শান্তি ঘোষ ১৬ বছর বয়সী কিশোরী বুঝে গেছেন সহিংস বিপ্লব ছাড়া ভারতবর্ষ থেকে ব্রিটিশ খেদানো যাবে না। তিনি একা নন, বয়সে তার চেয়ে প্রায় ছয় মাসের ছোট্ট সুনীতি চৌধুরীরও একই বিশ্বাস। অপারেশনটা তাদের যৌথ পরিকল্পনা।

১৪ ডিসেম্বর ১৯৩১ দুজনেই বড়দিনের আগেই অভিনন্দন জানাতে এলেন কুমিল্লার ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট চার্লস স্টিভেনস জিওফ্রে বাকল্যান্ডকে। ২৫ ডিসেম্বর বড়দিন পালন করতে তিনি ব্রিটেনে ফেরার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। শান্তি ও সুনীতি ডিএম সাহেবকে উপহার দেয়ার জন্য সঙ্গে নিলেন লজেন্স আর চকোলেট। স্টিভেনস সাহেব যখন একটি মুখে তুলে নিলেন শান্তি ও সুনীতি দুজনেই গায়ের চাদরের তলদেশ থেকে স্বয়ংক্রিয় পিস্তল বের করে খুব কাছে থেকে ডাকসাইটে ব্রিটিশ ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটকে গুলি করলেন। তার মৃত্যু হলো।

দুর্ভাগ্য ক্ষুদিরামের তিনি সঠিক লোকটিকে গুলি করতে পারেননি, হত্যার অভিযোগে তার ফাঁসি হয়। শান্তি ও সুনীতির কীর্তি ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তি নাড়িয়ে দেয়।

প্রশ্ন আসতেই পারে এই দেশপ্রেমিক কিশোরীর সঙ্গে নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানীর কী সম্পর্ক? আত্মীয়তার সম্পর্ক নেই। ফয়জুন্নেছার মৃত্যুর এক যুগ পর তাদের জন্ম। দুজনেই ছিলেন নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানীর নিজ ব্যয়ে স্থাপিত ফয়জুন্নেছা গার্লস হাইস্কুলের ছাত্রী। সে সময় সরকার প্রশ্ন তুলেছিল স্কুল কি সন্ত্রাসী লালন করে? তার জবাব: ফয়জুন্নেছার স্কুল দেশপ্রেমিক লালন করে—শান্তি ও সুনীতিই তার প্রমাণ। তারা সন্ত্রাসী নয়, দেশপ্রেমিক। ব্রিটিশ সরকারের খেতাব নিয়ে সন্দিহান হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে, কেউ কীর্তিতে হয়েছেন কেউ দাস্যবৃত্তিতে অর্জন করেছেন। ফয়জুন্নেছা ছিলেন বাস্তবিকই কীর্তিমান।

ভারতীয় লেখক সাকিব সালিম নওয়াব ফয়জুন্নেছার একটি স্মরণীয় কাহিনী তুলে ধরেছেন:

উনবিংশ শতকের নারী জমিদার ফয়জুন্নেছা চৌধুরানীকে তার সমাজকর্মের জন্য উপযুক্ত খেতাব প্রদান করতে মহারানী ভিক্টোরিয়ার কাছে প্রস্তাব পাঠান জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ডগলাস সাহেব। তিনি লন্ডনে প্রেরিত তার দাপ্তরিক পত্রে উল্লেখ করেন ফয়জুন্নেছার জন্য নওয়াব খেতাবটি হবে সবচেয়ে উপযুক্ত। একজন নারীকে নওয়াব খেতাব দেয়ার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে সংবাদটি জানাজানি হয়ে গেলে গোঁড়া জমিদাররা তো বোটেই এমনকি কথিত মুক্তমনা বাঙালি মুসলমান ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। তারা ভিক্টোরিয়াকে পত্র দেন এবং দাবি করেন যে একজন নারীকে নওয়াব খেতাব দেয়া সমীচীন হবে না, কারণ এটি পুরুষের জন্য প্রযোজ্য খেতাব। ভারতের গুরুত্বপূর্ণ পুরুষদের এ আবেদন ভিক্টোরিয়া বিবেচনা করলেন এবং ফয়জুন্নেছাকে বেগম খেতাব দিলেন। মূলত নওয়াবের স্ত্রীলিঙ্গ হচ্ছে বেগম এবং নওয়াবের স্ত্রীকে বেগম বলা হয়।

এখানেই ঘটনা প্রাবাহের একটি বৈপ্লবিক এবং ঐতিহাসিক মোচড় দেখা গেল—ফয়জুন্নেছা ভিক্টোরিয়ার দেয়া স্ত্রীবাচক বেগম খেতাব প্রত্যাখ্যান করলেন। যেখানে ভোপালের মতো রাজশাসিত রাজ্যে (তখনকার সবচেয়ে বড় প্রিন্সলি স্টেট) নারী শাসককে নওযাব খেতাব দেয়া হয়নি, তিনি বেগম হিসেবে পরিচিত—সেখানে ফয়জুন্নেছার নওয়াব হওয়াতে ভারতবর্ষের পুরুষদের গাত্রদাহ হওয়ার কথা।

ফয়জুন্নেছা প্রত্যাখ্যান করতে গিয়ে ব্রিটিশ শাসকদের জানালেন, তিনি সফলতার সঙ্গে জমিদারি পরিচালনা করছেন। কেবল নারী হওয়ার কারণে সরকারকে কর প্রদানকারী একজন নাগরিকের সঙ্গে এ ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণ করা সঠিক হবে না।  বিষয়টি অনেক দূর গড়াল। তার কথায় যৌক্তিকতা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা হলো। ফয়জুন্নেছা ধর্মীয়, সামাজিক ও সংস্কৃতিক গোঁড়ামির কাছে মাথা নত করতে রাজি নন। মুসলমান পুরুষদের লবি ব্রিটিশ সরকারকে চাপ দিয়ে যাচ্ছে যেন নওয়াবের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি খেতাব একজন নারীকে দেয়া না হয়। শেষ পর্যন্ত এ সংকটের সমাধান করতে ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। ১৮৮৯ সালে ভিক্টোরিয়ার খেতাব পেয়ে ফয়জুন্নেছা হলেন নওয়াব ফয়জুন্নেছা। তিনিই ব্রিটিশ ভারতের প্রথম নারী নওয়াব।

কুমিল্লার লাকসামের পশ্চিমগাঁও গ্রামে ১৮৩৪ সালে ফয়জুন্নেছার জন্ম। তার বাবা আহমদ আলী চৌধুরী হোসনাবাদ-পশ্চিমগাঁও গ্রামে ১৮৩৪ সালে। তার বাবা আহমদ আলী চৌধুরী হোসনাবাদ-পশ্চিমগাঁও অঞ্চলের জমিদার ছিলেন। এ পরিবারটি মোগল সম্রাটদের দূরবর্তী বংশধর। পরিপূর্ণ ইসলামী অনুশাসনে পর্দা মেনে তিনি সুশিক্ষিত হয়ে এবং আরবি, ফারসি, সংস্কৃত, বাংলা ভাষা রপ্ত করেছেন। প্রতিবেশী জমিদার এবং দূরসম্পর্কীয় ভাতিভ্রাতা মুহাম্মদ গাজীর দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে দাম্পত্যজীবন শুরু করেন। দুই কন্যা সন্তানের জননী হলেও সংসারটি সুখের হয়নি, বিয়ের পঞ্চম বর্ষে স্বামী ত্যাগ করে মা-বাবার পরিবারে বসবাস করতে থাকেন। মায়ের মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারী হিসেবে পশ্চিমগাঁওয়ের জমিদারি লাভ করেন। জমিদারি তাকে সনাতন শোষক ও প্রজাপীড়নকারী না বানিয়ে ক্রমাগতভাবে সমাজকল্যাণের দিকে টেনে আনে। ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম দিনকার বালিকা বিদ্যালয় তারই হাতে ১৮৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। তার স্কুলটিই এখনকার নওয়াব ফয়জুন্নেছা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। পশ্চিমগাঁওয়ে যে স্কুল স্থাপন করেছিলেন তা এখন নওয়াব ফয়জুন্নেছা ডিগ্রি কলেজ। বিপন্ন নারীদের জন্য এবং পর্দানসীনদের জন্য তিনি দাতব্য চিকিৎসালয় গড়ে তোলেন, তাই এখনকার কুমিল্লা ফয়জুন্নেছা জেনানা হাসপাতাল। কুমিল্লার বহু রাস্তা ও পুকুর তার অনুদানে সৃষ্টি। মসজিদ নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণে তিনি অনেক অর্থ ব্যয় করেছেন। বাঙালি নারী মক্কাতে হজযাত্রীদের জন্য রেস্ট হাউজ এবং মদিনায় মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন এমন নজির ফয়জুন্নেছা ছাড়া আর নেই। পূর্ববঙ্গের মুসলমান যে পড়াশোনায় অনেক পিছিয়ে আছে এবং এই পশ্চাত্পদতা দূর করতে তাদের শিক্ষিত ও সংস্কৃতমনা করে গড়ে তোলার বিকল্প নেই—এটা তিনি উপলব্ধি করেছিলেন। তিনি নিজে সৃজনশীল লেখক ছিলেন এবং ঢাকা প্রকাশের মতো সে কালের শ্রেষ্ঠ পত্রিকাসহ বান্ধব, সুধাকর, মুসলমান বন্ধু এবং ইসলাম প্রচারক পত্রিকার তিনি ছিলেন অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষক। ফয়জুন্নেছার অভিজাত নওয়াবি এবং জমিদারি নিয়ে এক ধরনের প্রতিক্রিয়াশীল, রক্ষণশীল এবং ভোগলালসাপূর্ণ জীবনযাপনের কথা—কিন্তু সংস্কারক হিসেবে প্রজাকল্যাণে ব্রতী হিসেবে তিনি প্রগতিশীল জীবনযাপন করেছেন। কোনো সন্দেহ নেই মুসলিম নারী জাগরণে প্রধান ব্যক্তিত্ব হিসেবে বেগম রোকেয়া সমাদৃত। যদি অগ্রদূত বিবেচনা করতে হয়, তাহলে এ স্থানটি অবশ্যই ফয়জুন্নেছাকে ছেড়ে দিতে হবে। বেগম রোকেয়ার (১৮৮০-১৯৩২) জন্মেরও সাত বছর আগে তিনি নারীশিক্ষার জন্য পৃথক বিদ্যালয় স্থাপন করেছেন। বেগম রোকেয়াকে অধিকতর প্রতিষ্ঠা করতে সহায়ক হয়েছে তখনকার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রভূমি কলকাতায় অবস্থান এবং তার মৌলিক রচনাবলি, যা পাঠকমহলে বিশেষ সমাদৃত হয়েছে। অন্যদিকে ফয়জুন্নেছার জীবন ছিল কুমিল্লার মতো একটি মফস্বল জেলাকেন্দ্রিক। তিনিও লিখেছেন, রূপজালাল তার প্রধান সৃষ্টি। তবে তা মূলত গবেষকদের আকৃষ্ট করেছে, সাধারণ পাঠকের কাছে সেভাবে পৌঁছেনি। আধ-আত্মজীবনীমূলক কবিতা নির্ভর এ রচনার প্রকাশকাল ১৮৭৬, বেগম রোকেয়ার জন্ম আরো চার বছর পর। আর রবীন্দ্রনাথের বয়স তখন কেবল ১৫ বছর।

যদিও রহিমুন্নেসা ও তাহেরুন্নেসার লেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশ ফয়জুন্নেছার আগে, পূর্ণাঙ্গ ও গ্রন্থাকারে প্রকাশিত একটি বইয়ের প্রথম মুসলমান নারী রচয়িতার স্বীকৃতি নওয়াব ফয়জুন্নেছারই পাওয়ার কথা। রূপজালাল ফয়জুন্নেছার ব্যক্তিজীবনের অনেকটা প্রতিফলন। একালের ভাষায় এটি অ্যাডাল্ট কাহিনী, কিন্তু পরিবেশনার ধরনটি পিছিয়ে থাকা কালের, সেজন্য গ্রন্থটি ব্যাপক পরিচিতি পায়নি।

নারী অধিকার, ক্ষমতায়ন, নারীর অংশগ্রহণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অধিকার, নারীর সম্পদের মালিকানা এসব নিয়ে অনেক তাত্ত্বিক আলোচনা হয়। নওয়াব ফয়জুন্নেছা বিষয়টি দেখেছেন নারীর অজ্ঞতার নিরিখে। নারীর জন্য শিক্ষিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারলে তারাই তাদের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কে অবহিত হবে এবং প্রয়োজনই তাদের নারীপুরুষ বৈষম্যরোধের সৈনিকে পরিণত করবে।

বাংলা ভাষার বিস্তারে ভূমিকা রাখার জন্য নওয়াব ফয়জুন্নেছা বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন, এ নিয়ে কখনো সেমিনার সিম্পোজিয়াম হয়েছে শুনিনি। কিন্তু বাঙালি মুসলমানের শিক্ষা মানেই মাদ্রাসা শিক্ষা, বড়জোর ফারসির পণ্ডিত হওয়ার সে যুগে নিজের স্থাপন করা স্কুলে তিনি প্রচলন করেন শিক্ষার মাধ্যম বাংলা ভাষা। ভারতবর্ষের প্রথম এবং একমাত্র নারী নওয়াব তার সব সম্পদ শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারমূলক কাজে ব্যয় করেছেন। রূপজালাল ছাড়াও ‘সঙ্গীত সার’ ও ‘সঙ্গীত লহরী’ তার গ্রন্থ। বাঙালি মুসলমানের জন্য উনিশ শতকে তিনিই ছিলেন ‘লেডি উইথ আ ল্যাম্প’।

২৩ সেপ্টেম্বর ১৯০৩ তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

 

এমএ মোমেন: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা