জলদুর্গ নির্মাণ পরিকল্পনা ছিল খুবই সূক্ষ্ম এবং নিরাপত্তা কৌশলের দিক থেকে উঁচু মানের। এগুলো এমনভাবে সাজানো হয় যে জলদস্যুরা নৌকাযোগে যখন মেঘনা নদী অতিক্রম করে ধলেশ্বরী নদীর মোহনায় এসে পৌঁছবে, সে সময় তারা প্রাচীন বিক্রমপুর অতিক্রম করবে। বিক্রমপুরের ইদ্রাকপুর থেকে ইছামতী নদী অতিক্রমের প্রথম ধাপেই থাকবে ইদ্রাকপুর দুর্গ। সেই দুর্গ থেকে কামানের গোলা ছোড়া হবে জলদস্যুদের প্রতিহত করার জন্য। ইদ্রাকপুর দুর্গসংলগ্ন এলাকা যদি জলদস্যুরা অতিক্রম করতে পারে, তখন তারা প্রবেশ করবে শীতলক্ষ্যা নদীতে। এ অবস্থায় শীতলক্ষ্যা নদীসংলগ্ন সোনাকান্দা দুর্গ থেকে কামানের গোলা ছোড়া হবে। এ ধাপও যদি জলদস্যুরা পেরিয়ে যেতে পারে তাহলে তারা বুড়িগঙ্গা নদীতে প্রবেশের প্রাক্কালে খিজিরপুর দুর্গ থেকে নিক্ষেপিত কামানের গোলার মুখোমুখি হবে। অনেক ইতিহাসবিদ এটিকে শেষ প্রতিরোধ ব্যবস্থা বলে মত দিয়েছেন।
মীর জুমলা ফতুল্লার পুরনো দাপায় আরেকটি দুর্গ নির্মাণ করেন। দাপা থেকে অদূরে ছিল তার নির্মিত আরেকটি দুর্গ। এ দুর্গ দুটিতেও পর্যায়ক্রমিক মোকাবেলা করে জলদস্যুদের সামনের দিকে অগ্রসর হতে হতো। এখানে শত্রু পক্ষকে ঘায়েল করার কতগুলো ধাপ রাখা হয়েছে। একটা ধাপ পার হলে আরেক ধাপ। শত্রুপক্ষের জন্য কোনো ধাপই নিরাপদ নয়। প্রথম ধাপ থেকে কেউ কেউ বেঁচে ফিরলেও দ্বিতীয় ধাপে সে ধরাশয়ী হবেই। তাও যদি না হয় তবে শেষ প্রতিরোধ ব্যবস্থা রাখা ছিল।
ট্রায়াঙ্গল ওয়াটার ফোর্ট
অনেকে ঢাকার আশপাশে সব জলদুর্গের কথা স্বীকার করেন না। তারা তিনটা জলদুর্গকেই প্রাধান্য দেন। কিন্তু ব্রিটিশ আমলে আঁকা রেনেলের ম্যাপ বলছে অন্য কথা।
রেনেলের ম্যাপ অনুযায়ী প্রাপ্ত দুর্গের একটা সরলরৈখিক পথ তৈরি হয়। যেটা ইদ্রাকপুর দুর্গ থেকে শুরু করে ধাপে ধাপে বেগ মুরাদের দুর্গ হয়ে ঢাকা পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রতিটি দুর্গে কামানের ব্যবস্থা ছিল। এতগুলো প্রতিরক্ষা প্রাচীরের ধাপ পেরিয়ে ঢাকা পৌঁছানো একেবারেই অসম্ভব ব্যাপার। মোগলদের এ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সত্যিই চমকপ্রদ ও সুদৃঢ় নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
রেনেলের ম্যাপ অনুযায়ী প্রাপ্ত দুর্গগুলোর নাম
১. ইদ্রাকপুর দুর্গ, ইদ্রাকপুর, মুন্সিগঞ্জ সদর (প্রাচীন বিক্রমপুর)
২. সোনাকান্দা দুর্গ (সুবর্ণকান্দি দুর্গ), সোনাকান্দা (প্রাচীন সুবর্ণকান্দি), বন্দর, নারায়ণগঞ্জ
৩. হাজীগঞ্জ দুর্গ, হাজীগঞ্জ (প্রাচীন খিজিরপুর), নারায়ণগঞ্জ
৪. দাপা দুর্গ, দাপা, ফতুল্লা, নারায়ণগঞ্জ
৫. ফতুল্লা দুর্গ (অনেকের মতে, এর নাম নেই), ফতুল্লা, নারায়ণগঞ্জ
৬. বেগ মুরাদের দুর্গ, পাগলা, নারায়ণগঞ্জ
৭. অষ্টভুজাকার মোগলাই চর

সোনাকান্দা দুর্গের বিভিন্ন অংশ। বাঁ থেকে, কামান স্থাপনার বৃত্তীয় মঞ্চ, দুর্গের অভ্যন্তরভাগ, বুরুজ

হাজীগঞ্জ দুর্গের বিভিন্ন অংশ। বাঁ থেকে, কামান স্থাপনার মঞ্চ বুরুজ, অভ্যন্তরীণ পর্যবেক্ষণ বুরুজ, দুর্গ স্থাপনার প্রাচীর

ইদ্রাকপুর দুর্গের বিভিন্ন অংশ। বাঁ থেকে, কামান স্থাপনার মঞ্চ, মঞ্চে প্রবিষ্ট তোরণদ্বার, দুর্গের অভ্যন্তরীণ অংশ ছবি: লেখক
সতেরো শতকের শেষদিকে সুবা বাংলার রাজধানী ঢাকায় প্রাসাদ দুর্গ হিসেবে লালবাগে আরো একটি দুর্গ নির্মাণের কাজ শুরু হলেও সে দুর্গের কাজ বন্ধ হয়ে যায়। অচিরেই পরিত্যক্ত ভিটায় রূপান্তরিত হয় এ দুর্গ। এ দুর্গ সম্পূর্ণরূপে তৈরি হলে মোগল ঢাকার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সুদৃঢ় কাঠামো আরো শক্ত ভিত্তি হতো।
খিজিরপুর দুর্গ যে অনেক প্রাচীন তার প্রাচীনত্বের প্রমাণস্বরূপ একটি সিএস ম্যাপ পাওয়া গেছে। ব্রিটিশ আমলের এ সিএস ম্যাপে বর্তমান হাজীগঞ্জ দুর্গের নকশার চারপাশে আরো কিছু প্রতিরক্ষা প্রাচীর ও নকশার দেখা মেলে। বলা চলে, বর্তমানে যে জলদুর্গের প্ল্যান বা নকশা দেখা যায়, তা ওই দুর্গের বৃহৎ নকশার তুলনায় নিতান্তই ছাড়। ব্রিটিশ আমলে ঐতিহাসিক নারায়ণগঞ্জ নগরীতে একবার ভূমি জরিপ হয়েছিল। সেই জরিপ অনুযায়ী, হাজীগঞ্জের মৌজায় দুর্গের স্থলে একটি বৃহৎ দুর্গের সন্ধান মেলে। সমগ্র স্থাপনাটি প্রায় ২৫ একর ভূমির ওপর ছিল বলে জানা যায়।

হাজীগঞ্জ দুর্গের প্রতিরক্ষা প্রাচীর ও সম্মুখভাগ
জলদুর্গের গঠন ও প্ল্যান
এক একটি জলদুর্গের আকার একেক রকম। যে তিনটি দুর্গ স্থাপনা টিকে রয়েছে তাদের তিনটার আকারও ভিন্ন ভিন্ন। জ্যামিতিক কনফিগারেশন অনুযায়ী একটি আরেকটির চেয়ে ছোট বা বড়। এ থেকে একটা বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা নেয়া যায় যে প্রতিটা দুর্গ বিভিন্ন আকারের। কোনোটির সঙ্গে কোনোটির মিল নেই।
সোনাকান্দা জলদুর্গের আকার আয়তাকার। দুর্গটি মোগল আমলের অন্য জলদুর্গ থেকে আকারে বড়। জলদুর্গের দৈর্ঘ্য ৩২৫ ও প্রস্থ ২২৮ ফুট। দুর্গের পশ্চিমদিকে বর্ধিত বৃত্তীয় বেদিসহ দৈর্ঘ্য ৬৪ ফুট প্রায়। জলদুর্গের অভ্যন্তরভাগ সম্পূর্ণ উন্মুক্ত।
হাজীগঞ্জ জলদুর্গটি মোগল আমলের অন্য সব দুর্গের চেয়ে আকারে বড়। এ জলদুর্গ অসমবাহুবিশিষ্ট। জ্যামিতিক আকার অনুযায়ী ও স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যের আলোকে জলদুর্গটি ষড়ভুজাকার। সময়ের পরিক্রমায় একসময় জলদুর্গটি ভেঙে গিয়েছিল। তখন একে এক কোনা ভাঙা অবস্থায় পঞ্চভুজাকার মনে হতো। পরবর্তী সময়ে এ পঞ্চভুজাকার