একটি প্রচলিত কিংবদন্তি

উত্তর-পূর্ব বঙ্গোপসাগরের তীরে খরস্রোতা কর্ণফুলী নদীর উত্তর ভাগে আদিম জঙ্গলে ঢাকা একটি পাহাড়ি অঞ্চল। এমন গভীর জঙ্গল ভেদ করে সূর্যের আলো প্রবেশ করতেও হিমশিম খায়। হিংস্র বন্য জন্তুর সঙ্গে জ্বীন ভূতের উপদ্রপের কারণে মানব বসতি গড়ে উঠতে পারেনি সেখানে। একদিন আরব দেশ থেকে এক সুফি সাধক এসে হাজির হলেন সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলটিতে। তিনি জ্বীন সমাজের কাছ থেকে একটি চাটি বা চেরাগ রাখার জায়গা চেয়ে নিলেন। চাটি জ্বালানোর পর জঙ্গলের আলোকিত অংশ থেকে জ্বীন-ভূতের দল সরে গেল। এভাবে একের পর এক চাটি জ্বালিয়ে দুর্গম পাহাড়-জঙ্গল বেষ্টিত অঞ্চলটিতে চতুর্দশ শতকে মানব বসতির সূচনা করেছিলেন পীর বদর নামের এক সুফি সাধক। সেই থেকে এলাকাটি চাটগাঁ নামে পরিচিত হয়।

শত শত বছর ধরে প্রচলিত এ কিংবদন্তির কোনো ভিত্তি পাওয়া না গেলেও ঐতিহাসিকরা চতুর্দশ শতকে বদর পীরের চট্টগ্রাম আগমন এবং ফখরুদ্দীন মুবারক শাহের চট্টগ্রাম অভিযানের মধ্যে যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছিলেন। যোগাযোগটি কীভাবে ঘটেছিল সেটা জানা যায় না, তবে ফখরুদ্দীন মুবারক শাহের সময়কালে বদর পীর চট্টগ্রাম এসেছিলেন তার সত্যতা পাওয়া যায়।

ফখরুদ্দীনের বাংলা বিজয়

ত্রয়োদশ শতকে বখতিয়ার খিলজি বাংলার বুকে ঘোড়া দাপিয়ে মুসলমান রাজ্য প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরি করলেও সে রাজ্যটি নিজের পায়ে দাঁড়ানোর শক্তি অর্জন করতে পারেনি ১০০ বছর পরও। একের পর এক শাসক বদল হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেসব শাসক দিল্লির অনুগত স্থানীয় প্রাদেশিক রাজত্বের বেশি কিছু অর্জন করতে পারেননি।

এদের মধ্যে যিনি প্রথম ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন, তিনি ফখরুদ্দীন মুবারক শাহ। সুযোগ, ভাগ্য এবং যোগ্যতা এ তিনের যোগফল সুলতানি যুগে বাংলার প্রথম স্বাধীন শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিল। দিল্লির অধীনতামুক্ত বাংলার সেই স্বাধীন যুগ পরবর্তী দুই শতাব্দী অব্যাহত ছিল।

তুর্কি বংশোদ্ভূত ফখরুদ্দীন মুবারক শাহের উত্থানটা হঠাৎ করেই ঘটেছিল। দিল্লির সিংহাসনে যখন তুগলকী বংশের শাসক মোহাম্মদ শাহ, বাংলায় তখন তার অধীনস্থ গভর্নর বাহরাম খান। ফখরুদ্দীন মোবারক শাহ ছিলেন বাহরাম খানের সিলাহদার বা বর্মরক্ষক বা অস্ত্রাগার প্রধান। বলা চলে তিনিই বাহরাম খানের ডানহাত। ১৩৩৭ খ্রিস্টাব্দে আকস্মিকভাবে বাহরাম খানের মৃত্যু হলে গভর্নরের পদটা খালি হয়ে পড়ে। এদেশের ইতিহাসে সিংহাসন শূন্য হলে প্রথমে সেটা কাছের মানুষরাই কব্জা করার সুযোগ গ্রহণ করে। ফখরুদ্দীনও এর বাইরে ছিলেন না। দূরবর্তী ক্ষমতার কেন্দ্র দিল্লির নির্দেশ আসার আগেই ফখরুদ্দীন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন সোনারগাঁয় কেল্লা দখল করার। কিন্তু তিনি শুধু গভর্নর হিসেবে সন্তুষ্ট ছিলেন না। তিনি নিজেকে বাংলার স্বাধীন সুলতান হিসেবে ঘোষণা করেন ১৩৩৮ খ্রিস্টাব্দে।

