার জন্য ছুটির দিনে আমি ১২ এমনকি দিনে ১৫ ঘণ্টাও লিখেছি।

(আর এর ফলই প্রথম গল্প সংকলন হোয়ার দ্য জ্যাকালস হাউল। তিনি উপন্যাসের আগে গল্পে কেন হাত দিলেন? এক ধরনের প্রশিক্ষণ— ক্রীড়াবিদরা যেমন করে থাকেন।)

আমার দরকার ছিল দ্রুত তৃপ্তি। আমার বয়স তখন অনেক কম। বড় কাজের প্রজ্ঞা ও ধৈর্য আমার ছিল না। আমি ছোটগল্প লেখারই সিদ্ধান্ত নিই। এ শৈলী স্বল্প সময়েই লেখককে গল্পে পৌঁছে দেয়। গল্পটা নিয়ে আমার মাথায় কাজ করি, তারপর একদিনেই লিখে ফেলতে পারি। এখন অবশ্য এটা আর হয় না। আমার গতি বদলে গেছে।

এ বই প্রকাশিত হওয়ার পর অ্যামোজ ওজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গেলেন। কিন্তু পড়ার বিষয়টি দর্শন কেন?

তিনি বললেন, কিবুজ থেকেই আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হলো। কারণ তাদের শিক্ষক দরকার।

আমার বাবা বললেন, কখনো এমন বিজ্ঞাপন তোমার চোখে পড়বে না, যেখানে বলা হবে: দার্শনিক চাই।

কাজেই আমি ভাবলাম, এমন একটা বিষয় নিয়ে আমি পড়তে পারি, যাকে কেউ কখনো চাকরিতে ডাকবে না। আমি বরং ভাগ্যবান। জেরুজালেম বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব মহান দার্শনিক পড়িয়েছিলেন, আমি তাদের লেজের দিকটা ধরতে পেরেছিলাম। তখনো সেখানে মার্টিন বুবারের আত্মা বিরাজ করছে, তেমনি রয়েছেন বার্গম্যান ও অন্যরা। জেরুজালেম তখন সেন্ট্রাল ইউরোপের দুর্গ— জার্মানি থেকে প্রাগ পুরোটাই। কিন্তু আমি সরলীকরণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দর্শন পড়ছি। কারণ আমি একজন গল্পলেখক। ন্যায়শাস্ত্র নিয়ে আলোচনায় অধ্যাপক যখন উদাহরণ দিয়ে বললেন, রুথ যখন প্রথমবারের জন্য ডেভিডের সঙ্গে দেখা করেন, অমনি আমার কল্পনার দরজা খুলে গেল, আমি তাদের সাক্ষাৎ ঘিরে একটি গল্প কল্পনা করতে থাকলাম। তবে আমি পরীক্ষায় ভালো গ্রেডই পেয়েছি এবং আমার ডিগ্রিটা শেষ করতে পেরেছি।

আমি পড়েছি সক্রেটিস, সেইন্ট অগাস্টিন, সেইন্ট টমাস একইনাস, তবে আমার স্পেশালাইজেশন হলো স্পিনোজা।

দেশীয় ও বৈশ্বিক

দস্তয়েভস্কি, গোগল, শেখভ— মহান এ রুশ লেখকরা একদিকে যেমন রুশ, অন্যদিকে তারা বৈশ্বিকও। তাদের কাহিনীর চরিত্রে ও দুর্দশায় আমরা নিজেদের আবিষ্কার করি। কিন্তু অ্যামোস ওজের উপন্যাসে মূল চরিত্র ইসরায়েল— ভূমি, মানুষ এবং সেখানকার ইতিহাস। ‘মাই মাইকেল’ কাহিনীতে হান্নাহ নামের একজন ইসরায়েলি নারীর সঙ্গে দুজন আরবের সম্পর্ক— সুয়েজ সংকটের পর। একে আরব-ইসরায়েল দ্বন্দ্বের প্রকাশ হিসেবে বিবেচনা করা যায়? তিনি কি সচেতনভাবে এ ধারণাকে এখানে প্রমূর্ত করে তুলেছেন?

অ্যামোস ওজ জবাব দিলেন: আপনি যদি পৃথিবীর সংকটাপন্ন কোনো স্থানে লেখেন তাহলে সবকিছুরই ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা হবে। আমি যদি একজন বাবা, একজন মা এবং একজন কন্যাকে নিয়ে একটি গল্প লিখি, সমালোচক বলবেন গল্পের বাবা হচ্ছেন সরকার, মা পুরনো মূল্যবোধ আর কন্যা হচ্ছে বিপর্যস্ত অর্থনীতি। আজ যদি দক্ষিণ আফ্রিকার মারিয়ো বার্গাস জোসার নামে ‘মবিডিক’ প্রকাশিত হতো, মানুষ বলত এটা একনায়কতন্ত্র নিয়ে রচিত। যদি দক্ষিণ আফ্রিকার ন্যাদাইন গর্দিমার লিখতেন, এটাকে বলা হতো কালো ও সাদার দ্বন্দ্ব। রাশিয়া হলে ‘মবিডিক’ তিমিটা হতো স্ট্যালিন, মধ্যপ্রাচ্য হলে বলা যেত ইসরায়েলিরা ফিলিস্তিনিদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে কিংবা তার উল্টোটা। সমস্যাক্রান্ত স্থানে বসে লিখলে এ মূল্য লেখককে দিতে হবে। তবে আমি সবসময়ই একগুচ্ছ চরিত্র নিয়ে লেখা শুরু করি। তারা তাদের গল্প বলতে থাকে। আমি কখনো রাজনৈতিক রূপক কাহিনী লিখিনি কিংবা ভাবাদর্শের উপন্যাস।

কিন্তু তার পরও অ্যামোস ওজ বলেছেন, আরব-ইসরায়েল দ্বন্দ্ব একটি ট্র্যাজেডি। কারণ জমিনের জন্য যে দাবি, তাতে উভয়েই সঠিক। ‘এটা হচ্ছে ন্যায়বিচারের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচার।’

অ্যামোস ওজ বললেন, তা সত্যিই কিন্তু তা প্রবন্ধে। আমার উপন্যাস ন্যায়পরাণতা নিয়ে নয়। আমি মধ্যযুগের একটি হ্যাসিডিক গল্প বলছি, একজন র্যাবাই (ইহুদি ধর্মযাজক) একই সঙ্গে বিচারকও ছিলেন। একটি ছাগল দুজন দাবি করছে, তাকে রায় দিতে হবে। তিনি সযত্নে দুজন দাবিদারের বক্তব্য শোনেন এবং ডিক্রি জারি করেন: উভয়ের দাবিই সঠিক। এটা শুনে তা স্ত্রী বললেন, প্রিয় স্বামী, আপনার রায় বাস্তবায়ন অসম্ভব— আপনি একটি ছাগলকে কেটে দুই ভাগ করতে পারেন না। এটা ‘ক’ কিংবা ‘খ’ পাবে। দুজন পেতে পারে না। র্যাবাই তার মাথা চুলকে বললেন, প্রিয় স্ত্রী, তোমার কথাও ঠিক!

আমি হচ্ছি সেই র্যাবাই। আমাকে যদি এক কথায় বলতে হয়, আমি কি নিয়ে কাজ করি, আমি বলব ‘পরিবার’। আমি পরিবারকেই দেখি সবচেয়ে রহস্যময় প্রতিষ্ঠান হিসেবে। অসম্ভব উল্টোপাল্টা এবং স্ববিরোধী প্রতিষ্ঠান, আমরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পরিবার নামের প্রতিষ্ঠানটির মৃত্যুর ভবিষ্যত্বাণী শুনে এসেছি। দেখুন ধর্ম, আদর্শ, শাসনামল ঐতিহাসিক পরিবর্তন সবকিছু ছাপিয়ে পরিবার কেমন করে টিকে আছে।  মা-বাবা, ভাইবোন— কত কিছু চলছে তাদের মধ্যে। এ ধারণাই আমাকে বুঝিয়ে দেয় পৃথিবীর বিভিন্ন দ্বন্দ্ব পারিবারিক শব্দাবলিতে ধারণ করা যায়: যেমন ভালোবাসা ও ঘৃণার চিরন্তন আবর্তন, ঈর্ষা ও একাত্মতা, সুখ ও দৈন্য। আমার প্রায় প্রতিটি উপন্যাসেই এ আবর্তন। পরিবারের মধ্যে সবাই পরস্পরের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে আছে আর সবাই ঠিক— র্যাবাই ও ছাগলের গল্পের মতো। পুত্রই সঠিক, কারণ বাবা স্বৈরাচারী; বাবাই সঠিক, কারণ ছেলেটি আলসে এবং বাবার প্রতি অশ্রদ্ধাশীল; মা-ই সঠিক, কারণ বাপ-বেটা দুজনই এক রকম এবং যে যা করছে ঠিকই আছে; মেয়েই ঠিক, কারণ এ পরিবেশ তার সহ্য হয় না, তাই সে বাড়ি ছেড়েছে। তার পরও তারা সবই পরস্পরকে ভালোবাসে। কাজেই আমি অনেক সময় আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্বকে পরিবারের প্রেক্ষাপট থেকে দেখতে চেষ্টা করি।

তলস্তয় বলেছেন, সুখী পরিবারগুলো একই রকম; অসুখী পরিবারগুলো ভিন্ন ভিন্নভাবে অসুখী। কিন্তু অ্যামোস ওজ কী মনে করেন?

তলস্তয়ের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই তিনি ঠিক উল্টোটাকে সঠিক মনে করেন। অসুখী পরিবার নিয়ে আধডজন বহুল চর্চিত আপ্তবাক্য রয়েছে, কিন্তু সুখী পরিবার— আর তা সত্যিই দুর্লভ— একেবারে অতুলনীয়। সুখী পরিবারই তাকে আকৃষ্ট করে।

তিনি এখন কী লিখছেন, এ প্রশ্নের জবাবে অ্যামোস ওজ বললেন, আমি কখনো এ সম্পর্কে মুখ খুলি না— এক্স-রের সামনে গর্ভাবস্থা তুলে ধরা ঠিক নয়। তাতে শিশুর ক্ষতি হতে পারে।

মৃত্যুর প্রস্তুতি

অ্যামোস ওজ যখন প্যারিস রিভিওতে সাক্ষাৎকার দিচ্ছিলেন তখন তার বয়স ৫৭। তাকে বলা হয়, আপনি এখনো তরুণ, পেছনে রেখে এসেছেন প্রচুর কাজ। আপনি কি কখনো মৃত্যুর কথা ভাবেন?

ওজ বললেন, আমি ৫৭, ইসরায়েলে এটা কখনো কম বয়স নয়। তার মানে আমি আমার দেশের চেয়ে বেশি বয়স্ক। আমি অবশ্যই মৃত্যুর কথা ভাবি। কিন্তু আমি যদি প্রতিদিনই মৃত্যুর কথা ভাবি তাহলে জীবনের প্রতি যে নেশাগ্রস্ততার আনন্দ, তা থেকে বঞ্চিত হব। আমি মৃত্যুর কথা ভাবি, তার চেয়ে বেশি ভাবি মৃতদের কথা। মৃত্যুর চিন্তাই হচ্ছে নিজেকে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত করা। কারণ ওই মৃত মানুষরা কেবল আমার স্মৃতিতে বিরাজ করে, আমার বাসনায় থাকে, চলে যাওয়া একটি মুহূর্ত পুনর্নির্মাণে আমার সক্ষমতার ওপর প্রুস্তের চলে যাওয়া সময় পুনরুদ্ধারের মতো— যা ৫০ বছর আগে ঘটতে পারত। একদিন নীরবে ১০ মিনিটে আমি আমার শৈশব পুনর্নির্মাণ করতে চেয়েছি! একটি কক্ষে ছয়জন মানুষ, তাদের মধ্যে একমাত্র আমিই জীবিত। ওখানে কে বসে আছে? কে কী বলছে? তারপর আমার মনে হলো, আমি যতদিন পারি আমার অন্তরে, আমার মস্তিষ্কে, আমার লেখায় সেই মানুষগুলোকে বাঁচিয়ে রাখছি। আমি যখন মরে যাব, কেউ আমাকে একইভাবে বাঁচিয়ে রাখবে— এটাই হবে ন্যায্য পাওনা।

