‘ফখর-উদ-দীন
মুবারক শাহ
সোনারগাঁয় স্বাধীনতা
ঘোষণা করে
বাংলায় এক
নতুন যুগের
সূচনা করেন।
ইতিপূর্বেও লখনৌতি
মাঝে মাঝে
স্বাধীন হয়,
কিন্তু স্বাধীনতা
বেশিদিন স্থায়ী
হয়নি, ফখর-উদ-দীন
স্বাধীনতা ঘোষণা
করে এমন
এক যুগের
সূচনা করেন,
যাতে সারা
বাংলার স্বাধীনতা
দুইশত বৎসর
স্থায়ী হয়’—ইতিহাসবিদ
আবদুল করিমের
এ মূল্যায়ন
থেকে বাংলার
ইতিহাসে ফখরুদ্দীন
মুবারক শাহের
স্বতন্ত্র অবস্থানটির
আভাস পাওয়া
যায়। ইতিহাসের
সে পর্বটি
ছিল এ
রকম—১৩৩৮
সালে সোনারগাঁর
গভর্নর বাহরাম
খান মৃত্যুবরণ
করেন এবং
তার সিলাহদার
বা বর্মরক্ষক
ফখরুদ্দীন মুবারক
শাহ স্বাধীনতা
ঘোষণা করে
স্বাধীন সোনারগাঁ
রাজ্য প্রতিষ্ঠা
করেন। ক্ষমতায়
আরোহণ করে
নিজের মুদ্রায়
তিনি ফখরুদ্দীন
আল-সুলতানুল
আযম ফখরুদ্দুনিয়া
ওয়াদ-দ্বীন
আবুল মুজাফফর
মুবারক শাহ
আল-সুলতান
উপাধি গ্রহণ
করেন। মুয়ায্যম
হুসায়ন খান
লিখেছেন, ‘ফখরুদ্দীন
মুবারক শাহ
(১৩৩৮-১৩৪৯)
বাংলার সুলতান।
বাংলায় প্রথম
স্বাধীন মুসলিম
সালতানাতের প্রতিষ্ঠাতা।
তার রাজধানী
ছিল ঐতিহাসিক
নগর সোনারগাঁ।
বাংলার প্রশাসনে
এমন এক
সময় এ
যুগসৃষ্টিকারী পরিবর্তন
সূচিত হয়,
যখন নব্য
মামলুক শাসনের
অবসানের পর
সমগ্র বাংলা
দিল্লির তুঘলক
সুলতানের করায়ত্ত
ছিল।’
সুখময় মুখোপাধ্যায়
মূল্যায়ন টেনেছেন
এভাবে—‘বাংলাদেশে
মুসলিম অধিকার
প্রতিষ্ঠার শুরু
থেকে শেষ
পর্যন্ত বাংলাদেশ
পর্যায়ক্রমে একবার
দিল্লির অধীন
হয়েছে, আবার
স্বাধীন হয়েছে।
কিন্তু ১৩৩৮
খ্রিস্টাব্দে ফখরুদ্দীন
মুবারক শাহের
স্বাধীনতা ঘোষণা
থেকে শুরু
করে ১৫৩৮
খ্রিস্টাব্দে গিয়াসুদ্দীন
মাহমুদ শাহের
উচ্ছেদ পর্যন্ত
পুরোপুরি ২০০
বছর বাংলাদেশ
যে রকম
অবিচ্ছিন্নভাবে স্বাধীনতা
ভোগ করেছিল,
তত দীর্ঘদিন
ধরে আর
কোনো সময়
তার স্বাধীনতা
স্থায়ী হয়নি।
এ ২০০
বছর বাংলাদেশের
ইতিহাসের একটি
গৌরবময় অধ্যায়।
এ সময়ে
বাংলার সুলতানরা
নিজেদের যোগ্যতা,
শক্তি ও
ঐশ্বর্যের মধ্য
দিয়ে ভারতবর্ষের
শ্রেষ্ঠ নৃপতিদের
অন্যতম হয়ে
উঠেছিলেন। শুধু
তা-ই
নয়, তারা
দেশের অভ্যন্তরীণ
শাসন-ব্যবস্থার
পরিচালনায় এবং
রাজার নানা
রকম কর্তব্য
পালনেও অপরিসীম
দক্ষতা দেখিয়ে
গিয়েছেন। ফলে
তারা বাংলার
জনসাধারণের, এমনকি
বিধর্মী হিন্দুদেরও
আস্থা ও
ভালোবাসা অর্জন
করেছিলেন।’
এ ২০০
বছরের স্বাধীনতা
বাংলাকে কীভাবে
সমৃদ্ধ করেছিল,
তার মূল্যায়ন
করেছেন আবদুল
করিম। তিনি
তার বাংলার
ইতিহাস: সুলতানি
আমল গ্রন্থে
লিখেছেন, ‘দুইশত
বৎসর স্বাধীন
থাকার ফলে
বাংলাদেশের সাহিত্য
ও সংস্কৃতির
বিকাশ হয়।
সে সময়ে
সূফী-সাধক,
পণ্ডিত এবং
