ফাতিমা জিন্নাহ রোডে অবস্থিত ফ্রেরে হল প্রাথমিকভাবে নির্মাণ করা হয়েছিল টাউন হল হিসেবে। এটির ডিজাইন করার জন্য ১২ জনের মধ্যে থেকে বেছে নেয়া হয় হেনরি সেইন্ট ক্লিয়ার উইলকিনসকে। ১৮৮৪ সালে স্যার হেনরি বার্টেল অ্যাডওয়ার্ড ফ্রেরের মৃত্যুর পরে তার নামে এ হলের নাম দেয়া হয় ফ্রেরে হল। তিনি ছিলেন একজন ব্রিটিশ প্রশাসক, যিনি সিন্ধের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনিই সিন্ধের প্রশাসনিক ভাষা ফারসির বদলে সিন্ধি করেন। আর তার সে কাজে সমর্থন জানিয়েছিল মোগলরা। ইতালিয়ান গথিক স্থাপত্যশৈলীর একটি ধারা ভেনেশিয়ান গথিক স্টাইলে হলটি নির্মিত। এ ধারায় ব্রিটিশ ও স্থানীয় স্থাপত্যশৈলীর মিশ্রণ দেখা যায়। ভবনটির কিছু কিছু দেয়ালে খোদাই করা এবং একাধিক দেয়াল ও স্তম্ভে সুন্দরভাবে মোজাইক করা নকশাও রয়েছে। ভবনে পাশের শহর ভোলারি থেকে উত্তোলন করা সাদা ওলাইট পাথর থেকে তৈরি হলদে রঙের চুনাপাথর ব্যবহার করা হয়েছে। তাছাড়া সিন্ধি শহর জংশাহী থেকে উত্তোলন করা লাল এবং ধূসর বেলেপাথরও ব্যবহার করা হয়েছে।
করাচি
শহরে দুয়ের্তে ম্যানসনও একটি অসাধারণ গোয়ান ভবন যেটা রাস্তার পাশেই অবস্থিত। সেখানেই পাওয়া যাবে এ শহরের সবচেয়ে পুরনো বইয়ের দোকান।
বেশকিছু
ঔপনিবেশিক স্থাপনার দেখাও মেলে এ শহরে। তারই একটি গোরা কবরিস্তান সিমেট্রি। স্থাপনাটির খ্রিস্টান ও মুসলিম নামের মিশ্রণ দেখে অনেকেই বিস্মিত হন। খ্রিস্টান পাকিস্তানি ব্যবসায়ী পারভেজ হেনরি গিল ১৪০ ফুট উঁচু ক্রস তৈরি করিয়েছেন। ২০ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এ সিমেট্রি ১৮৪৫ সালের ঔপনিবেশিক শাসনামলেই তৈরি করা হয়। কয়েক বছর আগে হেনরি গিল খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের জন্য কিছু করার স্বপ্ন দেখেন। তখনই তিনি সিদ্ধান্ত নেন করাচিতে এশিয়ার সবচেয়ে উঁচু ক্রুশ তৈরি করার।
করাচির স্থাপনা ও স্থাপত্যশৈলীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন মোহাট্টা প্যালেস। ১৯২৭ সালে আগা আহমেদ হুসেইন এ স্থাপনার ডিজাইন করেন। হিন্দু মারওয়ারী ব্যবসায়ী শিবরতন মোহাট্টা গ্রীষ্মকালীন আবাস হিসেবে ব্যবহারের জন্য সমুদ্রের তীরে ভবনটি তৈরি করা হয়। ভারতের রাজস্থানের স্টোন প্যালেসের আদলেই করাচিতে তৈরি করা হয় মোহাট্টা প্যালেস। পার্শ্ববর্তী গিজরি থেকে আনা হলুদ পাথরের সঙ্গে মিলিয়ে গোলাপি জোধপুর পাথরের সমন্বয়ে এ প্যালেস তৈরি। ভারত ভাগের আগে মাত্র দুই দশক এ ভবন ব্যবহার করতে পেরেছিলেন মোহাট্টা। এর পরেই তিনি করাচি ছেড়ে ভারতে চলে যান। এখনকার জিন্নাহ রোডে আছে ২০০ বছরের বেশি পুরনো স্বামীনারায়ণ মন্দির।
করাচিতে
আছে পার্সিদের কলোনি। এ কলোনির বাড়িগুলো দোতলা। দারুণ সব পুরনো নকশায় তৈরি এসব বাড়ি পার্সিদের স্বতন্ত্র সংস্কৃতির নিদর্শক।
করাচি