দুর্গকে রেনোভেশন করে ষড়ভুজাকার দুর্গে রূপান্তর করে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ। কিন্তু মূল ভূমির নকশা অনুযায়ী, জলদুর্গটি ষড়ভুজাকার। প্রাচীন নথি ও ঐতিহাসিক বইয়ে এমন তথ্যই মেলে। প্রবেশ তোরণসহ এ জলদুর্গের উত্তর বাহুর পরিমাপ ৪৪ দশমিক ০৪ মিটার। অর্থাৎ প্রতি বাহুর পরিমাপ অনুযায়ী, ১৯ দশমিক ৪৩ মিটার, ৫ দশমিক ১৮ মিটার ও ১৯ দশমিক ৪৩ মিটারের যোগফল। তাছাড়া দুর্গের অন্য বাহুগুলো প্রায় ৩ দশমিক ৬০ মিটার ও ৩ দশমিক ৬১ মিটার পরিমাপবিশিষ্ট। জলদুর্গের উচ্চতা প্রায় ১ দশমিক ৮৩ মিটার। জলদুর্গের অভ্যন্তরভাগ সম্পূর্ণ উন্মুক্ত। সোনাকান্দা জলদুর্গের মতো এ দুর্গও প্রাসাদ দুর্গ নয়।
ইদ্রাকপুর কেল্লাটি চতুর্ভুজাকার। মোগল আমলের অপরাপর জলদুর্গের থেকে দুর্গটি আকারে ছোট। এই কেল্লার আয়তন প্রায় ৮২ মি.×৭২ মি.।

যথাক্রমে সোনাকান্দা, হাজীগঞ্জ ও ইদ্রাকপুর দুর্গের প্রধান তোরণদ্বারের নকশা

বিভিন্ন জলদুর্গের আয়তাকার কাঠামোর প্রবিষ্ট প্যানেলে সজ্জিত অলংকরণশৈলীর নকশানকশা অঙ্কন: লেখক
জলদুর্গের স্থাপত্যবৈশিষ্ট্য
তিনটি জলদুর্গ নিয়ে গবেষণা ও বিস্তর আলোচনা সাপেক্ষে যে স্থাপত্যবৈশিষ্ট্যগুলো পাওয়া যায় তা হলো:
- প্রধান তোরণদ্বার (arcade gate)
- প্রতিরক্ষা প্রাচীর (fortification wall)
- কেন্দ্রীয় অঙ্গন (central courtyard)
- কোণের বুরুজ (corner bastions)
- কামান স্থাপনের বেদি (the altar of the cannon)
- কামান স্থাপনের বেদির প্লাজা (the altar plaza for the cannon)
প্রধান তোরণদ্বার
প্রতিটা জলদুর্গে প্রধান তোরণদ্বার রয়েছে। এ তোরণদ্বারের উচ্চতা প্রতিরক্ষা প্রাচীরের উচ্চতার চেয়ে বেশি। প্রতিটা তোরণদ্বার উত্তরদিকে অবস্থিত। এ তোরণদ্বারের দুই পাশে ও বিপরীত দিকে রয়েছে দুর্গের প্রতিরক্ষা প্রাচীর।
এ তোরণদ্বারের ভেতরের ও বাইরের দিকের স্থাপত্যশৈলী ও অলংকরণশৈলী দেখে মোগল আমলের স্থাপনা বলে খুব সহজেই চিহ্নিত করা যায়। প্রতিটা দুর্গের তোরণদ্বারে যেসব স্থাপত্যবৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়—প্রবেশ তোরণদ্বার খিলানবিশিষ্ট; যা অর্ধগম্বুজ দ্বারা সৃষ্ট। প্রতিটা তোরণদ্বার আয়তাকার কাঠামোর মধ্যে অবস্থিত। আয়তাকার কাঠামোর বাইরের প্রবিষ্ট ও ভেতরের প্রবিষ্টতে ছোট ও মাঝারি আকৃতির প্যানেল রয়েছে। প্রতি প্যানেল আবার আলাদা অলংকরণসমৃদ্ধ। প্যানেল ছাড়াও প্রতি দুর্গে ছোট ছোট খোপ দেখা যায়। প্রতিটা খোপ আবার খাঁজবিশিষ্ট নকশাসমৃদ্ধ।