এমনকি ব্যবসায়ীদের
একদেশ হইতে
অন্য দেশে
যাওয়ার বাধা-নিষেধ
না থাকায়
বহিরাগত মুসলমানদের
বাংলাদেশে আসা
বন্ধ ছিল
না। বহিরাগত
সূফী-সাধক,
পণ্ডিত, সেনাপতি
এবং প্রশাসনিক
বিশেষজ্ঞরা বাংলার
স্বাধীন সুলতানদের
নিকট সদ্ব্যবহার
লাভ করিত।
দিল্লির সুলতানদের
সঙ্গে বিরোধ
থাকায় বাংলার
স্বাধীন সুলতানরা
দেশের অমুসলমান
প্রতিভাবান ব্যক্তিদিগকেও
কাজে লাগাইতেন।
ফলে স্বাধীন
সুলতানি আমলে
হিন্দুদের সঙ্গে
মুসলমানদের হূদ্যতা
বৃদ্ধি পায়।
আরবি এবং
ফারসি ভাষা
ও সাহিত্যের
সঙ্গে বাংলা
ভাষা ও
সাহিত্য উত্কর্ষ
সাধন করে। এ সময়ে
স্থাপত্যশিল্পে মুসলমান
স্থাপত্য রীতির
সঙ্গে সঙ্গে
হিন্দু আঞ্চলিক
স্থাপত্যরীতিও প্রাধান্য
লাভ করে।
স্থানীয় লোকরা
নিজ নিজ
যোগ্যতার ভিত্তিতে
রাষ্ট্রের প্রশাসনিক
এবং সামরিক
চাকরিতে স্থান
পায়। অধিক
সংখ্যক মুসলমান
সূফী-সাধক
বাংলাদেশে আগমন
করায় এবং
ইসলাম ধর্ম
প্রচার করা
ফলে স্থানীয়
লোকরা অধিকহারে
ইসলাম গ্রহণ
করে এবং
মুসলমানদের সংখ্যা
বৃদ্ধি পায়।’
এহেন গুরুত্বপূর্ণ
ঘটনাটি কীভাবে
ঘটেছিল বা
ফখরুদ্দীন মুবারক
শাহ কীভাবে
সোনারগাঁর স্বাধীনতা
ঘোষণা করেছিলেন,
তার উল্লেখযোগ্য
বিবরণী পাওয়া
যায় তারিখ-ই-মুবারকশাহীতে।
ফারসি ভাষায়
এ গ্রন্থ
রচনা করেছিলেন
ইয়াহিয়া বিন
আহমদ বিন
আবদুল্লাহ শিরহিন্দী।
দিল্লির সুলতানি
আমলের ইতিহাস
চর্চায় এটি
অত্যন্ত মূল্যবান
আকরগ্রন্থ। যদুনাথ
সরকার বলেছেন,
এ গ্রন্থে
সংশ্লিষ্ট কালপর্বের
এমন কিছু
তথ্য পাওয়া
যায়, যা
আর কোথাও
নেই। তারিখ-ই-মুবারকশাহীতে লেখা আছে—
‘বাহরাম খান সোনারগাঁয় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন এবং তার তরবারি-বাহক মালিক ফখরুদ্দীন ৯৩৯ হিজরিতে (১৩৩৮-৩৯ খ্রি.) বিদ্রোহ
করে সুলতান ফখরুদ্দীন নাম নিয়ে রাজচিহ্ন ধারণ করেন। লখনৌতির শাসনকর্তা মালিক পিণ্ডার খিলজি কদর খান, মুন্তৌফি-ই-মমালিক মালিক হিসামুদ্দীন আবু রেজা, সাতগাঁওয়ের জায়গীরদার আজম-ই-মুলক আজুদ্দীন ইয়াহিয়া এবং করহ এর আমীর নসরৎ খানের পুত্র ফিরোজ খান বিদ্রোহীদের দমন করতে সোনারগাঁ যাত্রা করলেন। তিনিও (ফখরুদ্দীন) তার সেনাদের নিয়ে তাদের মুখোমুখি হলেন। এ যুদ্ধে ফখরুদ্দীন পরাজিত হয়ে পলায়ন করেন। ফখরুদ্দীনের হাতি ও ঘোড়াগুলো বিজয়ী পক্ষ দখল করে নেয়। কদর খান সোনারগাঁয়ই থেকে গেলেন এবং অন্যরা নিজ নিজ জায়গীরে ফিরে যান।’
বর্ষাকালে কদর খানের বাহিনীর বেশির ভাগ ঘোড়া মারা যায়। তিনি কয়েক মাস বিপুল পরিমাণ রৌপ্যমুদ্রা সংগ্রহ করে নিজের ঘরে ভাণ্ডার গড়ে তুলেছিলেন। তিনি বলতেন, সম্রাটের সামনেও তিনি এভাবে রৌপ্যমুদ্রা সঞ্চয় করতেন, কারণ তিনি যত বেশি সঞ্চয় করবেন, সুলতানের তাতে তত বেশি কাজ হবে। মালিক হিসামুদ্দীন তাকে এ বলে উপদেশ দিলেন, ‘দূর দেশে প্রভূত ধন সংগ্রহ করা ক্ষতিকর, কারণ তার ওপর মানুষের লোভ হবে এবং তারা সন্দেহ করবে কেন এ অর্থ সম্রাটকে পাঠানো হচ্ছে না। যা কিছু অর্থ ও সম্পদ সংগ্রহ করা হয়েছে, সব রাজকোষে পাঠিয়ে দেয়া উচিত। এর চেয়ে ভালো আর কিছুই হতে পারে না।’
কিন্তু কদর খান এসব কথায় কান দিলেন না। তিনি সেনাদের প্রাপ্য (লুঠের অংশ) দিলেন না, রাজকোষেও কোনো সম্পদ পাঠালেন না। ফলে সেনাদের মধ্যে লোভ চাগিয়ে উঠল। এর মধ্যে হাজির হলেন ফখরুদ্দীন মুবারক শাহ এবং কদর খানের অসন্তুষ্ট সৈন্যরা তার সঙ্গে যোগ দিয়ে কদর খানকে হত্যা করে।
ফখরুদ্দীন সোনারগাঁকে তার রাজধানী করেন এবং তার গোলাম মুখলিসকে লখনৌতিতে রেখে দেন। কদর খানের অধীনস্থ আরিজ-ই-লস্কর (সেনাবাহিনীর বেতনদাতা) আলী মুবারক মুখলিসকে হত্যা করে লখনৌতি অধিকার করলেন। কিন্তু তিনি সার্বভৌম রাজা হওয়ার কোনো লক্ষণ না দেখিয়ে সম্রাটের (মুহম্মদ তুঘলক) কাছে এ মর্মে আবেদন জানালেন যে তিনি লখনৌতি অধিকার করেছেন। যদি সম্রাট তার কোনো ভৃত্যকে সেখানে পাঠান এবং (লখনৌতির) সিংহাসনে বসান, সেক্ষেত্রে তিনি সম্রাটকে সম্মান দেখাবেন। সুলতান আদেশ জারি করলেন, দিল্লির শাসনকর্তা ইউসুফকে ‘খান’ পদবি দিয়ে লখনৌতিতে পাঠানো হলো। ইতিমধ্যে লখনৌতিতে পৌঁছার আগেই মালিক ইউসুফের মৃত্যু হলো, কিন্তু সুলতান এদিকে মনে দিলেন না এবং কাউকেই তিনি লখনৌতিতে পাঠালেন না। আলী মুবারক তখন ফখরুদ্দীনের সঙ্গে তার শত্রুতার পরিপ্রেক্ষিতে বাধ্য হয়ে রাজচিহ্ন ধারণ করলেন এবং সুলতান আলাউদ্দীন নামে নিজেকে অভিহিত করলেন।’
এবার আলী মুবারক বা সুলতান আলাউদ্দীন সরাসরি মুখোমুখি হলেন ফখরুদ্দীন মুবারক শাহের। একদিকে লখনৌতি দখল করতে না পারা এবং অন্যদিকে আলী মুবারকের হাতে নিজের সেনাপতি মুখলিসের মৃত্যু ফখরুদ্দীনকে ক্ষিপ্ত করেছিল সন্দেহ নেই। অন্যদিকে আলী মুবারক তখন নিজেই লখনৌতির সিংহাসনে বসেছেন, ফলে ফখরা ও তার দ্বন্দ্ব অনিবার্য হয়ে উঠল। মুয়ায্যম হুসায়ন খান লিখেছেন, ‘দুই নরপতি সমগ্র বাংলায় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হন। এ দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যকার সংঘর্ষ ছিল উভয়ের জন্যই একদিকে আক্রমণাত্মক ও অন্যদিকে প্রতিরোধ প্রকৃতির। উন্নততর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও শক্তিশালী নৌবাহিনী নিয়ে ফখরুদ্দীন বর্ষা মৌসুমে প্রায়ই লখনৌতিতে আক্রমণ চালাতেন এবং শুষ্ক মৌসুমে প্রতিহত করতেন। আর তার চেয়ে উন্নততর অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনী নিয়ে আলাউদ্দিন আলী শাহ (আলী মুবারক) আক্রমণ করতেন।’
ফখরুদ্দীন মুবারক শাহ ১৩৩৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৩৪৯-৫০ খ্রি. (৭৫০
হিজরি) পর্যন্ত শাসন ক্ষমতায় ছিলেন। সোনারগাঁর টাঁকশালে ৭৫০ হিজরি পর্যন্ত উত্কীর্ণ তার মুদ্রা পাওয়া গেছে। এরপর আর যায়নি। বরং ৭৫০-৭৫৩ হিজরি সময়কালে সোনারগাঁর টাঁকশালে ইখতিয়ারুদ্দীন গাজী শাহের মুদ্রা পাওয়া যায়।
ফখরুদ্দীন মুবারক শাহের আমলে বিশেষভাবে সমৃদ্ধি ঘটেছিল সোনারগাঁর। তিনি তার স্বাধীন সালতানাতের রাজধানী করেছিলেন এ শহরকে। ত্রয়োদশ শতাব্দীর সত্তর দশকে রাজা দনুজ রায়ের আমলে সোনারগাঁ বঙ্গরাজ্যের রাজধানীতে পরিণত হয়। এরপর থেকে পূর্ববঙ্গে হিন্দু রাজত্বের অবসানের আগ পর্যন্ত সোনারগাঁ বঙ্গরাজ্যের রাজধানী ছিল। এরপর সোনারগাঁর সমৃদ্ধি ও গৌরবে ভাটার টান শুরু হয়। কিন্তু ফখরুদ্দীন মুবারক শাহের শাসনামলে সোনারগাঁ অতীতের গৌরব ফিরে পায়। তার প্রতিষ্ঠা করা বাংলার প্রথম স্বাধীন মুসলিম সালতানাতের রাজধানী হয় সোনারগাঁ। ইতিহাসবিদরা বলেন, এটাই সোনারগাঁর সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। সোনারগাঁ এ কালপর্বে প্রায় ১৪ বছর পূর্ববঙ্গ ও দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গের সুলতানি শাসনের রাজধানীর মর্যাদায় অধিষ্ঠিত ছিল।
ফখরুদ্দীন মুবারক
শাহের কৃতিত্ব
মূল্যায়ন করতে
গিয়ে মুয়ায্যম
হুসায়ন খান
লিখেছেন, ‘এ
বিশিষ্ট সমর
সংগঠক, বিজেতা
ও কূটনীতিক
স্পষ্টই ছিলেন
দিল্লির অধীনতা
পাশ থেকে
বাংলার স্বাধীনতার
সূচনার অগ্রনায়ক,
আর তিনিই
প্রসারিত করে
দেন পরবর্তী
দুই শতক
ব্যাপী বাংলায়
স্বাধীন শাসনের
দিগন্তকে। বাংলায়
সর্বাধিক সুদৃশ্য
মুদ্রার রূপকার,
চারুশিল্প ও
হস্তশিল্পের পৃষ্ঠপোষক,
ব্যবসা-বাণিজ্যের
সম্প্রসারক, বহিরাগত
ও ফকির-দরবেশদের
উদার পৃষ্ঠপোষক,
মসজিদ সমাধিসৌধ
ও সড়ক
নির্মাতা, আরাকানি
মগদের অত্যাচার
ও লুণ্ঠন
থেকে রাজ্যের
জনগণের রক্ষক
এ মহান
নৃপতি বাংলার
ইতিহাসে এক
উজ্জ্বল স্বাক্ষর
রেখে গেছেন।
বহুমুখী গুণে
বিভূষিত বাংলার
এ সুলতানের
প্রধান কৃতিত্ব
হলো, জীবনধারণের
প্রয়োজনীয় সামগ্রীর
প্রাচুর্য এবং
পণ্যের সস্তাদর
নিশ্চিত করে
তিনি তার
রাজ্যের জনগণের
জন্য সহজ
ও স্বাচ্ছন্দ্যময়
জীবনযাপনের সুযোগ
করে দিয়েছেন।
১৩৪৯ খ্রিস্টাব্দে
(৭৫০ হিজরি)
সোনারগাঁয় ফখরুদ্দীন
মুবারক শাহের
মৃত্যু হয়।’
এসএম রশিদ: লেখক





