২০০৩ সালে ব্রিটিশরাজের ইংরেজি নারী লেখকদের ওপর পিএইচডির মৌখিক পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় আমি সোনিয়া আমিনের দ্য ওয়ার্ল্ড অব মুসলিম ওমেন ইন কলোনিয়াল বেঙ্গল: ১৮৭৬-১৯৩৯ বইটি পড়ি। আমিন তার ভূমিকায় লিখেছেন, তিনি ১৮৭৬ সালকে বেছে নিয়েছিলেন কারণ সেটা ছিল রূপজালাল প্রকাশনার বছর, যা ঔপনিবেশিক বাংলায় নারীর ইতিহাসের সূচনা। তত্ক্ষণাৎ নওয়াব ফয়জুন্নেছাকে নিয়ে আমার আগ্রহ তেতে ওঠে। পরের বছর বাংলাদেশ সফরের সময় আমি রূপজালালের একটি কপি সংগ্রহের চেষ্টা করি। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হলো এর চেয়ে খড়ের গাদায় সুচ খোঁজাটা বরং সহজ কাজ।

আমি বাংলা একাডেমির তত্কালীন মহাপরিচালক মনসুর মুসার কাছে গেলাম এবং তার কাছে ১৯৭৬ সালে বাংলা একাডেমির রিপ্রিন্ট করা একটি কপি চাইলাম। আমার চাওয়া সাম্মানিক মহাপরিচালককে সন্তুষ্ট করেছিল (হতে পারে সেটা আমার অনভিজ্ঞ কিংবা আমার আগ্রহ, কিন্তু আমি নিশ্চিত নই এ দুয়ের কোনটা!)। তিনি তার কর্মীদের বললেন, বইটার একটি কপি খুঁজে আনতে। দুই সপ্তাহ পর আমাকে জানানো হলো যে রূপজালালের কোনো কপি খুঁজে পাওয়া যায়নি। আমি আবার মহাপরিচালকের কাছে গেলাম। এবার নিজেই খুঁজে দেখার অনুমতি চাইলাম। তিনি তখন আমাকে দুষ্প্রাপ্য বইয়ের বিভাগে যাওয়ার অনুমতি দিলেন। বইয়ের স্তূপে ডুব দেয়ার সময় দুজন কর্মী আমাকে সহায়তা করলেন। অনেক বই ছিল ম্যানুয়ালি ক্যাটালগ করা, আর কিছু ছিল এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা। ঘণ্টাখানেক খোঁজার পর এক ভদ্রলোক আমার হাতে পোকায় কাটা একটি বই তুলে দিলেন—ফয়জুন্নেছার রূপজালাল! আমি মহাপরিচালককে শেষ আরেকটা অনুরোধ করলাম: বইটার একটা ফটোকপি করে দিতে। তিনি আমার এ ইচ্ছাও পূরণ করলেন। আমি আজও অধ্যাপক মুসার প্রতি কৃতজ্ঞ—আমার ওপর আস্থা রাখার জন্য।

আমি বইটা থেকে কয়েকটা কবিতা অনুবাদ করি এবং আমার মৌখিক পরীক্ষায় সেগুলো নিয়ে কথা বলি। আমার পিএইচডি কমিটির সদস্যরা তখন আমাকে পুরো বইটা অনুবাদের জন্য অনুরোধ করেন। তারা বইটি পড়তে চাইলেন এবং অনুবাদটি প্রকাশের পর বইটি তারা তাদের দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস, ক্রিয়েটিভ রাইটিং, জেন্ডার স্টাডিজ কিংবা ট্রান্সলেশন স্টাডিজের একাডেমিক কোর্সে অন্তর্ভুক্ত করার আগ্রহ প্রকাশ করলেন। ২০০৮ সালে রূপজালালের ইংরেজি অনুবাদ ব্রিল পাবলিশারস থেকে প্রকাশিত হয়। দুনিয়ার বেশির ভাগ রিসার্চ লাইব্রেরিগুলো বইটির কপি সংগ্রহ করেছে এবং এটা তাদের সাউথ এশিয়ান ওমেন’স হিস্ট্রি বা সাহিত্যের কোর্সের পাঠ্যতালিকায় স্থান করে নিয়েছে। আমি নিজেও জেন্ডার স্টাডিজের একটি গ্র্যাজুয়েট কোর্সে বইটি পড়াই।

এ রকম একটি বইয়ের অনুবাদ কিংবা প্রকাশনা আপাতদৃষ্টিতে সহজ কাজ মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে, একজন অনুবাদকের কাজ কখনই সহজ নয়। আমার কাছে সবচেয়ে শক্তিশালী লেখা সেটাই, যেখানে কোনো জটিল ভাবনা বা ধারণাকে সবচেয়ে সরল ভাষায় তুলে ধরা যায়। এক্ষেত্রে কোনো লেখা বা অনুবাদ সবচেয়ে বেশি প্রভাব রাখতে পারে যখন তা পাঠক সামান্য আয়াসেই পড়তে পারেন। দিনশেষে ভাষা তো প্রকাশের মাধ্যম, বাধা সৃষ্টি তার কাজ নয়। আমি এক্ষেত্রে গায়ত্রী স্পিভাকের সঙ্গে অনেকটা একমত, তিনি বলেছেন, the translator’s surrender to the rhetoricity of the original text and her ability to speak of intimate matters in the language of the original retains the “literarity, textuality and sensuality of the writing,” and  helps her embrace the Other through the intimacy of cultural translation (The Politics of Translation, 43)

আমি বিশ্বাস করি অনুবাদ একটি দ্বিমুখী প্রক্রিয়া। একজন অনুবাদক অনুবাদ করেন অন্যের (মূল লেখক) জন্য এবং অন্যদের (পাঠক) জন্য।

রূপজালাল অংশত কাব্য এবং কিছু অংশ গদ্যে রচিত। প্লটের গঠন ও ন্যারেটিভ কৌশল মঙ্গলকাব্যের রীতি দিয়ে প্রভাবিত। এতে সহসাই রামায়ণ ও মহাভারতের ইঙ্গিত পাওয়া যায় এবং আরব্য রজনীর সঙ্গে গভীর সাদৃশ্য দেখা যায়। কাব্য অংশটি বাংলা গীতিকাব্যের রীতি অনুসরণে রচিত, যাতে আবার মুসলিম সাহিত্য ঐতিহ্যের মিশ্র ভাষার ব্যবহার যুক্ত হয়েছে। কিছু পদ্য লেখা হয়েছে পয়ারে, কিছু চৌপদী, আবার কিছু লেখা হয়েছে ত্রিপদী।

এ রকম জটিল ন্যারেটিভ প্যাটার্নের টেক্সট নিয়ে কাজ করাটা যেকোনো অনুবাদকের জন্য রোমাঞ্চকর। কাব্যের ফর্ম যতটা সম্ভব অনুগতভাবে আমি ইংরেজিতে হাজির করতে চেয়েছি এবং খেয়াল রেখেছি মূল রচনার শব্দের ভাবকে ব্যাহত না করতে। কখনো আমি প্রতিটি শব্দ বা বাক্য অনুবাদ করেছি। আবার কখনো চিত্রকল্প বা ভাব খুব জটিল মনে হয়েছে, তখন আমাকে ফয়জুন্নেছার লেখা মূল রচনার চেয়ে বেশি শব্দ বা লাইন ব্যবহার করতে হয়েছে।

রূপজালাল অনুবাদ, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে স্থাপন এবং অনুবাদের পেছনে আমার প্রেরণা ছিল বাংলাদেশে নারীদের লেখালেখির ক্ষেত্রে ফয়জুন্নেছার অবদান। সমসাময়িক পরিস্থিতিতে মনে হয় আমার অনুবাদ রূপজালালকে হয়তো বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করেছে। শত হলেও মূল রচনাটির চেয়ে ইংরেজি অনুবাদটি সহজে বোধগম্য। কারণ মূল রচনাটি লিখিত হয়েছে পুরনো আমলের বাংলা ভাষায়, যা এখন মৃত এবং প্রায় বিস্মৃত। কিন্তু আমরা তো আমাদের অগ্রদূতকে ভুলে যেতে পারি না। যারা পথ দেখিয়েছিলেন তাদের ভুলে গিয়ে আমরা কীভাবে বাংলাদেশে নারী লেখকদের লেখালেখির সমৃদ্ধ ইতিহাস করে গড়ে তুলব? আমি অনুভব করি ইতিহাস নওয়াব ফয়জুন্নেছাকে যে অবহেলা করেছে তা আমি শোধ করেছি এবং আশা করি পোকায় কেটে শেলফ থেকে বইগুলো উধাও হয়ে যাওয়ার আগেই অন্যরা আমাদের নারী লেখকদের মূল্যবান সব রচনা পুনরুদ্ধারে এগিয়ে আসবেন।


 

The Ordeal of Rupbanu

 

1

The month of Sravan    pours monsoon rain

Darkness envelops whole nature.

The sky falls apart    and breaks my heart

Like rain drops, I tremble in fear.

At a time like this    where is he? Which

Paths does he tread? And what hurdles

Block his ways?!    I wish I could erase

All the dangers that lie in his path.

 

2

Bhadra is a dangerous    month. Ferocious

Tidal waves threaten rivers

My heart falters    as it sees no hope. Tears

Betray my eyes; what if he is

Trying to return?  What if this rain

Has caused a flood? How would he return?

And what if    his boat or his ship

Sinks in the deep ocean?

My heart sinks    in sorrow. Fate brings

Me nothing but loads of despair.

My lover suffers    in a remote place

And for him, I suffer here.

 

নবাব ফয়জুন্নেছার রূপজালাল অনুবাদের অভিজ্ঞতা নিয়ে দ্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত ফায়েজা হাসানাতের The Burdens of Translation: Nawab Faizunnesa’s Rupjalal প্রবন্ধের ভাষান্তর। লেখকের অনুমতিক্রমে অনূদিত। অনুবাদ: এস এম রশিদ। লেখার শেষে রূপজালাল থেকে ইংরেজি অনুবাদের অংশটি ব্রিল পাবলিশারস থেকে প্রকাশিত ফায়েজা হাসানাতের Nawab Faizunessa’s Rupjalal গ্রন্থ থেকে নেয়া হয়েছে।

 

ফায়েজা হাসানাত: যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সেন্ট্রাল ফ্লোরিডার শিক্ষক