হ্যামলেট বলেছেন, বয়স ৫০ হয়ে গেলে মৃত্যু যেকোনো সময়ই আসতে পারে, মৃত্যু প্রস্তুতিই সব।

অ্যামোস ওজ বলেন, আমি বরং বলব, মৃত্যু ৫০ বছর আগেই এসেছে। আমি জীবনকে ভালোবাসি এবং দারুণ উপভোগ করি। কিন্তু সেই উপভোগের একটি অংশে আমার জীবন জীবিত ও মৃত মানুষে পরিপূর্ণ। আজ রাতে মৃত্যু এসে যদি হাজির হয়, আমাকে দেখবে ক্ষুব্ধ এবং অনিচ্ছুক কিন্তু প্রস্তুতিবিহীন মোটেও নয়।

নিবন্ধ লেখার তাড়না

আমি (পত্রিকায়) নিবন্ধ লিখি এ কারণে নয় যে, আমাকে লিখতে অনুরোধ করা হয় তাই আমি লিখি, আমি আসলে ভীষণ রেগে থাকি। আমি মনে করি, আমার সরকারের কী করা উচিত, তা আমাকে বলতে হবে। কখনো কখনো কোন দিকে যাবে তাও। তখন আমি আর সব কাজ ফেলে একটি নিবন্ধ লিখে ফেলি। লেখাটি প্রথম এখানেই প্রকাশিত হয়, তারপর দ্য নিউইয়র্ক টাইমস কিংবা ইংল্যান্ডের গার্ডিয়ান কিংবা অন্য কোনো প্রকাশনা সেই লেখাটি তুলে নেয়। দেখুন, আমি রাজনৈতিক বিশ্লেষক কিংবা ভাষ্যকার নই। আমার লেখাটা অবিচারের বিরুদ্ধে, অবিচারের বিরুদ্ধে এটা আমার বিদ্রোহ। আমি যখন নিজের সঙ্গে শতভাগ সম্মত হই তখনই কেবল এ ধরনের একটি নিবন্ধ রচনা করি। এই শতভাগ কিন্তু আমার বেলায় স্বাভাবিক শর্ত নয়; সাধারণত আমার নিজের সঙ্গেই আংশিক অসম্মতি থাকতে পারে— আমি তিনটি বা পাঁচটি ভিন্ন মতের কথা বলতে পারি, একই বিষয় নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন অনুভূতি তুলে আনতে পারি— আর এমনটা ঘটে যখন আমি গল্প লিখি। সেখানে বিভিন্ন চরিত্র একই বিষয়ে তাদের ভিন্ন মতের কথা বলতে পারে। কোনো কিছু সম্পর্কে মানুষের মন বদলানোর জন্য আমি কখনো গল্প কিংবা উপন্যাস লিখিনি। কখনই না। যখন আমাকে এ কাজটা করতে হয়, আমি প্রবন্ধ লিখি, একটি নিবন্ধ লিখি। এমনকি প্রতীকী অর্থে আমি দুটো ভিন্ন কলমও ব্যবহার করতে পারি— একটা দিয়ে গল্প বলব, অন্যটা দিয়ে বলব সরকারের কী করা উচিত। যাহোক, কলম দুটি অতি সাধারণ বল পয়েন্ট; যা আমাকে সপ্তাহ তিনেকে একবার করে পাল্টাতে হয়।

এটা গল্পের মতো নয়, নিবন্ধ লেখা হয় এক ঝটকায় ৬-৭ ঘণ্টা সময়ে। এটা আমার স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া করার মতো। আমরা চিৎকার-চেঁচামেচি করে পরে সমঝোতা করে ফেলি। আমরা বাস করি ফেলিনির সিনেমার জগতে, ইঙ্গমার বার্গম্যানের সিনেমা নয়! নিঃশব্দ ও গুমরামুখো থেকে একজন অন্যজনকে অপরাধবোধে আক্রান্ত করানোর চেয়ে অন্য যা কিছু আছে ভালো। রাজনীতিতে আমি এ নীতিতেই কাজ করি।