লাক্সের যাত্রা শুরু ১৯২৫ সালে। তখন এটি বাজারে আনে লিভার ব্রাদার্স, কোম্পানির বর্তমান নাম ইউনিলিভার। উদ্দেশ্য ছিল অভিজাতদের জন্য তৈরি ফরাসি সুগন্ধি সাবান সাধারণ নারীদের ঘরে পৌঁছে দেয়া।

লাক্স নামটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ ‘লাইট’ থেকে। এর অর্থ আলো। এ আলোর অর্থ সৌন্দর্য, উজ্জ্বল ও কোমলতা। নামের সঙ্গে ‘লাক্সারি’র মিলও আছে। অর্থাৎ কম দামে মানসম্মত বিলাসী সৌন্দর্যের প্রতিশ্রুতি। শুরুর দিক থেকেই লাক্স পরিচিত হয় ‘তারকাদের বিউটি সাবান’ হিসেবে। এটি শুধু সাবান ছিল না, ছিল দৈনন্দিন জীবনে সৌন্দর্যের বিলাসিতা ও কিছুটা আভিজাত্যের বিষয়। এ ভাবনাই লাক্সকে বিশ্বের প্রথম দিকের সফল গ্লোবাল বিউটি ব্র্যান্ডে পরিণত করে।

১৯৩০ ও ’৪০-এর দশকে লাক্স দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কারণ তখনই কোম্পানি সিনেমার তারকাদের পণ্যটির বিজ্ঞাপনে নিয়ে আসে। বিশ্ববিখ্যাত অভিনেত্রী এলিজাবেথ টেইলর, মেরিলিন মনরোর মতো হলিউড তারকারা লাক্সের বিজ্ঞাপন করেন। সিনেমার পর্দার জৌলুস যেন ঢুকে পড়ে অন্দরমহলে।

ব্রিটিশ বৈশ্বিক ব্র্যান্ড হিসেবে লাক্স পৌঁছে যায় এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে। ভারতীয় উপমহাদেশে এসে লাক্স নেয় স্থানীয় রূপ। দক্ষিণ এশিয়ার জনপ্রিয় নায়িকাদের দিয়ে এর প্রচার শুরু হয়। ফলে ব্র্যান্ডটি একদিকে যেমন সাংস্কৃতিকভাবে আপন হয়ে ওঠে, তেমনি ধরে রাখে তার বৈশ্বিক মর্যাদা। ‘চলচ্চিত্র তারকাদের সাবান’ হিসেবে লাক্স হয়ে ওঠে ঘরে ঘরে পরিচিত নাম। লাক্স কম দামে বিলাসের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।

স্থানীয় উৎপাদন শুরু হওয়ার আগেই বাংলাদেশে আমদানি করা লাক্স সাবান আকর্ষণী প্রসাধনী হিসেবে ব্যবহারকারীদের মনে জায়গা করে নিয়েছিল। অনেক পরিবার এটি ব্যবহার করত বিশেষ দিনে। বিশেষ করে ঈদ, বিয়ে কিংবা উৎসবে। লাক্সের সুগন্ধের স্পর্শ লাভ ছিল বিলাসীর প্রথম ধাপ। একটি লাক্স সাবান উপহার পাওয়া ছিল ভালোবাসার প্রকাশ, লাক্স পেলে অনেকের মন আনন্দে ভরে উঠত।

১৯৬২ সালে চট্টগ্রামের কালুরঘাট কারখানায় স্থানীয়ভাবে লাক্সের উৎপাদন শুরু হয়। ফলে সাবানটি আরো সহজলভ্য হয়। দাম কমে আসে। আমদানি করা স্বপ্নের সাবান হয়ে ওঠে দেশের ঘরের প্রয়োজনীয় পণ্য। ১৯৭৮ সালের পুনরায় যাত্রা লাক্সকে নতুন রূপ দেয়। নতুন সুগন্ধ ও উন্নত ফর্মুলা আসে। শুরু হয় নতুন তারকাখচিত প্রচারণা। আন্তর্জাতিক তারকার সঙ্গে যুক্ত হন বাংলাদেশের সমকালের তুমুল জনপ্রিয় নায়িকা শাবানা ও কবরীর মতো দেশী মুখ। এ সময় থেকেই লাক্স আর শুধু সাবান নয়, যেন বাংলাদেশের নারীর সৌন্দর্যের এক প্রতীক।

১৯৮০, ’৯০ ও ২০০০-এর দশকে লাক্সের টেলিভিশন জাদু

১৯৮০, ’৯০ এবং ২০০০-এর দশকে বাংলাদেশে টেলিভিশন হয়ে ওঠে সবচেয়ে শক্তিশালী জনপ্রিয় মাধ্যম। লাক্স কর্তৃপক্ষ তখন টিভি বিজ্ঞাপনের শিল্পটা নিখুঁতভাবে রপ্ত করে। উচ্চমানের সিনেমার মতো বিজ্ঞাপন বানানো শুরু হয়। স্থানীয় পর্দায় যা আগে কেউ দেখেনি। এ সময় লাক্সের বিজ্ঞাপন মডেল হন দেশের জনপ্রিয় চলচ্চিত্র তারকারা। যেমন অপি করিম, শমী কায়সার, বিপাশা হায়াত, সুবর্ণা মুস্তাফা, আফসানা মিমি, শাকিলা জাফর ও শামীম আরা নিপা। পরে যুক্ত হন সাদিয়া ইসলাম মৌ। তারা সবাই লাক্সের বিজ্ঞাপনে আকর্ষণীয় ও স্মরণীয় মুখ পর্দায় দর্শকের সামনে হাজির হন।

এ বিজ্ঞাপনগুলোয় দেখানো হয় আভিজাত্যপূর্ণ পরিবেশ। স্বপ্নময় সাজ। তার সঙ্গে যুক্ত করা হয় লাক্সের চেনা জিঙ্গেল ও স্লোগান। সব মিলিয়ে যেন গ্ল্যামারের পূর্ণতা পায়। ব্র্যান্ডকে আরো আধুনিক রাখতে লাক্স বিদেশে বিজ্ঞাপন শুট করতে শুরু করে। যেমন থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরে শুটিং হয়। এসব বিজ্ঞাপনে আসে আন্তর্জাতিক মানের ঝকঝকে লুক। বিদেশী লোকেশন, পরিশীলিত স্টাইল ও উন্নত প্রডাকশনের সমন্বয়ে লাক্সের গল্পগুলো ছিল বাংলাদেশের মানুষের খুব কাছের। স্থানীয় তারকা আর বৈশ্বিক নান্দনিকতার মিশেলে লাক্সের বিজ্ঞাপন হয়ে ওঠে একেকটি মন জয় করা ঘটনা। নতুন বিজ্ঞাপন দেখার জন্য দর্শক অপেক্ষা করত। এ সময় বাজারে আসে লাক্সের নতুন নতুন ভ্যারিয়েন্ট। ‍যুক্ত করা হয় ফুলের ঘ্রাণ, ফলের সুবাস ও ময়েশ্চারাইজিং ফর্মুলা। উপাদানে সবার পছন্দের কিছু না কিছু রাখা হয়। উন্নতমানের ভাব আর সহজলভ্যতার মেলবন্ধনে লাক্স তৈরি করে প্রজন্মের পর প্রজন্মের বন্ধন। লাক্স মানেই যেন সৌন্দর্য, আত্মবিশ্বাস আর রুপালি পর্দার মোহ।

গ্রামবাংলায় পৌঁছানোর পর লাক্স পায় সত্যিকারের দেশজ সাফল্য। কম দাম, শক্তিশালী বিতরণ ব্যবস্থা আর হৃদয়ছোঁয়া বিজ্ঞাপনে গ্রাম ও ছোট শহরেও পৌঁছে যায় লাক্স। গ্রামের অনেক নারীর কাছে লাক্স শুধু সাবান নয়, এটি ছিল নিজের জন্য একটু আলাদা সময়। একটু মর্যাদা। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করা একজন গৃহিণী দিনের শেষে সন্ধ্যার গোসলে লাক্সই ছিল তার একান্ত মুহূর্তের আকর্ষণ। ঘন ফেনা হয়ে উঠত তার স্পা। সুগন্ধ হয়ে উঠত তার পারফিউম। কয়েক মিনিটের জন্য তিনি নিজেকে মনে করতেন তারকার মতো, হতেন বিমোহিত।

২০০০-এর দশকে লাক্স নতুন প্রজন্মের জন্য নিজেকে নতুনভাবে উপস্থাপন করে। শুরু হয় ‘লাক্স সুপারস্টার’ অনুষ্ঠান। দেশজুড়ে প্রতিভা খোঁজার এ আয়োজন ছিল বিনোদন আর ব্র্যান্ডের মিশেল। লাখো দর্শক অনুষ্ঠানটি দেখেছেন। জাকিয়া বারী মম, মেহজাবিন চৌধুরী, বিদ্যা সিনহা মিম, আজমেরী হক বাঁধনের মতো তারকারা এ প্লাটফর্ম থেকেই উঠে আসেন। পরে হয়ে ওঠেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী ও সাংস্কৃতিক আইকন।

দশকের পর দশক ধরে লাক্স ছিল নতুন তারকাদের প্রথম ধাপ। লাক্সের বিজ্ঞাপনে কাজ করা মানেই ছিল মর্যাদার স্বীকৃতি ও ক্যারিয়ারের জন্য মাইলফলক। এটি তাদের জন্য ছিল শোবিজ জগতে প্রবেশের এক ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

আজও লাক্স তার নতুনত্ব ধরে রেখেছে। যেমন ত্বকের জন্য কোমল ফর্মুলা, ফুলের নির্যাস, প্রয়োজনীয় অয়েলের অন্যতম ‍উপাদান। একই সঙ্গে যুক্ত আছে ইউনিলিভারের বৈশ্বিক পরিবেশবান্ধব প্রসাধনীর অঙ্গীকার। পাম অয়েল ও কাগজের প্যাকেজিং আসে টেকসই উৎস থেকে। পরিবেশের ক্ষতি কমাতে নানাভাবে কাজ করছে ব্র্যান্ডটি।

বিলাস আর দায়িত্ব—দুটোই একসঙ্গে করা হচ্ছে। এ প্রক্রিয়া ও কার্যক্রম ১৯২০-এর হলিউডের গ্ল্যামার থেকে গ্রামবাংলার ঘর পর্যন্ত চলছে। লাক্সের যাত্রা মানে বৈশ্বিক মর্যাদা আর স্থানীয় ভালোবাসার গল্প। ১০০টির বেশি দেশে লাক্স পরিচিত নাম। বাংলাদেশে এটি হয়ে উঠেছে একান্ত আপন পণ্য।

প্রজন্মের পর প্রজন্ম বড় হয়েছে লাক্সের সুগন্ধে। তারকার গ্ল্যামারে। সহজলভ্য সৌন্দর্যের স্বপ্নে। তাই লাক্স শুধু একটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড নয়, এটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও আবেগের অংশ। এর বৈশ্বিক সাফল্য ব্র্যান্ডটির দীর্ঘস্থায়ী আকর্ষণের বাস্তবতাকে প্রমাণ করে এবং এটি বিভিন্ন সংস্কৃতি ও শ্রোতাদের সঙ্গে গভীরভাবে সংযোগ স্থাপন করতে সক্ষম।