‘সে মঞ্চটার কথা আজও মনে আছে। আমরা যারা মফস্বলে বড় হয়েছি, তাদের জন্য লাক্সের মঞ্চ একটি বিশাল স্বপ্ন ছিল। এর আগে লাক্স ফটোজেনিকের যে ট্যাগলাইন ছিল “রূপসী গুণের খোঁজে’’, লাইনটাই ভীষণ ইনস্পায়ারিং ছিল। আমাদের সময় থেকে তো লাক্স চ্যানেল আই সুপারস্টার শুরু হলো। একটা বিশাল পরিবর্তন এল। আমার মতো যারা স্বপ্ন দেখতে পছন্দ করে, তাদের জন্য এটা আসলে বিশাল সুযোগ। আমার পেশাগত জীবনের অনেক বছর কেটে গেছে। তবে লাক্স আমার জীবনে এখনো বিশেষ জায়গায় আছে। আমি এ মঞ্চের কাছে কৃতজ্ঞ’—বলছিলেন ‘লাক্স চ্যানেল আই সুপারস্টার-২০০৫’-এর বিজয়ী শানারেই দেবী শানু। বাংলাদেশের এমন অসংখ্য পরিচিত মুখের স্মৃতিতে রঙিন হয়ে আছে ‘লাক্স’ নামটি।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে লাক্স মানুষের সবচেয়ে ব্যক্তিগত পরিসরে জড়িয়ে থেকেছে, প্রত্যন্ত অঞ্চলের কলপাড় থেকে শুরু করে শহরের বাথটাব সবখানেই লাক্সের আধিপত্য। এর সুবাস পরিচিত, মোড়ক চিরচেনা। কিন্তু লাক্সকে শুধু একটি সৌন্দর্য সাবান হিসেবে দেখলে তার গভীর তাৎপর্য বোঝা যায় না।
১৯২৫ সালে লিভার ব্রাদার্স যখন বিশ্ববাজারে লাক্সকে পরিচয় করিয়ে দেয়, তখন এটি কেবল প্রসাধনী নয়, বরং একেবারেই ব্যতিক্রমী ধারণা নিয়ে এসেছিল ‘ফিল্ম স্টারদের সৌন্দর্য সাবান’। এটি নিছক বিজ্ঞাপনের ভাষা ছিল না। এর ভেতরে লুকিয়ে ছিল আকাঙ্ক্ষা, মর্যাদা ও আত্মবিশ্বাসের গভীর দর্শন। এ ধারণাই ছিল লাক্সের আসল শক্তি। সে ধারণাই ভ্রমণ করেছিল দেশ থেকে দেশ, সংস্কৃতি থেকে সংস্কৃতিতে।
১৯৬০-এর দশকের শুরুতে লাক্স প্রবেশ করে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাজারে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর এটি নবগঠিত বাংলাদেশের ভোক্তা সংস্কৃতিতে দৃঢ় শিকড় গেড়ে বসে। ষাটের দশকের শুরুতেই স্থানীয় উৎপাদন শুরু হওয়ায় লাক্স সহজলভ্য হয়ে ওঠে নানা শ্রেণী ও অঞ্চলের মানুষের কাছে। ধীরে ধীরে সাবানের মোড়কে লাক্স নিয়ে আসে আধুনিকতার স্বপ্ন, দৃশ্যমান হওয়ার সাহস এবং একটি বিশ্বাস, ‘নারীর সৌন্দর্য কেবল ব্যক্তিগত নয়, তা আত্মসম্মান, সামাজিক উপস্থিতি ও ভবিষ্যৎ কল্পনার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।’
১৯৮৩ সাল বাংলাদেশের বিজ্ঞাপন ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এক সিদ্ধান্তমূলক মোড়। সে বছরেই দেশের প্রথম স্থানীয়ভাবে নির্মিত লাক্স টেলিভিশন বিজ্ঞাপন প্রচারিত হয়, যা নির্মাণ করে বিজ্ঞাপনী সংস্থা এশিয়াটিক। নির্দেশনায় ছিলেন আলী যাকের ও আসাদুজ্জামান নূর, চিত্রগ্রহণ করেন এমএ মমিন। ঐতিহাসিক এ বিজ্ঞাপনের মুখ্য চরিত্র ছিলেন নূতন, সত্তরের দশক ও আশির দশকের অন্যতম সমাদৃত অভিনেত্রী।

২০০৬ সালের লাক্স সুপারস্টার প্রতিযোগীরা
সে সময় বিজ্ঞাপনে অভিনয় করা সব অভিনেত্রীর কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনে অংশ নেয়াকে অনেকেই আপস মনে করতেন। কিন্তু লাক্স সেখানে পরিবর্তন আনল। বৈশ্বিক পরিসরে ব্র্যান্ডটি তখন নারী-উত্তরাধিকার তৈরি করেছিল, যার সূচনা ১৯২৯ সালে লীলা চিটনিসের মাধ্যমে, যিনি লাক্সের প্রথম মডেল হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেন। পরবর্তী সময়ে মীনা কুমারী, সুচিত্রা সেন, সায়রা বানু, আশা পারেখ, শর্মিলা ঠাকুর, মালা সিনহা, হেমা মালিনী ও মাধুরী দীক্ষিতের মতো কিংবদন্তি অভিনেত্রীরা এ ধারায় যুক্ত হন।
নূতনকে নির্বাচনের মাধ্যমে লাক্স একজন বাংলাদেশী নারীকে এ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র ঐতিহ্যের ধারায় স্থাপন করে। এটি কেবল বিজ্ঞাপনের সিদ্ধান্ত নয়, এটি ছিল সাংস্কৃতিক স্বীকৃতির ঘোষণা। নূতন সেখানে গ্ল্যামারকে ধারণ করছিলেন। ঘরে বসে সে বিজ্ঞাপন দেখে অসংখ্য নারীর ভেতর ঘটেছিল এক সূক্ষ্ম কিন্তু গভীর পরিবর্তন। অসংখ্য নারী স্বপ্ন দেখতে থাকল নিজেদের ভিন্নভাবে উপস্থাপনের।
নূতনের পর বাংলাদেশে বিজ্ঞাপনে নারীদের কাজ করার যে ট্যাবু ছিল তা ভেঙে যায়। ব্র্যান্ডটি সচেতনভাবে এমন এক ধারাবাহিকতা তৈরি করেছিল, যেখানে নারীদের জনসমক্ষে উপস্থিতি ছিল শ্রম, সাধনা এবং পেশাগত অর্জন থেকে উৎসারিত আত্মবিশ্বাসের প্রতিফলন। বছরের পর বছর ধরে লাক্সের প্রচারণায় সামনে এসেছেন দেশের সবচেয়ে সম্মানিত ও প্রভাবশালী অভিনেত্রী, যেমন সুবর্ণা মুস্তাফা, বিপাশা হায়াত, অপি করিম, আফসানা মিমি, অঞ্জনা। তারা সবাই লাক্সের সে গ্ল্যামারকে ধারণ করেছেন।
বাংলাদেশী নারীদের সঙ্গে লাক্সের সম্পর্কের সবচেয়ে রূপান্তরমূলক অধ্যায় শুরু হয় তখনই, যখন ব্র্যান্ডটি প্রতিনিধিত্বের সীমা পেরিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক নির্মাণের পথে এগোয়। ২০০৫ সালে চ্যানেল আইয়ের সঙ্গে অংশীদারত্বে ‘লাক্স চ্যানেল আই সুপারস্টার’-এর সূচনা হয়। এই প্রথম কোনো বিউটি সাবান ব্র্যান্ড জাতীয় পর্যায়ে টেলিভিশনভিত্তিক মঞ্চ তৈরি করল, যেখানে নারীরা কাঠামোবদ্ধ প্রশিক্ষণ, দৃশ্যমানতা ও সামাজিক স্বীকৃতি পেয়েছিল।
এর আগে ১৯৯৭ সালে লাক্স ও বিনোদন পত্রিকা আনন্দধারা যৌথ উদ্যোগে ‘Lux Anandadhara Ms. Photogenic’ আয়োজন করেছিল। প্রথম বিজয়ী ছিলেন ফারাহ রুমা। তবে ২০০৫ সালের ‘লাক্স চ্যানেল আই সুপারস্টার’ নারীদের আরো দৃশ্যমান করেছিল, তাদের প্রতিভা, আত্মবিশ্বাস ও পেশাদারত্ব সবার সামনে তুলে ধরেছিল।
এটি নিছক সৌন্দর্য প্রতিযোগিতা নয়। এতে ছিল অভিনয়, পারফরম্যান্স, গ্রুমিং, শৃঙ্খলা ও মিডিয়া প্রশিক্ষণ। প্রতিযোগীদের পেশাদার মেন্টররা দিতেন পরামর্শ এবং তারা পরিচিত হতেন শিল্পের মান ও নীতিমালার সঙ্গে, যা আগে প্রায়ই অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অর্জনযোগ্য হতো।
একাধিক মৌসুমজুড়ে ‘লাক্স চ্যানেল আই সুপারস্টার’ পরিচয় করিয়েছে জাকিয়া বারী মমো, মেহজাবিন চৌধুরী, নাদিয়া আফরিন মিম, মিম মানতাসার মতো কলাকুশলীদের, যারা টেলিভিশন, চলচ্চিত্র, মডেলিং ও মিডিয়ায় সফল পেশাগত জীবন গড়েছেন। এ পর্যন্ত ‘লাক্স সুপারস্টার’ এর মোট ১০টি মৌসুম বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। সর্বশেষ মৌসুমটি আয়োজিত হয়েছে ২০২৫ সালে।
লাক্সের প্রভাব শুধুই পর্দার মুখের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। উচ্চপর্যায়ের প্রচারণাগুলো স্থায়ী কাজের সুযোগ সৃষ্টি করেছিল স্টাইলিস্ট, পোশাক ডিজাইনার, মেকআপ আর্টিস্ট, নৃত্য পরিচালক, সহকারী পরিচালক এবং প্রডাকশন পেশাজীবীদের জন্য, যাদের মধ্যে অনেকেই নারী। লাক্সের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় কাজ করেছেন মেকআপ আর্টিস্ট কানিজ আলমাস খান, উপস্থাপক হিসেবে কাজ করেছেন ফারজানা ব্রাউনিয়া, ইভা, রুমানা মালিক মুনমুন। এমন আরো অসংখ্য জায়গায় নারীরা নিজেদের প্রতিভাকে দেখানোর সুযোগ পেয়েছে। বিজ্ঞাপনের জগতে নারীরা স্থান খুঁজে পায় কেবল ব্যতিক্রম নয়, বরং সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হিসেবে।
এভাবেই লাক্স নারীর উপস্থিতিকে স্বাভাবিক করতে সাহায্য করেছিল, শুধু ক্যামেরার সামনে নয়, বরং সাংস্কৃতিক উৎপাদনের যন্ত্রপাতির ভেতরেও। নারীরা কেবল চেহারার প্রতীক নয়, শিল্প ও সৃজনশীলতার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃতি পেলেন।
১৯৮৩ সালে নূতনের মর্যাদাপূর্ণ উপস্থিতি থেকে শুরু করে ‘লাক্স চ্যানেল আই সুপারস্টার’-এর আকাঙ্ক্ষামূলক মঞ্চ পর্যন্ত, লাক্স গড়ে তুলেছে এমন একটি সাংস্কৃতিক ব্যাকরণ, যেখানে নারীরা আত্মবিশ্বাসী, স্বাবলম্বী, প্রশংসিত ও সমাদৃত হয়ে উঠেছে।
আনিকা চৌধুরী প্রিয়ন্তি: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা









