মোগল আমলে বাংলার শাসক বা সুবাদারদের শুরুতেই দুটি চ্যালেঞ্জ ছিল গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, বারবার বিদ্রোহ করা ভাটি বাংলার শাসকদের পরাজিত ও মোগল আনুগত্যে আনা। দ্বিতীয়ত, আরাকানি মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের লুটতরাজ থেকে ঢাকা অঞ্চলের প্রশাসনিক কার্যক্রম ও নগরবাসীকে নিরাপদ করা। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীজুড়ে মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুরা বারবার ঢাকা অঞ্চলে হামলা ও লটুতরাজ চালাত। এ অঞ্চলে নদী ও জলপথনির্ভর অর্থনীতি থাকায় জলদস্যুরা সহজেই আক্রমণ করতে পারত। ফলে মোগল শাসকদের জন্য এটি একদিকে যেমন প্রশাসনিক ও সামরিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবন হয়ে ওঠে নিরাপত্তাহীন। নদীর দিক থেকে আসা এ মানবসৃষ্ট সংকট মোকাবেলা এবং নৌপথকে সামরিক দিক থেকে শক্তিশালী করতেই জলদুর্গ নির্মাণ ও এগুলোকে শক্ত ভিত্তি দেয়া হয়।
প্রেক্ষাপট: বাংলার ভূরাজনীতি ও সমুদ্রপথের গুরুত্ব
সুবাদার ইসলাম খান চিশতি (১৬০৮-১৩) বাংলার রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তর করলে এর কৌশলগত গুরুত্ব বাড়ে। পূর্ববঙ্গের নদীনির্ভর জনপদ, বন্দর, বাণিজ্য ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি ঢাকাকে এক আকর্ষণীয় নগরীতে রূপ দেয়া শুরু হয়। ভাটি বাংলায় তখন নদী ও সমুদ্রপথই ছিল সহজ যোগাযোগমাধ্যম। ব্যবসা-বাণিজ্য হতো জলপথেই। ফলে জলদস্যুরা এ অঞ্চলকে লক্ষ্যে পরিণত করে।
আরাকানের মগ রাজারা তখন সমুদ্রশক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে প্রভাব বিস্তার করছিল। অন্যদিকে পর্তুগিজরা প্রথমদিকে ব্যবসা-বাণিজ্যের অজুহাতে বঙ্গোপসাগরে প্রবেশ করলেও পরবর্তী সময়ে অনেকেই জলদস্যুদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অপরাধমূলক কার্যক্রম চালাতে থাকে। দুই পক্ষের মধ্যে জোট গড়ে ওঠে, যেখানে মগ রাজা ও বিদ্রোহী পর্তুগিজ নাবিকরা যৌথভাবে বাংলার জনপদ লুণ্ঠনে নামে।
মগ জলদস্যুদের উত্থান ও পর্তুগিজ দস্যুদের ভূমিকা
আরাকান রাজ্যের মগরা দীর্ঘদিন ধরেই বঙ্গোপসাগরের উপকূলে দস্যুবৃত্তি চালাত। তারা দ্রুতগামী নৌযান ব্যবহার করত, যাকে স্থানীয়রা ‘মগি ডিঙি’ বলে ডাকত। তাদের লক্ষ্য ছিল নদীপথের ধনী জনপদ, কৃষক, বণিক ও জেলেরা। ঢাকার অদূরে নারায়ণগঞ্জ, বিক্রমপুর, সোনারগাঁ এসব এলাকায়ও আক্রমণ করে লুটতরাজ চালাত। মগরা শুধু লুটপাটই করত না, মানুষ ধরে নিয়ে যেত এবং তাদের দাস হিসেবে বিক্রি করত। আরাকান রাজ্যের রাজধানী তখন বাংলার মানুষে ভরে গিয়েছিল। বহু মুসলমান ও হিন্দু নারী-পুরুষ দাসত্বে বন্দি হয়ে চট্টগ্রাম হয়ে আরাকানে বিক্রি হয়। সমকালে এভাবে মগদের জলদস্যুতা কেবল অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক বিপর্যয়ও তৈরি করেছিল।
পর্তুগিজরা প্রথমে চট্টগ্রাম ও হুগলির মতো বন্দরনগরে বাণিজ্য করত। কিন্তু ষোড়শ শতাব্দীর শেষ ভাগ থেকে অনেক পর্তুগিজ নাবিক স্বাধীন জলদস্যু হিসেবে গড়ে ওঠে। তাদের স্থানীয়রা ‘ফিরিঙ্গি নামে চিনত। তারা মগদের সঙ্গে মিলে এক যৌথ জলদস্যু নেটওয়ার্ক তৈরি করে। এ ফিরিঙ্গিরা বন্দুক, কামান, জাহাজ চালনার কৌশলে দক্ষ ছিল। ফলে মগরা তাদের বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করত। পর্তুগিজ জলদস্যুরা মগদের জন্য সামরিক প্রযুক্তি সরবরাহ করত এবং বিনিময়ে লুণ্ঠিত সম্পদ ও বন্দি মানুষ ভাগ করে নিত। এ দুটি দলে অপরাধমূলক তৎপরতা পর্যালোচনা করে ইতিহাসবিদদের অভিমত হলো মগ ও পর্তুগিজ সহযোগিতায় গঠিত জোট বাংলায় দস্যুবৃত্তিকে তীব্র ও অসহনীয় মাত্রায় নিয়ে যায়।
ঢাকায় আক্রমণের ধরন ও প্রভাব
ঢাকা তখন সদ্য রাজধানী হিসেবে বিকশিত হচ্ছিল। এখানকার ধনী বণিক, সুতা ও বস্ত্র শিল্প এবং নদীবন্দরসমৃদ্ধ জনপদ জলদস্যুদের প্রধান লক্ষ্যে পরিণত হয়। দস্যুরা সাধারণত ভোরে বা রাতে আকস্মিক হামলা চালাত। সম্পদ লুট করত, গ্রাম জ্বালিয়ে দিত, মানুষ হত্যা করত। নারীদের অপহরণ করারও তথ্য পাওয়া যায়।
ঢাকার আশপাশের হাজারো মানুষ ধরে নিয়ে যেত। সমসাময়িক বিদেশী ভ্রমণকারীরা উল্লেখ করেছেন, চট্টগ্রাম ও আরাকানের দাসবাজারে বাংলার মানুষের আধিক্য ছিল। ফলে গ্রামীণ কৃষক ও ব্যবসায়ীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে থাকে। খাদ্যশস্য উৎপাদন ও বাণিজ্যেও এর প্রভাব পড়ে। জলদস্যুদের আক্রমণের কারণে নদীতীরের অনেক মানুষ ঘর-বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেত, অনেকে দুর্গ বা জঙ্গলে আশ্রয় নিত। নগর ও সমাজে এক ধরনের সামাজিক ভীতির সংস্কৃতি তৈরি করেছিল।
মোগল প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া
এমন বাস্তবতায় মোগল শাসকরা জলপথে আক্রমণ করা দস্যুদের দমন করাকে অগ্রাধিকার দেন। তারা বুঝতে পারেন, সমুদ্র ও নদীপথনির্ভর সংশ্লিষ্ট সামরিক শক্তি না থাকলে প্রশাসন, অর্থনীতি ও সমাজ অরক্ষিত থাকবে। ফলে সুবাদার ইসলাম খান প্রথম বড় আকারে নৌবাহিনী সংগঠিত করেন। তিনি নদীপথে যুদ্ধের জন্য বিশেষ নৌযান ব্যবহার শুরু করেন এবং স্থানীয় জমিদার ও নৌসৈন্যদের সহযোগিতায় প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। পরবর্তী সুবাদার মীর জুমলা (১৬৬০-৬৩) মগ-পর্তুগিজ দস্যুদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেন। এতে মগদের শক্তি অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়ে। তবে স্থানীয় পর্যায়ে লুটপাট পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
সমাজ-সংস্কৃতিতে প্রভাব ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য
জলদস্যুদের ভয়াবহতা কেবল অর্থনীতিকেই নয়, সমাজ-সংস্কৃতিকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করে। লোককথা, গান, প্রবাদ-প্রবচনে মগি আক্রমণের উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমন গ্রামীণ মানুষ সন্তানকে ভয় দেখাতে বলত, ‘চুপ করো, নইলে মগি ধরে নিয়ে যাবে।’ এ স্মৃতিচিহ্নগুলো প্রমাণ করে দস্যুবৃত্তি কীভাবে জনমনে গভীর আতঙ্কের ছাপ ফেলেছিল। অন্যদিকে দস্যুবৃত্তি মোগল শাসকদের জন্য নৌবাহিনী গড়ে তোলার গুরুত্ব বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। ফলে মোগলরা ধীরে ধীরে বাংলার নদীপথে কার্যকর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।
মোগল আমলে ঢাকায় মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের লুটতরাজ ছিল রাজনৈতিক শূন্যতা, জলপথে দুর্বল প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও বহিরাগত শক্তির অপরাধমূলক উচ্চাভিলাষের ফল। এ ঘটনাগুলো শুধু স্থানীয় মানুষের দুর্ভোগ বাড়ায়নি, বরং ঢাকাকে ঘিরে মোগল প্রশাসনকে এক নতুন সামরিক ও প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলতে বাধ্য করে। জলদস্যুদের এ তৎপরতা বাংলার ইতিহাসে অন্ধকার অধ্যায়। তবে এ বাস্তবতা মোকাবেলায় জলদুর্গ নির্মাণের মতো পদক্ষেপ জলপথের নিরাপত্তার নতুন পথ খুলে দেয়। তৎকালীন শাসকদের উপলব্ধি হয় যে ঢাকা বা পূর্ব বাংলায় নৌশক্তিতে দক্ষ না হলে শাসন ব্যবস্থা ও নগরের নিরাপত্তা দীর্ঘস্থায়ী করা যাবে না।
মাহমুদ আব্দুল্লাহ: লেখক ও গবেষক








