এখন যে
এলাকাকে আমরা
কুমিল্লা জেলা
বলে চিনি,
একদা তা-ই
ছিল ত্রিপুরা
জেলার অধীন।
তখন উপমহাদেশজুড়ে
চলছে কোম্পানির
শাসন। ওই
সময় এ
এলাকারই এক
সমৃদ্ধ ও
বিশাল পরগনা
হোমনাবাদের (অধুনা
লাকসাম উপজেলার
অন্তর্গত) পশ্চিমগাঁও
গ্রামের প্রখ্যাত
জমিদার আহমদ
আলী চৌধুরী
ও আফরান্নেছার
ঘরে ১৮৩৪
সালে দুই
পুত্রসন্তানের পর
জন্ম নিল
এক ফুটফুটে
কন্যাশিশু। নাম
তার ফয়জুন্নেছা
চৌধুরাণী। কে
জানত, সেই
জমিদার ঘরের
কন্যা ফয়জুনই
একদিন হয়ে
উঠবেন বাংলার
অন্যতম জনসেবক
জমিদার ও
উপমহাদেশের নওয়াব
উপাধি পাওয়া
প্রথম নারী?
বাড়িতে ছোটবেলায়
খেলাধুলা করে
মূলত ফয়জুন্নেছার
সময় কাটলেও
একটু বড়
হওয়ার পরই
তার জন্য
দরকারি শিক্ষাদীক্ষার
বন্দোবস্তও করা
হয়েছিল। পাঠশালা
বা বিদ্যালয়ে
যাওয়ার সুযোগ
হয়নি সেকালের
প্রেক্ষাপটে, কিন্তু
বাবা-মা
তার জন্য
যথাসময়ে একজন
গৃহশিক্ষক রেখেছিলেন।
সেকালে অভিজাত
মুসলিম পরিবারে
যেমন শুধু
ফারসি বা
উর্দুতে কথা
বলার চল
ছিল, তার
থেকে খানিকটা
ব্যতিক্রম ছিল
তাদের বাড়িতে।
সেখানে বাংলাও
সমান তালে
চর্চা করা
হতো। ফলে
একই সঙ্গে
আরবি-ফারসি-উর্দু
ও বাংলা-সংস্কৃত
পঠন-পাঠন
শৈশবেই রপ্ত
করেছিলেন ফয়জুন্নেছা।
বলতে গেলে,
তাদের বাড়িতে
পরিবেশটাই ছিল
অন্যরকম। পিতার
একতরফা কর্তৃত্ব
নয়, তাদের
মা-ও
সন্তানদের ওপর
সমান অধিকার
নিয়ে তাদের
জীবনপ্রণালি নির্ধারণ
করতেন। ফয়জুন্নেছা
তার বিখ্যাত
‘রূপজালাল’
গ্রন্থে তাই
পিতার বংশপরিচয়ের
কথা যেমন
লিখেছেন, তেমনি
গুরুত্বের সঙ্গে
জানিয়েছেন মায়ের
পরিবারের পরিচয়ও,
যা কিনা
ওই সময়
ও তত্কালীন
সমাজের পরিপ্রেক্ষিতে
এক দুর্লভ
ঘটনাই বটে।
এমনকি বংশ-ইতিহাসের
প্রাসঙ্গিক বিবরণ
দিতে গিয়ে
পিতার মাতামহের
কথাও বিশেষভাবে
উল্লেখ করেছেন:
‘লেখিকার
পিতা (যিনি
হোমনাবাদেশ্বর আহম্মদ
আলী চতুর্ধূরী
নামে প্রসিদ্ধ)
এই বিখ্যাত
মোজাফফর তনয়ার
গর্ভজাত। তদীয়
বিখ্যাত গুণের
প্রশংসা সর্ব্বত্র
বিদিত। জনশ্রুতি
আছে যে
মোজাফফর গাজি
ঈদৃশ বিবেকী
ছিলেন যে
বঙ্গভূমি ইংলন্ডীয়দিগের
শাসনাধীন হইবার
সময় তদধীনতা
স্বীকারার্থ তাঁহাকে
আহ্বান করাতে
অস্বাধীনতা অপেক্ষা
মৃত্যুই শ্রেয়
বিবেচনায় তিনি
হীরক চুম্বন
করিয়া শরীর
ত্যাগ করেন।...’
পরে মাতৃকূলের
কথা লিখতে
গিয়ে ফয়জুন্নেছা
বলেন: ‘প্রসিদ্ধ
ভুলুয়া জেলান্তঃর্গত
দাডরা দেশাধিপতি
আছজদ চতুর্ধূরীনামা
ছিলেন, তিনি
দান, ধর্ম্ম,
তপতপাদিতে অদ্বিতীয়।
তত্প্রশংসা সময়মতো
অসাধ্য ভাবিয়া
ক্ষান্ত রহিলাম।
উক্ত চতুর্ধূরীর
তিন তনয়া,
তন্মধ্যে আফরান্নেছা
সর্ব্বজ্যেষ্ঠা। তাঁহার
রূপ-লাবণ্য
রমণীগণেও অনিমেষলোচনে
নিরীক্ষণ করিয়া
থাকে। তাঁহার
ভাগ্যবুদ্ধিও রূপলাবণ্যের
অনুরূপ। বোধহয়
ধরণীপৃষ্ঠে তৎসদৃশী
রূপবতী ও
গুণবতী সতী
অধিক পাওয়া
দুষ্কর।...[আফরান্নেছার]
গর্ভে দুইটী
পুত্র এবং
দুইটী কন্যা
জন্মে।...’
অতি অল্প বয়সেই ফয়জুন্নেছাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন তারই পরগনার আরেক জমিদার ভাউকসারের মোহাম্মদ গাজী চৌধুরী। গাজী চৌধুরী ছিলেন তার পরিবারের দূর সম্পর্কের আত্মীয়। আত্মীয়তা ও সামাজিক প্রভাবের কারণে ফয়জুন্নেছার বাবা প্রস্তাব প্রথমে নাকচ করেননি, কিন্তু পরে স্ত্রী আফরান্নেছার অসম্মতিতে সে বিয়ে তখনই আর হয়নি। মায়ের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে অপেক্ষা করার এ ঘটনা থেকে ফয়জুন্নেছার পরিবারের উদার মানসিকতা ও অগ্রগামিতার পরিচয় মেলে বৈকি। এর মাঝে, ফয়জুন্নেছার বয়স তখন মাত্র ১০, তার বাবা আহমদ আলী চৌধুরী সেই সময় হঠাৎ করেই পরলোকগমন করেন। দেশ-বিদেশ থেকে আসা বহু চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়েও তাকে বাঁচানো যায়নি। এ প্রসঙ্গে ‘রূপজালাল’-এ ফয়জুন্নেছা লিখেছেন: ‘পিতা যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত হইলেন, সহস্র সহস্র মুদ্রা ব্যয় করিয়া দেশ-বিদেশ হইতে বহুসংখ্যক বিজ্ঞচিকিৎসক আনয়ন পূর্ব্বক চিকিৎসা করাইলেন, কিন্তু কিছুতেই কিছু হইল না।...পিতা আমাগিকে অপার শোকসাগরে ভাসাইয়া আনন্দে স্বর্গপুরে গমন করিলেন। আমরা এবং দেশস্থ প্রজাপুঞ্জ সকলেই বহুদিন খেদ করিলাম। পরে আমরা আবার সংসারের মায়াজালে আবদ্ধ এবং লোভের বশীভূত হইলাম। বৈরাগের চিহ্নমাত্র রহিল না।’ কিশোরী ফয়জুন্নেছার মনে পিতার মৃত্যু এক বিরাট বিষাদের ছাপ ফেলে যায়। পিতার মৃত্যুর পর ফয়জুন্নেছার নাবালক বড় ভাই ইয়াকুব আলী চৌধুরী চাচা বকস আলী চৌধুরীর অভিভাকত্বে জমিদারির দায়িত্ব পান। যদিও জমিদারির দেখাশোনা কার্যত আফরান্নেছাকেই করতে হচ্ছিল।
এর মাঝে
ঘটল আরেক
মর্মান্তিক কাণ্ড।
ফয়জুন্নেছাকে বিয়ে
করতে চাওয়া
সেই জমিদার-পুত্র
গাজী চৌধুরী
এরই মধ্যে
বাবার জমিদারির
দায়িত্ব পেয়ে
গেছেন। অন্য
এক নারীকে
বিয়েও করেছেন।
কিন্তু তা
সত্ত্বেও ফের
ফয়জুন্নেছাকে পত্নীরূপে
পাওয়ার বাসনা
ছিল তার
মনের ভেতরে।
এজন্য নানা
ষড়যন্ত্র করে
ফয়জুন্নেছার দুই
ভাই এয়াকুব
ও ইউসুফ
আলী চৌধুরীর
তীব্র দ্বিমত
সত্ত্বেও মা
আফরান্নেছাকে চাপে
ফেলে শেষমেশ
ফয়জুন্নেছাকে বিয়ে
করতে সক্ষম
হোন। রূপজালাল
গ্রন্থে এ
করুণ ঘটনার
বয়ান ফয়জুন্নেছা
দিয়েছেন এভাবে:
‘[গাজী
চৌধুরী] আমার
পাণিগ্রহণাভিলাষে জননীকে
অনেক স্তুতি
করিলেন এবং
অমাত্যদিগকে ধনে
বশীভূত করিয়া,
তাহাদের সাহায্যে
আমার গর্ভধারিণীকে
বহুপ্রযত্নে সম্মত
করাইলেন।... কেবল
জামাতার অন্তঃকরণে
অত্যন্ত আসক্তির
ভাব দেখিয়াই
আমাকে বিবাহ
দিলেন।...স্বচক্ষে
স্বপত্নী দেখিয়াও
জননী আমাকে
সলিলে ভাসাইলেন।...’
তবে ফয়জুন্নেছা
পরে এও
লিখেছেন, ‘...কিন্তু
বিবাহের পর
কয়েক বৎসর
সুখেই গত
হইল।...’
এক্ষেত্রে ফয়জুন্নেছার
একটি শর্ত
গাজী চৌধুরীকে
মেনে নিতে
হয়। তা
হলো বিয়ের
পর ফয়জুন্নেছা
স্বামীর বাড়িতে
যাবেন না।
পশ্চিমগাঁওয়ে নিজের
বাড়িতে থেকেই
সংসার করবেন।
ফয়জুন্নেছা চেয়েছিলেন,
এ শর্তে
তিনি অটুট
থাকবেন। বিয়ের
পাঁচ বছর
অব্দি তা
হয়েও ছিল।
এর মাঝে
তাদের ঘরে
আরশাদুন্নেছা ও
বদরুন্নেছা নামের
দুই কন্যাসন্তানও
জন্ম নেয়।
কিন্তু একদিন
বজরায় করে
নদীতে ঘোরাবার
কথা বলে
গাজী চৌধুরী
দ্বিতীয় পত্নীকে
তার ভাউকসারের
বাড়ির ঘাটে
নিয়ে হাজির
হন। দৃঢ়চেতা
ফয়জুন্নেছার জন্য
এ ছলচাতুরী
ছিল বিরাট
আঘাতের মতো।
সাতদিন গাজী
চৌধুরীর বাড়িতে
থাকলেও সেই
বাড়ি থেকে
আসা কোনো
খাবার ও
এমনকি পানিও
তিনি ছোঁননি।
তার ভাইয়েরা
তার জন্য
খাবার ও
পানি পাঠিয়ে
দিচ্ছিলেন। সাতদিন
পর যখন
তিনি নিজের
বাড়িতে ফিরে
আসার প্রস্তুতি
নেন গাজী
চৌধুরী তখন
জোর করে
তাদের বড়
মেয়েকে নিজের
কাছে রেখে
দেন। ফয়জুন্নেছা
রাগে-কষ্টে
আর কোনোদিন
স্বামীর মুখ
না দেখার
পণ করেন।
অবশ্য ‘রূপজালাল’
পাঠ করলে
এটাও মনে
হতে পারে
যে পূর্বোক্ত
ঘটনার পাশাপাশি
গাজী চৌধুরীর
প্রথমা স্ত্রীর
নানা কূট
তত্পরতাও ফয়জুন্নেছা-গাজীর
আপাত বিচ্ছেদ
ঘটানোর নেপথ্যে
কাজ করেছিল:
‘...আমার
প্রতি পতির
ঈদৃশ অনুরাগ
দেখিয়া সতিনীর
অন্তঃকরণে বিষমহিংসা
জন্মিয়া উঠিল।
কিরূপে আমাকে
স্বামীর চিত্ত
হইতে দূরীভূত
করিবে তাহার
অনুসন্ধান করিতে
লাগিল। গোপনে
বহু মুদ্রা
ব্যয় করিয়া
অনেক তান্ত্রিক
দ্বারা...আমাকে
তাহার চক্ষের
শূল করিয়া
তুলিল।...’
১৮৮৫ সালে
মায়ের মৃত্যুর
পর পিতার
জমিদারির একাংশের
দেখাশোনার ভার
এসে পড়ে
ফয়জুন্নেছার ওপর।
সেকালের অনেক
প্রত্যক্ষদর্শীর মতে,
ফয়জুন্নেছা তার
অংশের জমিদারি
যেমন সুচারুরূপে
চালাতেন, তেমনটা
তার ভাইয়েরাও
পারতেন না।
জমিদারি এলাকায়
বসবাসকারী জনতার
অবস্থা ঠিক
কেমন, তা
দেখার জন্য
তিনি পালকিতে
চড়ে বিভিন্ন
জায়গায় যেতেন।
স্বচক্ষে দেখতেন
সাধারণ মানুষের
হাল-হকিকত।
প্রতিদিন সকালে
তিনি নামাজ
আদায়ের পর
কোরআন পাঠ
করে অল্পকিছু
খাবার খেয়ে
সোজা জমিদারির
দপ্তরে গিয়ে
বসতেন। দরিদ্র
মানুষের অভাব-অভিযোগের
সম্পর্কে তথ্য
নিয়ে তার
জমিদারির কাজ
প্রতিদিন শুরু
হতো। প্রতি
ওয়াক্তের নামাজ
পড়া আর
স্নান-খাওয়ার
মতো নৈমিত্তিক
কাজের সময়টুকু
বাদ দিয়ে
তিনি জমিদারির
পেছনে প্রায়
বিকাল পর্যন্ত
নিজের সময়
ব্যায় করতেন।
জনসেবক হিসেবে
প্রায় পুরো
বাংলায় পরিচিত
ফয়জুন্নেছা নিজের
এলাকায় বেশকিছু
জনকল্যাণকর প্রতিষ্ঠান
ও স্থাপনা
তৈরি করেছিলেন।
পশ্চিমগাঁও গ্রামের
নিজের বাড়ির
পাশেই তৈরি
করেন দশ
গম্বুজের একটি
বিরাট মসজিদ।
প্রাত্যহিক প্রার্থনার
পাশাপাশি এ
মসজিদে কোরআন
শিক্ষা দেয়া
হতো এবং
এখান থেকে
প্রতি শুক্রবার
জুমার নামাজের
দিন গরিবদের
খাবার দেয়া
হতো। এছাড়া
একটি মাদ্রাসাও
ফয়জুন্নেছা প্রতিষ্ঠা
করেন, যেখানে
পড়তে কোনো
বেতন লাগত
না। এমনকি
পড়ুয়াদের রাত
জেগে পড়াশোনা
করার জন্য
যে বাতি
জ্বালানো হতো
তখন, তার
জ্বালানি তেলের
খরচও তিনি
দিতেন। নিজের
জমিদারির বেশ
কয়েকটি এলাকায়
ছেলেদের জন্য
ফয়জুন্নেছা প্রতিষ্ঠা
করেছিলেন প্রাথমিক
বিদ্যালয়। মোটমাট
পাঁচটি বালক
বিদ্যালয় তিনি
তৈরি করে
দিয়েছিলেন। কুমিল্লা
শহরে ১৮৭৩
সালে মেয়েদের
জন্য প্রতিষ্ঠা
করেছিলেন দুটি
প্রাথমিক বিদ্যালয়।
একটি প্রতিষ্ঠা
হয়েছিল শহরের
নানুয়া দীঘির
পশ্চিমপাড়ে, আরেকটি
কান্দিরপাড়ে। ওই
সময় বাংলার
প্রধান শহর
কলকাতা ও
ঢাকাতেও মুসলিম
কিশোরীদের পড়ার
জন্য আলাদা
বিদ্যালয়ের ব্যবস্থা
ছিল না।
নারীশিক্ষার
প্রসারের দিকে
যেমন ফয়জুন্নেছার
বিশেষ নজর
ছিল, তেমনি
নারীদের সুচিকিৎসা
নিয়েও তিনি
ভাবতেন। ১৮৯৩
সালে কুমিল্লা
শহরে শুধু
নারীদের জন্য
বিশেষায়িত চিকিৎসার
ব্যবস্থাসমেত তিনি
প্রতিষ্ঠা করেন
‘ফয়জুন্নেছা
জেনানা হাসপাতাল’।
আর নিজের
গ্রামের নারী-পুরুষ
সবার জন্য
একটি দাতব্য
চিকিৎসালয়ও তিনি
তৈরি করে
দিয়েছিলেন। যার
মাসিক খরচ
তিনিই মেটাতেন।
গরিব-অসহায়দের
থাকার জন্য
মুসাফিরখানা প্রতিষ্ঠাও
ফয়জুন্নেছার এক
অনন্য কীর্তি।
যেকোনো দরিদ্র
ব্যক্তি বা
দূর-দূরান্তে
ভ্রমণকারী ব্যক্তিরা
তার মুসাফিরখানায়
বিনা শর্তে
ও নিখরচায়
তিনদিন তিন
রাত থাকতে
পারতেন। শীতকালে
ঠাণ্ডায় কাতর
গরিবদের জন্য
তিনি শীতবস্ত্রও
বিলি করতেন।
প্রতি বছরের
জন্য তার
তহবিল থেকে
তখনকার ৮০০
টাকা বরাদ্দ
করা হতো।
এছাড়া নিজের
জমিদারির সীমানায়
বেশকিছু দীঘি
খনন, রাস্তাঘাট-কবরস্থান
ও সেতু
তৈরির কাজ
করেছিলেন ফয়জুন্নেছা।
এসবের মাঝে
তিনি সাহিত্যচর্চাও
করতেন। ১৮৭৬
সালের ২০
ফেব্রুয়ারি ঢাকার
গিরিশ মুদ্রণযন্ত্র
থেকে প্রকাশিত
হয় তার
গদ্যে-পদ্যে
মেশানো আত্মজৈবনিক
কাহিনীগ্রন্থ ‘রূপজালাল’।
বাঙালি মুসলমান
নারীদের মধ্যে
তিনিই প্রথম
গ্রন্থ-রচয়িতা।
বলা যেতে
পারে, ‘রূপজালাল’
আদতে নিজের
জীবনপ্রবাহের বেদনার
অংশটুকু অন্যের
সঙ্গে ভাগ
করে নেয়ার
উদ্দেশ্যে রচিত।
একান্ত ব্যক্তিগত
উদ্দেশে এটি
তিনি রচনা
করলেও মানবিক
অনুভূতির আন্তরিক
অকপট প্রকাশ
ও ভাষার
সারল্যের গুণে
বইটি বিশেষত্ব
পেয়েছে। এমনকি
ইতিহাসের উপাদান
হিসেবেও এর
গুরুত্ব কম
নয়। একজন
বাঙালি মুসলমান
নারীর চোখে
দেখা সেকালের
সমাজের এমন
চিত্রাবলি সত্যিই
দুর্লভ।
১৮৮৯ সালে
ফয়জুন্নেছা ব্রিটিশ
সাম্রাজের রানী
ভিক্টোরিয়ার থেকে
‘নওয়াব’
খেতাব লাভ
করেন। এমন
অভূতপূর্ব ঘটনার
নেপথ্যে একটি
বড় কাহিনী
রয়েছে। ত্রিপুরা
জেলা তথা
কুমিল্লা এলাকার
তত্কালীন জেলা
ম্যাজিস্ট্রেট ডগলাস
সাহেব একবার
এলাকার জমিদারদের
কাছে রাস্তা
তৈরি ও
নানা নির্মাণকাজের
জন্য ঋণ
হিসেবে ফেরতযোগ্য
অর্থ সাহায্য
চেয়েছিলেন। কিন্তু
এক ফয়জুন্নেছা
বাদে আর
কেউই এগিয়ে
আসেননি। ডগলাস
সাহেবের জন্য
তিনি ষাট
হাজার বা
মতান্তরে ১
লাখ টাকা
তখনই অনুদান
হিসেবে পাঠিয়ে
দিয়েছিলেন। যেখানে
কোনো পুরুষ
জমিদার এক
পয়সাও দিলেন
না, সেখানে
একজন নারী
জমিদার অন্তরাল
থেকে এত
টাকা দিলেন—এমনটা
দেখে ডগলাস
সাহেব অবাকই
হয়ে গিয়েছিলেন।
রাস্তাঘাট তৈরির
পর যখন
তিনি টাকাটা
ফয়জুন্নেছাকে ফেরত
দিতে গেলেন,
তখন তিনি
তা গ্রহণ
করেননি। বরং
বিনয়ের সঙ্গে
বলেছিলেন, ‘ফয়জুন্নেছা
যা দেয়
তা দান
হিসেবেই দেয়,
ঋণ হিসেবে
নয়।’ ডগলাস
এ রকম
একজন মহীয়সী
নারীর সাক্ষাৎ
পেয়ে এত
মুগ্ধ হয়েছিলেন
যে রানী
ভিক্টোরিয়ার কাছে
ফয়জুন্নেছাকে ‘বেগম’
উপাধি দেয়ার
আবেদন জানিয়ে
ফেলেন। ভিক্টোরিয়াও
এ প্রস্তাবে
সানন্দে সম্মতি
দেন। কিন্তু
এ খবর
ফয়জুন্নেছার কানে
গেলে তিনি
বলেন, এলাকার
লোক তাকে
এমনিতেই জমিদার
হিসেবে বেগম
বলে চেনে,
কাজেই এ
উপাধির সার্থকতা
কিছু নেই।
ফয়জুন্নেছার এমন
দ্বিমতের কথা
ভিক্টোরিয়ার কানেও
যায়। তাই
তিনি ফয়জুন্নেছাকে
‘নওয়াব’
উপাধি প্রদানের
নির্দেশ দেন
পরে। সে
সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে
এ ছিল
এক যুগান্তকারী
ঘটনা। বাংলার
কেন, ভারতীয়
উপমহাদেশের কোনো
নারীই এর
আগে এ
খেতাব পাননি।
বাংলার অন্য
অনেক পুরুষ
জমিদার এ
প্রস্তাব মেনে
নিতে পারেননি।
তারা দিল্লির
ভাইসরয়ের দরবারে
এ বিষয়ে
এক নারাজি
প্রস্তাব পাঠান।
ব্রিটিশ সরকার
এহেন তত্পরতায়
খানিক বিচলিত
হয়ে ফয়জুন্নেছাকে
ফের ‘বেগম’
উপাধি দিতে
চাইলে তিনি
তা প্রত্যাখ্যান
করেন। পরে
ব্রিটিশ পার্লামেন্টের
বিশেষ সিদ্ধান্তে
ভিক্টোরিয়ার আদেশই
বহাল রাখা
হয়। কুমিল্লা
শহরের নওয়াব
বাড়িতে বিরাট
অনুষ্ঠান করে
ফয়জুন্নেছাকে এ
উপাধি আনুষ্ঠানিকভাবে
তুলে দেয়া
হয়। দুঃখের
বিষয়, নওয়াব
খেতাব প্রাপ্তির
কয়েক মাস
আগে ফয়জুন্নেছার
স্বামী গাজী
চৌধুরীর মৃত্যু
হয়েছিল। মৃত্যুর
আগে অভিমান
ও রাগ
ভেঙে তার
সঙ্গে ফয়জুন্নেছা
দেখা করে
এসেছিলেন।
১৮৯৪ সালে
কন্যা বদরুন্নেছাকে
সঙ্গে নিয়ে
পবিত্র হজ
পালন করার
উদ্দেশে ফয়জুন্নেছা
মক্কায় গিয়েছিলেন।
কিন্তু সে
বছর শারীরিক
অসুস্থতার কারণে
তার হজপালন
করা হয়নি।
এর পরের
বছর, ১৮৯৫
সালে তিনি
পবিত্র হজ
সম্পন্ন করেন।
হজ পালনের
প্রায় সাত
বছর পর
১৯০৩ সাল
বা বাংলা
১৩১০ সনের
১০ আশ্বিন
নিজের বাড়িতেই
ফয়জুন্নেছা প্রয়াত
হন। পশ্চিমগাঁও
গ্রামের পারিবারিক
গোরস্তানে তাকে
সমাহিত করা
হয়।
মুহিত হাসান: নন-ফিকশন লেখক





