ব্রাহ্মণবাড়িয়া সাংস্কৃতিক কারণে বিখ্যাত। ওখানে একসময় সংস্কৃতিচর্চা ছিল নিয়মিত ব্যাপার। প্রায় প্রতিটি বাড়িতে সকাল-সন্ধ্যায় গান-বাজনার আওয়াজ শোনা যেত, ছেলেমেয়েরা রেওয়াজ করত। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটা সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল ছিল, যেটা আমার ওপর প্রভাব ফেলাটাই স্বাভাবিক। আমি ব্রাহ্মণবাড়িয়া টাউন হলে বাচ্চাদের নাটক করেছি, অনেক নাটক দেখেছি। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবকে সেখানে দেখেছি। সংগীত সংসদের সেই চমৎকার পরিবেশ দেখেছি, বড় বড় ওস্তাদকে সেখানে বসতে দেখেছি।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো শিক্ষা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা আমার মনে হয় বাংলাদেশের আর যেকোনো জায়গার চেয়ে বেশি ছিল। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দুজন বিখ্যাত মানুষ ছিলেন, যাদের খ্যাতি সারা ভারতে ছড়িয়ে ছিল। অথচ তাদের নাম আমরা কেউই তেমন জানি না। একজন ব্যারিস্টার এ রসুল। যতদূর জানি, তিনি অবিভক্ত বাংলার প্রথম মুসলিম ব্যারিস্টার ছিলেন। আরেকজন আমারই একজন পূর্বপুরুষ, স্যার সৈয়দ শামসুল হুদা। ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি ডক্টর রাজেন্দ্র প্রসাদ তার সহকারী হিসেবে কাজ করেছিলেন। যিনি ১৯১০ সালে সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯১১-১৫ সাল পর্যন্ত তিনি ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সদস্য এবং ১৯১২-১৯ সাল পর্যন্ত বাংলার গভর্নরের এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯১৭ সালে কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পেয়ে বাংলার দ্বিতীয় মুসলিম বিচারপতি হন।

বাংলাদেশের শিক্ষাদীক্ষায়ও তার বিরাট অবদান রয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও তার বড় ভূমিকা ছিল। এটা আমাদের গর্বের বিষয়, অথচ আমরা অনেকেই এসব জানি না, খবর রাখি না।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল সেখানকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও আয়োজন। ষাটের দশক থেকেই ব্রাহ্মণবাড়িয়া টাউন হলে নিয়মিত নাটক ও অনুষ্ঠান হতো। ছোটবেলায় স্কুলজীবনে আমিও সেই টাউন হলে বাচ্চাদের নাটক ও স্কুলের নাটকে অংশ নিয়েছি। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সাহেব একবার ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এসেছিলেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়াবাসী তাকে খুব অনুরোধ করে নিয়ে এসেছিলেন, টাউন হলেরই একটি অনুষ্ঠানে, যতদূর মনে পড়ে। সেখানে তার অনুষ্ঠান দেখতে আমরা গিয়েছিলাম, তাকে দেখেছি। উনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ারই লোক ছিলেন।

আরেকটি জায়গা ছিল সংগীত সংসদ। বাংলাদেশের আর কোথাও এ রকম প্রতিষ্ঠান খুঁজে পাওয়া যাবে না। এটা ছিল গান-বাজনার একটি কেন্দ্র, যেখানে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সব গুণী শিল্পী-সাহিত্যিক নিয়মিত বসতেন, গান-বাজনা হতো, চমৎকার একটি পরিবেশ ছিল। আমরা ছোটবেলায় সেখানে গিয়েছি এবং সেখান থেকেই গান-বাজনার শিক্ষার বিষয়টি প্রথম অনুভব করতে পেরেছি। কারণ সেখানে বড় বড় ওস্তাদ যেতেন, কিছু ছাত্রছাত্রীও শিখতেন। আমিও কিছুদিন সেখান থেকে একেবারে বেসিক কিছু শিক্ষা পেয়েছি।

সুবল দাস, আমাদের দেশের সংগীত পরিচালনার একজন পথিকৃৎ, তার বাড়িও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুতুলনাচ এবং তখনকার অপেরা পার্টি বা যাত্রার জন্যও বিখ্যাত ছিল। ফলে ছোটবেলা থেকেই এ পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হওয়াটা আমার জন্য স্বাভাবিক ছিল।

এ সাংস্কৃতিক পরিবেশের স্মৃতির কারণেই বর্তমানে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাংস্কৃতিক অবস্থার কথা শুনলে আমার খারাপ লাগে। এখন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সঙ্গে আমার যোগাযোগ খুবই কম। তবে আমি খুব মর্মাহত হয়েছি এত পুরনো, এত চমৎকার একটি সংগীত সংসদ, একটি সংস্কৃতির কেন্দ্র ছিল, সেটি এখন আর নেই। এটা আমরা রেখে দিতে পারলাম না—এটা দুঃখের বিষয়, আশ্চর্যের বিষয়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সংস্কৃতিচর্চার দিক থেকে বর্তমানে অনেকখানি পিছিয়ে গেছে। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর নাম জড়িয়ে থাকা যে প্রতিষ্ঠানটি ছিল, সেটি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। সাংস্কৃতিক পরিবেশকে একটি পক্ষ জেনেশুনে, ইচ্ছাকৃতভাবে ধ্বংস করার চেষ্টা করছে। ইদানীং শুনেছি সেখানে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বাধা দেয়া হচ্ছে, এসব নিয়ে হইচই ও গণ্ডগোল হয়েছে। এটা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির সঙ্গে মানায় না, যায় না। আমি আশ্চর্য হই, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কী হয়ে গেল!

সংস্কৃতির এ অবস্থার দায় শুধু সরকারের ওপর দিয়ে দিলে হবে না। আমরা কথায় কথায় শুধু সরকারকে দোষ দিই, সরকারের দায়িত্ব আছে কিনা বলি, কিন্তু মানুষের দায়িত্ব নেই? আমি সেটাই আগে বলব, আমাদের সাধারণ মানুষেরও দায়িত্ব আছে। সরকারি প্রচেষ্টায় সংস্কৃতিচর্চা হয় না, মানুষের দ্বারাই সংস্কৃতিচর্চা হয়। সরকার টাকা-পয়সা ঢাললেই সংস্কৃতির উন্নতি হয় না। মানুষের মানসিকতা, সংস্কৃতিবোধ, সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসাই আসল কথা। সরকার সাহায্য করতে পারে, কিন্তু সরকার করে দেবে, তা হয় না।

কিছুক্ষেত্রে সরকারের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। যেমন ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সংগীত বিদ্যালয় পুড়িয়ে দেয়ার ঘটনা হঠাৎ ঘটেনি। এর পেছনে অবশ্যই প্রস্তুতি ছিল। অথচ প্রশাসন কিছুই জানতে পারল না। এটা বিশ্বাস করা যায় না।

এছাড়া ইদানীং সবখানেই দেখি বিভিন্ন অনুষ্ঠান পণ্ড করে দেয়া হচ্ছে, বাধা দেয়া হচ্ছে—শুধু ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নয়, বিভিন্ন জায়গায় এমনটা হচ্ছে। এগুলো কোনো ভালো লক্ষণ নয়। সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে আমরা মহৎ কিছু অর্জন করতে পারব না। যারা এমন মনে করে, তাদের ধারণাটা ভুল, ভ্রান্ত। সংস্কৃতি হচ্ছে সভ্যতার নির্যাস। এর ওপর আঘাত এলে সভ্যতার ওপরই আঘাত করা হয়। আমরা তখন সভ্য থাকব না, সভ্য বলা যাবে না।

আমার নিজের স্মৃতির সঙ্গে যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাংস্কৃতিক পরিবেশ জড়িয়ে আছে, সে জায়গা থেকেই আজকের পরিস্থিতি আমাকে বেশি কষ্ট দেয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সংস্কৃতি আজ অনেকখানি পিছিয়ে গেছে, এটাই আমার দুঃখ।