করাচি বেকারি—নাম শুনলে আর সবার মতো আমারো ধারণা হতো, এ নিশ্চয়ই করাচি শহরের কোনো স্থানীয় বেকারি। তবে সম্প্রতি জানলাম, এ বেকারির অবস্থান করাচিতে নয়, বরং ভারতের হায়দরাবাদের। বলা ভালো হায়দরাবাদের খুবই বিখ্যাত একটি প্রতিষ্ঠান এটি। বর্তমানের ভারতের আরো কয়েকটি বড় শহরে আছে তাদের শাখা। ১৯৫৩ সালে শ্রী খানচান্দ রামনানি এ বেক হাউজ প্রতিষ্ঠা করেন। রামনানি সাতচল্লিশের দেশভাগের এক ঠাঁইনাড়া সিন্ধি হিন্দু। দেশভাগের ছুরিতে কাটা পড়ে করাচির এ অধিবাসী চলে আসেন হায়দরাবাদে। ১৯৫৩ সালে মোয়াজ্জাম জহি মার্কেটে চালু করেন করাচি বেকারি। এখন হায়দরাবাদেই আছে তাদের ২৩টি স্টোর।

ভারতের বুকে করাচি নামটি নিয়ে মাঝেসাঝেই ঝামেলায় পড়তে হয় করাচি বেকারির স্বত্বাধিকারীদের। কিন্তু এর প্রতিষ্ঠাতা এবং তার উত্তরাধিকারীদের কাছে এটা তাদের ফেলে আসা জন্মভিটার স্মৃতি, এ নাম তারা কীভাবে মুছবেন।   

করাচি বেকারি এখনকার পরিচালকদের একজন রাজেশ রামনানি। নাম নিয়ে বিতর্কের জের ধরে কয়েক বছর আগে তার কাছে বিষয়টি নিয়ে জানতে চেয়েছিল দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস। রাজেশ বলেন, ‘এ নাম স্মরণ করিয়ে দেয় ব্র্যান্ডটি প্রতিষ্ঠার জন্য জন্মভূমি ছেড়ে এতদূর এসে আমাদের পূর্বপুরুষদের আবেগ, উৎসর্গ ও কঠোর পরিশ্রমের কথা।’ রাজেশের বয়স এখন চল্লিশের কোটায়। প্রতিষ্ঠাতা রামচান্দ রামনানির নাতি তিনি।

বিস্তৃত ও পারিবারিক ইতিহাস থেকে বলতে শুরু করেন রাজেশ। দেশভাগের আগে করাচি নানা রকম উদ্যোগ আর সুযোগে হয়ে উঠেছিল সক্রিয় একটি বাণিজ্যিক কেন্দ্র। রাজেশের চোখে সেটা ছিল একালের মুম্বাইয়ের মতো। সে সময় তার দাদা করাচিতে মিষ্টি ও বেকারি প্রডাক্টের ব্যবসা শুরু করেন আর নাম দেন নিজের প্রিয় শহরের নামে। এরপর দেশভাগ—ব্যবসা, জন্মভিটা সব ছেড়েছুড়ে তাদের চলে আসতে হল হায়দরাবাদে। এখানেও রামচান্দ  আগের ব্যবসাই শুরু করলেন। নামটাও বদলালেন না। রাজনীতি আর মানচিত্রে যা-ই ঘটুক না কেন, করাচি তো তার শহর। 

দাদা রামচান্দের মুখে রাজেশ শুনেছেন দেশভাগে রক্তগঙ্গা বয়ে গেলেও তখন এ বেকারির নাম নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলেনি। এ সিন্ধি পরিবারের কাছে করাচি পাকিস্তান নয়, বরং তাদের অতীতের হারানো জন্মভূমি। পাঞ্জাব কিংবা বাংলার মতো সিন্ধ অঞ্চলটি ভাগ হয়নি, এর পুরো অংশটিই গেছে পাকিস্তানের মধ্যে। দেশভাগের পর পাঞ্জাবিরা ভারতে পাঞ্জাব, বাঙালিরা পশ্চিমবঙ্গ, গুজরাটিরা গুজরাট রাজ্য পেলে সিন্ধি অভিবাসীরা নিজেদের পরিচয়ের নামে কোনো ভূখণ্ড পায়নি।

ভারতে উদ্বাস্তু হয়ে আসা সিন্ধি সম্প্রদায়কে নিয়ে বিশদ গবেষণা, ডকুমেন্টেশন করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, এ সিন্ধিরা ভারতের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। ভারতের রাজস্থান ও গুজরাটের সীমান্তেই সিন্ধের অবস্থান। দেশভাগের আগে অন্যান্য অঞ্চলের মতো সিন্ধে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা হয়নি। তখন সিন্ধের ২৫ শতাংশ জনগণ ছিল হিন্দু। এদের ওপর শিখ রীতিনীতি ও সুফিবাদের বেশ প্রভাব ছিল। পুরো ভারতবর্ষে সিন্ধ কিছুটা বিচ্ছিন্নই ছিল। ব্রিটিশরা সিন্ধ দখল করে ১৮৪৩ সালে এবং একে বোম্বে প্রেসিডেন্সির অধীন করা হয়।