শহরের আরেকটি স্থাপনার নাম ভিক্টোরিয়া মিউজিয়াম। ভবনটির পরতে পরতে লুকিয়ে আছে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার ইতিহাস। বর্তমানে সুপ্রিম কোর্ট রেজিস্ট্রি নামে পরিচিত এ ভবনের আগের নাম ছিল ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড আলবার্টা মিউজিয়াম। ১৮৮৭ সালে রানী ভিক্টোরিয়ার সময়ে ভবনটি তৈরি করা হয। ১৮৯২ সালে ভবনটিকে পুরোপুরি জাদুঘর ঘোষণা করা হয় আর সেটার নাম দেয়া হয় ভিক্টোরিয়া মিউজিয়াম। ১৯৫৭ সালে সেখানে কোর্ট রেজিস্ট্রি বসানো হয়। জাদুঘরজুড়ে মহেঞ্জোদারোর প্রত্নতত্ত্বসামগ্রী, মানুষের মূর্তি, প্রতিকৃতি, পেইন্টিং এবং বিশ্বের বিখ্যাত ব্যক্তিদের ছবি রয়েছে।
ইতিহাসে
চোখ বুলালে বোঝা যাবে, চৌখান্ডি সমাধিও করাচিতে থাকা প্রাচীন সমাধিগুলোর একটি। সাধারণভাবে বলা হয় এগুলো জাখিও নৃগোষ্ঠীর পারিবারিক সমাধিক্ষেত্র। পনের-আঠার শতকে মোগল শাসনামলের কোনো এক সময়ে যখন ইসলাম ধর্ম এ অঞ্চলে প্রভাবশালী হয়ে ওঠে সেই সময়ে এসব বানানো। কেউ বলে ওই জায়গাটির নাম চৌখান্ডি বলেই সমাধির নাম চৌখান্ডি আবার কেউ কেউ বলেন চৌখান্ডি স্থাপত্যশৈলীর একটি ধারা। হালকা বাদামি হলুদাভ বেলেপাথরে বিস্তৃত এ সমাধিগুলো তৈরি। সাধারণত আলাদা আলাদা সমাধি অথবা আটটি সমাধির গ্রুপ হিসেবে সমাধিক্ষেত্রটি তৈরি করা হয়েছে। বছরের পর বছর স্থানীয় আবহাওয়াতেও সমাধিগুলো একদম একই রকম এবং ঠিকঠাক আছে। সমাধিগুলো জ্যামিতিক নকশা এবং মোটিফ দিয়ে অলংকৃত করা হয়েছে, যার মধ্যে আছে ঘোড়ায় বসা ঘোড়সওয়ার, শিকারের দৃশ্য, অস্ত্র ও গহনা।
এবার ওয়াজির ম্যানসনের দিকে নজর বুলানো যাক। সরকারিভাবে কায়েদে আজমের জন্মস্থান জাদুঘর নামেই পরিচিত এ ম্যানসন। এটি করাচির কান্দাহার জেলায় অবস্থিত। ১৮৬০-৭০ সালের দিকে তৈরি হওয়া ম্যানসনটি সে সময়ের জনপ্রিয় আধুনিক স্থাপত্যকলায় নির্মাণ করা হয়েছিল। করাচির আবহাওয়ার সঙ্গে মানানসই চুন ও পাট মর্টারে পাথরের গাঁথুনি দিয়ে বানানো ওয়াজির ম্যানসনেই শৈশবের ১৬ বছর কাটিয়েছেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। বর্তমানে বাড়িটি একটি জাতীয় সংগ্রহশালা হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে।
শৈশবের
১৬ বছর ওয়াজির ম্যানসনে কাটালেও মোহাম্মদ আলী জিন্নাহের সমাধি রয়েছে মাজার-ই-কায়েদের ভেতরে। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ রোডে অবস্থিত এ মাজারের ডিজাইনেও আছে ভিন্নতা। উজবেকিস্তানের বুখারার সামানিজ জাদুঘরের দ্বারা অনুপ্রাণিত এ মাজারের স্থাপত্যশৈলী।
ঐতিহাসিকভাবে
করাচি শহরকে ১৮টি কোয়ার্টারে ভাগ করা হয়। শহরের এ ১৮টি অংশকে বলা হয় ঐতিহাসিক কেন্দ্র। এর মধ্যে ১৩টি বেশ কাছাকাছিই অবস্থিত আর বাকিগুলোর অবস্থান একটু দূরে দূরে।
পাকিস্তানের
সংবাদমাধ্যম দি এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের এক খবরে বলা হয়, করাচি শহরটি একসময় তার বাসিন্দাদের জন্য খুবই দয়ালু ছিল। সেটা শুধু মানুষ নয় বরং চারপেয়ে প্রাণীদের জন্যও। উনিশ শতকের দিকে তাই এ শহরে প্রাণীদের জন্য শহরজুড়ে জলের নালা তৈরি করা হয়। যেন পণ্য বা মানুষ বহন করার কাজের জন্য অপেক্ষারত প্রাণীরা সেখানে পানি পান করতে পারে। করাচির সোলজার বাজার পার হতে গেলেই চারপাশে এমন অনেক অনেক প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত পানির নালা দেখতে পাওয়া যাবে। কিন্তু কজনই-বা জানবে যে খুব বেশি পুরনো নয় এমন ইতিহাসের সামনে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেসব পানির নালায় ধুলোবালির স্তর জমেছে, কিন্তু ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে সেগুলো এখনো ঠায় দাঁড়িয়ে আছে করাচি শহরের ভেতরে।
করাচি
শহরকে বলা হয় আলোর শহর। সিন্ধ প্রদেশের এ রাজধানীতে দোকানপাট খোলা থাকে মধ্যরাত পর্যন্ত। খাওয়া আর ঘোরাফেরাও চলে রাতভর। ঠিক যেমন করাচি শহরের স্থাপত্যশৈলীতে নানা ধরনের সংস্কৃতি দেখা যায়, সে রকমই ভিন্ন রকম সংস্কৃতি দেখা যায় সেখানকার খাবারেও।
নরিন
গুলামি তার কালচার ট্রিপ নামের একটি ব্লগে লেখেন, করাচির খাবার সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছে উর্দুভাষী মোহাজিরদের দ্বারা, যারা ভারত বিভাজনের সময়ে অভিবাসী হয়ে এখানে এসেছে। সেই সব উর্দুভাষীদের আনা খাবারগুলোরই একটি নেহারি। বর্তমানে শহরটির জাতীয় খাবার হচ্ছে নেহারি। এ মোহাজিরদের কাছে এ খাবারের সবচেয়ে খাঁটি রূপটি পাওয়া যায়। কেউ কেউ করাচির এ খাবারকে উনিশ শতকের দিল্লির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত করেন। যেটা মোগল আমলের অন্তিমকাল ছিল। আবার কেউ কেউ নেহারিকে আধুনিক যুগের ভারতের লক্ষ্মৌ শহরের অওধ প্যালেসের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত বলে ব্যাখ্যা করেন।
করাচিবাসীর
প্লেটে বিরিয়ানিও শোভা পাচ্ছে অনেক অনেক বছর ধরেই। মসলা, চাল, মাংস আর আলুর সংমিশ্রণে গড়া খাবারটি দক্ষিণ এশিয়ানদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়। খাবারটি এ অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনে দেখা যায়। করাচিতে বেশি চল হায়দ্রাবাদি, সিন্ধি, বোহরি ও মেমন বিরিয়ানির। মোগল আমলের খাবার বিরিয়ানি পাকিস্তানের করাচি ও লাহোরে ছড়িয়ে পড়ার কারণ মোগল শাসন এখানেও বিস্তৃত হয়েছিল।
লাহোরের
হলেও ‘কাটাকাট’ নামের খাবারটি করাচিতেও বেশ জনপ্রিয়। করাচির রাস্তার পাশের দোকানে বা রেস্টুরেন্টে খাবারটি দারুণ জনপ্রিয়। খাবারের এমন অদ্ভুত নামের কারণটাও একটু অদ্ভুত। ফ্রাইপ্যানে যখন মাংসগুলো ভাজা হয় তখন সেখানে যে শব্দটা হয়, সেখান থেকেই এটার নামকরণ করা হয়েছে কাটাকাট।
করাচি
শহরের চিরচেনা আরেকটি খাবারের নাম চিকেন মালাই বটি। এর নাম এসেছে মালাই বা ফ্রেশ ক্রিম থেকে। বারবিকিউ করার আগে মাংস মেরিনেট করতে মসলার পাশাপাশি সে মালাইটাই ব্যবহার করা যায়। এটা করাচির সবচেয়ে জনপ্রিয় খাবার। কারণ একসঙ্গে খাবারটিতে যেমন মসলাযুক্ত স্বাদ থাকে, সেসঙ্গে থাকে একটা ক্রিমি ভাব। ফলে মুখে দিলেই গলে যায়।
তাছাড়া
নার্গিসি কোফতা, রোগিনি নান, লাস্যিওতে নানা রকম ভিন্নতা দেখা যায় করাচি শহরে। চাট, বান কাবাবের মতো ভিন্ন রকম খাবারও আছে শহরটির বিভিন্ন প্রান্তের রেস্তোরাঁয়।
সূত্র: কালচারট্রিপ ব্লগ, ডন, দি এক্সপ্রেস ট্রিবিউন





