উনিশ শতকের শেষ দিকে করাচিতে ১ লাখ ৫ হাজার জনের বসবাস ছিল। সে সময় বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির হিন্দু, মুসলমানের ‘কসমোপলিটান মিক্স’ ছিল করাচি শহরে; সেই সঙ্গে এ মিশ্রণকে সমৃদ্ধ করেছে ইউরোপীয় খ্রিস্টান ও ইহুদি, অগ্নি উপাসক পারসি; ইরানি, লেবানিজ ও গোয়ান জীবিকাসন্ধানী।

ঐতিহাসিকরা জেলে বসতি হিসেবে করাচি নগরীর পত্তনের কথা বলে থাকেন, যে বসতির সাগরঘেঁষা তীর ধীরে ধীরে বন্দরে পরিণত হয়। আমেরিকান ইউনিভার্সিটি ওয়াশিংটনের অধ্যাপক ও সিন্ধের মাদ্রাসাতুল ইসলাম ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর মুহাম্মদ আলী শেখ ‘ফিশিং ভিলেজ’ তত্ত্বটি খণ্ডন করে বলেছেন, ২ হাজার ৫০০ বছর আগেই করাচি একটি বর্ধনশীল ব্যবসাকেন্দ্র ছিল এবং ১৮৩৯ সালে ব্রিটিশরাজের অধীনে আসার আগেই করাচি একটি উন্নত শহর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। সময় ও ঘটনার পরিক্রমায় করাচি বিভিন্ন নামে সম্বোধিত হয়েছে: ক্রোচে, ক্রোচে উপসাগর, কারানজি, করাচে, কোলাচি ও কুরাচি। আজকের করাচির প্রথম উল্লেখ খ্রিস্টপূর্ব ৩২৬ অব্দে আলেকজান্ডারের পারস্য ও ভারত অভিযানের সময়। তখন আলেকজান্ডারের বন্ধু অ্যাডমিরাল বেয়ারচুস স্থলযোদ্ধাদের তার নৌবাহিনীর সমর্থন জোগাতে আরব সাগরের যে প্রান্তে নোঙর করে অবস্থান করছিলেন তা করাচি বলেই মনে করা সংগত; অন্য কোথাও নোঙরের সুযোগ ছিল না। এ নৌবহর সিন্ধু বদ্বীপ থেকে ইউফ্রেটিস নদীপথে গমন করেছে।

উইলিয়াম ভিনসেন্ট (১৭৩৯-১৮১৫) ঘোষণা করেন, ইউরোপিয়ান কোনো নৌবহর ভারত মহাসগরে যেখানে প্রথম নোঙর ফেলেছে সে স্থানই করাচি, তার আদি নাম ক্রোকালা। আঠারো শতকের প্রথমার্ধের কবি শাহ আবদুল লতিফ ভিটাই (১৬৮৯-১৭৫২) সমুদ্রে কালাচির দানবীয় ঘূর্ণাবর্তের কথা লিখেছেন। তিনি করাচির কথাই বলেছেন। আঠরো শতকেই উপমহাদেশের পশ্চিম প্রান্তের করাচির ওপর কৌশলগত কারণে ইংরেজদের নজর পড়ে। পারস্যে উত্তেজনা দমাতে করাচিকে বন্দর হিসেবে ব্যবহার করা যাবে এবং সড়কপথে আসা রুশদের সম্পর্কেও সতর্ক থাকা যাবে। ১৭৯৯ থেকে ১৮৩৯ পর্যন্ত বিভিন্ন সময় এ অঞ্চল সফর করা ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের প্রতিবেদন এবং পর্যটকদের বিবরণ থেকে জানা যায়, এখানে একটি জনপদ ও সংস্কৃতি বিরাজমান ছিল।

১৮৩০ সালে সফর করা পর্যটক চার্লস ম্যাসন লিখেছেন, করাচি মাটির দেয়াল দিয়ে ঘেরা ছিল এবং বিভিন্ন স্থানে বৃত্তাকার টাওয়ার ছিল, সেখানে গোলাবারুদসহ কামান প্রস্তুত থাকত। মাটির তৈরি দুর্গে পূর্ব ও পশ্চিমে আসা-যাওয়ার দুটি তোরণ ছিল, তার গা ঘেঁষেই ছিল করাচির বাজার ও প্রধান সড়ক। করাচির বাজারগুলো ছিল অপ্রশস্ত এবং অনেক স্থানে রোদ ঠেকাতে ঢাকা থাকত। বাজারে বিশিষ্ট ব্যবসায়ীদের গদি থাকত, অর্থের জোগান দেয়ার জন্য ব্যাংকারও ছিল। শহরের অধিকাংশ লোক দেয়ালঘেরা সীমানার ভেতরেই বসবাস করত, কিন্তু হতদরিদ্র একটি অংশের বসবাস ছিল প্রতিরক্ষা দেয়ালের বাইরে। হায়দরাবাদের বাড়িঘরগুলোর মতো এখানেও মাটির ঘরে ছাদে সমুদ্রমুখী খোলামুখ রাখা হতো—গরম থেকে রক্ষা পেতে এটা ছিল ‘উইন্ড ক্যাচার’; এটা আলোর জোগানও দিত। ১৮৩০ দশকের পর্যটকের বর্ণনায় পাওয়া যায় বাড়িঘরের চারপাশে গাছ, বিশেষ করে আম ও তেঁতুলের সমারোহ থাকত, নদীর দিকটা বাগান। তবে করাচির আম বোম্বের আমের চেয়ে কম সুস্বাদু ছিল।

করাচির পানি নোনা এ অভিযোগ করেছেন কোনো কোনো ব্রিটিশ অফিসার, কিন্তু ব্রিগেডিয়ার ভ্যালিয়েন্ট বলেছেন, মিষ্টি পানির জন্য করাচিতে পর্যাপ্ত কূপ খনন করা ছিল; ভূ-ভাগের ১০-১২ ফুট নিচেই ছিল মিষ্টি পানির স্তর। 

১৮৩৮ সালে কমান্ডার কার্লেস লিখেছেন, করাচির জনসংখ্যা ১৪ হাজার; অর্ধেক হিন্দু, ধনী ব্যবসায়ীদের প্রায় সবাই হিন্দু। বাকিরা বালুচি, মোয়ানা, জাট ইত্যাদি। মোয়ানারা মূলত জেলে ও মাঝি আর জাটরা উষ্ট্রচালক। সমুদ্রপথে জংশন হয়ে ওঠার কারণে এখানকার মানুষও পেশাগতভাবে দক্ষ হয়ে ওঠে। করাচির ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক ভারতবর্ষ ছাড়াও সেন্ট্রাল এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিল। আলেকজান্ডার বেইলি লিখেছেন, করাচির বাণিজ্য মাসকাট, হেরাত, কাবুল, কান্দাহার, মুলতান প্রভৃতি স্থানে বিস্তৃত ছিল। কিন্তু হিন্দু ব্যবসায়ীরা মুসলমান শাসকদের বিশ্বাস করত না বলে তারা তাদের সম্পদ অন্যত্র পাঠিয়ে দিত। করাচি দাস ব্যবসার একটি বড় কেন্দ্র হয়ে ওঠে। আরব বণিকরা মাসকাট থেকে নৌকায় দাসদের করাচিতে নিয়ে আসত। বাণিজ্যের ধরনটা ছিল বিনিময়। করাচিতে তৈরি মোটা কাপড়ের সঙ্গে দাস বিনিময় হতো, অর্থের বিনিময়েও বিক্রি হতো। ব্যবসায়ীরা তাদের টাকা বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ করত। শাসকরা বাজেয়াপ্ত করে ফেলতে পারে, এ আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা সব অর্থ কোনো নির্দিষ্ট স্থানে রাখত না বা বিনিয়োগ করত না। মুসলমানদের হাতে শাসনভার থাকলেও তারা ছিল নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত। তারা ছিল গায়ে খাটা শ্রমিক এবং বড়জোর সরকারি চাকুরে। কমান্ডার চার্লস লিখেছেন, মুসলমানরা চাইত না করাচি ব্রিটিশের দখলে চলে যাক, কিন্তু এ নিয়ে হিন্দুদের কোনো আপত্তিই ছিল না, বরং ব্যবসায়ীরা মনে করেছে, তাহলে তাদের পুঁজি অধিক নিরাপদ থাকবে। তার পরও করাচি ছিল ধর্মীয় প্রশ্নে অত্যন্ত সহনশীল একটি শহর। ১৯৩৮ সালে করাচি শহরে ২১টি মসজিদ, ১৩টি পীরের দরগা এবং হিন্দুদের বেলায়ও প্রায় সমসংখ্যক মন্দির ও অন্যান্য ধর্মশালা ছিল। দুই সম্প্রদায়ই নিজেদের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য ধরে রাখত। দাড়ি চিনিয়ে দিত মুসলমানকে আর গোঁফ হিন্দুকে। করাচির বাজারে দাসদের অধিকাংশই—প্রায় ৭০ ভাগই ছিল আফ্রিকান নারী। এটি ছিল আরব বণিকদের এক্সক্লুসিভ বাণিজ্য। চেহারা ও শারীরিক সামর্থ্যের ওপর ভিত্তি করে ৬০ থেকে ১৩০ টাকার মধ্যে একজন ক্রীতদাস বা দাসী বিক্রি হতো।

বয়স্ক দাস পালিয়ে যেতে পারে, এ আশঙ্কায় বাজারে তাদের দর কম ছিল। হাবসি দাস অধিক মূল্যে ১৭০ থেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি হতো। ক্রেতাদের মধ্যে কেবল ধনীরাই ক্রীতদাসীর দিকে হাত বাড়াত। তারা তাদের বিয়ে করতে পারত, তাদের মিলনে জন্মগ্রহণ করা সন্তানদের বলা হতো গুড্ডু। তবে গুড্ডুরাও ক্রীতদাস হিসেবে বিবেচিত হতো। সরকার দাস ব্যবসা থেকে কর আদায় করত। কমান্ডার চার্লস লিখেছেন, তার হিসাবে ১৮৩৭ সালে আফ্রিকান উপকূল ও মাসকাট থেকে করাচিতে কমপক্ষে দেড় হাজার ক্রীতদাস এসেছে। একটি ব্যতিক্রমধর্মী দিক হচ্ছে এখানে ক্রীতদাসরা ইউরোপ-আমেরিকার মতো ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হতো না। মালিক তাদের নিজ বাড়ির অন্য সদস্যদের মতোই বিবেচনা করতেন। পালিয়ে যাওয়ার অনেক সুযোগ থাকার পরও করাচির দাস কমই পালিয়েছে। তারা খাবারবঞ্চিত হয়নি। পোশাক-পরিচ্ছদ পেয়েছে এবং পারিবারিক উৎসবেও অংশ নিয়েছে। গুড্ডু তরুণীর সঙ্গে সিন্ধি পুরুষের বিয়ের অনেক নজির আছে, তারা সুখী জীবন যাপন করেছে।

করাচি দুজন গভর্নরের শাসনাধীন ছিল, হায়দরাবাদের মীর গভর্নর নিয়োগ করতেন। গভর্নরের অপশাসনের বিরুদ্ধে হিন্দু বণিকরা অভিযোগ করলে মীর তাদের অপসারণ করে ভিন্ন ব্যক্তিকে নিয়োগ দিতেন।

বেশ কয়েকটি অভিযান পরিচালনার পর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ৩ ফেব্রুয়ারি ১৮৩৯ করাচি দখল করে নেয়। মিয়ানির যুদ্ধে চার্লস জেমস নেপিয়ারের নেতৃত্বাধীন বাহিনীর সিন্ধ বিজয়ের পর তা ব্রিটিশ ভারতীয় সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। করাচিকে সিন্ধুর রাজধানী ঘোষণা করা হয়। চার্লস নেপিয়ার ফিরে যাওয়ার পর সিন্ধুকে যখন বোম্বে প্রেসেডেন্সির শাসনে আনা হয় তখন সিন্ধিদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয় এবং বিক্ষোভ ছড়াতে থাকে। তবে ব্রিটিশরা এর মধ্যে এখানে ক্যান্টনমেন্ট নির্মাণ পরিকল্পনা গ্রহণ করে, বন্দরকে আধুনিক বাণিজ্য জাহাজের উপযোগী করে তোলে, নগর পৌর সরকার প্রতিষ্ঠা করে। করাচি ‘কোম্পনি বাহাদুর’ সরকার ব্রিটিশদের জন্য হোয়াইট সিটির পত্তন করে। ১৮৫৭-এর সিপাহি বিদ্রোহের সময় করাচিতে অবস্থানরত নেটিভ ইনফেন্ট্রি ব্রিগেডে বিদ্রোহীদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে ১০ সেপ্টেম্বর ১৮৫৭ বিদ্রোহ ঘোষণা করে। তবে ব্রিটিশ সৈন্যরা নিজেদের হাতে নিয়ন্ত্রণ তুলে নিতে সক্ষম হয় এবং বিদ্রোহী সিপাহিদের পরাজিত করে। সিন্ধে ব্রিটিশ শাসন জোরদার হয়। ১৮৬৪ সালে করাচি ও লন্ডনের মধ্যে প্রথম টেলিগ্রাফ যোগাযোগ স্থাপিত হয়। ভারতবর্ষে এটাই প্রথম টেলিগ্রাফ প্রযুক্তির ব্যবহার।

১৮৭৮ সালে করাচির সঙ্গে ভারতবর্ষের অন্যান্য স্থানের রেল যোগাযোগ স্থাপিত হয়। ১৯০০ সালে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম ট্রাম চলাচল করাচিতেই শুরু হয়। ১৯২৪ সালে করাচিতে নির্মিত হয় প্রথম এরোড্রাম যা কালক্রমে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পরিণত হয়।

আমরা আটকে পড়া অবাঙালিদের কথা জানি, কিন্তু পাকিস্তানে রয়ে যাওয়া বাঙালিদের কথা কতটা জানি? পাকিস্তানে বাঙালির সংখ্যা আনুমানিক ৩০ লাখ। প্রায় ২০০ বস্তিতে তাদের অধিকাংশের বসবাস, এর মধ্যে ১৩২টি বস্তি রয়েছে কেবল করাচিতেই। করাচিতে বিখ্যাত ও বৃহৎ বাঙালি বসতিগুলো হচ্ছে: মুছা কলোনি, চাঁটগা কলোনি, মাচার কলোনি। করাচির বাঙালিরা ভালো নেই, নাগরিকত্ব দূরে থাক, বৈধ পরিচিতিই দাখিল করতে না পারায় গত ৫০ বছরেও অনেকেই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে পারেননি। পাকিস্তান বাঙালি অ্যাকশন কমিটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট শেখ মুহাম্মদ সিরাজ বলেন, করাচি বাঙালিদের কোনোভাবেই তার মূল ধারার অংশ করতে দেবে না, তারা পাকিস্তানের এলিয়েন।

১৯৪৭ থেকে ১৯৫৮ পর্যন্ত করাচি ছিল পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় রাজধানী। ১৯৫৯ সালে রাজধানী ইসলামাবাদে স্থানান্তরিত হওয়ায় করাচির গুরুত্ব কমে আসে আর চীনের আর্থিক সহায়তায় বালুচিস্তানের আরব সাগর ঘেঁষা অংশে গোয়াদর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ হবার পর করাচি বন্দরও তার গুরুত্ব অনেকটাই হারিয়েছে। তবে গরীবের কসমোপলিটান হিসেবে করাচি এখনো যথেষ্ট প্রাণচঞ্চল। লোকসংখ্যার হিসেবে করাচি পৃথিবীর দ্বাদশ বৃহত্তম নগর। 

 

এম এ মোমেন: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা