বাদশাহ আকবরের সময় সংগীতে নানা নতুন সংযোজন হয়েছিল। তিনি ও দরবার সংগীতজ্ঞদের নানাভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। এ সময়েরই একজন সংগীতজ্ঞ নওবত খান। তিনি রুদ্র বীণা বাদন ও সংগীত তৈরির জন্য বিখ্যাত হয়ে আছেন। মোগল আমলের চিত্রকলায় নওবত খানের উপস্থিতি তার গুরুত্ব প্রমাণ করে। নওবত খান ছিলেন কিংবদন্তি সংগীতকার তানসেনের সমসাময়িক। কেবল তা-ই নয়, তিনি তানসেনের জামাতা।

নওবত খানের গল্পটা কৌতূহলোদ্দীপক। তিনি ছিলেন কিষণগড়ের রাজা সামোখান সিংয়ের পৌত্র। কিষণগড় বর্তমানে রাজস্থানের অন্তর্গত। সামোখান সিং ছিলেন রাজপুতদের রাথোর বংশের কুলতিলক। এই সামোখান নিজে তার সময়ের একজন সেরা বীণাবাদক ছিলেন। আকবরের নজর পড়েছিল কিষণগড় ও সামোখানের ওপর। আকবরের দরবারে তানসেন তো ছিলেন কিন্তু আকবর চাইতেন যেন একজন সেরা বাদক তার দরবারে পাওয়া যায়। আকবর এ বিষয়ে তানসেনের সহায়তা চেয়েছিলেন। তানসেন তাকে বলেন, ‘আপনি চাইলে বহু বাদকই আনা সম্ভব কিন্তু সামোখানের মতো বাদক আর নেই।’ সামোখানকে নিজের ইচ্ছার কথা জানিয়ে আকবর চিঠি লেখেন, কিন্তু সামোখান তার রাজপুত গৌরব বজায় রেখে বলেন, ‘আমি কেবল সৃষ্টিকর্তার নামে বীণা বাজাই।’

আকবর তখন উত্তর ভারতের সবচেয়ে রণকুশল শাসক। তিনি বিশাল বাহিনী দিয়ে আজমেরের ফৌজদারকে প্রেরণ করেন। যুদ্ধে সামোখান ও তার পুত্র ঝনঝন সিং মৃত্যুবরণ করেন। সামোখানের পুত্র মিসরি সিংকে গৃহবন্দি করা হয়। পরবর্তী সময়ে এই মিসরি সিং ইসলাম গ্রহণ করলে তার নাম হয় আলী। বৈরাম খানের পুত্র আবদুর রহীম খান-ই-খানানের অধীনে তার প্রশিক্ষণ চলে। তাকে মোগল কেতা ও দরবারি নিয়মের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়। এখানেই শেষ নয়। খোদ আকবর তাকে খান উপাধি দেয়ার পাশাপাশি তাকে করোরি পদে নিয়োগ দেন। এ পদটি ছিল রাজস্ব সংগ্রাহকের। এরপর তিনি নক্করখানার (এটি নওবতখানা নামেও পরিচিত। একে অর্কেস্ট্রা হাউজ বলা চলে) দারোগার পদও লাভ করেন। তুজুক-ই-জাহাঙ্গীরিতে উল্লেখ আছে, আলী খান করোরিকে নওবত খান উপাধি দেয়ার পাশাপাশি ১৬০৭ খ্রিস্টাব্দে তাকে ৫০০ পদাতিক ও ২০০ ঘোড়সওয়ারের মনসব প্রদান করা হয়। এর আগে আকবরের তত্ত্বাবধানে নওবত খানের বিয়ের আয়োজন করা হয়। তানসেনের কন্যা সরস্বতীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়। সরস্বতী ইসলাম গ্রহণ করলে তার নাম হয়েছিল হুসেইনি। তাদের সন্তানও মোগল ভারতের সংগীতে ভূমিকা রেখেছিলেন। সে প্রসঙ্গ পরে আলোচিত হবে।

সামোখান সিংয়ের কাছ থেকে মিসরি সিং বীণার পাঠ পেয়েছিলেন কিনা তা জানা যায় না। কিন্তু আকবরের দরবারে তিনি ছিলেন অন্যতম সংগীতকার। নক্করখানার দারোগার দায়িত্ব থেকেই বোঝা যায় সংগীত, বিশেষত যন্ত্রসংগীতে তিনি ছিলেন দক্ষ। মোগল চিত্রকলায় তার উপস্থিতি এর প্রমাণ দেয়। কেবল তা-ই নয়, একাধিক চিত্রে নওবত খানের একক উপস্থিতি দেখা যায়। সাধারণত উচ্চ পদের মোগল দরবারিরাই এ সম্মান লাভ করতেন। যন্ত্রীদের মধ্যে তানসেন ছাড়া তাকেও ক্যানভাসে এককভাবে পাওয়া যায়। আকবরের সময়কার দরবারি চিত্রকররা তাদের চিত্রকর্মের মধ্যে তানসেন ও নওবত খানকে অমর করে রেখেছেন।

মোগল দরবারি চিত্রকর মনসুরের আঁকা নওবত খানের একটি চিত্রকর্ম বেশ বিখ্যাত। ছবিতে কাঁধে বীণা ধরা নওবত খানকে দেখা যায়। ছবিটি ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রক্ষিত। বোস্টনের ফাইন আর্ট মিউজিয়ামেও একটি ছবি রয়েছে তার। এসব চিত্রকর্মের উল্লেখ করার বিশেষ কারণ রয়েছে। যেমন একটি দুই পৃষ্ঠার মুরাক্কার এক পৃষ্ঠায় একটি ছবিতে নওবতকে পাওয়া যায়। তার কাঁধে একটি রুদ্র বীণা। চিত্রকর্ম থেকে তাকে রুদ্র বীণার বাদক হিসেবে সহজেই চেনা যায়। এর পাশাপাশি এটিও বোঝায় যে এ বিশেষ বাদ্যযন্ত্রের তিনিই ছিলেন ওস্তাদ বাদক। অন্য পাশে নাস্তালিক লিপিতে একটি সুফি কবিতা লেখা রয়েছে।

নওবত খানের এসব ছবি বা ছবিতে নওবত খানের উপস্থিতি আরো কিছু কারণে গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্য দিয়ে মোগল আমলে সংগীত ও বাদ্যের গুরুত্বও কিছু কিছু বোঝা যায়। ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়ামে রক্ষিত আকবরনামার কপিতে একটি মিনিয়েচার রয়েছে। সেখানে দেখা যায় হোসেন কুলী খান কয়েকজন বন্দিকে আকবরের কাছে পেশ করছেন। ছবিটির ডান কোণে সাদা পোশাকে নওবত খানতে দেখা যায়। ১৫৯০ সালে অঙ্কিত চিত্রটিতে তার কাঁধে রুদ্র বীণা দেখা যায়। অর্থাৎ বাদশাহর দরবারে বাদ্য, বাদন ও সংগীত কেবল চলতই না, সংগীতকাররা সেখানে যথেষ্ট গুরুত্ব লাভ করতেন। আকবরনামার মিনিয়েচারে নওবতের উপস্থিতি মোগল দরবারে তার ও সংগীতের গুরুত্ব প্রমাণ করে। পাশাপাশি বীণা যে সে সময়ের সংগীতের অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছিল, তারও প্রমাণ রাখে এসব চিত্রকর্ম।

মোগল আমলে ভারতীয় যন্ত্রসংগীতে নওবত খান ও তার পরিবারের অবদান রয়েছে। তিনি ও তার পরবর্তী প্রজন্ম বীণায় তাদের দক্ষতা প্রমাণ করেছেন। কেবল বীণা বাদন নয়, তারা বীণার উন্নতিও সাধন করেছেন। নতুন নতুন নিরীক্ষার মাধ্যমে এসেছে তা। রুদ্র বীণা এর মধ্যে ছিল প্রথম সংযোজন, যা স্বয়ং নওবত করেছিলেন। এরপর আসে তার উত্তরসূরিদের কথা। বীণকার বংশ নামে পরিচিত তার পুরো বংশধারাই সংগীতের সঙ্গে যুক্ত ছিল। সামোখানের উত্তরাধিকার বহন করছিলেন নওবত। এরপর বিবাহের মাধ্যমে তার সঙ্গে যুক্ত হয় তানসেনের পারিবারিক প্রতিভা। তানসেন-কন্যা সরস্বতীর সঙ্গে বিয়ের পর তাদের এক সন্তান হয়। এর নাম লাল খান। তানসেনের আরেক জামাতা বিলাস খানের কন্যার সঙ্গে লাল খানের বিয়ে হয়। এই লাল খান ছিলেন বাদশাহ শাহজাহানের দরবারের প্রধান সংগীতকার। শাহজাহান তাকে গুণসমুদ্র উপাধি প্রদান করেন।

লাল খান তার সময়ের সেরা বাদ্যকার। তিনি শাহজাহানের সময়ে দরবার অলংকৃত করতেন। লাল খানের বাদ্য শুনে বাদশাহ তাকে হাতি প্রদান করেছিলেন। মমতাজের মৃত্যুর পর শাহজাহান তার পীড়ার দিনগুলোতে লাল খানকে ডেকে আনতেন। তার সংগীত শাহজাহানের মন শান্ত করত। তিনি সাধারণত ধ্রুপদ গাইতেন। লাল খানের পুত্র ছিলেন খুশহাল খান। পিতা লাল খানের কাছ থেকে তিনি আলাপ ও ধ্রুপদের প্রশিক্ষণ নেন। তিনি শাহজাহান ও আওরঙ্গজেবের দরবারে সংগীত ও বাদ্য পরিবেশন করতেন। খুশহাল খানের প্রতি আওরঙ্গজেব সন্তুষ্ট ছিলেন। তিনি একাধিক উপহারে তাকে ভূষিত করেছেন। দারা শুকোর বিয়ে বিষয়ক একটি চিত্রকর্মে তার উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। তার ভাই বিশ্রাম খানও ধ্রুপদ গাইতেন এবং দরবারে বিশিষ্ট আসন লাভ করেন।

তবে নওবত খানের বংশের দুজন ব্যক্তির নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়—সদারঙ ও আদারঙ। মূলত গায়ক, গীতিকার ও সুরকার নৈমত খান সদারঙ নামে পরিচিত। আদারঙ ছিলেন তার জামাতা। আদারঙের আসল নাম ফিরোজ খান। নৈমত খান খেয়াল গাওয়ার ধারায় পরিবর্তন আনেন। বর্তমানে যেভাবে খেয়াল গাওয়া হয় তা নিয়ামত খান ওরফে সদারঙের সৃষ্টি। সদারঙ ও আদারঙ মুহম্মদ শাহর দরবারে সংগীত পরিবেশন করতেন। তারা তাদের সময়ে হিন্দুস্তানি ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিকের প্রভাবশালী সংগীতকার ছিলেন। তারা মূলত সুরারোপের মাধ্যমে সংগীতের ধারায় পরিবর্তন এনে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছেন।

নওবত খানের এই উত্তরসূরিরা সংগীতে নানা পরিবর্তন আনেন কিন্তু বীণা তাদের ছেড়ে যায়নি বা তারাও বীণা ছাড়েননি। বীণকার হিসেবে তারা শেষ অবধি নিজেদের পরিচয় দিতেন। অন্যদিকে বীণা বাদনেও তাদের জুড়ি মেলা ছিল ভার। সালার জঙ নওয়াব দরগা কুলি খানের লেখা থেকে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। দাক্ষিণাত্যের এ তরুণ ১৭৩৪ থেকে ১৭৪১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দিল্লিতে বসবাস করতেন। নৈমত খানের বীণা বাদন সম্পর্কে রিসালা সালার জঙ বইয়ে তিনি লিখেছেন, ‘তিনি যখন বীণা বাজাতে শুরু করেন, বীণার সুরগুলো পৃথিবীতে এমন এক ধরনের জাদু সৃষ্টি করে যে জমায়েতের সবাই এক অদ্ভুত পর্যায়ে চলে যান: তারা ডাঙায় তোলা মাছের মতো ছটফট করেন। নৈমত খান সংগীতের সব ধারার সঙ্গে পরিচিত। নৈমত খানের মতো আর কেউ নেই। তিনি দিল্লির মানুষের গর্ব।’

 

মাহমুদুর রহমান: লেখক