চোরাচালান, অস্ত্র, মাদক ব্যবসা থেকে উদ্ভূত নানা ধরনের অপরাধের জন্য ভারতের উপকূলীয় শহর মুম্বাই বিখ্যাত, নাকি কুখ্যাত? ‘বিখ্যাত’ শব্দটি আনার কারণ খবরের কাগজ থেকে শুরু করে বলিউডের সিনেমায় এ অপরাধের রোমান্টিক চিত্রায়ণ দেখা যায় হরহামেশাই। অপরাধ, সন্ত্রাসের জন্য সমুদ্রতীরবর্তী শহরগুলোতে সুযোগ সবসময়ই বেশি থাকে। এ কারণে সমুদ্রতীরবর্তী পাকিস্তানের করাচি শহরও বহুকাল ধরে অপরাধের স্বর্গরাজ্য ছিল। আধুনিককালের আগেও বিভিন্ন বিদেশী আগ্রাসনের সময়ে করাচির আইনশৃঙ্খলা বহুবার ভেঙে পড়েছে। পরবর্তী সময়ে নানা রাজনৈতিক, জাতিগত সংকটের মধ্য দিয়ে যাওয়া শহরটি একটা সময়ে ‘ত্রাসের শহর’ বলেও পরিচিতি পায়।
ভারত ভাগের পর ১৯৪৮ সাল থেকে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে করাচিতে মানুষের আগমন হয়। পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের এ প্রধান শহরটি পরবর্তী চার-পাঁচ বছরের মধ্যে নানা জাতির মানুষের বসতিতে পরিণত হয়। কিন্তু অবস্থানের বিষয়টি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান হয়নি। দেশভাগের সময়ে ১৯৪৮ সালে করাচিতে দাঙ্গা সংঘটিত হয়। এটিকে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের মতো করেই দেখা যায় কিন্তু মোহাজির এবং সিন্ধিদের মধ্যে তৈরি হওয়া তিক্ততা জাতিগত দাঙ্গার কারণ হয়ে উঠেছিল। স্থানীয় সিন্ধিদের সঙ্গে পরবর্তী সময়ে পশতুনরা যুক্ত হলে বহিরাগতদের (মোহাজির) সঙ্গে দাঙ্গায় জড়িয়ে পড়ে। এটা প্রায় প্রমাণিত যে কোনো দাঙ্গাই রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা কিংবা ইন্ধন ছাড়া ঘটে না। করাচির ক্ষেত্রে প্রথম বড় দাঙ্গাটি ১৯৭২ সালে হয়েছিল। জুলফিকার আলী ভুট্টোর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফলে সংঘটিত এ দাঙ্গায় বেশকিছু হতাহতের ঘটনা ঘটে।
করাচির পরবর্তী দাঙ্গাটিকে ধর্মীয়-সাম্প্রদায়িক বলা চলে। ১৯৭৪ সালে আহমদিয়াদের প্রতি বিদ্বেষ থেকে তাদের ওপর সহিংস হামলা আরম্ভ হয়। ধর্মীয় কট্টর দলগুলোর চাপে যতদিন না ভুট্টো তাদের অমুসলিম ঘোষণা দেন, ততদিন এ সহিংসতা চলমান ছিল। ’৪৭ পরবর্তী করাচি মোহাজিরদের এলাকা হয়ে ওঠে এবং তাদের গঠিত ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলো ভুট্টোর বিরোধী ছিল। কিন্তু স্থানীয় সিন্ধিদের মধ্যে ভুট্টোর সমর্থন ছিল শক্ত। ১৯৭৭ সালে জুলফিকার আলী ভুট্টো ক্ষমতা হারালে সিন্ধু প্রদেশ টালমাটাল অবস্থার মধ্যে পড়ে। করাচিতে সহিংসতা এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে কারফিউ জারি করার প্রয়োজন হয়েছিল। এ সময়ের মধ্যেই ছাত্রনেতা আলতাফ হোসেনের নেতৃত্বে মোহাজিরদের পক্ষে একটি ছাত্র সংগঠন তৈরি হয়।
প্রাথমিকভাবে দলটি সম্ভাবনা সৃষ্টি করলেও অল্প সময়েই দেখা যায় যে সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছাত্ররা মাদক, অস্ত্র ব্যবসা থেকে শুরু করে নানা সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ে। মূলত এ পর্যায়ে করাচি একটি আন্তর্জাতিক রাজনীতির শিকার হয়েছিল। আফগানিস্তানে সোভিয়েত আধিপত্যের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অস্ত্র ও অর্থ সরবরাহ করা হলে তার কিছু অংশ খুব সহজেই বেলুচিস্তান, সিন্ধুতে পৌঁছে যায়। করাচির ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছাত্রদের হাতে হাতে কালাশনিকভ উঠে আসে। সেই সঙ্গে মাদকের সহজলভ্যতার কারণে করাচির তরুণ সমাজ মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। জেনারেল জিয়াউল হক ক্ষমতা লাভ করলে তিনি বহুদলীয় রাজনীতি রদ করেন। অস্ত্রের এ ঝনঝনানির মধ্যে ১১টি দল জোট গঠনের পাশাপাশি করাচির রাজনীতি মারমুখী হয়ে ওঠে। ১৯৮৩ সালে ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার’ আন্দোলনে ৬০-২০০ জন মৃত্যুবরণ করে এবং ১৫ হাজার মানুষ গ্রেফতার হয়। ভয়ভীতি একটি স্বাভাবিক বিষয় হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক ডামাডোল ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে করাচিকে ‘ত্রাসের শহর’ বলা ভুল হয় না।
সে ভয়ের শহরে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী দাঙ্গাটি ১৯৮৫ সালে সংঘটিত হয়। বুশরা যায়দি নামের ২০ বছর বয়সী এক মোহাজির তরুণী সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করে। স্যার সৈয়দ কলেজের ছাত্রী বুশরাকে ধাক্কা দেয়া বাসটির চালক ছিল একজন কাশ্মীরি, কিন্তু প্রাথমিকভাবে তাকে পশতুন বলে সন্দেহ করা হয়েছিল। করাচির পরিবহন ব্যবস্থা পশতুনদের হাতে থাকার কারণে ধারণা করা হয় এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। ঘটনার পর মোহাজিররা সড়কে প্রতিবাদের পাশাপাশি বাস-ট্রাকে অগ্নিসংযোগ করে। বিপরীতে পশতুনরা জবাব দেয়ার পন্থা হিসেবে মোহাজিরদের এলাকায় তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। সরকারি হিসাব অনুসারে, ১৫ এপ্রিল সংঘটিত এ দাঙ্গায় ৫০ জনের মৃত্যু হয়। বেসরকারি হিসাবে এ সংখ্যা ১০০-এর বেশি।
মোহাজিরদের এমকিউএম পার্টি এবং সিন্ধি, পশতুন ও পাঞ্জাবিদের মধ্যে জাতিগত সংঘাত ছিল প্রবল। ১৯৯২ সালে বিতর্কিত সরকারি অভিযানে এমকিউএমের নেতাকর্মী, সমর্থকদের টার্গেট করা হয়। ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত এ অভিযান অব্যাহত ছিল।
এসব রাজনৈতিক, জাতিগত সংকটের পাশাপাশি করাচির পথে-প্রান্তরে ছুটকো-ছাটকা উৎপাতও আরম্ভ হয়। বন্দর নগরী হওয়ার কারণে করাচিতে নাবিকের পাশাপাশি অপরাধীদেরও আনাগোনা লেগে থাকত। মুম্বাইয়ের মতো করাচিও চোরাচালানের পীঠস্থান হয়ে ওঠে। লারি অঞ্চলটি এর মধ্যে নানা অপরাধের কেন্দ্রে পরিণত হয়। এখানেই পরবর্তীকালে করাচির বহু ‘নামকরা’ অপরাধী বেড়ে উঠতে থাকে। আফগানিস্তান থেকে আগত হেরোইন ভারতে পরিবহনের ক্ষেত্রে করাচি মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে। লারি অঞ্চলে এ সুযোগে অস্ত্র, জুয়া ও অবৈধ নানা ব্যবসার রমরমা অবস্থা তৈরি হয়।
করাচির এ লারি অঞ্চলটি ডাকাতদের জন্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কালাশনিকভ, চোরাচালান আর অনিয়ন্ত্রিত মাদকের ব্যবসার কারণে সহজেই এখানে সন্ত্রাসী তৈরি হতে থাকে। ‘ডাকাত’ শব্দটি করাচিতে যদিও একটি গ্রামীণ সংঘবদ্ধ চক্রকে বোঝাত, পরবর্তী সময়ে শহরাঞ্চলের সন্ত্রাসীদেরও এ নাম দেয়া হয়। উদাহরণস্বরূপ রেহমান ডাকাতের নাম করা যেতে পারে। নব্বইয়ের দশকে অপরাধ জগতে প্রতিষ্ঠিত রেহমানের জন্ম সত্তরের দশকে। রেহমানের বিরুদ্ধে নিজের মাকে হত্যার অভিযোগ রয়েছে। কেউ বলে ওই অঞ্চলের এক প্রভাবশালী ব্যক্তিকে হত্যা করতে গিয়ে রেহমান জানতে পারেন, ওই ব্যক্তিই তার বাবা। তখন সেই রাগ নিজের মায়ের ওপর দেখিয়ে মাকে হত্যা করে সে। আবার রেহমানের আত্মীয়স্বজনের মতে, কালাশনিকভ পরিষ্কার করার সময় ভুলবশত গুলি বেরিয়ে তার মা ফাহমিদা শিরিনের মৃত্যু হয়। দ্বিতীয় সম্ভাবনাটিকে বিবেচনায় নিলে বোঝা যায় কালাশনিকভ তখন কতটা ‘খেলো’ হয়ে উঠেছিল। এ সময়েই রেহমানের নামের সঙ্গে ‘ডাকাইত’ যুক্ত হয় এবং মোটামুটি ১৯৯৭-২০০৬ পর্যন্ত তার প্রভাব বজায় ছিল। রেহমান রাজনীতিতে আসতে চেয়েছিল কিন্তু সফল হতে পারেনি। পরে তার সঙ্গী উজাইর বালুচ ‘পিপলস আমান কমিটি’ গঠন করে, যারা আলতাফ হোসেনের এমকিউএমকে প্রধান শত্রু হিসেবে বিবেচনা করেছিল।
করাচির অবস্থা একটা সময়ে এমন হয়েছিল যে মোহাজিররা ভয়ে ভয়ে পথ চলত। বিশেষত, নিরিবিলি সড়কে তো একা চলার কথা ভাবাই যেত না। লরেন্ট গেয়ার লিখেছেন, ‘নির্জন গলিতে ঢোকার সময় তারা গাড়ির কাচ তুলে দিতেন।’ গোলাগুলির ঘটনা খুবই বেড়ে যায়। ১৯৮৮ সালে সিন্ধি সন্ত্রাসীরা হায়দরাবাদে মোটরবাইকে চড়ে এলাপাতাড়ি গুলি ছুড়তে থাকে, যাতে প্রায় ২৫০ জন নিহত হন। পরের দিন করাচিতে সে খবর পৌঁছলে করাচির লোকেরা পথে নেমে গাড়িঘোড়ায় অগ্নিসংযোগ করেন, যাতে ৬০-৬৫ জন হতাহত হয়। ১৯৯০ সালে পাকা কেল্লায় মোহাজিরদের মিছিলে পুলিশ গুলি চালালে সেখানেও বহু লোক মৃত্যুবরণ করে। অর্থাৎ অবস্থা এমন হয়েছিল যে একটা সময় করাচিতে ঘর ছেড়ে বেরোনোর মানেই যেন মৃত্যুঝুঁকি। লরেন্ট গেয়ার তার Karachi-Ordered
Disorder and the Struggle for the City বইয়ে এক করাচিবাসীর বয়ানে লিখেছেন, একটা সময় বাইরে কোনো গণ্ডগোল হলে লোকে সহজে খোঁজখবর করত না। প্রথমত তারা সাহস পেত না, তাছাড়া দুদিন পর খবর এমনিই পাওয়া যেত।
করাচির শিশুদের মধ্যেও যে ভীতি চেপে বসেছিল, আরেকটি ঘটনা সে চিত্র দেখায়। একটি মেয়ে তার পুতুলদের সরিয়ে রাখছিল এবং বাবাকে বলছিল, ‘ওদের আর কোনো ক্ষতি হবে না।’ করাচিতে কেন ‘ভয়ের শহর’ বলা হয়, এর চেয়ে বড় উদাহরণ আর প্রয়োজন নেই।
২০১৩ সালে সরকারি বাহিনী করাচিতে সর্বাত্মক অভিযান শুরু করে। এরপর শহরে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ কমতে শুরু করে। ২০১৫ সালে শহরের রিয়েল এস্টেট ব্যবসা বিকশিত হতে শুরু করে, কারণটা ছিল নিরাপত্তার গ্যারান্টি। একই সঙ্গে ক্যাফে, রেস্টুরেন্টও সংখ্যায় বাড়তে থাকে।
আলী আমজাদ: লেখক





