১৯২৫
সাল।
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া
কলেজে ভর্তি
হই। প্রবেশ
পথে বাঁদিকের
দেয়ালে মারবেল
পাথরে লেখা
প্রতিষ্ঠালগ্নে আর্থিক
সাহায্যদাতাদের নাম।
পড়ে মনে
খটকা লাগল
মেয়ে মানুষের
আগে ‘নওয়াব’
শব্দ দেখে।
ব্যাকরণে পড়েছি
লিঙ্গান্তরেও নওয়াবের
বিপরীতে বেগম।
এখানে এর
ব্যতিক্রম কেন?
লেখা ছিল
নওয়াব ফয়জুন্নেসা
চৌধুরাণী।
১৯৫৬ সাল।
চট্টগ্রাম নর্মাল
স্কুলের সুপারিনটেনডেন্ট,
অধ্যক্ষ। টেক্সট
বুক বোর্ডের
বিজ্ঞপ্তি মোতাবেক
ষষ্ঠ শ্রেণীর
দ্রুত পঠনের
বই লিখি—নাম
‘পথের
দিশা দেখাল
যারা।’ বিশ্ব
মনীষীর আটাশটি
বিরল চরিত্রের
সংক্ষিপ্ত সমাবেশ
ছিল তাতে।
সেখানে ‘বেগম
হল নবাব’
নাম ফয়জুন্নেসা
চৌধুরাণীকে তুলে
ধরি। তার
সম্পর্কে জেনেছি
কিছুটা। যতই
তার সম্পর্কে
জানতে চাই
ততই অবাক
বিস্ময়ে ভাবি
কী বিস্ময়কর
প্রতিভার অধিকারিণী
ছিলেন তিনি।
১৯৬৩ সালের
সেপ্টেম্বর।
শিক্ষা বিভাগের
বয়স্ক শিক্ষার
প্রথম সহকারী
জনশিক্ষা পরিচালক,
এডিপি আই
হিসেবে কাজ
শুরু করি।
অফিস ঢুলীপাড়াস্থ
অভয় আশ্রমে।
গাঁয়ের নিরক্ষর
মানুষের বিশেষ
করে ক’টি
সমবায়ীদের সাক্ষর
ও শিক্ষিত
করে তোলার
কাজ। সদ্য
সাক্ষর ও
স্বল্প পড়ুয়াদের
জন্য বই
চাই। শিক্ষা
সনদপ্রাপ্তির পরেই
বই। নইলে
তারা আবার
নিরক্ষর হয়ে
যাবে।
মেয়েদের পাঠে
উৎসাহ জোগানের
জন্য বাংলার
দুজন মহীয়সী
নারীর জীবনী
লিখি। যুক্ত
অক্ষরবর্জিত সহজপাঠ্য
বই রোকেয়া।
বহু কষ্ট
করে প্রতিকূল
অবস্থার মধ্যে
তাকে পড়তে
হয়েছে। রাত
জেগে লুকিয়ে।
অন্যদিকে বিশাল
জমিদারির মালিক,
পরগনে হোমনাবাদের,
ফয়জুন্নেছা। জন্মেছেন
অজ পাড়াগাঁয়ে,
লাকসাম উপজেলার
পশ্চিমগায়ে। ঘরে
বসে জ্ঞানার্জন
করেছেন। মহাজ্ঞানী,
পণ্ডিত হয়েছেন,
লিখে গেছেন
চারখানা বই—‘রূপজালাল’
(১৮৭৬) ৪৭৬
পৃষ্ঠা, দ্বিতীয়
‘তত্ত্ব
ও জাতীয়
সঙ্গীত’ (১৮৮৭)।
আর দুখানা
গানের বই
‘সংগীত
সার’ ও
‘সংগীত
লহরী’।
সহজ ভাষায়
লিখিত নওয়াব
ফয়জুন্নেসা মাত্র
২২ পৃষ্ঠায়
সমাপ্ত। কিন্তু
জীবন ও
কর্মের সংক্ষিপ্ত
পরিচিতি তাতে
আছে।
বই অতি
ছোট হলেও
নওয়াব ফয়জুন্নেসা
জীবন তথ্য
সংগ্রহের জন্য
বারবার যেতে
হয়েছে পশ্চিম
গাঁয়ে। একবার
বেবি ট্যাক্সির
অ্যাকসিডেন্টে চোয়ালের
হাড় ভেঙেছে।
কিন্তু ভাঙতে
পারেনি আমার
সংকল্প। কিন্তু
দুর্ভাগ্য ফয়জুন্নেসার
লিখিত কোনো
বইয়ের সন্ধান
পাওয়া যায়নি।
১৯৬৮ সালের
নভেম্বরে চাকরি
জীবন শেষ।
হন্যে হয়ে
রূপজালালের অনুসন্ধানে
জুটলাম পশ্চিমগাঁয়ে,
এখানে ওখানে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
পাঠাগার, বাংলা
একাডেমি পাঠাগার
কোথাও বই
নেই। কবি
আব্দুল কাদির,
মনসুরউদ্দীন, আব্দুল
মতিন পাটওয়ারী
কেউ কোনো
সন্ধান দিতে
পারলেন না।
অথচ ফয়জুন্নেসা
প্রথম বাঙালি
মহিলা লেখিকা
যার বই
ছাপার অক্ষরে
বেরিয়েছে।
ফয়জুন্নেসা স্মৃতিরই
কুমিল্লা উচ্চ
ইংরেজি বালিকা
বিদ্যালয়, স্থাপনকাল
১৮৭৩। ১৯৭৬
সালে স্কুলের
প্রধান শিক্ষিকা
ছিলেন উম্মে
কুলসুম গুলে
নূর। অনেক
বুঝিয়ে শুনিয়ে
স্কুলের একটা
শতবার্ষিকী স্মরণিকা
বের করা
হলো। সবই
করতে হলো
আমাকে। তবু
তাদের সহযোগতাি
না হলে
ওই প্রকাশনা
সম্ভব হতো
না: শিক্ষিতমহল
বইখানা তল্লাশি
করেছে বারবার।
এবার সংকল্প
নিলাম রূপজালাল
কাব্যের শতবার্ষিকী
করব। বইয়ের
শতবার্ষিকী! শুনে
অনেকে আড়চোখে
চেয়েছে। কেউ
কেউ টিটকারী
দিয়েছে। যোগাযোগ
করলাম নওয়াব
বাড়ির ফয়জুন্নেসার
বংশধর, আত্মীয়
দুজনার সঙ্গে—
ব্যারিস্টার সৈয়দ
হাবিবুল হক
ও বেগম
রেনুকা হকের
সঙ্গে। তারা
উঠেপড়ে লেগে
গেলেন বই
সংগ্রহে। দৈনিক
ইত্তেফাকে ও
কুমিল্লার সাপ্তাহিক
আমোদে বিজ্ঞপ্তি
দেয়া হলো—বইয়ের
সন্ধানে। সবই
ব্যর্থ। হাবিবুল
হক সাহেব
শেষ পর্যন্ত
খণ্ডিত চারখানা
বই সংগ্রহ
করে এনে
দিলেন। জোড়াতালি
দিয়ে দেখা
গেল ৪০০
পৃষ্ঠা মিলে।
বাকি ৭৬
পৃষ্ঠা নেই।
তাই সম্বল
করে ছুটে
গেলাম ঢাকা।
বাংলা একাডেমির
মহাপরিচালক আশরাফ
সিদ্দিকী সভাপতি
ও শিক্ষামন্ত্রী
আবুল ফজল
প্রধান অতিথি
হতে রাজি
হলেন। পরে
যোগ দিতে
রাজি হলেন
স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা.
মোহাম্মদ ইব্রাহিম।
পশ্চিমগাঁয়ে নওয়াব
বাড়িতে যথারীতি
অনুষ্ঠিত হলো
রূপজালালের শতবার্ষিকী।
৯ জানুয়ারি
১৯৭৭। লাভ
হলো অনেক।
মৃত নওয়াব
আবার জীবিত
হলেন। দেশবাসী
লোকজন জানল
তার সাহিত্য
সাধনার কথা।
তখনকার প্রকাশিত
শতবার্ষিকী স্মরণী
নতুন করে
স্মরণে এনেছিল
সরাসরি নওয়াব
উপাধি পাওয়া
ভারতের একমাত্র
নারী নওয়াবকে।
অনুষ্ঠান শেষ
হলো। কিন্তু
আমার কাজ
নতুন করে
শুরু হয়।
পূর্ণাঙ্গ বই
চাই। অনেক
খোঁজাখুঁজি হলো।
নস্ফিল প্রয়াস।
একবার আলাপ
হলো চট্টগ্রাম
বিশ্ববিদ্যালয়ের আবুল
ফজল সাহেবের
সঙ্গে। তিনি
‘পাণ্ডুলিপির’
একটা কপি
দেবেন। তাতে
ছিল ড.
আবদুল আউয়ালের
ফয়জুন্নেসার সম্পর্কে
একটা প্রবন্ধ।
তাতে দেখা
গেল লন্ডনের
ইন্ডিয়া অফিস
লাইব্রেরিতে বাংলা
বিভাগের ক্রমিক
নং-১৪১৮তে
বইখানা সযত্নে
সংরক্ষিত আছে।
এরই মধ্যে
দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের
দুজন ছাত্রী
তপতী রায়,
জলপাইগুড়ি বিশ্ববিদ্যালয়,
আর রওশন
আরা বেগম,
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়—গবেষণা
করছেন ফয়জুন্নেসা
চৌধুরীর সাহিত্য-সাধনা
সম্পর্কে। পত্রালাপে
তারা আমার
কাছ থেকে
প্রাপ্ত তথ্য
নিয়ে যায়।
রওশন আরা
তো নিজেই
চলে আসেন
কুমিল্লায়। তাকে
সাহায্য করি।
আমার কাজ
আবারো নতুন
করে শুরু।
ছুটে গেলাম
ঢাকা ব্রিটিশ
কাউন্সিলে। অনেক
বোঝানোর পর,
অর্থাৎ প্রথম
বাঙালি মহিলা
প্রকাশিত বই,
তদুপরি মুসলমান
মহিলা, প্রবীণ
কর্মচারী জয়নুল
আবেদিন এসে
দিলেন ৭৬
পৃষ্ঠার ফটোস্ট্যাট
কপি লন্ডন
থেকে। বেশ
পয়সা দিতে
হয়েছে।
মহাখুশি। এবার
বই প্রকাশনার
প্রশ্ন। সমাপ্ত
বইখানা শুদ্ধাশুদ্ধিসহ
নতুন করে
সম্পাদনা করলাম।
সঙ্গে ফয়জুন্নেসার
সংক্ষিপ্ত জীবন
আলেখ্য। অর্থের
অভাব। হাবিবুল
হক সাহেব
প্রকাশনার ব্যবস্থা
করতে অপারগ।
সম্বল নওয়াব
খেতাব দেখার
সময়কার হীরকখচিত
পদক আর
একটা ‘ডাক-গান’।
এসব নিয়ে
তার সঙ্গে
অনেক আলাপ।
থাকেন আজিমপুরা
দায়রা শরীফে।
দুজনের বহু
জল্পনা-কল্পনা।
হঠাৎ আমি
অসুস্থ হলাম।
অপারেশন হলো।
১৯৮০ সালে
ডেকে পাঠালাম
হাবিবুল হক
সাহেবকে। সমস্ত
বইখানা তাকে
ফেরত দিলাম।
বিধিবাম। কয়েক
দিন পর
তিনি মারা
গেলেন। বহু
কষ্টে তাদের
পরিবার থেকে
বইখানা উদ্ধার
করলাম। বাংলা
একাডেমির মহাপরিচালক
ড. আশরাফ
সিদ্দিকীকে বহু
অনুরোধের পর
তা ছাপাতে
রাজি হলেন।
কিন্তু সময়
ঠিক করতে
নারাজ। কারণ
বহু পুরনো
গ্রন্থ প্রকাশনার
অপেক্ষায় আছে।
পুরনো সাহিত্য
সংকলন বিভাগের
দায়িত্বে ছিলেন
জনাব আবদুর
রাজ্জাক। অত্যন্ত
সহানুভূতির সঙ্গে
তিনি বিবেচনা
করতে রাজি
হলেন, পরামর্শ
দিলেন—এ
বিভাগের কমিটির
প্রধান ড.
আহমদ শরীফ।
তিনি জোর
দিলে প্রকাশনা
সহজ ও
সত্বর হবে।
অসুস্থ শরীরে
ছোট মেয়েকে
নিয়ে তার
বাড়ি হাজির।
তিনি আশ্বাস
দিলেন। পেছনে
লেগে থাকলাম।
পুনর্মুদ্রণের জন্য
৫০ হাজার
টাকা মঞ্জুর
হলো। এবারই
বই মুদ্রণে
যাবে। উত্ফুল্ল
আমি। জুনের
মধ্যে বের
হবে। শতবর্ষের
পুরনো বই
ঝরঝরে। হুকুম
হলো সমস্ত
বইটা ফটোস্ট্যাট
করে দাও।
(৪৭৬ পৃষ্ঠা)
করলাম। জুলাইতে
যেয়ে জানলাম
বই প্রকাশিত
হয়নি। হতাশায়
ভেঙে পড়লাম।
ব্যাপার কী?
স্বার্থান্বেষীরা টাকাটা
দিয়ে অন্য
বই ছাপিয়েছে।
বাংলা একাডেমির
নতুন মহাপরিচালক
জনাব মঞ্জুর-ই-মাওলা
সিএসপি। পূর্ব
পরিচিতির দাবিতে
সব ঘটনা
খুলে বললাম।
তিনি কথা
শুনলেন। ১৯৮৪
সালের ২১
ফেব্রুয়ারি রূপজালালের
পুনর্জন্ম হলো।
বইয়ের একটা
নতুন সংযোজন
আছে। নওয়াব
ফয়জুন্নেসার একটা
কল্প-ছবি।
একুশে বইমেলায়
দেখা যায়
বাংলার প্রখ্যাত
সাহিত্যিকদের ছবি।
জাদুঘরেও আছে
তাদের ছবি।
কিন্তু নেই
ফয়জুন্নেসার ছবি।
আবার পশ্চিমগাঁয়ে।
ইরানী হক
ও হাবিবুল
হক ফয়জুন্নেসার
মুখের আদলের
বর্ণনা দিলেন
তা নাকি
ছিল রামসুন্দর
বসাকের বাল্যশিক্ষার
মলাটের রানী
ভিক্টোরিয়ার মুকুটবিহীন
আকৃতি। কিন্তু
তত মোটা
নয়। কিনলাম
বাল্যশিক্ষা। এক
কলেজে সহকর্মী
চিত্রশিল্পী সুরঞ্জন
দত্তকে দিয়ে
আঁকালাম একটা
ছবি। বারবার
পরিমার্জনের পর
তাই সংযোজিত
হলো নতুন
প্রকাশিত ‘রূপজালাল’
গ্রন্থে। ব্যস!
আর হারিয়ে
যাবে না
ফয়জুন্নেসা। তার
একটা ফটো
নাকি রানী
ভিক্টোরিয়া বাকিংহাম
প্যালেসে রেখেছিলেন।
এখন তার
কোনো হদিস
পাওয়া যায়
না। হয়তো
ব্রিটিশ জাদুঘরে
বাংলাদেশ বিভাগে
থাকতে পারে।
খুঁজে বের
করবে কে?
রূপজালাল ছাড়া অন্য
তিনখানা বইয়ের
মধ্যে ‘তত্ত্ব
ও জাতীয়
সঙ্গীত’ অত্যন্ত
মূল্যবান, তা
আবিষ্কার ও
প্রকাশনার প্রয়োজন
আছে। গবেষকদের
দিকে চেয়ে
আছে জাতি,
বিশেষ করে
কুমিল্লাবাসী।
গবেষণা অনুসন্ধান
খুব কঠিন
কাজ। চাই
অসীম ধৈর্য,
কঠোর অধ্যবসায়,
অবিশ্রান্ত সাধনা।
তা হাড়ে
হাড়ে, মর্মে
মর্মে উপলব্ধি
করেছি তিন
বছর। অবিরাম
চেষ্টার পর
হারিয়ে যাওয়া
বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে
থাকা রাজিয়া
খাতুন চৌধুরাণীর
(১৯০৮-১৯৩৪)
লেখা গ্রন্থেও।
আড়াইশ পৃষ্ঠার
বই সংকলনে।
আর দুই
বছরের চেষ্টার
অলিখিত কুমিল্লা
শহরের ইতিবৃত্ত
‘শহর
কুমিল্লা’ প্রকাশ।
অন্যান্য তথ্যের
মধ্যে শহরের
১৪৯ জন
বিভিন্ন পেশায়
কৃতবিদ্য পুরুষ
নারীর সংক্ষিপ্ত
জীবন পরিচিত
আছে তাতে।
তথ্য সংগ্রহে
জান ফাশ
হয়েছে। কত
দরজায় কতবার
ধরনা দিতে
হয়েছে হিসাব
নেই।
টাউন হলের
সামনে কৃতী
সন্তানদের স্মৃতিফলকে
উল্লিখিত ১৬৮
জনের মধ্যে
বেশির ভাগের
জন্ম ও
মৃত্যু তারিখ
ও জন্মস্থান
সংগ্রহে কী
কষ্টকর ব্যাপার
ছিল তা
অনুমেয়।
কুমিল্লা রত্নগর্ভা-রত্ন
প্রসবিনী, কৃতী
সন্তানের গৌরব
উজ্জ্বল। ছোটদের
মনে ঔত্সুক্য
অনুসন্ধিৎসা ও
কুমিল্লা পরিচিতির
জন্য ‘কুমিল্লার
স্মরণীয় ও
বরণীয়’ নামক
গ্রন্থটি ৬৩
জন কৃতী
সন্তানের জীবন
আলেখ্যের ছিটেফোঁটা
নিয়ে ছাপাখানায়
আছে।
রূপজালালের পুনর্জন্মের
সঙ্গে জন্ম
হোক কুমিল্লার
সব কৃতী
সন্তানের কীর্তিগাথা
এই কামনা।
সাপ্তাহিক আমোদ
২৭
মে-মার্চ,
১৯৮৬ কুমিল্লা
রচনাটি মামুন সিদ্দিকী সম্পাদিত মোহাম্মদ আবদুল কুদ্দুস স্মারকগ্রন্থ থেকে সংকলিত





