প্রাচীনকাল থেকেই বাংলার নদী ও জলপথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি বাঙালির প্রতিদিনকার জনজীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। নদী ও জলপথ শুধু বাণিজ্য ও কৃষির উৎসই নয়, রাজনৈতিক ক্ষমতা ও সামরিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও প্রবল ভূমিকা রেখেছে, রাখছে। এ অঞ্চলের ভৌগোলিক বাস্তবতা এবং সমকালীন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রয়োজনীয়তা থেকেই সৃষ্টি করা হয়েছিল জলদুর্গ।

বাংলার অধিকাংশ অঞ্চলই নদীবাহিত প্লাবন ভূমি। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক নীহাররঞ্জন রায় বিষয়টি গুরুত্বসহকারে ব্যাখ্যা করে বলেছেন:

‘...এই দেশের প্রাচীন যে রাষ্ট্র ও জনপদ-বিভাগ তাহাও কিছুটা নির্ণীত হইয়াছে বাঙলার নদ-নদীগুলো দ্বারা। বাঙলার এই নদ-নদীগুলি, এই বন ও প্রান্তর, ইহার জলবায়ুর উষ্ণ জলীয়তা, ইহার ঋতু-পর্যায়, ইহার বিধৌত নিম্নভূমিগুলি, বনময় সমুদ্রোপকূল সমস্তই এই দেশের সমাজ বিন্যাসকে কমবেশি প্রভাবান্বিত করিয়াছে। কাজেই বাঙলাদেশের সত্য ভৌগোলিক পরিচয়ও বাঙালীর ইতিহাসের কথা।’

এই নদী, নদীর জল এবং সংশ্লিষ্ট খাল-বিল সমাজ ব্যবস্থাকেই প্রভাবিত করার পাশাপাশি রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপরও ভূমিকা রেখেছে। এখানে নতুন কোনো শাসকের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যেমন নদী ও পানিকে নিয়ে ভাবতে হয়েছে, তেমনি আধিপত্য ধরে রাখা এবং সুসংহত করতেও নদীকেন্দ্রিক নানা উদ্যোগ নিতে হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো মোগল শাসনামলের আগে ও পরে বাংলায় দক্ষ নৌশক্তি গঠন এবং জলদুর্গ নির্মাণ।

দুর্গ ও জলদুর্গ

জলদুর্গ নিয়ে আলোচনা করতে হলে দুর্গের ধারণাটি পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। দুর্গ হলো শাসন ব্যবস্থা ও সমাজের জন্য প্রতিরক্ষামূলক একটি ব্যবস্থা। সাধারণত দুই ধরনের দুর্গ দেখা যায়—স্থায়ী ও অস্থায়ী। স্থায়ী দুর্গ রীতি অনুযায়ী বেশ শক্তিশালী করে প্রতিষ্ঠা করা হয়। এগুলো শহর, সীমান্ত চৌকি, সমুদ্র অথবা নদীর উপকূলবর্তী অঞ্চল ও বাণিজ্য কেন্দ্রগুলোকে রক্ষা করার জন্যই নির্মাণ করা হয়। দুর্গ দেয়াল দ্বারা বেষ্টিত থাকে। ভেতরে সৈন্যরা বসবাস করে এবং অভিযান করার সামরিক রসদ ও অস্ত্র থাকে। অন্যদিকে অস্থায়ী দুর্গ যুদ্ধকালের প্রয়োজনে তাড়াহুড়া করে নির্মাণ করা হয়। যেখানে থাকে পরিখা, আত্মরক্ষার্থে খোঁড়া গর্ত, যুদ্ধাস্ত্র স্থাপনের মঞ্চ, তাৎক্ষণিকভাবে তৈরি মাটির প্রাচীরাদি প্রভৃতি। দুর্গ সম্পর্কে এ তথ্য পাওয়া যায় অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম সম্পাদিত জাতীয় জ্ঞানকোষখ্যাত বাংলাপিডিয়া থেকে।

বাংলা যেহেতু নদীবহুল অঞ্চল ও দেশ তাই এখানকার দুর্গগুলো সাধারণত নদীর সংযোগস্থলে কিংবা নদীর তীরে নির্মাণ করা হয়েছিল। মুসলিম শাসকরা বাংলায় তাদের ক্ষমতাকে সুসংহত করার জন্য সীমান্ত ফাঁড়ি হিসেবে দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন। এর মধ্যে পাবনার চাটমোহর দুর্গ, বরিশালের সুজাবাদ দুর্গ, ময়মনসিংহের তাজপুর দুর্গ ও চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লা অন্যতম। মোগল শাসনামলে নির্মিত নদী বা জলদুর্গগুলোর মধ্যে হাজীগঞ্জ, সোনাকান্দা ও ইদ্রাকপুরের জলদুর্গ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এছাড়া নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জের পূর্ব সীমান্তে মেঘনা-গোমতী নদীর তীরে দাউদকান্দির দুর্গের তথ্যও পাওয়া যায়।

we

সুবাদার মীর জুমলা, শিল্পী: অজানা সূত্র: দি অনলাইনপোর্ট্রেটগ্যালারি ডটকম

প্রখ্যাত ভূগোলবিদ ও নৌ-প্রকৌশলী জেমস রেনেল (১৭৪২-১৮৩০ সাল) বাংলার নদী অববাহিকা সম্পর্কে অনুসন্ধান চালান এবং সর্বপ্রথম এর মানচিত্র অঙ্কন করেন। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তা হিসেবে তার অঙ্কিত এক সেট মানচিত্র ১৭৭৯ সালে বেঙ্গল অ্যাটলাস নামে মুদ্রিত হয়। তার এ কাজ সমকাল পেরিয়ে আজও অতিমূল্যবান হিসেবে বিবেচিত। রেনেলের একটি মানচিত্রে ঢাকা নগরকে ঘিরে সাতটি জলদুর্গের উল্লেখ পাওয়া যায়। দুর্গগুলো হলো: ১. ইদ্রাকপুর দুর্গ, মুন্সিগঞ্জ সদর (প্রাচীন বিক্রমপুর)। ২. সোনাকান্দা দুর্গ, বন্দর, নারায়ণগঞ্জ। ৩. হাজীগঞ্জ দুর্গ, হাজীগঞ্জ (প্রাচীন খিজিরপুর), নারায়ণগঞ্জ। ৪. দাপা দুর্গ, ফতুল্লা, নারায়ণগঞ্জ। ৫. ফতুল্লা দুর্গ, ফতুল্লা, নারায়ণগঞ্জ। ৬. বেগ মুরাদের দুর্গ, পাগলা, নারায়ণগঞ্জ এবং ৭. অষ্টভুজাকার মোগলাই চর।

ইতিহাসবিদ প্রফেসর আহমেদ হাসান দানী তার ঢাকা: আ রেকর্ড অব ইটস চেঞ্জিং ফরচুনস গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন যে উপরিউক্ত কেল্লা বা দুর্গগুলোর পরে সর্বশেষ প্রতিরক্ষা হিসেবে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারসংলগ্ন আরেকটি কেল্লা বা দুর্গ ছিল। এটি পুরনো কেল্লা হিসেবে খ্যাত। পরবর্তী সময়ে লালবাগে আরো একটি কেল্লা নির্মাণ হলেও সেটি অসম্পূর্ণ অবস্থায় পরিত্যক্ত হয়। বর্তমানে লালবাগ কেল্লা আছে। তবে পুরনো কেল্লার অস্তিত্ব নেই। পুরনো কেল্লা জলদুর্গ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এটি প্রাসাদ ও স্থলের নিরাপত্তা দুর্গই হওয়ার কথা।

অবশ্য বর্তমানে অধিকাংশ ইতিহাস গ্রন্থ এবং সংশ্লিষ্ট প্রবন্ধে শুধু ইদ্রাকপুর, হাজীগঞ্জ ও সোনাকান্দা জলদুর্গের কথাই পাওয়া যায়। বাকি চারটির তথ্য নেই। এর পেছনে দুটি কারণ হতে পারে, লেখকরা হয়তো রেনেলের মানচিত্র হাতে পাননি। দ্বিতীয়ত, নদীভাঙনে যেহেতু বাকি চারটি জলদুর্গ বিলীন হয়ে গেছে তাই এ সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য নেই।

