নওয়াব ফয়জুন্নেছা (১৮৩৪-১৯০৩) ‘রূপজালাল’ উপন্যাস লিখে বাংলা সাহিত্যে খ্যাতি লাভ করেছেন। তিনি বাংলা সাহিত্যে প্রথম নারী, যার গ্রন্থ প্রথম প্রকাশ পেয়েছে। সমকালীন সাহিত্যিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে, মুসলিম সমাজের পরিপ্রেক্ষিতে এটি বিরাট বিষয়। ‘রূপজালাল’ ছাড়াও তার কিছু সৃষ্টিকর্ম রয়েছে। তিনি ‘সঙ্গীত-সার’ ও ‘সঙ্গীত-লহরী’ নামে দুটি গ্রন্থ লিখেছেন বলে ফয়জুন্নেছা-গবেষকরা জানিয়েছেন। রূপজালালের শতবর্ষ উপলক্ষে বাংলা একাডেমি থেকে মোহাম্মদ আবদুল কুদ্দুস (১৯০৬-১৯৮৮) সম্পাদিত ‘রূপজালাল’ বের হয়, এর ভূমিকায় বিষয়টি উল্লিখিত হয়েছে। তাছাড়া ফয়জুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শতবর্ষ ও রূপজালালের শতবর্ষ উপলক্ষে যে দুটি স্মরণিকা, ওখানে সংগীতের বিষয়টি রয়েছে। আবুল কাশেম আদমুদ্দিন রচিত ‘নবাব ফয়জুন্নেছা’ জীবনীগ্রন্থেও প্রসঙ্গটি অনুরূপ। রওশন আরা বেগম রচিত ‘নবাব ফয়জুন্নেছা ও পূর্ববঙ্গের মুসলিম সমাজ’ অভিসন্দর্ভে ফয়জুন্নেছার সংগীতের বিষয়টি ব্যাখ্যাত হয়েছে। রওশন আরা বেগম দেখিয়েছেন এরই মধ্যে গবেষকরা নওয়াব ফয়জুন্নেছার সংগীতবিষয়ক যে গ্রন্থগুলোর কথা বলেছেন তা কাল্পনিক। কিন্তু এ ব্যাখ্যা যথার্থ নয়। নওয়াব ফয়জুন্নেছা সংগীত রচনা করেছেন।

‘ঢাকা প্রকাশ’-এ (৯ জানুয়ারি ১৮৮৭) ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণীর তিনটি গান প্রকাশিত হয় (মুনতাসীর মামুন, উনিশ শতকে বাংলাদেশের সংবাদ-সাময়িকপত্র, চতুর্থ খণ্ড)। যেখানে বলা হয়, ‘জিলা ত্রিপুরা পশ্চিম গাঁ নিবাসিনী শ্রীমতী ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণীর ন্যায় সম্ভ্রান্ত গৃহের বিদুষী মহিলা বঙ্গীয় মুসলমান কি হিন্দু পরিবারের মধ্যেও দেখা যায় না। ইঁহার সুবিস্তৃত জমিদারীর প্রজাগণ সম্প্রতি ৮ আইনের মাহাত্ম্যে বিদ্রোহী হওয়ায় ইঁহার মনের আবেগে যে কতকগুলি দুঃখ গীতি ইহার হূদয় হইতে বিনিঃসৃত হইয়াছে, আজ আমরা তাহার গুটি তিনেক গান পাঠককে উপহার দিলাম। এই গানে গভর্নমেন্টের জ্ঞানোদয় হইবে কিনা, বলিতে পারি না, কিন্তু অনেক ভুক্তভোগীর হূদয়ানল উচ্ছলিত হইবে সন্দেহ নাই।’

‘রূপজালাল’-এর শতবার্ষিকী স্মরণীতেও সৈয়দ মুর্তাজা আলী সংগৃহীত দুটি অপ্রকাশিত গান সংকলিত হয়েছে। অতএব গীতিকায় ফয়জুন্নেছার যে পরিচিতি তা অমূলক নয়। গানগুলো এখানে সংকলিত হলো।

ফয়জুন্নেছার দুটি অপ্রকাশিত গান

 

বলোনা মনের কথা

পরকে আপন ভেবে

বলোনা মনেরই কথা

সাথে থাকে মধুকরে

ফুলের মধু পানও করে

মধু শূন্য হইলে পরে

কোথায় থাকে সেই মমতা।

বলোনা মনেরই কথা।।

 

বিয়ে কনে সাজানো গীত

আর যত ছিল আয়াগণ

পরি নানা আভরণ

যায় জলের জন্য সরোবর।

রজত কলসী ভরি

বারি নিয়ে সব নারী

এনে কিন্তু রাখে স্নানাগার

সকলে প্রস্তুত হইল

কুমারীকে নিয়ে চলল

শুনে কন্যা নেয় সেই স্থান

নালো সজনী।

প্রথমে প্রভুকে স্মরি

হাত মুখ ধৌত করি

পরে করি মস্তক ঘর্ষণ

নালো সজনী।

সুগন্ধি সামগ্রী দিয়ে

কেশরাশি ধোয়াইয়ে

পরে করে গ্রীবা মার্জন।

ঠাঁই ঠাঁই যত নারী

একে অন্য জনে ধরি

গায় গীত সবে কৌতূহলে।

কেহ মাজে হাত পাও

কেহ মাজে সর্ব গাও

কেহ কেহ অঙ্গে জল ঢালে।

নালো সজনী।

স্নান করাইয়া পরে

কন্যাকে আনিয়া ঘরে

বসাইল মসলন্দের উপর।

নালো সজনী।

লইয়া কেশেরও পানি

সুগন্ধেরও তৈল আনি

চিকুরেতে দিল সত্বর।

নালো সজনী।

পরে চিরুণীতে ছিরি

কেশ দুই ভাগ করি।

মধ্যে রাখে জনকও কুমারী।

নালো সজনী।

কনকেরই জাত দিয়ে

কেশ বেষ্ট না করিয়ে

বান্ধে খোপা অতি মনোরম।

ফুল কাঁটা বহুতর

সীথিতে পরে সীথা পরল

স্থাপয়ে শিশফুল শিরেতে

নালো সজনী।

বেশর শোভায়ে নাকে

ফুল বালি তারি সাথে

মুক্ত নথ নাকেরে পরায়ে

নালো সজনী।

বুদাবলে শ্রবণেতে

গজ মুক্তা গলাতে শোভায়ে

নালো সজনী।

তদবেতে চম্পাকলি

ঝকমক মুক্ত ঝলি

হীরকাধি প্রস্তরে জড়িত

বাহু মাঝে নয় রতন

করেতে চুড় কংকন

অংগুলে অগুরী দল বিভূষিত

কটি মাঝে চন্দ্রহার

কি শৌভা বলিব তার

জহুরিয়ার কিবা কারিগরি।

নালো সজনী।

অষ্টবেকী গুজবি কড়া

পায়েতে ঘুঙুরী জোড়া

রুমঝুম বাজে ঘুঙুরী।

নালো সজনী।

ললাটে সিন্দুর বিন্দু

নক্ষত্রে শোভিছে ইন্দু

কিবা শোভা মনি মনোহর

ভ্রমরে অঞ্জন দিয়ে

মিশি দিয়ে পান খেয়ে

হেরি নারীদের মনোহর

নালো সজনী।

সাজিলে কোন রূপভানু

লইয়া কামের ধেনু

বধিবারে পুরুষ জীবন।

নালো সজনী।

তার পরে পরে পায়জামা

পেশোয়াজে অনুপমা

পড়াইল উপরে ওড়নি

নালো সজনী।

 

ঢাকা প্রকাশে প্রকাশিত তিনটি গান

 

প্রথম গান

সবার নিবেদন; বিচারকগণ, করুন শ্রবণ,

  প্রজার অন্যায়।

তারা, না দেয় রাজকর, নির্ভয় অন্তর, থাকে ঘরে ঘর

   নিজ ক্ষমতায়।

এবম্প্রায় বলে, ভূপতি সকলে, কি করিবে মিলে,

           আমা সবাকায়।

তাদের, সাহস এমত, নিম্নশ্রেণী কত, করিয়াছে হত

     খাজনারি দার।

তাতে, দারুণ আইন ডোবে, বেন্ধেছে যে করে,

     -নড়িতে কি পারে, ঠেঁকিয়াছে দায়।

বিষম বন্ধনে, নরপতিগণে, মরিবে জীবনে

      নাহেরে উপায়।

সেই মহারাণীমায়, কেপাবে কোথায়, জানাবে

তাঁহায় ঘোর দুঃখ দায়।

এখন যত হাকিমান, প্রজার গুণ গা’ন

রাজার অপমান ফিরে নাহি চায়।

 

দ্বিতীয় গান

করেগো দরখাস্ত, দুখে করেগো দরখাস্ত।

   যত ভদ্র তব অধীনস্থ।

ক্ষুদ্র ভূমি নিয়ে সব, এত কাল প্রজাদের

  ভক্তিতে মনে ছিল সুস্থ।

সে প্রজা বিদ্রোহী হ’লে, মহারাণীর আইন বলে

  ঘটাইলে তা এইকালে, কলিরাজার,

মানী জনার উচ্চপদ হল ন্যস্ত।

কাচারিতে আমলাগণ, করজন্য আবাহন,

কৈরে আনলে একজন, অন্য জনায়,

থানায় যেয়ে কয়েদ খালাসী দেয় ত্রস্ত।

খাজান কা হ’তে নিবে, নিজে রক্ষা শঙ্কট হবে,

  আর কত টাকা যাবে, সে নিমিত্ত।

  সে হৈতে শাসিত পক্ষেবর নিরস্ত।

দশ আইন কর্ত্তে আইন বলাবে ছয় মাস পরে

ডিক্রী পাবে, নিরোপিত দিনে যাবে, তাদের বিত্ত

   তা রক্ষার্থে হ’তে হবে দারগ্রস্ত।

   ঋণ ক্রমশ বৃদ্ধি হবে, অর্থাদি সমুদয় নিবে,

উত্তর রূপে নষ্ট হবে, জমিদারগণ;

ফয়জন চিন্তিত হে’রে এ সমস্ত।

 

তৃতীয় গান

রাজ্যেশ্বরী। চাওগা কৃপাকরি, ভূম্যধিকারী,

  মরে হায় হায় হায়।

হাইয়া নাচার, শবের আকার, প্রজাবিদ্রোহিতা নদী

  নীরে ভেসে যায়।

ইথে ব্যতিব্যস্ত, ভূপতি সমস্ত,

  হ’লে সূর্য্য অস্ত, বিত্তাদি হারায়।

নারে কর নিতে, রাজস্ব কি মতে,

দিবে কোথা হতে, ঠেকেছে যে দায়।

জুটে প্রজা যত, মন্ত্রণা এমত,

কৈরে বলে প্রভু, ভূস্বামী সবায়;

কখন দেবনা, আপোশে খাজানা,

নীলাসেতে যাহা, পাবে নিবে তায়।

আদালতে যবে, মামলা দায়ের হবে

ব’লব যাহা ডিক্রী, পাইব সবায়।

যে নিরিখে পাব, দাখিল কৈরা দিব,

ভূমি অধিকারীর না রহিবে দায়।

গ্রামে গ্রামে যদি পাঠায় অনুচর,

অমিন বলে বেটা নালীস যেয়ে কর,

টাকাতে পাঁচানা, হয়েছে খাজানা,

মুন্সেপ বাবু বৈলে দিয়েছে তত্প্রায়।

যদি ইচ্ছা হয়ে থাকে মা তোমার,

নিবে দুর্ভাগাদের ভূমির অধিকায়

কেন সে সবার, অপমান কুঠার

কপালে প্রহার, করিবে অন্যায়

কৃপা বিতরণে কর সুবিচার,

নতুবা অযশে পুরিবে সংসার,

বৃথা দুঃখ দিবে, ধরমে ঠেকিবে,

হৈথে ফয়জনের, মর্ম্মে ব্যথা পায়।

 

রচনাটি কথাপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত লেখকের বাঙালির সংস্কৃতি সাধনা গ্রন্থ থেকে সংকলিত

 

মামুন সিদ্দিকী: প্রাবন্ধিক ও গবেষক