ফখরুদ্দীন মুবারক শাহের এ দুর্বিনীত উত্থান মেনে নেয়া সম্ভব ছিল না দিল্লির পক্ষে। ফখরুদ্দীনের বিরুদ্ধে অভিযান পাঠানো হলো মোহাম্মদ শাহের নির্দেশে। লখনৌতির শাসনকর্তা কদর খান এবং সাতগাঁওয়ের শাসনকর্তা আইজ্জুদ্দিন ইয়াহিয়া তাদের সম্মিলিত বাহিনী নিয়ে ফখরুদ্দীনের বিরুদ্ধে অভিযান চালান। সেই বাহিনীর যৌথ শক্তির সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকতে পারলেন না তিনি। পরাজয় ঠেকাতে না পেরে ফখরুদ্দীন মেঘনা নদী পার হয়ে পূর্বাঞ্চলে চলে যান। তবে পালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটি ছিল সাময়িক। আপাতত পরাজয় মেনে নিয়ে নাছোড়বান্দা ফখরুদ্দীন অপেক্ষা করছিলেন উপযুক্ত সময়ের জন্য।

কদর খানের বাহিনী বাংলার যুদ্ধে জয় লাভ করার পর মিত্র বাহিনীর একাংশ ফিরে যায় সাতগাঁও এবং লখনৌতিতে। এরপর তিনি তার বাহিনীর বেশির ভাগ সৈন্যকে রাজস্ব আদায়ের কাজে মফস্বল এলাকায় পাঠিয়ে দেন। সোনারগাঁ অধিকার করার পর বিপুল ধনসম্পদ এবং বহুসংখ্যক হাতি হস্তগত হয় কদর খানের। দিল্লির সুলতানের জন্য ধনসম্পদ আহরণ ও সঞ্চয়ের অজুহাতে লোভী ও অর্থলিপ্সু কদর খান রাজধানী সোনারগাঁয় প্রাপ্ত সব ধনসম্পদ নিজেই আত্মসাৎ করেন। এমনকি তিনি যুদ্ধে প্রাপ্ত সম্পদের ন্যায্য পাওনা থেকেও বঞ্চিত করেন সৈন্যদের। ফলে কদর খান সোনারগাঁয় নিজের বাহিনীর কাছেই জনপ্রিয়তা এবং আস্থা দুটোই হারান। তিনি একদিকে সৈন্যদের বঞ্চিত করে ক্ষেপিয়ে রেখেছিলেন, অন্যদিকে লখনৌতির সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থাও তিনি রক্ষা করতে পারেননি। সব মিলিয়ে বিজয়ী হওয়ার পরেও সোনারগাঁয় একটা চরম অব্যবস্থাপনার পরিস্থিতি তৈরি হয়।

এদিকে বাংলার ভৌগোলিক অবস্থা এবং আবহাওয়া সম্পর্কে অভিজ্ঞ ফখরুদ্দীন মোক্ষম সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। এ অঞ্চলে তখন বর্ষা মৌসুম আগত। পশ্চিমা সৈন্যদের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক রণকৌশল হিসেবে বর্ষার কোনো তুলনা হয় না। ফখরুদ্দীনের ছিল সুদক্ষ একটি নৌবাহিনী। বর্ষা শুরু হতেই তিনি তার নৌবহর নিয়ে অগ্রসর হন এবং জলপথে কদর খানকে সোনারগাঁয় অবরুদ্ধ করে ফেলেন। বর্ষার স্যাঁতসেঁতে কর্দমাক্ত ভূমি ও ভ্যাপসা গরমে অনভ্যস্ত কদর খানের বহুসংখ্যক সৈন্য ও অশ্বরোহী বাহিনীর ঘোড়া অসুস্থ হয়ে মারা যায়।

ফখরুদ্দীনের নৌবাহিনী কর্তৃক রাজধানী সোনারগাঁ অবরোধ কার্যতই কদর খানের পতন অনিবার্য করে তুলেছিল। তবু তিনি কোনো ঝুঁকি নিতে চাননি। তাই চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনের জন্য তিনি একটা কৌশলের আশ্রয় নেন। কদর খানের অসন্তুষ্ট সৈন্যদের কাছে ফখরুদ্দীন প্রস্তাব পাঠালেন, যদি তারা কদর খানকে হত্যা করে তার সঙ্গে এসে যোগ দেয়, তাহলে তিনি রাজধানীতে সঞ্চিত সব ধনসম্পদ তাদের মধ্যে বণ্টন করে দেবেন। ধনসম্পদের লোভে কদর খানের সৈন্যরা বিদ্রোহ করে কদর খানকে হত্যা করে এবং ফখরুদ্দীনের সঙ্গে যোগ দেয়। ফখরুদ্দীন সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীতে প্রবেশ করেন এবং সঞ্চিত ধনসম্পদ আয়ত্তে এনে পূর্ব প্রতিশ্রুতি মতো সৈন্যদের মধ্যে বণ্টন করে দেন। এভাবেই বাংলায় ফখরুদ্দীন মুবারক শাহের স্বাধীন শাসনপর্ব শুরু হয়।

চাটগাঁ অভিযান ও বিজয়


বাংলা দখল করেই ফখরুদ্দীন বসে থাকেননি। নজর দিয়েছিলেন প্রতিবেশী রাজ্যের দিকেও। পশ্চিমের লখনৌতি এবং সাতগাঁও আক্রমণ করে ব্যর্থ হওয়ার পরবর্তী লক্ষ্য পূর্বদিকের রাজ্য ত্রিপুরা। ত্রিপুরার প্রতাপ মাণিক্যকে পরাজিত করে নোয়াখালী এবং কুমিল্লা অঞ্চল অধিকার করেন। তারপর চাটগাঁ অভিযান। চাটগাঁ তখন ত্রিপুরার সামন্ত শাসকের অধীনস্থ একটি প্রদেশ।

অনুমান করা হয় আরব দেশ থেকে আগত সুফি সাধকরা চাটগাঁয় তাদের ধর্ম প্রচারের কাজে বাধাপ্রাপ্ত হয়েছিলেন স্থানীয় শাসক দ্বারা। সেই সুফি সাধকদের অন্যতম ছিলেন বদর পীর এবং কদল শাহ গাজী। তারা কোনোভাবে ফখরুদ্দীনের কাছে খবর পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছিলেন অথবা ফখরুদ্দীনের কোনো প্রতিনিধি সুফিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। নিশ্চিত বলা যায় না। তবে ঐতিহাসিক সূত্রমতে, পীর বদর এবং কদল শাহ গাজী তার সঙ্গী সাথী অন্যান্য দরবেশ ও ফকিরদের নিয়ে ফখরুদ্দীনের অভিযানে সক্রিয়ভাবে সহায়তা করেছিলেন। ফখরুদ্দীনের বাহিনী হয়তো নৌপথেও চাটগাঁ আক্রমণে ভূমিকা রেখেছিল। ফখরুদ্দীন চাটগাঁও দুর্গের বিপরীতে কর্ণফুলীর অন্য পারে একটি সুউচ্চ ও দুর্ভেদ্য দুর্গ দখল করেন। দুর্গটি দেয়াঙ অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ার সম্ভাবনা। যেটি কয়েক শতাব্দী আগে হরিকেল রাজ্যের রাজধানী কিংবা প্রধান নগরী ছিল। পরবর্তীকালে সেটি আরাকানের অধীনে চলে যায় এবং আরাকানের হাত থেকে ত্রিপুরার দখলে আসে। চাটগাঁ জয়ের পর ওই অঞ্চল একটি প্রদেশ হিসেবে বাংলার অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

