এ জেলার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা দরগাহগুলো শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের স্থান নয়, এগুলোকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে মানুষের সমাগম, নৌযাত্রা, ওরস, জিকির, দোয়া, মাহফিল, বাউল ও মরমি সংগীত, লঙ্গরখানা, মেলা এবং স্থানীয় পণ্য ও খাদ্যসামগ্রীর অস্থায়ী বাজার। ফলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দরগাহ সংস্কৃতিকে বোঝার জন্য এর ধর্মীয় তাৎপর্যের পাশাপাশি নদী ও কৃষিনির্ভর জনজীবনের সঙ্গে এর সম্পর্কও বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। এ সাংস্কৃতিক পরিবেশে আখাউড়ার খড়মপুরের কেল্লা শহীদের দরগাহ, গনি শাহর দরগাহ এবং নবীনগরের মালিক ভরসা দরবার শরিফ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি নবীনগরের নারায়ণপুরে তিতাসের একটি শাখার তীরে অবস্থিত হাসান শাহ দরগাহ এবং সীতারামপুর ও মনতলী এলাকায় তিতাসের মোহনাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা তারিফ শাহ দরগাহও জেলার বিস্তৃত দরগাহ ঐতিহ্যের অংশ। এসব দরগাহর অবস্থান, মানুষের যাতায়াত এবং বার্ষিক আয়োজনের দিকে তাকালে নদী ও লোকসংস্কৃতির একটি গভীর যোগসূত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

গনি শাহ দরবার শরিফ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার থোল্লাকান্দিতে অবস্থিত সুপরিচিত গনি শাহ দরগাহ। গনি শাহকে ঘিরে স্থানীয় ভক্তদের মধ্যে একটি নৌকাকে কেন্দ্র করে বিশেষ ধরনের লোকস্মৃতি প্রচলিত রয়েছে। স্থানীয়ভাবে বলা হয়, গনি শাহের নিজস্ব একটি নৌকা ছিল এবং তিনি দিনের অধিকাংশ সময় সেই নৌকায় বসে কাটাতেন। নদী ও নৌকার সঙ্গে তার এ ঘনিষ্ঠতার স্মৃতি পরবর্তীকালে তাকে ঘিরে গড়ে ওঠা লোকবিশ্বাসেরও একটি অংশ হয়ে ওঠে। গনি শাহকে নিয়ে প্রচলিত কিছু ভক্তিগীতিতেও নৌকা, নদী ও তরীর প্রতীক ব্যবহারের মধ্য দিয়ে এ লোকস্মৃতির প্রতিফলন দেখা যায়।

দূর দূরান্ত থেকে আসা ভক্ত ও আশেকানদের কথা বিবেচনা করে দরগাহে আবাসন ও আপ্যায়নের ব্যবস্থাও গড়ে উঠেছে। দরগাহের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা ও বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার জন্য একটি পরিচালনা কমিটি কাজ করে। পাশাপাশি দরগাহের ব্যবস্থাপনা, সেবামূলক কার্যক্রম এবং উন্নয়নমূলক উদ্যোগ পরিচালনার ক্ষেত্রে দরবার পরিষদ ও দরবার উন্নয়ন পরিষদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দরগাহ প্রাঙ্গণে শাহি লঙ্গরখানা রয়েছে, যেখানে ভক্তদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। দরগাহর সেবার সঙ্গে যুক্ত ভক্ত নূর মোহাম্মদ রমিজের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতি সপ্তাহের বৃহস্পতিবার এখানে মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয় এবং উপস্থিত ভক্তদের মধ্যে তবারক বিতরণ করা হয়। প্রতি বছর অনুষ্ঠিত বার্ষিক ভক্ত সম্মেলন এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ সম্মেলনকে ঘিরে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ভক্ত ও আশেকানরা এখানে সমবেত হন এবং পারস্পরিক যোগাযোগ ও ধর্মীয় ভাব বিনিময়ের সুযোগ তৈরি হয়।

স্থানীয় লোকসংস্কৃতিতেও তার উপস্থিতি স্পষ্ট। তাকে নিয়ে স্থানীয়ভাবে বেশকিছু ভক্তিমূলক গান রচিত ও পরিবেশিত হয়েছে। স্থানীয় গীতিকার হারুন এবং শিল্পী শরীফউদ্দিনের কণ্ঠে প্রচলিত গানগুলোতে, গনি শাহকে ভক্তের প্রিয় ‘মুর্শিদ’ এবং আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এসব গানের ভাষা সরল হলেও এর মধ্যে ভক্তি, আত্মসমর্পণ এবং মুর্শিদের প্রতি গভীর আস্থার অনুভূতি প্রকাশ পেয়েছে। যেমন ‘প্রাণের মুর্শিদ, তোমার নামে ভাসাইলাম তরী’। পঙ্‌ক্তিতে ‘তরী’ একটি তাৎপর্যপূর্ণ প্রতীক। নদীমাতৃক বাংলার লোকজ সংস্কৃতিতে নৌকা ও তরী মানুষের দৈনন্দিন জীবনের পরিচিত অনুষঙ্গ। কিন্তু মরমি ও ভক্তিমূলক গানের পরিসরে ‘তরী’ অনেক সময় মানুষের আত্মিক যাত্রার প্রতীক হয়ে ওঠে। সে অর্থে ‘তোমার নামে ভাসাইলাম তরী’ পঙ্‌ক্তিটি মুর্শিদের প্রতি ভক্তের সম্পূর্ণ আস্থা ও আত্মসমর্পণের ভাব প্রকাশ করে। গনি শাহর নৌকার সঙ্গে সম্পর্কিত স্থানীয় লোকস্মৃতির আলোকে এ প্রতীক ব্যবহারের বিষয়টি আরো তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।

কেল্লা শাহ দরবার শরিফ

আখাউড়ার খড়মপুরে অবস্থিত হজরত সৈয়দ আহম্মদ (রহ.)-এর দরগাহ সারা দেশে কেল্লা শহীদের দরগাহ বা কেল্লা শাহর দরগাহ নামে পরিচিত। দরগাহটির সঙ্গে তিতাস নদীর সম্পর্ক স্থানীয় ঐতিহ্যে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রচলিত কাহিনী অনুযায়ী, একসময় খড়মপুরের জেলেরা তিতাস নদীতে মাছ ধরার সময় তাদের জালে একটি খণ্ডিত শির পান। লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে, সেই মস্তক আল্লাহর কুদরতের কথা বলে এবং জেলেদের কলেমা পাঠ করে মুসলমান হওয়ার নির্দেশ দেয়। পরবর্তীকালে চৈতন দাস ও তার সঙ্গীরা ইসলাম গ্রহণ করেন এবং মস্তকটি ইসলামী মতে খড়মপুরে দাফন করেন।

sfsdfsdfsdfs

কেল্লা শাহর ওরসকে ঘিরে প্রতি বছর বিপুল মানুষের সমাগম হয়। বিশেষত বর্ষাকালে তিতাস যখন পানিতে টইটম্বুর হয়ে ওঠে, তখন বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ নৌকাযোগে খড়মপুরে আসেন। রঙবেরঙের নিশানায় সজ্জিত নৌকা, ভক্ত-আশেকানদের সমবেত যাত্রা এবং নৌকার মধ্যে গান-বাজনা—সব মিলিয়ে নদীপথটিও যেন ওরসের সাংস্কৃতিক পরিসরের অংশ হয়ে ওঠে। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত গান—

‘যাবো কেল্লার রওয়াজায়,

তোরা জলদি করে আয়,

নৌকা দিব ছাড়িয়া,

যাইতাম খরমপুরে।’

গানটি সেই নৌযাত্রার আবেগকে ধারণ করে। এখানে নদী শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়, এটি মানুষের বিশ্বাস, আনন্দ ও লোকসংগীতকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বহন করে।

মালিক ভরসা দরবার শরিফ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার বীরগাঁওয়ে অবস্থিত মালিক ভরসা দরবার শরিফ জেলার দরগাহ-ঐতিহ্যের আরেকটি উল্লেখযোগ্য ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। এ দরবারকে ঘিরে যে লোকস্মৃতি গড়ে উঠেছে, তার কেন্দ্রে রয়েছেন নূরুল হোসাইন, যিনি ভক্তদের কাছে মালিক ভরসা নামে অধিক পরিচিত। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত আছে, তিনি কোনো কাজ শুরু করার আগে ‘আল্লাহ ভরসা’ বলে কাজ আরম্ভ করতেন। তার এ অভ্যাস মানুষের মধ্যে এতটাই পরিচিত হয়ে ওঠে যে পরবর্তীকালে ‘মালিক ভরসা’ নামটিই তার পরিচয়ের সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়ে যায়।

ভক্তদের কাছে তিনি হযরত খাজা শাহ হাছান সাঈয়্যিদ নূরুল হোসাইন আহম্মদ চিশতী নামেও পরিচিত। তিনি নবীনগর উপজেলার বড়াইল গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। পেশাগত জীবনে শিক্ষকতায় যুক্ত থাকার পাশাপাশি তিনি হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা প্রদান করতেন। স্থানীয় মানুষের বর্ণনা অনুযায়ী, দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য তিনি বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিতেন। শিক্ষকতা ও চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের প্রতি তার এ সহমর্মিতা স্থানীয় সমাজে তার প্রতি শ্রদ্ধা ও আস্থার পরিবেশ তৈরি করে। পরবর্তী সময়ে তার স্মৃতিকে কেন্দ্র করেই দরবার শরিফের ধর্মীয় ও সামাজিক পরিসর বিস্তৃত হয়।

দরবার শরিফের চারপাশের পরিবেশেও এর স্বাতন্ত্র্যের পরিচয় পাওয়া যায়। প্রাঙ্গণে ছোট ছোট বাগান, হাঁটার জন্য নির্দিষ্ট স্থান এবং কারুকার্যখচিত দেয়াল রয়েছে। সোনালি রঙের অলংকরণে সজ্জিত স্থাপত্যিক উপাদানগুলো দরবারের পরিবেশকে একটি স্বতন্ত্র নান্দনিকতা দিয়েছে। একই সঙ্গে নূরুল হোসাইন আহম্মদ চিশতীর ব্যক্তিগত ব্যবহৃত কিছু সামগ্রীও এখানে সংরক্ষিত রয়েছে। এর মধ্যে হারিকেন, আলমারি এবং বিভিন্ন ধরনের তৈজসপত্র উল্লেখযোগ্য। এসব বস্তু তার ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে ভক্তদের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এছাড়া দরবার শরিফের প্রাঙ্গণে মালিক ভরসার স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য একটি হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসালয় রয়েছে। বর্তমানে তার শিষ্যরা চিকিৎসালয়টি পরিচালনা করছেন। মালিক ভরসাকে ঘিরে স্থানীয় লোকসংস্কৃতিতেও ভক্তির প্রকাশ লক্ষ করা যায়। তাকে নিয়ে প্রচলিত একটি গানে বলা হয়েছে—

‘চাই না আমি জমিদারি,

চাই তোমার দর্শন।

মালিক ভরসা, তোমায় সঁপে দিলাম মন।’

এ গানের বক্তব্যে পার্থিব সম্পদ ও সামাজিক মর্যাদার আকাঙ্ক্ষার পরিবর্তে আধ্যাত্মিক প্রাপ্তি এবং সাধকের দর্শনলাভের আকাঙ্ক্ষাকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। ‘জমিদারি’ এখানে বস্তুগত সম্পদ ও পার্থিব আকাঙ্ক্ষার প্রতীক, আর ‘দর্শন’ ও ‘মন সঁপে দেয়া’ প্রকাশ করে আধ্যাত্মিক আশ্রয় এবং আত্মসমর্পণের আকাঙ্ক্ষা। ফলে গানটি কেবল একজন সাধকের প্রশংসাগীতি হিসেবে নয়, বরং ভক্ত ও সাধকের মধ্যকার আধ্যাত্মিক সম্পর্কের একটি লোকজ অভিব্যক্তি হিসেবেও বিবেচনা করা যায়। মালিক ভরসা দরবার শরিফের ক্ষেত্রেও নূরুল হোসাইনের জীবন, তার মানবসেবা, ভক্তদের স্মৃতিচর্চা, সংরক্ষিত ব্যবহার্য সামগ্রী এবং তাকে নিয়ে রচিত গান—সবকিছু মিলিয়ে একটি বহুমাত্রিক স্মৃতিভুবন গড়ে উঠেছে। এ স্মৃতিভুবনই দরবার শরিফকে স্থানীয় ধর্মীয় পরিসরের পাশাপাশি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বৃহত্তর লোকঐতিহ্য ও দরগাহ সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত করেছে।

বাংলা সন, কৃষিজীবন ও ওরসের সময়চক্র

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দরগাহগুলোর ওরসের সঙ্গে স্থানীয় কৃষিজীবনের সময়চক্রের একটি বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। গ্রামীণ সমাজে সময়ের ধারণা শুধু ক্যালেন্ডারের তারিখ দিয়ে নির্ধারিত হয় না। ঋতু, কৃষিকাজ, ফসল এবং সামাজিক উৎসবও সময়কে চিহ্নিত করে। এ কারণে দরগাহের ওরসও স্থানীয় মানুষের কাছে প্রতি বছরের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রতীক্ষিত আয়োজন। অনেক ওরস বৈশাখের পরের দিকে অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় কৃষকের ঘরে ধান থাকে, গোলা ভরে থাকে নতুন ফসলে এবং দীর্ঘ কৃষিশ্রমের পর মানুষের মনে এক ধরনের স্বস্তি ও আনন্দ তৈরি হয়। বছরের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৃষিচক্র সম্পন্ন হওয়ার পর মানুষ তখন কিছুটা অবসর পায়। ফলে আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও পরিচিতজনদের সঙ্গে দলবদ্ধভাবে দরগাহে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। ধর্মীয় আয়োজনের সঙ্গে সামাজিক মিলন ও আনন্দ যুক্ত হয়।

ওরসের তারিখ নির্ধারণে বাংলা সন ও বাংলা তারিখের হিসাবও স্থানীয় সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বৈশাখ, ভাদ্র কিংবা অন্য কোনো বাংলা মাস এখানে কেবল সময়ের নাম নয়। এগুলো কৃষিকাজ, ঋতু, ফসল এবং সামাজিক আয়োজনের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে দরগাহের বার্ষিক ওরস স্থানীয় মানুষের কাছে একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের পাশাপাশি একটি সাংস্কৃতিক সময়চিহ্ন হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত। এ সময়চক্রের সঙ্গে মানুষের আবেগও যুক্ত থাকে। গোলাভরা ধান যেমন অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অনুভূতি দেয়, তেমনি ওরস মানুষের মনে সামাজিক আনন্দেরও সৃষ্টি করে। কেউ পরিবার নিয়ে আসেন, কেউ কাফেলায়, কেউ নৌকাযোগে। ফলে কৃষিজীবনের স্বস্তি, ধর্মীয় ভক্তি ও সামাজিক আনন্দ একই সময়ের মধ্যে এসে মিলিত হয়।

নদী, নৌকা ও লোকসংস্কৃতির সেতুবন্ধ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দরগাহ সংস্কৃতির একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো নদীর সঙ্গে এর ঘনিষ্ঠতা। তিতাস ও তার শাখা-প্রশাখা এ অঞ্চলের জনজীবন, যোগাযোগ ও সংস্কৃতিকে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবিত করেছে। অনেক দরগাহ নদী বা নদীর শাখার কাছাকাছি অবস্থিত হওয়ায় জলপথ মানুষের যাতায়াতের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে। নবীনগরের হাসান শাহ দরগাহ নারায়ণপুরে তিতাসের একটি শাখার তীরে অবস্থিত। আবার তারিফ শাহ দরগাহ সীতারামপুর ও মনতলী এলাকায় তিতাসের মোহনাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। এসব অবস্থান ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দরগাহগুলোর সঙ্গে নদীভিত্তিক ভূপ্রকৃতির সম্পর্ককে স্পষ্ট করে।

বর্ষাকালে নদী যখন পানিতে পরিপূর্ণ হয়, তখন এ জলপথে মানুষের চলাচলও বৃদ্ধি পায়। রঙিন নিশানায় সাজানো নৌকা যখন দরগাহের দিকে এগিয়ে যায়, তখন নৌযাত্রা নিজেই এক ধরনের লোকজ উৎসবে পরিণত হয়। এ নৌযাত্রা বিভিন্ন এলাকার মানুষের মধ্যে সাংস্কৃতিক যোগাযোগও তৈরি করে। এক অঞ্চলের মানুষ অন্য অঞ্চলের গান শোনে, খাদ্য ও পণ্য নিয়ে আসে, নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হয়। অর্থাৎ নদী এখানে শুধু যোগাযোগের পথ নয়, সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানেরও একটি মাধ্যম।

ওরস, মেলা ও স্থানীয় অর্থনীতির প্রাণচাঞ্চল্য

ওরসের সময় দরগাহ প্রাঙ্গণ ও আশপাশ এলাকা কয়েক দিনের জন্য একটি প্রাণবন্ত সামাজিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত হয়। দূর-দূরান্ত থেকে আসা ভক্ত-আশেকানদের জন্য লঙ্গরখানা খোলা হয়। বিভিন্ন ধর্মের মানুষও এসব দরগাহে আসেন। ফলে ধর্মীয় আয়োজনের পাশাপাশি সামাজিক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক যোগাযোগের একটি পরিবেশ সৃষ্টি হয়। মেলাকে কেন্দ্র করে বসে অস্থায়ী বাজার। খাবারের দোকানে পাওয়া যায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার স্থানীয় বিভিন্ন খাবার ও মিষ্টি। পাশাপাশি থাকে মাটির তৈরি সামগ্রী, পাট ও বাঁশের তৈরি পণ্য, স্থানীয় কারুশিল্প এবং অস্থায়ী কসমেটিকসের দোকান। শিশুদের আকর্ষণের জন্য থাকে নাগরদোলা। ফলে ওরসের ধর্মীয় আবহের সঙ্গে যুক্ত হয় স্থানীয় খাদ্য ও কারুশিল্পের ঐতিহ্য এবং গ্রামীণ বিনোদন। এ মেলার অর্থনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, খাবার বিক্রেতা, কারুশিল্পী, হকার, নৌকার মাঝি এবং বিভিন্ন সেবাদাতা এ সময় অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ পান। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্য সরাসরি ক্রেতার কাছে বিক্রি হয়। নদীপথে যাতায়াতের ফলে মাঝিদেরও বাড়তি কর্মসংস্থান তৈরি হয়। অর্থাৎ ওরসকে ঘিরে যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি হয়, তা একটি সাময়িক বাজারের চেয়েও বিস্তৃত। এখানে ধর্মীয় সমাবেশ মানুষের চলাচল বাড়ায়, মানুষের চলাচল বাজার সৃষ্টি করে এবং সেই বাজার স্থানীয় উৎপাদক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য আয়ের সুযোগ তৈরি করে।

কেল্লা শাহর তিতাস, গনি শাহর ভাদ্র মাসের ওরস, মালিক ভরসাকে ঘিরে মানুষের ভক্তি, নারায়ণপুরের তিতাস শাখা নদীর তীরে অবস্থিত হাসান শাহ দরগাহ এবং তিতাসের মোহনার কাছে তারিফ শাহ দরগাহ—সব মিলিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটি সমৃদ্ধ দরগাহ ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বাংলা সনের সময়চেতনা, কৃষকের গোলাভরা ধানের আনন্দ, বর্ষার নদী, নিশানাসজ্জিত নৌকা, বাউল ও মরমি সংগীত, জিকির, দোয়া, মাহফিল, লঙ্গরখানা, স্থানীয় খাবার, মেলা ও ক্ষুদ্র ব্যবসা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দরগাহগুলোর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য সম্ভবত এখানেই—এগুলো অতীতের কোনো স্থির স্মৃতিচিহ্ন নয়, বরং মানুষের অংশগ্রহণে প্রতিনিয়ত পুনর্নির্মিত একটি জীবন্ত ঐতিহ্য। বর্ষার নদীতে রঙিন নিশানায় সাজানো নৌকা, দরগাহমুখী মানুষের কণ্ঠে ভেসে আসা গান, ওরসের জিকির ও মাহফিল, লঙ্গরখানার সমবেত আহার, স্থানীয় খাবারের সুবাস, মাটি-পাট-বাঁশের পণ্যের পসরা এবং মেলার কোলাহল—সবকিছু মিলিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া হয়ে উঠেছে নদী, দরগাহ ও লোকসংস্কৃতির এক জীবন্ত জনপদ।

সোনিয়া আক্তার: সিনিয়র লেকচারার, ডিপার্টমেন্ট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি