ফিল্ম সোসাইটি অব লিংকন সেন্টারের প্রকাশনা ফিল্মকমেন্টের জুলাই/আগস্ট ২০০০ সংখ্যায় প্রকাশিত
সাম্প্রতিক কালের ইরানি চলচ্চিত্রের উত্থানের ক্ষেত্রে, তর্কসাপেক্ষে গত ১২ বছরের সবচেয়ে চলচ্চিত্রের নাটকীয় বিকাশে অন্য যেকোনো পরিচালকের চেয়ে আব্বাস কিয়ারোস্তামিই বেশি কৃতিত্বের দাবি রাখেন। নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে তাঁর ‘ক্লোজ আপ’ আন্তর্জাতিক বলয়ে পৌঁছালে উত্তেজনার সৃষ্টি হওয়ার পর ১৯৯৭ সালের কান চলচ্চিত্র উত্সবে তাঁর অসাধারণ চলচ্চিত্র ‘টেস্ট অব চেরি’ যৌথভাবে পালমে ডি’অর লাভ করলে সেটা তুঙ্গে ওঠে। তাঁর মৃষ্টিমেয় কয়েকজন ইরানি সহকর্মী— মোহসিন মাখমালবফ ও জাফর পানাহিসহ, দুজনই তাঁর সহযোগী— পাশ্চাত্যের স্বীকৃতি পেলেও ইউরোপ ও মাার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রীতিকর সমালোচনা ও উত্সাহী শিল্পকেন্দ্রের দর্শকদের আকৃষ্ট করা তথাকথিত কোকের ট্রিলজির (হোয়ার ইজ দ্য ফ্রেন্ড’স হোম, অ্যান্ড লাইফ গোজ অন, থ্রু দ্য অলিভ ট্রিজ) মতো ছবির কল্যাণে তিনিই সবচেয়ে দৃশ্যমান ব্যক্তিত্ব হয়েছিলেন। এসব কিছুই কোনো কোনো ভক্তের ভেতর অর্চনার প্রবণতাসহ তাঁকে দেবতার আসনে বসানোর ঝোঁক এবং পাশাপাশি অন্যদের তরফ থেকে এই সম্রাটভক্তদের দাবিমতো আদতেই দৃষ্টিনন্দন পোশাক পরেন কিনা পাল্টা এ প্রশ্ন তোলার বিষয়টি ব্যাখ্যা করে। ‘টেস্ট অব চেরি’র সমাপ্তি নিয়ে বিস্ময়কর মাত্রার বিতর্কের দেখা দিয়েছিল। ছবিটি খুবই আকর্ষণীয় বর্ণনামূলক কাহিনীর— তিনজন আগন্তুকের সঙ্গে নিজের জীবন শেষ করা প্রসঙ্গে দীর্ঘ আলোচনাকেন্দ্রিক— শেষে কুশীলব ও চলচ্চিত্র নির্মাতাদের আত্মহত্যার দৃশ্য চিত্রায়ণের প্রীতিকর লোকেশনে শেষ দৃশ্যের প্রস্তুতি নেয়ার একটা ভিডিও পরিশেষে জুড়ে দেয়া হয়েছে। সমর্থকরা একে কিয়ারোস্তামির আত্মজটিলতার স্পষ্ট বিস্তার হিসেবে দেখেছে, বিরোধীরা একে বিষয়বস্তুও ফয়সালার বদলে তাকে এড়িয়ে যাওয়া ও বিভ্রান্তির দায় এড়ানো বলে তকমা দিয়েছে।
‘দ্য উইন্ড উইল ক্যারি আস’-এর শিরোনাম ও চিত্রনাট্যের ছোট অথচ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়বস্তু ইরানি নারীবাদী ও আধুনিক পারস্য ঘরানার কবি মরহুম ফারুগ ফারুকজাদের একটা কবিতা থেকে নেয়া। নিচের সাক্ষাত্কারে কিয়ারোস্তামি গভীরভাবে কাব্যিক চলচ্চিত্রের চর্চা করাই তাঁর ব্রতের পেছনের মূল চালিকাশক্তি বলে স্বীকার করার পরিপ্রেক্ষিতে ‘দ্য উইন্ড উইল ক্যারি আস’ নামটি খুবই লাগসই। তিন বছর আগে কিয়ারোস্তামির সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয়েছিল আমার এবং এবারের বসন্তে স্যান ফ্রান্সিসকো ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে আবার তার দেখা পেয়েছি। কিছু পরিমাণ ইংরেজি বলতে পারেন তিনি, তবে দোভাষী নাযিল মোনাহানের মাধ্যমে মনোযোগ দিয়ে তার তরজমা শুনে আর মাঝে মাঝে ভুল শোধরাতে পেছনে ফিরে ফারসিতেই আমাদের সাক্ষাত্কার গ্রহণ বেছে নিয়েছেন।
আজীবন সম্মাননা আকিরো কুরোসাওয়া পুরস্কার গ্রহণের জন্য যেহেতু স্যান ফ্রান্সিসকোয় রয়েছেন, কুরোসাওয়ার চলচ্চিত্রের সঙ্গে আপনি কি বিশেষ কোনো সম্পর্ক বোধ করেন?
না। তবে আমি মনে করি বিশেষ কেতার একজন চলচ্চিত্রকার সম্পূর্ণ ভিন্ন কেতার একজন চিত্রকারের ছবি উপভোগ করতে পারেন। যেমন, আমি সত্যিই পছন্দ আর উপভোগ করেছি এমন একটা ছবি হলো ‘দ্য গড ফাদার’। লোকে তাতে হতবাক হয়েছে।
আপনি যে ধরনের ছবি তৈরি করে থাকেন, সেখানে ওই ধরনের ছবি উপভোগ করেন কীভাবে?
ওখানেই তো ব্যাপারটার সৌন্দর্য (হাসি)।
আজকের দিনে কি জাতীয় চলচ্চিত্রের কথা বলা সাজে, নাকি এ ধরনের তকমা এঁটে দেয়ার পক্ষে চলচ্চিত্র বড় বেশি আন্তর্জাতিকায়িত হয়ে গেছে?
প্রতিটি চলচ্চিত্রের নিজস্ব পরিচয় বা জন্ম সনদ আছে। একটি চলচ্চিত্র তৈরি হয় মানুষ, মানবজাতিকে নিয়ে। চেহারা, ধর্ম, ভাষা ও জীবন ধারার পার্থক্য সত্ত্বেও পৃথিবীর সব ভিন্ন ভিন্ন জাতির এখনো একটি সাধারণ বিষয় রয়েছে। আর সেটা আমাদের অন্তরে যা রয়েছে, আমরা বিভিন্ন মানুষের ভেতরটা এক্স-রে করলে সেসব এক্স-রে থেকে মানুষটার ভাষা বা পটভূমি বা জাতিগত পরিচয় সম্পর্কে কিছুই বলতে পারব না। ঠিক একইভাবে আমাদের রক্ত সঞ্চালিত হয়, আমাদের স্নায়ুতন্ত্র, আমাদের চোখ কাজ করে একইভাবে। আমরা একইভাবে হাসি, কাঁদি। আমাদের মুখের ভেতরের দাঁত— আমাদের জাতীয়তা বা পটভূমি যাই হোক না কেন, একইভাবে ব্যথা করে। আমরা সিনেমা আর সিনেমার বিষয়বস্তুকে ভাগ করতে চাইলে সেটা করার কায়দা হবে যন্ত্রণা আর সুখের কথা বলা। সব দেশেই এগুলো সাধারণ।
প্রায়ই আপনার ছবিগুলো আমাদের চরিত্র বা কাহিনী সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য জোগায় না। দর্শক সৃজনশীল প্রক্রিয়ার অংশ হওয়াই এর একটা কারণ বলে আপনার জবানিতে উল্লেখ করা হয়েছে। বিষয়বস্তুর অর্থ বের করা আমাদের ওপর বর্তায় এবং আমরা প্রত্যেকে ভিন্নভাবে সেটা করি। এ ধারণাটুকু— কোনো একটি ছবি সম্পর্কে প্রতিটি ব্যক্তির নিজস্ব উপলব্ধি লাভ— সাধারণ মানবিকতার অংশ বলে আমরা সবাই মূলত এক, এ ধারণার সঙ্গে কি খাপ খায়?
এটা একটা কঠিন প্রশ্ন। মানুষের সত্যিই ভিন্ন ভিন্ন ধারণা রয়েছে, আমার ইচ্ছা সব দর্শক একইভাবে যেন তাদের মনের ভেতর ছবিটা শেষ না করেন। যেমন যেই সমাধানই করুক না কেন, একই রকম দেখতে শব্দজটের মতো— এমনকি ‘ভুলভাবে’ পূরণ করা হলেও আমার ঘরানার ছবি ‘শুদ্ধ’ বা মূল অর্থের অনুরূপ। স্রেফ লোকে পূরণ করবে বলে আমার কাছে কোনো শূন্য স্থান নেই। আমি শূন্য স্থান রেখে দিই, যাতে লোকে তাদের চিন্তা আর চাহিদামতো সেগুলো পূরণ করতে পারে। আমার মনের ভেতর শিল্পের অন্যান্য ধারায় আমরা যে বিমূর্তকরণ মেনে নিই— পেইন্টিং, ভাস্কর্য, সংগীত, কবিতা-সিনেমাতেও আসতে পারে। সিনেমাকে আমি সপ্তম শিল্পকর্ম হিসেবে দেখি এবং অন্যান্য শিল্পকর্মকে সমন্বিত করে বলে এর অবশ্যই সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ হওয়া উচিত। কিন্তু এটা স্রেফ গল্পকথনে পরিণত হয়েছে, আসলে যা শিল্পকর্ম হওয়ার কথা ছিল।
এমন কিছু চলচ্চিত্রকার আছেন, যারা আপনি এইমাত্র যা বললেন ঠিক তাই বলেন আর গল্প বলে না এমন ছবি তৈরিতে অগ্রসর হন— প্রকরণ, রঙ আর গতি নিয়ে সত্যিকারের বিমূর্ত, কিন্তু ছবিগুলো কোনো বয়ান তুলে ধরে না। এ ধরনের কৌশল কখনো আপনাকে আগ্রহী করেছে?
প্রতিটি ছবিরই নিজস্ব কাহিনী থাকা উচিত। কিন্তু গল্পটা কীভাবে বলা হচ্ছে সেটাই গুরুত্বপূর্ণ— কাব্যিক হওয়া উচিত এবং একে ভিন্ন ভিন্ন রূপে দেখা সম্ভব হওয়া উচিত। আমাকে আকর্ষণ করেনি বা দেখার সময় তেমন একটা অর্থ জোগায়নি এমন ছবি আমি দেখেছি। কিন্তু সেগুলোয় এমন সব মুহূর্ত ছিল, যা আমার জন্য একটা জানালা খুলে দিয়েছে, আমার কল্পনাকে অনুপ্রাণিত করেছে। সমাপ্তি পেয়ে গেছি মনে হওয়ায় অনেক ছবি মাঝপথেই দেখা বাদ দিয়েছি, ছবিটির বেলায় পূর্ণাঙ্গ ও পরিপূর্ণ মনে হয়েছে আমার, বেশি সময় লেগে থাকলে আমাকে আরো বেশি কিছু বলে যেত এবং কে ভালো মানুষ আর, কে দুষ্ট লোক, ওদের কী হতে যাচ্ছে— সেসব বিচারে আমাকে বাধ্য করত বলে সেই অনুভূতি মিলিয়ে যেত। আমি নিজের মতো করে শেষ করাই পছন্দ করি।
আপনার কথার বেশির ভাগ অংশ ঔপন্যাসিকের চেয়ে বরং কবি কীভাবে কাজ করেন তারই বর্ণনা দিচ্ছে। আপনার অতি সাম্প্রতিক ছবি ‘দ্য উইন্ড উইল ক্যারি আস’ কবিতা থেকে এর শিরোনাম ও বিষয়বস্তু নিয়েছেন। আপনি কি ওই পথেই আরো আগে বাড়ার চেষ্টা করছেন— উপন্যাস হিসেবে ছবির বদলে কবিতা হিসেবে ছবি?
হ্যাঁ। স্রেফ গল্প বলে যাওয়া ছবি নয়, বরং কাব্যিক ছবিই বেশি দিন টিকে থাকবে বলে আমি মনে করি। বাড়িতে আমার লাইব্রেরিতে উপন্যাস আর গল্পের বইগুলো দেখে মনে হবে আনকোরা নতুন, কারণ মাত্র একবারই পড়ে একপাশে তুলে রেখেছি, কিন্তু বারবার পড়ার কারণে কবিতার বইগুলোর চারদিকই খসে পড়ার দশা হয়েছে! কবিতা সবসময়ই আপনার কাছ থেকে পালিয়ে যায়— নাগাল পাওয়া খুবই কঠিন, আর যতবারই পড়বেন, আপনার অবস্থার ওপর নির্ভর করে ভিন্ন ছোঁয়া পাবেন। কিন্তু উপন্যাসের বেলায় একবার পড়লেই আপনার বোঝা হয়ে যায়। অবশ্যই সব উপন্যাস এর আওতায় পড়ে না। ঠিক উপন্যাসের মতো যেমন কবিতা আছে, তেমনি কবিতার স্বাদ আছে— এমনি গল্পও আছে। স্কুলে থাকতে আমাদের যেসব কবিতা মুখস্থ করতে হয়েছে, সেগুলো এ জাতের— শুঁয়োপোকা ও মাকড়সার ভেতর সংলাপ আর এই জাতীয় ব্যাপার আর কি। সত্যিকার অর্থে আমাদের কবিতা শেখানোর চেষ্টা করছিল না ওগুলো, কবিতার ভেতর দিয়ে আমাদের তালিম দিয়ে গড়ে তোলার চেষ্টা করছিল।
চলচ্চিত্র আর কবিতার ভেতরকার অন্যতম পার্থক্য হলো বেশির ভাগ লোক ধরে নেয় যে, তারা কোনো একটা চলচ্চিত্র একবার বা দুবার দেখে ‘বুঝে ফেলতে’ পারে। লোকে যেহেতু কোনো একটা ছবির কাছে বারবার ফিরে যেতে অভ্যস্ত নয়, তাতে করে কি সিনেমার কাব্যিক ধরন নিয়ে দর্শকদের কাছে পৌঁছানোর সমস্যা সবসময়ই থেকে যাবে? আপনি কি আশা করেন যে লোকে আপনার কোনো একটি ছবি বহুবার দেখবে, নাকি তারা দেখবে বলে কিঞ্চিত্ ভরসা রাখেন?
সবারই আমার ছবি একবারের বেশি দেখা উচিত বললে সেটা বড্ড স্বার্থপরের মতো হয়ে যাবে। সেটা বলার মানে দাঁড়াবে আমি স্রেফ নিজের কাজের বিপণন করছি! আমি কেন এভাবে ছবি বানাই ঠিক বলতে পারব না, তবে এটাই আমার জানা কৌশল। ছবি বানানোর প্রক্রিয়ায় থাকার সময় শেষ ফল, মানুষকে একবার বা একবারের বেশি সেটা দেখতে হবে কিনা, প্রতিক্রিয়া কী হবে সেসব নিয়ে ভাবি না। স্রেফ বানাই এবং তার পর পরিণতির সঙ্গে বাস করি, সেগুলোর কোনোটা আমার মনমতো প্রীতিকর নাও হতে পারে! অবশ্য, একটা ব্যাপার জানি আমি। বহু দর্শক অসন্তুষ্ট হয়েই হল থেকে বের হয়ে আসতে পারে, তবে ছবিটা ভুলে যেতে পারবে না ওরা। আমি জানি, পরে রাতের খাবারের সময় এ নিয়ে আলাপ করবে তারা। আমার ছবির ব্যাপারে কিছুটা অস্থির এবং সেগুলোর ভেতর একটা কিছু পাওয়ার চেষ্টা করছে দেখতে চাই ওদের।
আপনি খুদে একটা দলের একজন— যারা আপনাদের বিশ্বাসমতো বিশেষ কিছু নীতি আর বিশ্বাস অনুযায়ী অবিরাম ছবি বানিয়ে যাচ্ছেন— আপনাদের দর্শকদের শিক্ষিত করছেন, তুলনামূলকভাবে চ্যালেঞ্জিং ধরনের ছবি বোঝার কৌশল শেখাচ্ছেন তাদের। প্রতিটি ছবির সঙ্গে সঙ্গে আপনার কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ার উপায় সম্পর্কে কিছুটা বেশি উপলব্ধি করতে পারি আমরা।
আমি বিশ্বাস করি আজকের দিনে এ ধরনের ছবির যে সুযোগ রয়েছে, ২০ বছর আগে সেটা ছিল না। আজকাল দর্শকরা যে ধরনের ছবি দেখে, তাতে তারা ক্লান্ত, ভিন্ন কিছু দেখতে চাইছে তারা। অবশ্য ইরানে এই (কাব্যিক) ধরনের ছবি কেবল একটি থিয়েটারে দেখানো হয় আর (যুক্তরাষ্ট্রে) দুটো থিয়েটারে দেখানো হয়। কিন্তু আমি সন্তুষ্ট। বেশির ভাগ লোক চায় সরলতা, তারা উত্তেজিত হতে, কাঁদতে, হাসতে চায়... (কাব্যিক) ছবির বেলায় আমরা একই ধরনের উত্সাহ আশা করতে পারি না। আমি ওদের কাজের সঙ্গে আমার কাজের তুলনা করছি না, তবে কোনো পার্কে নিলামে তোলা কান্ডিস্কি বা বারোক বা পিকাসোর ছবি যদি তোলেন, এমনকি ১০০ ডলার দর হলেও কতজন কিনবে সেগুলো? বিনোদনের বিপরীতে সত্যিকারের শিল্পকর্মের ক্ষেত্রে বাস্তবভিত্তিক প্রত্যাশা থাকতে হবে। সাধারণ মানুষ ছবিতে কী আছে এবং সেটা কী বলছে বুঝতে না পারলে কোনো ছবির জন্য খরচ করবে না।
আমি অনেক সময় চিন্তাকে রুদ্ধ করে দেয়া কাজ— স্কুলে আমরা যেসব কবিতা শিখতে বাধ্য হয়েছি, আমাদের যা নিজের চাহিদামতো উত্তর আর চিন্তা তুলে দেয়— চিন্তা উন্মুক্ত করে দিয়ে আমাদের নিজেদের চিন্তা শুরুর একটা জায়গা হিসেবে কাজ করা কর্মের প্রেক্ষিত ভেবেছি।
আমি একমত। কাব্যিক চলচ্চিত্র ধাঁধার মতো, যেখানে আপনি বিভিন্ন অংশ একত্রিত করেন কিন্তু সেগুলোকে মিলতে হবে এমন কোনো কথা নেই। আপনি আপনার পছন্দ অনুযায়ী যেকোনোভাবে সাজাতে পারেন। সাধারণ মানুষজন যাতে অভ্যস্ত তার বিপরীতে শেষ পর্যন্ত এটা আপনাকে স্পষ্ট ফল জোগায় না। আর এটা আপনাকে কোনো উপদেশও খয়রাত করে না!
‘দ্য উইন্ড উইল ক্যারি আস’-এ ফেরা যাক, আমাকে কৌতূহলী করে তোলা একটা থিম হলো চমকপ্রদ টেনশন কিংবা সংলাপ, তার মাঝে জমিনে প্রোথিত ভৌত, বস্তুগত ও বাস্তবিক ক্ষেত্রে অধরা কিছু। বেশ কয়েকটি স্তরে এটি ক্রিয়াশীল, কিন্তু কোনো একটি বেছে নিতে হলে গ্রামের অভ্যন্তরে আমাদের যোগাযোগ রয়েছে, যেখানে লোকে পরস্পরের সঙ্গে কথা বলে এবং একে অন্যকে বিভিন্ন জিনিস দেয়— এর বিপরীতে আমাদের আছে সেলফোন, বলতে গেলে যেটা বাতাসে ভেসে যায়। আমি বিমূর্ত বা অধরা কেমন করে আমাদের ভৌত জীবনে সম্পর্কিত হয় সে সম্পর্কে আপনার দৃষ্টিভঙ্গিতে আগ্রহী— আমরা যে বস্তুগত, মরণশীল সত্তা সেই বাস্তবতা। আমরা যাকে ভৌত আর আধ্যাত্মিক বলতে পারি তার ভেতর কি আপনার ছবিতে কোনো টানাপড়েন আছে?
আসলে ছবিটা এখনো দেখিনি। বছরখানেক টেকনিশিয়ান হিসেবে দেখেছি ওটা এবং এখনো ওভাবেই ওটার বড় বেশি কাছাকাছি রয়ে গেছি, তো ঠিক বিচার করতে পারব না। তবে আমার এক দর্শক আমাকে বলেছেন এটা আত্মা, বিদায় হয়ে যাওয়া মানুষ, যাদের অস্তিত্ব নেই তাদের নিয়ে— যেমন, নালাখোদক মানুষটা, কিংবা যে বয়স্ক মহিলা মরতে যাচ্ছে। আমরা ওদের জীবন দেখতে পাই না। ঠিক আপনি যেমন বললেন, ছবিটির এক ধরনের ভৌত সুর রয়েছে, তবে অবস্তুগত বা আধ্যাত্মিক দিকও আছে। আমরা কিছু চরিত্র দেখতে পাই না, কিন্তু ওদের আমরা অনুভব করি। এখানে সত্তাহীন সত্তার সম্ভাবনা রয়ে গেছে। আমার মনে হয় এটাই ছবির মূল থিম।
সত্তাহীন সত্তা? কথাটা একটু বিস্তারিত করবেন?
এ ধরনের ছবির ক্ষেত্রে দর্শক হিসেবে আমরা আমাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা অনুযায়ী বস্তু সৃষ্টি করতে পারি— আমরা যেসব জিনিস দেখি না, যেগুলো দৃশ্যমান নয়। এ ছবিতে ১১ জন লোক আছে, যারা দৃশ্যমান নয়। শেষে আপনি জানতে পারেন যে ওদের দেখতে পাননি, কিন্তু ওরা কারা এবং কী নিয়ে কাজ করে সেটা জানেন বলেই মনে করেন। আমি সেই ধরনের ছবিই বানাতে চাই, যা না দেখিয়েই দেখায়। এটা আজকালকার ছবি থেকে একেবারেই ভিন্ন ধরনের, যেগুলো আক্ষরিক অর্থে পর্নোগ্রাফিক নয়, কিন্তু আমাদের নিজেদের মতো করে কল্পনা করার সম্ভাবনা ছিনিয়ে নেয় বলে বস্তুত পর্নোগ্রাফিই বটে। সৃজনশীলতা ওর কল্পনার ভেতর দিয়ে আমাদের মনের ভেতর যতবেশি সম্ভব সৃষ্টির সুযোগ দিতে চাই আমি। আপনার মনের ভেতর লুকিয়ে থাকা, যার অস্তিত্ব থাকার কথা হয়তো আপনি জানতেনই না, তথ্য বের করে আনতে চাই। পারস্য ভাষায় আমাদের একটা প্রবাদ আছে, কেউ যখন সত্যিকারের তীব্রতা দিয়ে কোনো কিছুর দিকে তাকায়: ‘দুটি চোখ ছিল তার এবং আরো দুটি ধার করেছে সে।’ বারবার ধার করা দুটি চোখই দখল করতে চাই আমি— যে চোখ দর্শক ধার করবে তার তাকিয়ে থাকা দৃশ্যের বাইরে কী আছে দেখার জন্য। কী আছে আবার কী নেই, তাও দেখার জন্য।
আপনার মতে একই তরঙ্গদৈর্ঘ্যে কাজ করছেন বলে মনে করেন এমন অন্য চিত্রকার কারা হতে পারেন?
তাইওয়ানিজ চলচ্চিত্রকার হোউ সিয়াও-সিয়ান একজন। তারকোভস্কির কাজগুলো আমাকে রাজনৈতিক জীবন থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেয় এবং আমার দেখা সবচেয়ে আধ্যাত্মিক ছবি— ফেলিনি তাঁর ছবিগুলোয় আংশিকভাবে যা করেছেন, ছবিতে স্বপ্নের জীবন নিয়ে এসেছেন, চমত্কার করেছেন তিনি। গ্রিক থিয়ো অ্যাঙ্গেলেপোলোসের ছবিগুলো বিশেষ মুহূর্তে এ ধরনের আধ্যাত্মিকতার সন্ধান পায়। সাধারণভাবে চলচ্চিত্র আর শিল্পকলা আমাদের প্রতিদিনের জীবন থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া উচিত, আমাদের ভিন্ন স্তরে নিয়ে যাওয়া উচিত, এমনকি দৈনন্দিন জীবন থেকেই এই যাত্রা শুরু হলেও। এটাই আমাদের স্বস্তি আর শান্তি জোগায়। শেহেরজাদে আর রাজার কাল— গল্প বলার কাল— গত হয়েছে!
‘টেস্ট অভ চেরি’ মূল চরিত্র যেন ভৌত, বস্তু থেকে পূর্ণাঙ্গ পলায়ন চায়। কোনো প্রচলিত ধারার পরিচালক একে মনস্তাত্ত্বিক ছবিতে পরিণত করতেন, কিন্তু আপনার ছবিটি তেমন কিছু নয়, কারণ ছবির শুরুর চেয়ে শেষেও এ মানুষটার চিন্তাধারা আমরা ধরতে পারি না। সুতরাং, এমনকি তার মানে একেবারে নেতিবাচক হওয়ার ব্যাপার হলেও ছবিটি ভৌতকে অতিক্রম করে যাওয়ার অন্বেষার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে হয় এবং বস্তু ও আধ্যাত্মিকের ভেতরকার টানাপড়েনের সঙ্গেই আবার সম্পর্কিত হচ্ছে।
ওই ছবি সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন দর্শকের ভিন্ন মতামত রয়েছে। ইসলামে অবশ্যই আত্মহত্যা নিষিদ্ধ, এমনকি এর কথা উচ্চারিতও হয়নি। কিন্তু কিছু ধার্মিক লোক ছবিটা পছন্দ করেছে, কারণ তারা ঠিক আপনি যেমন বলেছেন, তাদের মনে হয়েছে এটা ভৌত জীবনের বাইরে, স্বর্গীয় কিছুর সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ার এক অন্বেষা দেখাচ্ছে। শেষের দৃশ্য, যেখানে আপনি চেরি ব্লসম আর সুন্দর সব জিনিস দেখেন, সেই বার্তা রয়েছে— স্বর্গের দরজা খুলেছে সে। নারকীয় কোনো কাজ করেনি সে, এটা ছিল স্বর্গীয় পরিবর্তন।
বিষয়বস্তুর কারণে ‘টেস্ট অভ চেরি’ কি সেন্সরের ঝামেলায় পড়েছিল?
ছবিটি নিয়ে বিতর্ক ছিল, কিন্তু আমি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলার পর এটা আত্মহত্যা সম্পর্কিত ছবি নয়, এটা জীবনে আমাদের পছন্দ নিয়ে, যখন ইচ্ছা শেষ করে দেয়ার— এই সত্যতা মেনে নিয়েছেন তারা। যেকোনো সময় খুলতে পারি এমন একটা দরজা আছে আমাদের, কিন্তু আমরা থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং আমি মনে করি, আমাদের এই বিকল্প থাকাটা খোদার মেহেরবানি। তিনি আমাদের এই সুযোগ দিয়েছেন বলেই খোদা দয়ালু। তারা এ ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হয়েছেন। এক রোমানীয় দার্শনিকের একটা কথা যথেষ্ট সাহায্য করেছে আমাকে: ‘আত্মহত্যার ওই সম্ভাবনা ছাড়া অনেক দিন আগেই নিজেকে হত্যা করতাম।’ এ ছবি বেঁচে থাকার সম্ভাবনা এবং আমরা কীভাবে বেঁচে থাকার সুযোগটা পেয়েছি সেটা নিয়ে। জীবন আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়নি। এটাই ছবির মূল থিম।
আরো একটা প্রশ্ন। চিত্রনাট্য নয়, বরং অল্প কয়েকটা পাতার কাহিনী রেখা থেকে কাজ করার এবং শেষ মুহূর্তে অভিনয় আর সংলাপ সৃষ্টি করেন বলে আপনি সুবিদিত। এভাবে কাজ করার সুবিধা কী?
অকুস্থলে সংলাপ সৃষ্টির দরকার হয়েছে তার কারণ পেশাদার অভিনেতা নয়, এমন লোকদের নিয়ে কাজ করার এটাই একমাত্র উপায় ছিল। আমার ছবিতে আপনাদের দেখা কিছু মুহূর্ত অন্যদের মতো আমাকেও বিস্মিত করেছে। অভিনেতাদের আমি সংলাপ জোগাই না, তবে ওদের কাছে দৃশ্য ব্যাখ্যা করার পর আমার কল্পনাকে ছাড়িয়ে কথা বলতে শুরু করেছে ওরা। এটা একটা চক্রের মতো এবং কোথায় এর শুরু বা শেষ আমি জানি না। ওদের কী বলতে হবে শিখিয়ে দিচ্ছি নাকি ওরাই আমাকে কী পেতে হবে তার শিক্ষা দিচ্ছে, জানি না!
ডেভিড স্টেরিট: চলচ্চিত্র সমালোচক-পণ্ডিত, লেখক। জাঁঁ লুক গদার ও আলফ্রেড হিচকককে নিয়ে কাজের জন্য সুবিখ্যাত। সভাপতি আমেরিকার ন্যাশনাল সোসাইটি অব ফিল্ম ক্রিটিকস। লেখালেখি করেন নিউইয়র্ক টাইমস, ফিল্মকমেন্ট, হাফিংটন পোস্ট, ভ্যারাইটিতে