চাটগাঁ বিজয়ের এ ঘটনা ঐতিহাসিকভাবে সত্য হলেও ফখরুদ্দীন মুবারক শাহের শাসনকালের বিস্তারিত কোনো বিবরণ পাওয়া যায় না। পরোক্ষ সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, তিনি কোন সময়কালে চাটগাঁ বিজয় করেন। প্রথম সূত্রটি পাওয়া যায় ইবনে বতুতার কাছে। ১৩৪৬ খ্রিস্টাব্দে মরক্কোর বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা যখন বঙ্গদেশে আসেন, তখন তিনি প্রথমে চাটগাঁয় পা রেখেছিলেন। তিনি চাটগাঁকে ‘সোদকাওয়ান’ হিসেবে অভিহিত করে বলেছিলেন, সেখানকার শাসক ফখরুদ্দীন মুবারক শাহ। এতে মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া যায় চাটগাঁ বিজয়ের ঘটনাটি ১৩৩৮ থেকে ১৩৪৬ পর্যন্ত সময়কালের মধ্যে ঘটেছিল।

দ্বিতীয় সূত্রটি পাওয়া যায় সপ্তদশ শতকের কবি মোহাম্মদ খানের কাছ থেকে। ড. আবদুল করিম সেই প্রসঙ্গে লিখেছিলেন—‘‘সপ্তদশ শতকের কবি মোহাম্মদ খান, তাহার বংশ পরিচয় দেওয়ার সময় অলক্ষ্যে মুসলমানদের চট্টগ্রাম বিজয়ের কাহিনী এবং বিশেষ করিয়া চট্টগ্রামে ইসলাম প্রচারের কাহিনী বর্ণনা করিয়াছেন। কবি বলিয়াছেন যে, কদল খান গাজী পীর ‘অসংখ্য রিপুদল’ পরাজিত করিয়া চট্টগ্রামে এক আল্লার মহিমা প্রকাশ করেন, অর্থাৎ ইসলাম প্রচার করেন। কদল খান গাজী পীরের সঙ্গে তাহার একাদশ মিত্র ছিল। জনশ্রুতি মতে চট্টগ্রাম বার আউলিয়ার দেশ, অর্থাৎ বারজন আউলিয়া সর্বপ্রথম চট্টগ্রামে আসিয়া ইসলাম ধর্ম প্রচার করেন। কবি মোহাম্মদ খানের সাক্ষ্য এ জনশ্রুতির ঐতিহাসিকতা স্বীকার করিতে সাহায্য করে, যদিও কবি তার পুস্তকে বারজন আউলিয়ার নাম উল্লেখ করেন নাই। শুধু মাতৃকূল পরিচয় দিতে গিয়া কবি তাহার পূর্বপুরুষ শয়খ শরীফ-উদ-দীনের নাম উল্লেখ করিয়াছেন, যিনি কদল খান গাজীর ‘প্রেমের সখা’ ছিলেন, অর্থাৎ বার আউলিয়ার অন্যতম ছিলেন। পরে পিতৃকূল পরিচয় দেওয়ার সময় কবি বার আউলিয়ার আর একজন পীর বদর আলমের নাম বলিয়াছেন। কবি বলিয়াছেন, তাহার পূর্বপুরুষ মাহি আসোয়ার তার সঙ্গী হাজী খলিল পীরসহ আরব দেশ হইতে চট্টগ্রামে আসিয়া পৌঁছিলে কদলখান গাজী বদর আলম এবং অন্যান্য আউলিয়ার সাথে তাহাদের সাক্ষাৎ হয়।”

তৃতীয় সূত্রটি পাওয়া যায় সপ্তদশ শতকের ঐতিহাসিক শিহাবুদ্দিন তালিশের কাছ থেকে। শিহাবুদ্দিন তালিশ বলেছেন, ‘সুদূর অতীতে ফখর-উদ-দীন নামে বাংলার একজন সুলতান চট্টগ্রাম সম্পূর্ণরূপে জয় করেন এবং শ্রীপুরের উল্টাদিকের নদীর অন্য তীরে অবস্থিত চাঁদপুর হইতে চট্টগ্রাম পর্যন্ত একটি রাজপথ তৈয়ার করেন। চট্টগ্রামে যেই সকল মসজিদ ও সমাধি ভবন রহিয়াছে, সেইগুলি ফখর-উদ-দীনের সময়ে নির্মিত, ধ্বংসাবশেষ হইতে ইহার প্রমাণ হয়।’

ঐতিহাসিক বিতর্ক ও মীমাংসা

ফখরুদ্দীন মুবারক শাহের চট্টগ্রাম বিজয় নিয়ে বাংলার ঐতিহাসিকদের মধ্যে দুটো মত প্রচলিত। একটি মতের পক্ষে ঐতিহাসিক সুখময় মুখোপাধ্যায় জানাচ্ছেন, ইবনে বতুতার ‘সোদকাওয়ান’ হলো পশ্চিমবঙ্গের সাতগাঁও। কারণ তিনি যে গঙ্গা যমুনার যুক্ত ধারার কথা বলেছেন, তা ভাগীরথী নদী এবং যমুনা নামের ছোট একটা নদী ত্রিবেণীতে মিলিত হয়েছে। ত্রিবেণী সাতগাঁওয়ের কাছে অবস্থিত। অতএব ফখরুদ্দীন মোবারক শাহ আসলে সাতগাঁও বিজয় করেছিলেন, চট্টগ্রাম নয়।

অন্যদিকে সুখময় মুখোপাধ্যায়ের এ দাবিকে নাকচ করে দিয়ে ঐতিহাসিক আবদুল করিমের মতে, ইবনে বতুতার উল্লিখিত ‘সোদকাওয়ান’ বলতে চট্টগ্রামকে বোঝানো হয়েছে। ইবনে বতুতা লিখেছেন ‘বাংলাদেশের যে শহরে আমরা প্রবেশ করি, তাহার নাম সোদকাওয়ান। ইহা সমুদ্রের উপকূলে অবস্থিত একটি শহর।’ ইবনে বতুতা আরো বলেছেন, সে শহরটির কাছে গঙ্গা ও যমুনা মিলিত ধারা সমুদ্রে পড়েছে। চট্টগ্রামের কাছেই বর্তমান মেঘনা মোহনায় গঙ্গা যমুনার পথ যুক্ত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে। সাতগাঁওয়ের ভৌগোলিক অবস্থানের সঙ্গে তার মিল নেই। সাতগাঁও শহরটি সমুদ্র থেকে ৯০ মাইল দূরে অবস্থিত। এটাকে সমুদ্র তীরবর্তী শহর বলার কোনো উপায় নেই। তাছাড়া সপ্তদশ শতকে শিহাবুদ্দিন তালিশ নিজে বেশ কিছুকাল চট্টগ্রামে অবস্থান করেছিলেন এবং তিনি ফখরুদ্দীনের শাসনামলের নানা স্মৃতিচিহ্নের ধ্বংসাবশেষ দেখেছিলেন বলে সুখময় মুখোপাধ্যায়ও স্বীকার করেছেন।

আরো একটি বিষয় বিশ্লেষণ করে ফখরুদ্দীনের চট্টগ্রাম বিজয়ের ঘটনা নিশ্চিত করা যায়। শাসনক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ফখরুদ্দীন লখনৌতি অধিকার করার জন্য তার সেনাপতি মুখলিসকে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু এরই মধ্যে কদর খানের সেনাপতি আলী মুবারক লখনৌতির ক্ষমতা দখল করেন। তার সঙ্গে যুদ্ধ করে মুখলিস পরাজিত ও নিহত হয়। ফখরুদ্দীন কখনই লখনৌতি বা সাতগাঁও বিজয় করতে পারেননি।

সুতরাং এতে কোনো সন্দেহ থাকে না যে ফখরুদ্দীন মোবারক শাহ চাটগাঁ কিংবা চট্টগ্রামেই অভিযান চালিয়েছিলেন এবং বাংলার অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন।

 

তথ্যসূত্র:

১.   বাংলার ইতিহাস-সুলতানি আমল: ড. আবদুল করিম

২.   বাংলার ইতিহাসের ২০০ বছর: স্বাধীন সুলতানদের আমল (১৩৩৮-১৫৩৮) : সুখময় মুখোপাধ্যায়

৩. The History of Bengal: From the First Mohammedan Invasion Until the Virtual Conquest of that Country by the English, A.D. 1757 : Charles Stewart

৪.   ফখরুদ্দীন মুবারক শাহ (বাংলাপিডিয়া নিবন্ধ)-মোয়াজ্জেম হোসেন খান

৫.   A History of Chittagong, Volume 1. : Suniti Bhushan Qanungo

 

হারুন রশীদ: প্রাচীন সভ্যতা ও ইতিহাস অনুসন্ধানী লেখক