তোরণশীর্ষে যে প্যারাপেট থাকে তাতে ছোট ছোট মারলন শোভিত। প্রতিটা মারলন ফোকরবিশিষ্ট। এ ফোকরগুলো কামানের গোলা নিক্ষেপের জন্য ব্যবহার করা হতো। আবার কোথাও কোথাও তোরণশীর্ষে পদ্ম পাপড়ির নকশার অস্তিত্ব দেখা যায়। কোথাও কোথাও প্রবেশ তোরণদ্বারের বাইরে ও ভেতরে ক্রম উচ্চতাসম্পন্ন সিঁড়ি দেখা যায়। যেমন খিজিরপুর দুর্গ। যেখানে ক্রম উচ্চতাসম্পন্ন সিঁড়ি দেখা যায়, সেখানে সিঁড়ির দুই পাশে ঢালু দেয়াল দেখা যায়।
তোরণদ্বার জলদুর্গে প্রবেশের একমাত্র পথ। যাতে লৌহ দরওয়াজা বিদ্যমান। তোরণদ্বারের শীর্ষবিন্দুতে অবস্থিত মারলনের ফোকরগুলো কামানের গোলা নিক্ষেপের জন্য ব্যবহার করা হতো।

সোনাকান্দা দুর্গের প্রতিরক্ষা প্রাচীর ও সম্মুখভাগ
প্রতিরক্ষা প্রাচীর
দুর্গের প্রতিরক্ষা প্রাচীর মানে চারপাশের পরিবেষ্টন প্রাচীর। এ প্রাচীর ঘন ও পুরুত্ববিশিষ্ট। প্রতিটি জলদুর্গের প্রাচীরের পুরুত্ব প্রায় ৩-৬ ফুট প্রায়। প্রাচীরের উপরিভাগে অসংখ্য মারলন রয়েছে, তবে সব মারলনের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ এক মাপের না হলেও উচ্চতা এক মাপবিশিষ্ট। প্রতিটা মারলন সমআকৃতির ফোকরযুক্ত। মারলনের সারিতে জ্যামিতিক ফোকরের ক্রম দেখা যায়।
জলদুর্গের বাইরে থেকে দেখলে ফোকরের ধারাবাহিকতা পুনঃপুন দেখা যায়। প্রতি দুই মারলনের সংযোগস্থলে যে লম্বাটে বর্গীয় প্যানেল দেখা যায়, তাতে একটিমাত্র ফোকর রয়েছে। প্রতিরক্ষা প্রাচীরের শীর্ষবিন্দুতে অবস্থিত মারলনের ফোকর যুদ্ধের ক্ষেত্রে বন্দুক স্থাপন করে যুদ্ধ পরিচালনা করার জন্য ব্যবহার করা হতো।
কেন্দ্রীয় অঙ্গন
প্রতিটা দুর্গের অভ্যন্তরভাগে কেন্দ্রীয় অঙ্গন (কোর্ট ইয়ার্ড) রয়েছে। ব্যতিক্রম শুধু ইদ্রাকপুর দুর্গ। ইদ্রাকপুর দুর্গের অভ্যন্তরে একটি পুকুর দেখা যায়। এ পুকুর দুর্গ নির্মাণের সময়কালীন নয়। পুকুরের চারপাশে ঘাট রয়েছে। দুর্গের কেন্দ্রীয় অঙ্গন একেকটা একেক পরিমাপের। সোনাকান্দা জলদুর্গের অঙ্গন খিজিরপুর দুর্গ (হাজীগঞ্জ দুর্গ) ও ইদ্রাকপুর দুর্গ থেকে আকারে অনেক বড়। সোনাকান্দা ও হাজীগঞ্জ দুর্গের অঙ্গন বর্তমানে একটি খেলার মাঠ। প্রতিটা দুর্গের অঙ্গনে সবুজ ঘাসের সমারোহ দেখা যায়। আবার বড় বড় গাছপালার দেখাও মেলে। এসব গাছের মধ্যে রয়েছে আম, লিচু, নারকেল, মেহগনি, শিশু ইত্যাদি। মোগল আমলে এ দুর্গের কেন্দ্রীয় অঙ্গন যুদ্ধের সমরক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সৈনিকরা এখানে তাঁবু খাটিয়ে বসবাস করত।
কোণের বুরুজ
প্রতি দুটি দুর্গের প্রতিরক্ষা প্রাচীরের চার বাহু বিদ্যমান। প্রতি দুই বাহুর অন্তর্বর্তী স্থানে বুরুজ বিদ্যমান।
এ বুরুজের উচ্চতা প্রতিরক্ষা প্রাচীরের চেয়ে বেশি। বুরুজের আকার একেক দুর্গে একেক রকম। সোনাকান্দা দুর্গে অষ্টভুজাকার বুরুজ দেখা যায়। আবার ইদ্রাকপুর দুর্গে গোলীয় আকারের বুরুজ দেখা যায়। এ দুর্গের দেয়ালে অর্থাৎ মারলনের নিচের দিকে বিশাল আকৃতির ফোকর, যা জানালাসদৃশ দেখা যায়। হাজীগঞ্জ বা খিজিরপুর দুর্গে বুরুজ নেই। সেখানে বুরুজের পরিবর্তে গোলীয় আকারের বেদি দেখা যায়। যা ভূমি থেকে উচ্চতাসম্পন্ন ও কয়েক ধাপ সিঁড়ি ডিঙিয়ে ওপরে উঠতে হয়। বুরুজের উপরিভাগে মারলন বিদ্যমান। প্রতিটা মারলন ফোকরযুক্ত।
কামান স্থাপনের বেদি
জলদুর্গের প্রধান ফাংশন হলো কামান গোলা স্থাপনের বেদি। সমগ্র দুর্গের মধ্যে এ অংশটা সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থাপনা। তিনটি দুর্গের মধ্যে সোনাকান্দা ও ইদ্রাকপুর দুর্গে একটি করে এ বেদি অবস্থিত। অন্যদিকে হাজীগঞ্জ দুর্গে এ বেদির সংখ্যা ছয়টি। এ দুর্গের দুটি বেদি সর্বাপেক্ষা বড় আকৃতির, মাঝারি আকৃতির একটি ও ছোট আকৃতির তিনটা বেদি বিদ্যমান। কামান স্থাপনের এ বেদিগুলো দুর্গের ভূমি থেকে অনেকটা উঁচুতে। বেশ কয়েক ধাপ সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে হয়। বেদিগুলোর আকার বৃত্তাকার। প্রতিটা বেদি নদীমুখী করে তৈরি। যাতে কামান স্থাপন করে নদী অভিমুখে নিশানা ঠিক রাখা যায়। বেদির দেয়ালের উচ্চতা প্রতিরক্ষা প্রাচীরের উচ্চতা থেকে অনেক বেশি। আবার পুরুত্বও অনেক। বৃত্তাকার বেদির প্রতি দেয়ালের ওপরে মারলন যুক্ত করা। এ মারলনগুলো ফোকরযুক্ত।
কামান স্থাপনের বেদির প্লাজা
প্রতিটা দুর্গে কামান স্থাপনের বেদিতে উঠতে বহু সিঁড়ির ধাপ পার হতে হয়। এক্ষেত্রে সোনাকান্দা দুর্গ ও ইদ্রাকপুর দুর্গের বেদিতে উঠতে হলে সর্বাপেক্ষা বেশি সিঁড়ির ধাপ পার হতে হয়। সিঁড়ির ধাপের দুই পাশে পুরুত্ববিশিষ্ট দেয়ালের দেখা মেলে। এ দেয়ালের ওপরেও মারলন ও ফোকর রয়েছে।
শেষকথা
মোগল আমলে পশ্চিম বাংলার মতো এপার বাংলায়ও এ নান্দনিক স্থাপনা তৈরি হয়েছিল। এর মধ্যে নিরাপত্তা ও সামরিক স্থাপনা ‘জলদুর্গ’ অন্যতম। বর্তমানে এ জলদুর্গগুলোর অবস্থা বড়ই নাজুক ও অবহেলিত। প্রশাসন ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অন্তর্ভুক্ত থাকা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের অবাধ প্রবেশ, অপ্রাসঙ্গিক কর্মকাণ্ড ও অপব্যবহারের শিকার ঐতিহ্যবাহী এ স্থাপনা। ফলে দিন দিন ধ্বংস হচ্ছে। জলদুর্গগুলোকে টিকিয়ে রাখার জন্য সরকার ও প্রশাসনিক উদ্যোগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সচেতনতা দরকার। বাংলার জলদুর্গ এবং এর ইতিহাস সংরক্ষণ জরুরি। তাহলে বাংলায় ইতিহাসের সামরিক দক্ষতা এবং নগর নিরাপত্তা কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সংরক্ষিত হবে।
মৃধা রাতুল: প্রধান স্থপতি, মৃধাজ ড্রয়িং হাউজ, নারায়ণগঞ্জ








