এরপর শিশু একাডেমি, সাহিত্য একাডেমিতে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিতাম। নাচ, গান, আবৃত্তি, ছবি আঁকা, অভিনয় শেখা এসবের মধ্য দিয়েই আমার ছোটবেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কেটেছে। লেখাপড়ার পাশাপাশি গান শিখতাম, নাচের স্যার আসতেন। পাশাপাশি হুজুর আসতেন, আরবি পড়তাম। সবকিছুই একসঙ্গে করেছি।
লেখাপড়া, নাচ-গান, আবৃত্তি, হুজুরের কাছে পড়া সবই খুব স্বাভাবিক ছিল। সংস্কৃতিকে আমাদের জীবনে কখনো আলাদা করে কিছু ভাবিনি।
ছোটবেলায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অনেক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো। কম-বেশি সবগুলোয় আমি অংশ নিতাম। তখন সেখানকার প্রশাসনের মানুষ, শিক্ষক, শিল্পী সবাই উপস্থিত থাকতেন। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরুর আগে কিরাত দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হতো। আমরা ছোটবেলায় যেমন গান শুনেছি, পাশাপাশি কোরআন তিলাওয়াতও শুনেছি। আলাদা করে কিছু দেখিনি। সবসময় একটা আরেকটার সঙ্গে সহযোগিতার পরিবেশ ছিল। ভিন্ন ধর্মের মানুষও নিজ নিজ ধর্মের উৎসব স্বাধীনভাবে পালন করেছেন, এখনো করছেন।
এ পরিবেশের কারণেই ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে আমি বাংলাদেশের একটি সুন্দর ও সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ জেলা মনে করি। এটা সম্পূর্ণ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অবদান। সেখানকার যে দারুণ সাংস্কৃতিক সহায়তার পরিবেশ ছিল, সেটা শুধু আমার জন্য নয়, সবার জন্যই ছিল। বাচ্চাদের গান, নাচ শেখানোর জন্য অভিভাবকরাই মনের আনন্দে উৎসাহ দিতেন।
আমিও এমন একটি পরিমণ্ডলেই বড় হয়েছি। আমার মা শিক্ষক ছিলেন, আমার দাদাও স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কাটানো সময়গুলোয় সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে সবাইকে কম-বেশি বড় হতে দেখেছি। সে সময় সংস্কৃতিচর্চা করার জন্য আলাদা করে কিছু ভাবতে হতো না, কারণ সেটি পরিবার ও সমাজের জীবনযাপনের মধ্যেই ছিল।
আমি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রতি কৃতজ্ঞ। যখন থেকে শুরু করেছি, তখন থেকে যে মানুষগুলো আমাকে শিখিয়েছেন, আমার গুরুজি, শিক্ষক—সেই পরিমণ্ডলের কারণেই আমি এ সেক্টরে কাজ করতে পেরেছি। একটু চিন্তা করে দেখলে বোঝা যায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে যারা উঠে এসেছেন, তাদের মধ্যে অনেক বড় বড় ব্যক্তিত্ব আছেন। সাংস্কৃতিক চর্চাটা সেখানে নিয়মিত ছিল বলেই এত মানুষের পদচারণা হয়েছে এ অঙ্গনে।
আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতেও ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে উঠে আসা অনেকেই আছেন। আমাদের আলী যাকের চাচা ছিলেন, আলমগীর আঙ্কেল, সাজু খাদেম ভাই। আরো অনেকে আছেন।
সময়ের সঙ্গে সেই সাংস্কৃতিক পরিবেশে পরিবর্তন এসেছে। এখন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড সেখানে কম চর্চা করা হয়, কিংবা অনেক ক্ষেত্রে ভয়ের সঙ্গে চর্চা করা হয়। জায়গাটা বদলেছে।
বর্তমানে ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে নিয়ে আমাদের যে ধারণা তৈরি হয়েছে, সেখানেও একটা পরিবর্তন দরকার। এখন সারা দেশেই অস্থিরতার শেষ নেই, সে প্রভাব সারা দেশেই। ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে যারা চেনেন না, তারা শুধু মারামারির কথা বলেন। নানা কারণে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নেতিবাচক ঘটনাগুলোই বেশি আলোচনায় আসে। এমনকি গণমাধ্যমও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মারামারি নিয়ে রিপোর্ট করতে পিছপা হয় না। অথচ গণমাধ্যমের দায়িত্ব আরো অনেক বেশি।
সেখানে যে সাংস্কৃতিক চর্চাও হয়, সেটা আমরা গত বেশ কয়েক বছর গণমাধ্যমে খুব একটা দেখিনি, শুধু মারামারির খবর দেখেছি। যার কারণে আমরা যারা দর্শক বা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাইরের মানুষ যারা, সেই মাটির স্বাদ পাননি, তারা ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে এক লাইনে ব্যাখ্যা করে ফেলেন। কিন্তু এভাবে ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া একটি দারুণ শহর, দারুণ জায়গা, যেখানে সত্যিকার অর্থেই সাংস্কৃতিক চর্চা হয়েছে।
আমি আমার জেলাকে নিয়ে গর্ববোধ করি। আমার জেলার সন্তান হিসেবে আমি শান্তি বোধ করি। আমি আমার ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে ভালোবাসি।
[সৈয়দ আব্দুল হাদী ও জাকিয়া বারী মমর সাক্ষাৎকার গ্রহণ ও অনুলিখন: অহিদুর রহমান]










