মার্কো পোলোর সফর ২৪ হাজার কিলোমিটারে সীমিত, জেঙ্গ হি অতিক্রম করেছেন তার দ্বিগুণেরও বেশি পথ ৫০ হাজার কিলোমিটার; আর ২১ বছর বয়সে ঘর ছাড়া মরক্কোর যুবক শেখ আবু আবদুল্লাহ মুহম্মদ ইবনে বতুতা পেরিয়েছেন জেঙ্গ হির দ্বিগুণেরও বেশি পথ, ঝুঁকিপূর্ণ অরণ্য ও লোকালয়। ১৩২৬ সালের ৩ হাজার ৫০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে যখন আলেকজান্দ্রিয়া বন্দরে পৌঁছলেন, সে সময় দুজন বুজুর্গের দেখা পেলেন। একজন শেখ বুরহানউদ্দিন তাকে বললেন, মনে হচ্ছে দেশ ঘুরে দেখা তোমার প্রিয় কাজ। অবশ্যই তুমি ভারতে গিয়ে আমার ভাই ফরিদউদ্দিনের সঙ্গে দেখা করবে, সিন্ধুতে দেখা পাবে আমার ভাই রুকনউদ্দিনের আর আমারই নামের অন্য একজন বুরহানউদ্দিন আছেন চীন দেশে। কেবল বুড়ি ছোঁয়ার মতো আমি তো গিয়েছি বলার জন্য নয়, নতুন নতুন গন্তব্যে মানুষ ও স্থানের সঙ্গে পরিচিত হতে কয়েক সপ্তাহ সময় অবস্থান করেছেন, পুরো রমজান মাসটাই কাটালেন দামেস্ক শহরে। এরপর উটের কাফেলায় যোগ দিয়ে ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে মদিনা, তারপর মক্কায় এসে হজব্রত পালন করলেন। বহুপথ ঘুরে বহু দেশ দেখে ১৩৩৪ সালে তিনি দিল্লিতে সুলতান মুহম্মদ বিন তুঘলকের দরবারে হাজির হলেন। তিনি জানতেন সুলতানকে বহিরাগত কোনো পরিব্রাজক যত উপহার দেয়, তিনি তার বহু গুণিতক উপহার অতিথিকে দান করেন। সুলতান তাকে কেবলই প্রত্যুপহারই দিলেন না, তাকে দিল্লির কাজিও নিযুক্ত করলেন। এ পদে আট বছর বহাল রাখার পর ইবনে বতুতা সন্দেহের শিকার হন এবং সুলতান তাকে রাষ্ট্রদূত করে চীনে পাঠান, চীনের পথে জাহাজডুবি হয়, তিনি মালয় নগরীতে ফিরে আসেন এবং সেখানেও এক বছর কাজির দায়িত্ব পালন করেন। ১৩৪৫ সালে পুনরায় শ্রীলংকা হয়ে দক্ষিণ ভারতে পৌঁছেন। কালিকটে সেখানে তিনি জাহাজ থেকে নামেন। তার আরো প্রায় এক শতাব্দী পর সেখানে ভাস্কো-দা-গামা পা রাখেন। তিনি মালদ্বীপেই চারটি বিয়ে করেছিলেন। গিয়াসউদ্দিন মোহাম্মদ দামঘানির মাদুরাই সালতানাতে কিছুকাল অবস্থানের পর তিনি বাংলার দিকে যাত্রা করেন। বাংলায় তার অন্যতম লক্ষ্য ছিল সিলেটের বুজুর্গ হযরত শাহজালালের সঙ্গে সাক্ষাৎ। ইবনে বতুতার বিবরণ থেকে তুলে ধরছি—

তারপর আমার জাহাজ পাল তুলেছিল, গভীর ও উত্তাল সমুদ্রে ৪৩ দিন পার করার পর আমরা বাংলায় পৌঁছি। বাংলা একটি বড় অঞ্চল, প্রচুর ধান উত্পন্ন হয়। সব মিলিয়ে এমন একটি দেশও আমার চোখে পড়েনি। বাংলার আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকে। খোরাসানিরা বলে, এখানে আল্লাহর অনেক দান। আমি বাংলার রাস্তায় অত্যন্ত কম মূল্যে চাল বিক্রি হতে দেখেছি। অথচ সেখানকার মানুষ বলেছে দাম অত্যন্ত বেশি (ইবনে বতুতার বর্ণনা থেকেই বোঝা যায়, বাংলার মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ছিল কম, নতুবা চালের যে নিম্নদাম তাকে বিস্মিত করেছে, তাতে কিছুতেই চাল কিনতে মানুষের হিমশিম খেতে হতো না)। মরক্কোর এক ধার্মিক ব্যক্তি মোহাম্মদ-উল-মাসমুদি বাংলায় অনেক দিন বাস করেছেন, দিল্লিতে আমার সঙ্গে থাকা অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তিনি একজন স্ত্রী ও একজন ভৃত্য নিয়ে বাংলায় বসবাস করতেন এবং দিল্লির দরের চেয়ে অনেক কম দরে চাল কিনতেন। আমি নিজেই দেখেছি, বাংলায় একটি দুধেল গরু তিনটি রৌপ্য দিনারে বিক্রি হচ্ছে, অবশ্য সেখানে মহিষগুলো গরু বলে বিক্রি করা হতো। আমি সেখানে ১ দিরহামে আটটি বড় মোরগ বিক্রি হতে দেখেছি। একই দামে ১ দিরহামে বিক্রি হতো ১৫টি কবুতর। একটা মোটা মেষ কিনতে লাগত মাত্র কয়েক দিরহাম।

প্রথম যে শহরে ঢুকেছি, তার নাম সোদকাওয়ান (আসলে চাটগাঁও-চট্টগ্রাম)। সমুদ্রের সৈকতে এটি একটি বিশাল শহর। শহরের নিকটেই মেঘনা, সেখানে নদীর মোহনায় হিন্দুরা তীর্থ করে, পূজা-অর্চনা করে। নদীটি যমুনার (ইবনে বতুতা বলেছেন যুন) সঙ্গে মিশে সাগরে পড়েছে। গঙ্গা নদীতে অসংখ্য জাহাজ দেখেছি। এ জাহাজ দিয়ে তারা লক্ষ্মণাবতীর সঙ্গে যুদ্ধ বাধায়।

এখনকার সুলতান হচ্ছেন ফখরুদ্দীন, তিনি ফখরা নামে পরিচিত। তিনি আগন্তুকের বিশেষ করে ফকির ও সুফিদের পছন্দ করেন। বাংলায় রাজত্বের মূল মালিক সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবনের ছেলে সুলতান নাসিরউদ্দিন। নাসিরউদ্দিনের ছেলে ময়েজউদ্দিন দিল্লির সার্বভৌম শাসক হয়েছিলেন। এ নিয়ে নাসিরউদ্দিনের ছেলের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমেছিলেন, গঙ্গার তীরে উভয়ের লড়াই হয়, তাদের মোলাকাতের কাহিনী বিবৃত হয়েছে, ‘লিকা-উস-সাদিন’-এ। নাসিরউদ্দিন ছেলের জন্য দিল্লির সিংহাসন ছেড়ে দিয়ে বাংলায় চলে আসেন এবং আমৃত্যু এখানেই ছিলেন। তার ছেলে শামসউদ্দিন বাংলার সুলতান হলেন। তার মৃত্যু হলে তার ছেলে শিহাবউদ্দিন ক্ষমতাসীন হলেন, তার ভাই গিয়াসউদ্দিন তাকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। ইবনে বতুতা তার জ্ঞাত ঐতিহাসিক পরম্পরা রক্ষা করে সুলতান ফখরুদ্দীন মুবারক শাহের ক্ষমতায় আরোহণের একটি চিত্র তুলে ধরেন।

ইবনে বতুতার বাংলা সফরের ঘটনাটি ঘটে ফখরুদ্দীনের রাজত্ব কালেই। তার ভ্রমণবৃত্তান্তের সূত্র ধরে রমেশচন্দ্র মজুমদার লিখেছেন:

ফখরউদ্দীনের সঙ্গে লখনৌতির শাসক আলাউদ্দিন আলী শাহর যুদ্ধ লেগেই থাকত। অত্যন্ত শক্তিশালী নৌবলের অধিকারী ফখরউদ্দীন বর্ষায় ও শীতে আলাউদ্দিন আলী শাহের রাজ্য আক্রমণ করতেন আবার স্থলশক্তিতে সবল লখনৌতি সোনারগাঁর রাজত্ব আক্রমণ করত গ্রীষ্মকালে।

ফকিরদের ব্যাপারে ফখরার দুর্বলতার কথা রমেশচন্দ্রও লিখেছেন:

তিনি একবার শায়দা নামে একজন ফকিরকে তাহার অন্যতম রাজধানী সোদকাওয়ান অর্থাৎ চট্টগ্রাম শহরে তাহার প্রতিনিধি নিযুক্ত করিয়া জনৈক শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে গিয়েছিলেন। বিশ্বাসঘাতক শায়দা সেই সুযোগে বিদ্রোহ করে এবং ফখরুদ্দীনের একমাত্র পুত্রকে হত্যা করে। ফখরুদ্দীন তখন চাটগাঁওয়ের ফিরিয়া আসেন। শায়দা তখন সোনারগাঁওয়ে পালাইয়া যায়। এবং ঐ স্থান অধিকার করিয়া বসিয়া থাকে। কিন্তু সোনারগাঁওয়ের অধিবাসীরা তাহাকে বন্দি করিয়া সুলতানের বাহিনীর কাছে পাঠাইয়া দেয়। তখন শায়দা ও অন্য অনেক ফকীরের প্রাণদণ্ড হইল। ইহার পরে কিন্তু ফখরুদ্দীনের ফকীরদের প্রতি দুর্বলতা কমে নাই। তাহার আদেশের বলে ফকিররা মেঘনা নদী দিয়া বিনা ভাড়ায় যাতায়াত করিতে পারিত; নিঃসম্বল ফকিরদের খাদ্যও দেয়া হইত। সোনারগাঁও শহরে কোনো ফকির আসিলে সেও আধ দীনার (আট আনার মতো) পাইত।

ইবনে বতুতার বর্ণনা: সুলতান বিদ্রোহীর মস্তক দেহবিচ্ছিন্ন করে পাঠিয়ে দেয়ার নির্দেশ দিলেন। কাজেই শায়দা এবং তার কারণে আরো ক’জন ফকিরের মাথা দেহবিচ্ছিন্ন করা হলো। আমি যখন চট্টগ্রামে (সোদকাওয়ান) তখন সুলতানকে দেখিনি, এমনকি তার সঙ্গে সাক্ষাতের চেষ্টাও করিনি, কারণ তিনি ভারত সম্রাটের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন। আমি আতঙ্কিত ছিলাম যে, আমার সাক্ষাতের পরিণতি খারাপ হতে পারে। পর্বত ডিঙিয়ে আমার যাওয়ার উদ্দেশ্য ছিল একজন বুজুর্গের সঙ্গে সাক্ষাৎ। তিনি তাব্রিজের শেখ জালালউদ্দিন (সিলেটের হযরত শাহজালাল), এ শেখ ছিলেন অসাধারণ ব্যক্তিত্বের একজন মহান সাধু, তার অনেক কেরামতির কাহিনী ছিল। তিনি আমাকে বলেছেন, তার ওপর আল্লাহ অনেক সদয় ছিলেন বলেই বাগদাদে যখন খলিফা আল মুস্তাসিম বিল্লাহ আল আব্বাসিকে হত্যা করা হয়, তিনি সেখানে থেকেও প্রাণে বেঁচে যান।       

ফখরুদ্দীন মুবারক শাহর অন্যতম কৃতিত্ব বাংলাদেশে প্রাপ্ত সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সর্বাঙ্গ সুন্দর মুদ্রাগুলো তার আমলের এবং তারই নামাঙ্কিত। এ মুদ্রার কথা ইবনে বতুতাও উল্লেখ করেছেন।

ইবনে বতুতার দেখা সমৃদ্ধ বাংলা

ইবন বতুতা সমৃদ্ধ বাংলার যে দ্রব্যমূল্য উপস্থাপন করেছেন, তা প্রশ্ন জাগায় তিনি কি ঠিক বলেছেন?

আমরা যে সোনার বাংলার কাহিনী নিত্যই বলি, তার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হচ্ছে ইবনে বতুতার সফরনামা। সোনার বাংলার চিত্র যৌক্তিকীকরণ করতে আমরা ইবনে বতুতার প্রত্যক্ষ সফর এবং তার দ্রব্যমূল্য তুলে ধরি। মুয়ায্যম হোসেন খান তার রচনায় ইবনে বতুতা প্রদত্ত দ্রব্যমূল্যের বিবরণী টাকা-পয়সায় রূপান্তর করে পেশ করেছেন। বাংলা যে কতটা সোনার বাংলা ছিল, রূপান্তরিত এ বিবরণী তা বুঝতে সাহায্য করবে।


চাল: প্রতি মণ ১১ পয়সা

ধান: প্রতি মণ ৩ পয়সা

চিনি: প্রতি মণ ১ দশমিক ৪২ পয়সা

গোলাপজল: প্রতি মণ ২ দশমিক ৮৫ পয়সা

ঘি বা মাখন: প্রতি মণ ১ দশমিক ৪২ পয়সা

তিলের তেল: প্রতি মণ: ৭১ পয়সা

সূক্ষ্মতম বস্ত্র: প্রতি গজ ১৩ পয়সা

দুধেল গাই/মহিষ: একটি ৩ পয়সা

মুরগি: আটটি: ১২ পয়সা

পায়রা: ১৫টি: ১২ পয়সা

মোটাতাজা ভেড়া: একটি: ২৫ পয়সা

সুন্দরী যুবতী দাসী: ১ জন ১০ টাকা

সুদর্শন দাস: ১ জন ২০ টাকা।

ফখরুদ্দীন মুবারক শাহের আমলের যে বাংলার বিবরণ ইবনে বতুতা দিয়েছেন, তাতে দাস প্রথা প্রচরিত ছিল। ১ স্বর্ণ মুদ্রায় সুন্দরী উপপত্নী সংগ্রহ করা যেত। তিনি সুন্দরী যুবতী দাসী ক্রয় করেছিলেন। তার দ্বিগুণ দামে সুদর্শন দাস বালক কিনেছিলেন। একটি দ্রুতগামী তেজী ঘোড়ার টাকায় ১২ জন নারীকে কেনা সম্ভব ছিল।

ইবনে বতুতা যে মূল্যতালিকা পেশ করেছেন, তা কেমন করে সোনার বাংলার বিবরণ হবে? হতে পারে তা কেবল ধনী সম্প্রদায়ের জন্য। মূল্যই বলে দেয় বাংলার জনসংখ্যা, যারা প্রায় ৮০ ভাগ কৃষক ও মজুর সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠের জীবন ছিল বঞ্চিতের জীবন। তারা তাদের পণর ও সেবার মূল্য পেত না। এমনকি এত সস্তার জিনিস ক্রয় করার মতো আর্থিক সামর্থ্যও তাদের গড়ে ওঠেনি।

বাংলা কি দোজখপুর নাকি জান্নাতাবাদ?

বাংলার বিত্তবৈভব, বাণিজ্য, সোনারগাঁ থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, সুলভ দাস, সুন্দরী দাসী, পৃথিবীর সবচেয়ে কম মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী—এ তো কিছু দেখা এবং পাওয়ার পরও খোরাসানি ব্যবসায়ীদের মন্তব্য উদ্ধৃত করে ইবনে বতুতা বাংলাকে বলেছেন দোজখপুর! তার সফরনামাতেই দোজখপুর উদ্ধৃত হয়েছে।

ল্যান্ড অব প্লেন্টি— প্রাচুর্যের দেশ হওয়া সত্ত্বেও প্রতিকূল আবহাওয়ায় ঝড়-বৃষ্টি, রোদ, সাপ-বিচ্ছু, কলেরা, ম্যালেরিয়া ইত্যাদি প্রাচুর্যের মহিমাকে অনেক ক্ষুণ্ন করেছে। দিল্লির সম্রাট যখন এমনকি বড় পদেও কাউকে বাংলায় পাঠাতে চাইতেন, অনেকের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া হতো তাকে দোজখে পাঠানো হচ্ছে।

আবার সম্রাট হুমায়ূন ইবনে বতুতার বাংলা সফরের প্রায় ২০০ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বী শেরশাহকে হারিয়ে বাংলার গৌড় দখলে নিয়ে নাম দিলেন জান্নাতাবাদ। গুলবদন বেগম হুমায়ুনের বাংলায় অবস্থান এবং বাংলামুগ্ধ হয়ে থাকার বিবরণ দিয়েছেন।

বাংলার বাস্তব অবস্থান জান্নাতাবাদ নয় দোজখপুরও নয়। মাঝামাঝি একটি স্থানে ছিল বিবেচনা করাই যুক্তিসম্মত। ইবনে বতুতা (১৩০৪-১৩৭৮) বাংলায় ছিলেন বড়জোর দুই মাস—১৩৪৬ সালের জুলাই-আগস্ট। তার সফরনামা ‘তুহফাও-উন নুজ্জার ফি গারাইব ইল-এমসার ওয়া আজাই আফসার’ ১৩৫৫ সালে লেখা হয়; ইংরেজি অনুবাদ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯১৭ সালে। কোনো সন্দেহ নেই বাংলার ইতিহাস রচনায় ইবনে বতুতাকে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

 

আন্দালিব রাশদী: কথাসাহিত্যিক