জলদুর্গের নির্মাতা ও সময়

জাতিসংঘের ইউনেস্কোর বাংলাদেশে স্থায়ী প্রতিনিধি কর্তৃক তৈরি প্রতিবেদন বলছে, জলদুর্গগুলো মোগল সুবাদাররা তৈরি করেছিলেন, যারা সুবাহ-ই-বাংলা (বাংলা প্রদেশ) শাসন করতেন। ১৬১০ থেকে ১৭১৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ঢাকা ছিল এ প্রদেশের রাজধানী। বঙ্গের বদ্বীপভূমির সঙ্গে মানিয়ে এসব দুর্গের নকশা করা হয়। নকশার এ ধরন ভারতীয় উপমহাদেশের প্রচলিত মোগল স্থাপত্য থেকে কিছুটা আলাদা।

ইতিহাসবিদ আবদুল করিমসহ অনেক ঐতিহাসিকের মতে, মীর জুমলা (১৬৬০-৬৩ খ্রি.) বাংলার সুবাদার ছিলেন। তার আমলেই বাংলা জলদুর্গগুলো নির্মাণ করা হয়েছিল। অবশ্য এ নিয়ে কোনো শিলালিপি বা তাম্রলিপি পাওয়া যায়নি।

বর্তমান উত্তর ভারতেও মোগল শাসকদের আমলে নির্মিত কিছু দুর্গ আছে। সেগুলো মোগল ঐতিহ্য ও শৈলী অনুযায়ী নির্মিত; বেষ্টিত বাগানযুক্ত, বৃহৎ আয়তন ও জাঁকজমকপূর্ণ। সেই তুলনায় ঢাকার আশপাশের দুর্গ সম্পূর্ণ ভিন্ন। সুতরাং এ দুর্গগুলো মীর জুমলার আমলেই নির্মিত তার কোনো অকাট্য প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

ঈসা খাঁ ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে বা তার অব্যবহিত পরে খিজিরপুর নগরটি প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে একটি দুর্গ নির্মাণ করেন বলেও জানা যায়। কোনো কোনো ঐতিহাসিক নারায়ণগঞ্জের অদূরে হাজীগঞ্জ দুর্গকে খিজিরপুর দুর্গ বলেও অভিহিত করেছেন। খিজিরপুর নগর প্রাচীর বেষ্টিত ও নিরাপত্তা বেষ্টনী দ্বারা সুরক্ষিত। সমকালে বাংলার পূর্বদিক থেকে ঢাকা অভিমুখী একমাত্র জলপথটি এ খিজিরপুর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হতো। খিজিরপুর ছিল তৎকালে বাংলার পূর্বাঞ্চলের প্রধান নৌবন্দর এবং এ বন্দর থেকেই তখন বড় ধরনের সব নৌ-অভিযান পরিচালিত হতো।

১৬৬০-৬৩ সালের দিকে জলদস্যুদের আক্রমণ থেকে ঢাকাকে নিরাপদ রাখতে যে কয়েকটি জলদুর্গ নির্মাণ করা হয়, তার মধ্যে খিজিরপুর জলদুর্গও ছিল বলে অভিমত রয়েছে। ইতিহাস বিশ্লেষক মুয়ায্যম হুসায়ন খান খিজিরপুরে শুধু একটি দুর্গের ধ্বংসাবশেষের অস্তিত্বের নিরিখে মতামত দিয়েছেন যে মীর জুমলা খিজিরপুরে কোনো নতুন দুর্গ নির্মাণ করেননি, বরং ঈসা খাঁ কর্তৃক নির্মিত দুর্গটিই মোগল আদলে সংস্কার বা পুনর্নির্মাণ করেছেন।

অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জের সোনাকান্দা দুর্গ নিয়ে জনশ্রুতি আছে যে বারোভুঁইয়াদের নেতা ঈসা খাঁ বিক্রমপুরের জমিদার কেদার রায়ের বিধবা কন্যা সোনাবিবিকে বলপূর্বক বিয়ে করে এনে এ দুর্গে অন্তরীণ করে রেখেছিলেন। সোনাবিবি দুর্গে বসে কেঁদেছিলেন বলে এ দুর্গের নাম হয় সোনাকান্দা। অন্য কাহিনীতে বলা হয় ঈসা খাঁর অনুপস্থিতিতে সোনাবিবি একাকী যুদ্ধ করে মোগলদের হাত থেকে এ দুর্গ রক্ষা করতে না পেরে কেঁদেছিলেন। এ কারণে দুর্গের নাম হয় সোনাকান্দা। যদিও এসব জনশ্রুতির কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। তবে সমকালীন কারো মৌখিক সাক্ষ্যর লিখিত রূপ পাওয়া গেলে সেটা অকাট্য উপাদান হিসেবে গৃহীত হতো। কারণ ইতিহাস গবেষণায় কথ্য ইতিহাস অতিমূল্যবান উপাদান হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। তাই জনশ্রুতিকে একেবারে তুচ্ছও বলা যায় না।

আরেকটি বিষয় হলো কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলায় ‘এগারসিন্দুর’ নামে একটি দুর্গের অস্তিত্ব আছে। এটি ১১টি নদীর (বানার, শীতলক্ষ্যা, আড়িয়াল খাঁ, গিয়র সুন্দা ইত্যাদি) সংযোগস্থলে অবস্থিত ছিল বলে এ নাম। জনশ্রুতি আছে, বেবুধ নামে এক কোচ উপজাতিপ্রধান ষোড়শ শতাব্দীতে এগারসিন্দুর দুর্গ নির্মাণ করেন। পরে সোনারগাঁর শাসক ঈসা খাঁ (১৫২৯-৯৯ সাল) বেবুধ রাজার কাছ থেকে দুর্গটি দখল করেন এবং একে শক্তিশালী সামরিক ঘাঁটিতে পরিণত করেন। ২০২২ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর দুর্গটিতে কিছু খননকাজ করেছিল। সে সময় সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে এটিকে জলদুর্গ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এগারসিন্দুর দুর্গকে যদি জলদুর্গ ধরা হয়, তাহলে বোঝা যায় যে মীর জুমলার আগেও বাংলায় জলদুর্গ ছিল।

ইদ্রাকপুর দুর্গ, মুন্সিগঞ্জ

ইদ্রাকপুর দুর্গ বর্তমান মুন্সিগঞ্জ জেলা সদরে অবস্থিত। বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, এটির নির্মাণকাল ১৬৬০ সাল। নির্মাতা তৎকালীন বাংলার মোগল সুবাদার মীর জুমলা। মুন্সিগঞ্জ শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত খালের পশ্চিমপাড় এবং দেওভোগ গ্রামের পূর্ব প্রান্তে দুর্গটির অবস্থান। এ জলদুর্গ তৎকালীন ইছামতী ও মেঘনা নদীর সংযোগস্থলে সামরিক গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নির্মাণ করা হয়। এটির প্রধান নির্মাণ উপাদান হলো ইট। আকৃতি চতুর্ভুজ ধরনের। উত্তর-দক্ষিণে প্রসারিত। এর দৈর্ঘ্য ৮৬ দশমিক ৮৭ মিটার ও প্রস্থ ৫৯ দশমিক ৬০ মিটার। দুর্গটির অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হলো এর ড্রামের পাদদেশে ভূগর্ভস্থ একটি কুঠুরি এবং কুঠুরিতে অবতরণের জন্য নির্মিত সিঁড়ি আছে। এ নিয়ে জনশ্রুতি আছে যে সিঁড়িটি ছিল একটি গোপন সুড়ঙ্গপথের অংশ। এর মধ্য দিয়ে দুর্গে অবস্থানকারীরা কোনো জরুরি অবস্থার মুখোমুখি হলে যেন নিরাপদ আশ্রয়স্থলে সরে যেতে পারে সেজন্য এ সুড়ঙ্গ রাখা হয়েছে। কিন্তু ইতিহাসবিদদের অভিমত হলো, এটি গোপন ভূগর্ভস্থ কক্ষে অবতরণের পথ এবং সে কক্ষটি ছিল অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ মজুদ রাখার গুদামঘর। দুর্গের প্রধান ফটক উত্তরদিকে। ফটকের ওপরের অংশে রয়েছে শীর্ষভাগ খিলানাকার ফোকরবিশিষ্ট ও মারলন শোভিত উঁচু আয়তাকার বুরুজ। অংশটি ছিল প্রহরীদের কক্ষ।

হাজীগঞ্জ দুর্গ, নারায়ণগঞ্জ

নারায়ণগঞ্জ শহরের হাজীগঞ্জ এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিম তীরে হাজীগঞ্জ দুর্গের অবস্থান। সম্ভবত মোগল সুবাদার ইসলাম খান কর্তৃক ঢাকায় মোগল রাজধানী স্থাপনের অব্যবহিত পরেই এটি নির্মিত হয়। এ দুর্গও চতুর্ভুজাকৃতির। দুর্গ পঞ্চভুজ প্রাচীর বেষ্টিত। প্রাচীর ও দেয়ালে রয়েছে বন্দুক উপযোগী ফোকর, যাতে সহজেই বন্দুকের নল ঢুকিয়ে লক্ষ্যবস্তুর দিকে গুলি করা যায়। প্রাচীরের চারদিকে অভ্যন্তরভাগে দেয়ালের ভিত থেকে ১ দশমিক ২২ মিটার উঁচুতে রয়েছে চলাচলের পথ। চারকোণের প্রতিটি বুরুজের অভ্যন্তরভাগে দুর্গ প্রাচীরের শীর্ষ পর্যন্ত বিস্তৃত সিঁড়ি এবং এর বহির্গত অংশে রয়েছে বন্দুক দিয়ে গুলি চালানোর প্রশস্ততর ফোকর। রয়েছে কামান বসানোর উপযোগী উঁচু বেদি। এটি দুর্গটির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

দুর্গের একমাত্র প্রবেশপথ শীতলক্ষ্যা নদীর দিকে। এ থেকে বোঝা যায়, শুধু নদীপথেই দুর্গের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা ছিল। ফটকটির আয়াতাকার কাঠামোতে রয়েছে পঞ্চভুজ প্রবেশপথ। দুর্গের অভ্যন্তরে অন্য কোনো নির্মাণ কাঠামো নেই। এ কাঠামো বিশ্লেষণ করে ইতিহাসবিদদের অভিমত হলো, বর্ষা মৌসুমে যখন জলদস্যুদের আক্রমণের আশঙ্কা দেখা দিত ঠিক তখনই দুর্গটিতে সৈন্য মোতায়েন করা হতো। সৈন্যরা সেখানে তাঁবুতে থাকত। এ কারণে স্থায়ীভাবে আবাসস্থল নির্মিত হয়নি।

তবে হাজীগঞ্জ দুর্গের সামরিক সক্ষমতা ও ব্যাপকতা সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায় ১৮২৫-৩৫ সাল পর্যন্ত ঢাকায় নিযুক্ত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সিভিল সার্জন জেমস টেলরের আ স্কেচ অব দ্য টপোগ্রাফি অ্যান্ড স্ট্যাটিসটিকস অব ঢাকা গ্রন্থে। সেখানে তিনি বলেছেন, মীর জুমলা হাজীগঞ্জ দুর্গ থেকে অশ্বারোহী, গোলন্দাজ ও নৌসেনার সমন্বয়ে একটি বিরাট বাহিনী নিয়ে আসাম আক্রমণের উদ্দেশে যাত্রা করেন। এর দ্বারা প্রমাণ হয়, হাজীগঞ্জ দুর্গ অশ্বারোহী সেনা, গোলা নিক্ষেপকারী ও নৌপথে যোদ্ধা—সব মিলিয়ে এটি একটি সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী সামরিক ঘাঁটি ছিল।

সোনাকান্দা দুর্গ, বন্দর, নারায়ণগঞ্জ

সোনাকান্দা দুর্গের অবস্থান নারায়ণগঞ্জ জেলার বন্দর উপজেলায়। বন্দর ফেরিঘাট থেকে দুই কিলোমিটার দক্ষিণে সোনাকান্দা অঞ্চলে দুর্গটি নির্মিত হয়। জায়গাটি শীতলক্ষ্যা ও ব্রহ্মপুত্রের প্রাচীন সঙ্গমস্থলের কাছাকাছি। দুর্গটিতে দুটি প্রধান অংশ আছে। একটি অংশ বিশাল আয়তনের মাটির ঢিবিসহকারে গঠিত দুর্গপ্রাচীর দ্বারা সুরক্ষিত। এর ভেতরে গোলা নিক্ষেপের জন্য বহুসংখ্যক প্রশস্ত-অপ্রশস্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ছিদ্র আছে। অন্য অংশটি সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ, যা দুর্গের অভ্যন্তরে পশ্চিমাংশে নির্মিত। সুরক্ষিত দেয়ালের অভ্যন্তরে উঁচু মঞ্চটি ব্যতীত আর কোনো স্থায়ী ইমারতের সন্ধান পাওয়া যায়নি। দুর্গপ্রাচীরের সর্বত্র গুলি ছোড়ার ব্যবস্থাসহ মারলোন দ্বারা সজ্জিত।

দাউদকান্দি দুর্গ, কুমিল্লা

দাউদকান্দি জলদুর্গের কোনো অস্তিত্ব বর্তমানে নেই। দাউদকান্দির ইতিহাস-ঐতিহ্য, রাজনীতি ও সংস্কৃতি নিয়ে ১৯৭৯ সালে জয়নুল আবেদিনের দাউদকান্দি দর্পণ শীর্ষক একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। জয়নুল আবেদিন তৎকালে বাংলাদেশ সাঁটলিপি একাডেমি, বাংলা একাডেমির অধ্যক্ষ ছিলেন। তিনি তার গ্রন্থে দাউদকান্দি দুর্গের কথা উল্লেখ করেছেন যে মীর জুমলা কর্তৃক নির্মিত দাউদকান্দি দুর্গ নদীর ভাঙনে ধ্বংস বা হারিয়ে গেছে।

ss

রেনেলের মানচিত্র (১৭৭৯) অনুসরণে ঢাকার পরিপার্শ্ব ছবি: স্যার চার্লস ড’য়লী, ঢাকার প্রাচীন নিদর্শন, অনুবাদ: শাহ মোহাম্মদ নাজমুল আলম

মুন্সিগঞ্জের পূর্বদিকে শেষ উপজেলা গজারিয়া ও নারায়ণগঞ্জের পূর্ব সীমান্তের ঠিক পরেই দাউদকান্দি অবস্থিত। মেঘনা ও গোমতী নদীর সংযোগস্থলের তীরঘেঁষেই এর অবস্থান। সুতরাং সমকালীন ভূকৌশল এবং ঢাকার নিরাপত্তা রক্ষা বিবেচনায় দাউদকান্দিতে নদীর প্রান্তে জলদুর্গ নির্মাণ হওয়া স্বাভাবিক। অবশ্য ভাঙনে বাংলাদেশের অনেক জনপদের ভৌগোলিক সীমানা প্রায়ই পরিবর্তিত হয়। কোথাও নতুন ভূমি জাগে, কোথাও আবার নদীতে বিলীন হয়। দাউদকান্দির নদীতীরও অনেকবার ভেঙেছে। ঐতিহাসিক বাস্তবতা থেকে এটা বলা যায় যে দাউদকান্দি দুর্গও ছিল জলদুর্গ। এটি নদীভাঙনে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য।

জলদুর্গের সামরিক, অর্থনৈতিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব

জলদুর্গগুলো কেবল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবেই নয়, আঞ্চলিক ক্ষমতারও প্রতীক ছিল। একই সঙ্গে নদীভিত্তিক বাণিজ্য রুটের নিরাপত্তা সুরক্ষায় অপরিহার্য ভূমিকা পালন করেছে। এ দুর্গগুলো সাধারণত নদীর তীরে বা নদীর বাঁকে কৌশলগতভাবে নির্মিত হয়, যাতে স্থল ও নৌপথ উভয় দিক থেকেই শত্রু আক্রমণ প্রতিহত করা যায়। স্থাপত্যে ইট, চুন-সুরকি ও পাথরের ব্যবহার, ত্রিকোণাকার বা বহুভুজাকৃতির প্রাচীর, বুরুজ, কামান বসানোর স্থান এবং জলে ডুবে থাকা পরিখা সমকালে প্রতিরক্ষা বিষয়ে বিশেষ দক্ষতা ও কৌশলকে নির্দেশ করে।

জলদুর্গগুলোর মাধ্যমে শত্রুর তৎপরতা নিয়ন্ত্রণ এবং তাদের নগরে প্রবেশে বাধা দেয়া হতো। ফলে এর মাধ্যমে নগর বা জনপদ নিরাপত্তা পেত। এর সঙ্গে অর্থনৈতিক বিষয়ও সম্পৃক্ত থাকা স্বাভাবিক। দুর্গের আশপাশে বাজার, গুদাম ও কর সংগ্রহ কেন্দ্র ছিল। দুর্গের মাধ্যমে এগুলো নিরাপত্তা পেত। অন্যদিকে তৎকালে ব্যবসা-বাণিজ্যের মূল যোগাযোগমাধ্যম ছিল নৌপথ। জলদুর্গের কারণে নৌপথে বাণিজ্যিক কার্যক্রমও নিরাপত্তা পেত।

বাংলার জলদুর্গ কেবল সামরিক স্থাপত্য নয়, বরং ভূগোল, অর্থনীতি, রাজনীতি ও পরিবেশনির্ভর নগর-পরিকল্পনার এক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ও অধ্যায়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও নদীভাঙনে কিছু জলদুর্গের অস্তিত্ব আর নেই। যেগুলো আছে তাও যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। এগুলো রক্ষা করা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে শুধু ইট-পাথরের স্থাপনাই রক্ষা হবে না, বরং বাংলার নদীনির্ভর সামরিক পরিকল্পনার ইতিহাস, ঐতিহাসিক স্মৃতি এবং এ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক পরিচয় সংরক্ষিত হবে।

তথ্যসূত্র

১। নীহাররঞ্জন রায়, বাঙালীর ইতিহাস, আদি পর্ব, কলকাতা: দে’জ পাবলিশিং, ১৪২০ (বাংলা), পৃ. ১৪ এবং ৭২।

২। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম (সম্পা.), বাংলাপিডিয়া, ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ভু্ক্তি: মীর জুমলা, দুর্গ, ইন্দ্রাকপুর দুর্গ, হাজীগঞ্জ দুর্গ ও সোনাকান্দি দুর্গ। (এখানে বাংলাপিডিয়ার ওয়েবসাইট থেকে তথ্য সংগৃহীত হয়েছে)

৩। অধ্যাপক এ কে এম শাহনাওয়াজ, ঢাকার কথা-১: মুগল জলদুর্গ, এনটিভিবিডি ডটকম, ১০ অক্টোবর ২০১৫।

৪। কামরুন নেছা খন্দকার, নারায়ণগঞ্জে মধ্যযুগের মুসলিম স্থাপত্য, ঢাকা: বাংলা একাডেমি, ২০০৪, পৃ. ১০৫-৬।

৫। জয়নুল আবেদিন, দাউদকান্দি দর্পণ, ঢাকা: নিজস্ব উদ্যোগে প্রকাশিত, ১৯৭৯।

৬। Kamrin Nessa Khondker, Mughal Rivers Fort in Bangladesh 1575–1688): An Archaeological Appraisal, Thesis, School of History, Archaeology and Religion, Cardiff University, United Kingdom, December 2012.

৭। Latifa Sultana Liza and Ar. Shariar Hasan Mridha Ratul, Documentation and Conservation above the Ancient Fort of Bengal and Finding the Exact Connection of This Fort, Journal of Construction and Building Materials, Voume-7, Issue-1, January-April 2021.

৮। জেমস টেলর, কোম্পানি আমলে ঢাকা (অনূ. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান), ঢাকা: অবসর প্রকাশনা সংস্থা, ২০১৩ পৃ. ৩৫।

৯। স্যার চার্লস ড’য়লি, ঢাকার প্রাচীন নিদর্শন, ঢাকা: একাডেমিক প্রেস অ্যান্ড পাবলিশার্স লাইব্রেরি, ১৯৯১ পৃ. ৪২।

বাশার খান: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা