লাক্স সাবানের যাত্রা শুরু হয় ১৮৯৯ সালে, যুক্তরাজ্যে। এটি তখন প্রথমবার ‘সানলাইট ফ্লেকস’ নামে একটি ধোয়ার সাবান হিসেবে বাজারে আসে। নামটি ছিল লিভার ব্রাদার্সের সে সময়ের একটি উদ্ভাবনী ধোয়ার পণ্য, যা পরে সৌন্দর্য ও ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার বাজারে তার স্থান তৈরি করে। ধীরে ধীরে ‘সানলাইট ফ্লেইকস’-এর জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকলে ১৯০০ সালের দিকে এর নাম পরিবর্তন করে ‘লাক্স’ রাখা হয়। লাতিন শব্দ লাক্স অর্থ ‘আলো’, যা বিলাসিতা ও সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে গৃহীত হয়।
১৯২০-এর দশকে লাক্স সাবান বিশ্বব্যাপী পরিচিতি ও বাজারজাতের দিকে অগ্রসর হয়। ১৯২৫ সালে লিভার ব্রাদার্স এটি যুক্তরাষ্ট্রে সৌন্দর্য সাবান হিসেবে বাজারজাত শুরু করে। সে বছর লাক্সকে ফরাসি সাবানের সমতুল্য গুণমান এবং সুবাসের সঙ্গে তুলনীয় করে অনেক বেশি সাশ্রয়ী মূল্যে সরবরাহ করা হয়েছিল। পরের বছর ১৯২৬ সালে লাক্সের জাতীয় পর্যায়ের বড় প্রচারণা শুরু হয়, যেখানে শুধু নারীদের জন্য নয়, বরং পুরুষ ও শিশুদের জন্যও বিজ্ঞাপন করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে লাক্স জনপ্রিয়তা লাভ করতে থাকলে পণ্যটিকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। ১৯২৮-৪০ পর্যন্ত সাবানটি বহু দেশে বাজারজাত ও প্রচার করা হয়। এর মধ্যে ছিল যুক্তরাজ্য, ভারত, আর্জেন্টিনা, থাইল্যান্ডসহ আরো বহু দেশে ও বাজারে। এ সময়েই ছিল লাক্সের বাস্তব ‘বৈশ্বিক বিস্তার’ যুগের সূচনা।

কাপড় ধোয়ায় ব্যবহার হতো লাক্স (ইংল্যান্ড, ১৯২৯ খ্রি.)
বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশে লাক্সের প্রবেশ বেশ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল। ১৯২৯ সালে এটি ভারতে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয় এবং প্রথম বিজ্ঞাপনগুলোয় জনপ্রিয় অভিনেত্রীদের সৌন্দর্যের রহস্য হিসেবে লাক্স তুলে ধরা হয়। এ মার্কেটিংকে কেন্দ্র করে লাক্স শিগগিরই গ্ল্যামার, সেলিব্রিটি ও সিনেমার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় এবং ভারতীয় বাজারে দ্রুত জনপ্রিয়তা পায়। পরের দশকে লাক্সের প্রচারে শুধু আন্তর্জাতিক তারকারাই নয়, ভারতের নিজস্ব তারকারাও অংশ নেন। সে সময় তারকারা লাক্সের স্থানীয় ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসেবে কাজ করেন।

ইন্দোনেশিয়ার পত্রিকায় লাক্সের বিজ্ঞাপন (১৯৩১ খ্রি.)
আফ্রিকায়ও লাক্সের আগমন হয় ঔপনিবেশিক বাণিজ্যিক পথ ধরে। শুরুতে অনেক এলাকায়ই সাবান সম্পর্কিত ধারণা নিতান্তই নতুন ছিল। তবু ১৯৪০-এর দশকে প্রচারণার মাধ্যমে লাক্সকে গ্ল্যামার ও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে যুক্ত করে তুলে ধরার প্রচেষ্টা চালানো হয়। এতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে এ ব্র্যান্ডের গ্রহণযোগ্যতা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে।
১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে লাক্সের বিজ্ঞাপন কৌশল বদল হয়। তখন আন্তর্জাতিক তারকার বদলে স্থানীয় মডেল, গায়ক ও জনপ্রিয় মুখগুলোকে প্রাধান্য দেয়া হয়, যাতে প্রতিটি দেশের মানুষের মধ্যে বেশি সান্নিধ্য ও অনুভূতি তৈরি করা যায়। উদাহরণস্বরূপ, দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারগুলোয় লাক্সকে সহজেই গ্রহণযোগ্য করা হয় স্থানীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অনুযায়ী। বিভিন্ন দেশে এ প্রচার কৌশল পণ্যটিকে আরো জনপ্রিয় করে তোলে।
১৯৬২ সালে চট্টগ্রামের কালুরঘাট কারখানায় স্থানীয়ভাবে লাক্সের উৎপাদন শুরু হয়। এর আগে সাবানটি পূর্ব পাকিস্তানে তথা বর্তমান বাংলাদেশে আমদানি পণ্য ছিল। স্থানীয়ভাবে উৎপাদন ও বাজারজাত করার পর লাক্স হয়ে ওঠে এ অঞ্চলে মানুষের প্রয়োজনীয় পণ্য। ১৯৭৮ সালের পুনরায় যাত্রা লাক্সকে নতুন রূপ দেয়। নতুন সুগন্ধ ও উন্নত ফর্মুলা যুক্ত করা। শুরু হয় নতুন তারকাখচিত প্রচারণা।
লাক্স শুধু নিজের গুণমানেই জনপ্রিয় নয়, এক্ষেত্রে বৈশ্বিক বাজারজাত প্রচেষ্টা, সাংস্কৃতিক সংযোগ ও সেলিব্রিটির মাধ্যমে প্রচারের কৌশলও কাজে দিয়েছে। আজকের দিনে লাক্স একটি বিশ্বব্যাপী ব্র্যান্ড। এটি এখন ১০০টিরও বেশি দেশে পাওয়া যায় এবং বহু অঞ্চলের মানুষের জন্য সৌন্দর্য ও ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে এটি প্রায়ই শীর্ষ পর্যায়ের সৌন্দর্য সাবান হিসেবে বিবেচিত।
নীরব হাসান: লেখক ও অনুবাদক