দেশভাগের সময় সিন্ধ থেকে যে হিন্দুরা ভারতে চলে আসে তারা কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে আঞ্চলিক পরিচয় নিয়ে আবাস গড়তে পারেনি। তারা তাদের সুযোগমতো যেখানে পেরেছে সেখানেই কাজ করে নিজেদের ভাগ্য ফেরাতে চেষ্টা করেছে। এছাড়া নতুন সমাজে তারা নানা রকম সন্দেহ, বৈষম্যের শিকারও হয়েছে। তাই অনেকেই তাদের সিন্ধি পরিচয়ের যা কিছু ছাপ তা মুছে ফেলতে চেষ্টা করেছে। হারিয়ে গেছে তাদের সংস্কৃতি, ভাষা। অনেকে করেনি, তাদেরই উল্লেখযোগ্য একজন রামচান্দ রামনানি। অরো অনেক সিন্ধিই ভারতে বিশেষ অবদান রেখেছেন। দেশভাগের কয়েক বছরের মধ্যেই মুম্বাইতে তিনটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন তারা। তাদের আবাস তৈরির একটি চাহিদা ছিল। এ থেকে অনেকে যুক্ত হন আবাসন শিল্পে। তবে মন থেকে করাচি, হায়দরাবাদ (সিন্ধ), শিকারপুর, সুক্কুর কিংবা লারকানার অলিগলির স্মৃতি তো মোছার নয়। তাই তাদের অনেকের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেই যুক্ত হয়েছিল সেসব স্মৃতিমাখা নাম। এ স্মৃতি পাকিস্তানের নয়, বরং পাকিস্তানের জন্মের আগে তাদের জন্মভূমি সিন্ধের আবেগ স্মৃতি।

করাচি বেকারির নাম নিয়ে এ বছরের শুরুর দিকে মুম্বাইতে থাকা তাদের একটি শাখায় গিয়ে ঝামেলা করেছে মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনা। সে সময়ও রাজেশ রামনানি স্পষ্টই জানিয়েছেন, ব্র্যান্ডের নাম পরিবর্তনের কোনো ভাবনাই তাদের মাথায় নেই।

এবার ঘুরে আসা যাক আজকের করাচিতে মুদ্রার উল্টো পিঠে। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, করাচি বেশ কিছুদিন বোম্বে প্রেসিডেন্সির অধীন ছিল। ১৯৯৫ সালে বোম্বে মুম্বাই হলেও করাচিতে এখনো বোম্বেই। করাচিতে অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নামেই যুক্ত আছে বোম্বের নাম। আছে বোম্বে গার্মেন্টস, বোম্বে ফ্রুট, বোম্বে কোকোনাট। শহরের চেম্বার অব কমার্স বিল্ডিংয়ের কাছেই আছে একটি ফলক—বোম্বে ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি। উনিশ শতকের মাঝামাঝি বন্দর রোডে স্থাপিত হয় বোম্বে বাজার। বাজারটি ছিল স্যার হেনরি বার্টল ফ্রেরের অবদান। তিনি সিন্ধের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনি ব্রিটিশরাজের শাসনামলে করাচির কমিশনার ও বোম্বের গভর্নর ছিলেন।

দেশভাগের পর করাচিতে স্থাপিত হওয়া অনেক দোকানের নামেও যুক্ত হয় বোম্বে। এ নাম ব্যবসায়ীরা তাদের পণ্য বা সেবার মানের গ্যারান্টি হিসেবে প্রকাশ করেন। ফ্রেস্কো চকের কাছে আছে বোম্বে ড্রাই ফ্রুটস। এ দোকানে শুকনো ফল বিক্রি হয়। দোকানের মালিক আবু বকরের পিতা-মাতা করাচিতে এসেছিলেন বোম্বে থেকে। সেই শুরুতে তাদের জীবন ছিল বেশ কঠিন। আবু তখন ঠেলায় করে টুকটাক জিনিস বিক্রি করতেন। তারা দেখেছেন দিল্লি স্টোর নামের একটা দোকান। মনে স্বপ্ন ছিল তাদেরও একদিন একটা দোকান হবে আর সেই দোকানের নাম অবশ্যই বোম্বে হবে। তারপর যেদিন টাকার ব্যবস্থা হলো, সেই ১৯৮০ সালে আমরা খুললাম বোম্বে ড্রাই ফ্রুট। আবু অনেকবার বোম্বে গেছেন তার আত্মীয়দের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। আবার তারাও করাচি এসেছেন তার বাড়িতে। বোম্বের সেই আত্মীয়রা আবু বকরের দোকানের নেমপ্লেট দেখে যারপরনাই খুশি হয়েছিলেন।

মোহাম্মদ ইসমাইলের দোকানের নাম বোম্বেওয়ালা। তারা বাবা-মা করাচি এসেছিলেন বোম্বের মিস্ত্রি মহল্লা থেকে। তারা এ দোকান খুলেছিলেন ১৯৪৮ সালে।

বোম্বে কোকোনাট শপের মালিক ইকবাল। করাচির মানুষ বোম্বের নারকেল পছন্দ করেন। বিশেষত মুম্বাই থেকে এখানে অভিবাসী হয়ে আসা মানুষের কাছে সেখানকার নারকেলের চাহিদা আছে। একসময় করাচির একটি জনপ্রিয় হোটেলের নাম ছিল বোম্বে হোটেল।

করাচিতে আছে বোম্বে মাসালা, বোম্বে বিরিয়ানি। বিস্মৃতি এড়িয়ে স্মৃতি হয়ে টিকে আছে হায়দরাবাদের করাচি বেকারি আর করাচির বিখ্যাত বোম্বে ব্র্যান্ড।

 

এসএম রশিদ: লেখক