‘তুঘলকি কাণ্ড’ বাগধারাটা যেখান থেকে এসেছে দিল্লির মসনদে তখন সেই মুহম্মদ বিন তুঘলক। অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের জন্য ততদিনে ম্লান হয়ে এসেছে তার প্রতাপ। রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে ১৩৪৭ সালে দক্ষিণ ভারত থেকে বিদ্রোহ করে বসলেন সুফি প্রভাবিত জাফর খান। আলাউদ্দিন বাহমন শাহ নাম নিয়ে রাজধানী স্থাপন করলেন বর্তমান কর্ণাটকের গুলবরগায়। শুরু হলো দক্ষিণ ভারতে সুলতানি যুগের। অবশ্য অনেক আগে থেকেই নৌপথে মালাবার উপকূলে ব্যবসায়িক সূত্রে গড়ে উঠেছিল মুসলিম বসতি। শুরু হয়ে গিয়েছিল ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে আরব ও পারসিক সংস্কৃতির সম্মিলিত যাত্রা।

প্রায় দুইশ বছর শাসন করে দুর্বল হয়ে পড়ে বাহামনি আধিপত্য। তার শরীর ছিঁড়ে জন্ম নেয় পাঁচটি পৃথক সালতানাত—আহমেদনগর, বেরার, বিদার, বিজাপুর ও গোলকোন্ডা। দক্ষিণ ভারতে সংস্কৃতির গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে সালতানাতগুলো। বিশেষ করে ইউসুফ আদিল শাহের নেতৃত্বে ১৪৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত বিজাপুর সালতানাত দেখিয়েছে বিস্ময়কর সফলতা। আরব ও পারসিকদের সঙ্গে মারাঠা ও হিন্দু অভিজাত পণ্ডিতেরা অংশগ্রহণ করেছেন শাসকদের দরবারে। ফলে অভূতপূর্ব জাগরণ এসেছে চিকিৎসাশাস্ত্র, স্থাপত্য, চিত্রকলা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা শাখায়। উত্তর ভারতে মোগল সম্রাট আকবরের আমলকে যদি স্বর্ণযুগ বলা যায়, দক্ষিণ ভারতে সেই স্থান বিজাপুরের ষষ্ঠ সুলতান দ্বিতীয় ইব্রাহিম আদিল শাহের। ১৫৮০ সালে পিতা আলি আদিল শাহের মৃত্যুর পর মাত্র ৯ বছর বয়সে মসনদের অধিকারী হন আদিল শাহ। ১৬২৭ সাল অবধি সুদীর্ঘ শাসনকালে বিজাপুরকে তিনি পরিণত করেন শিল্প-সংস্কৃতির তীর্থস্থানে। নিজেও দক্ষ ছিলেন ফারসি, মারাঠা, কন্নড় ও দক্ষিণী ভাষায়। পাণ্ডিত্য দেখিয়েছেন তুলনামূলক ধর্ম, সাহিত্য ও দর্শনে। স্বাক্ষর রেখেছেন চিত্রকলা ও স্থাপত্যে। তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে গিয়েছে সংগীতশাস্ত্রে তার অবদান। আত্মজীবনী তুজুক-ই-জাহাঙ্গীরিতে তার অবদানের প্রশংসা করেছেন মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীর। পারসিক কবি নুরুদ্দিন জুহুরি লিখেছেন ৫০টির বেশি রুবাইয়াত। মৌলিক দলিল হিসেবে আছে নিজের লেখা গ্রন্থ কিতাব-ই নওরাস।

পৃষ্ঠপোষক হিসেবে দরবারের সংগীতকারদের তিন ভাগে ভাগ করেন আদিল শাহ। যারা সার্বক্ষণিক সুলতানের সঙ্গে থাকতেন তাদের বলা হতো হুজুরি। সংগীতের বিভিন্ন শাখায় হুজুরিদের পাণ্ডিত্য ছিল সালতানাতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ অবস্থানে। সুলতান নিজে অংশগ্রহণ করতেন তাদের সঙ্গে আলোচনায়। নতুন কোনো গান রচনা করলেও শোনানো হতো তাদের। ক্রম হিসেবে তালিকায় হুজুরিদের নিচের স্তরে অবস্থান করতেন দরবারিরা। দরবারে অবস্থান করার কারণেই এই নাম। রাজকীয় ফরমান অনুসারে হুজুরিদের কাছ থেকে সংগীতের দারস নিয়ে নিজেদের তৈরি করতেন। সেই সঙ্গে পড়াতেন তাদের অধস্তন সংগীতকার শাহরিদের। সংগীতের তৃতীয় ধাপে ছিল এই শাহরি শ্রেণী। শাহরির সদস্যরা নওরাসপুরেই বসবাস করে চালিয়ে যেতেন সংগীতচর্চা। শুধু সংগীতের স্বার্থেই নওরাসপুর নামে একটা শহরই নির্মাণ করেছিলেন সুলতান। সেখানে সমাবেশ ঘটত হরেক কিসিমের সংগীতকারের। প্রত্যেক শ্রেণীর জন্যই বরাদ্দ ছিল ভাতা ও স্থাবর সম্পত্তি।

শাসক হিসেবে ইবরাহিম আদিল শাহই প্রথম রাগমালা সিরিজ বাস্তবায়ন করেন। সংগীতের বিভিন্ন রাগ বিভিন্ন রঙ নিয়ে দৃশ্যকল্প হিসেবে হাজির হয়েছে এতে। ব্যক্তিরূপে চিত্রিত হয়েছে রাগ-রাগিণীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়াবলি। সুলতানের সরাসরি তত্ত্বাবধানে বিশেষ দিনগুলোতেও থাকত সংগীত নিয়ে আয়োজন। প্রতি মাসের ৯ তারিখে আয়োজিত হতো সংগীতের বিশেষ অনুষ্ঠান ঈদ-ই নওরাস। নানা রঙে ঝলমল করে উঠত নওরাস মহল। হাজির থাকতে হতো সালতানাতের অভিজাতদের। সংগীতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাই ছুটে আসতেন দূর-দূরান্ত থেকে। গান পরিবেশন করতেন বিখ্যাত সব গায়ক। সেরা পরিবেশনকারীরা ঘরে ফিরতেন হরেক রকম উপঢৌকন নিয়ে। এখানেই শেষ না। দেশে-বিদেশে দূত পাঠানো হতো সংগীতবোদ্ধাদের উচ্চ পারিতোষিকের প্রস্তাব দিয়ে বিজাপুরে নিয়ে আসতে। এ উদ্যোগের ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী। সালতানাতজুড়ে তৈরি হয়েছে সংগীতচর্চার নতুন স্রোত। অনেকটা রাতারাতিই নওরাসপুর পরিণত হয়ে উঠেছিল সংগীতকারদের আস্তানায়। জুহুরি ১৬০৪ সালে সংগীতকারদের সংখ্যা ৯০০ বলে দাবি করেছেন। ঠিক চার বছর পরেই ঐতিহাসিক রফিউদ্দিন শিরাজি ‘তাজকিরাতুল মুলুক’ গ্রন্থ লেখার সময় বলেছেন, এ সংখ্যা তিন-চার হাজার। ফুজুন আসতারাবাদির লেখা বাসাতিন-আস সালাতিন অনুসারে সংগীতের ছাত্র ও শিক্ষক মিলিয়ে সংখ্যাটা চার হাজার। ফলে নওরাসপুরে সংগীতকারের সংখ্যা যে দ্রুতবর্ধমান ছিল, তা সহজেই অনুমেয়। বিভিন্ন সূত্র থেকে বখতার খান ও চাঁদ খান নামে দুজন বিদগ্ধ সংগীতকারের কথা জানা যায়।

সংগীতের যন্ত্রপাতি নিয়ে সুলতানের জ্ঞান ছিল প্রগাঢ়। তার প্রিয় তানপুরার নাম ছিল মতি খান। সবসময় নিজের সঙ্গে রাখতেন তানপুরাটিকে। তার কাছে তানপুরা বাজানোর চেয়ে আনন্দদায়ক কিছু ছিল না। মতি খানের উল্লেখ পাওয়া যায় দরবারের বিশিষ্ট কবি জুহুরি ও মালিকের লেখায়। ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রক্ষিত পোর্ট্রেটে সুলতানের হাতে করতাল দেখা যায়। সংগীতের নানা তত্ত্ব আলোচনার বাইরে তিনি নিজে রচনা করেন গানের সংকলন ‘কিতাব-ই নওরাস’। কিতাব-ই নওরাসের আরেক নাম নওরাসনামা। ভারতীয় নন্দনতত্ত্বে কবিতা ও গদ্যে নয় রকমের রসের কথা বলা হয়েছে। রস হলো শিল্পের দর্শক কিংবা পাঠকের মনে সৃষ্টি হওয়া অনুভূতি। সুলতানের উদ্দেশ্য ছিল বইটিতে সেই নয় ধরনের অনুভূতিকে হাজির করা, তার জন্যই এ নাম। শিল্পের পৃষ্ঠপোষক সুলতান শুধু বইতে না, অন্যান্য ক্ষেত্রেও করেছেন ‘নওরাস’ শব্দের প্রয়োগ। শহরের নাম নওরাসপুর, প্রাসাদের নাম নওরাস মহল, পতাকার নাম আলাম-ই নওরাস, বিশেষ দিনের নাম ঈদ-ই নওরাস, বিভিন্ন শ্রেণীর সংগীতজ্ঞের নাম লস্করে নওরাস প্রভৃতি।

কিতাব-ই নওরাসের অন্তর্ভুক্ত গানগুলো বিভিন্ন সময়ে লেখা হলেও প্রথম সংকলিত হয় ১৬০৩ সালে। ভূমিকা লিখে দিয়েছেন জুহুরি। লেখা হয়েছে ভারতীয় সুর ও যন্ত্রের সঙ্গে গাওয়ার জন্য। এমনভাবে বিষয়গুলোকে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন অনভ্যস্ত পাঠকও যথাযথ স্বাদ থেকে বঞ্চিত না হন। সহজবোধ্যতার জন্য কঠিন বিষয়গুলোর সঙ্গে জুড়ে দেয়া হয়েছে ব্যাখ্যা। ৫৯টি গান ১৭টি বিশেষ সুরে গাইবার জন্য লিখিত। শেষে যুক্ত করা হয়েছে ১৭টি দোহরা। প্রতিটা গানই বিষয়বস্তু ও বর্ণনার ঢঙে আরেকটি থেকে আলাদা। অনবদ্য সৃষ্টি হিসেবে কিতাব-ই নওরাসকে কয়েক দিক থেকে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। কখনো সংগীতের পুস্তক হিসেবে, কখনো সাহিত্যিক দলিল হিসেবে কিংবা কখনো ভাষাগত গুরুত্বের ভিত্তিতে।

সংগীতের তত্ত্ব নিয়ে সুলতানের ধারণা থাকলেও কিতাব-ই নওরাস কোনো তত্ত্বমূলক আলোচনা নয়। বরং একরাশ অনবদ্য গানের সংকলন। প্রতিটা গান কোন রাগ বা রাগিণীতে গাওয়া হবে, তা উল্লেখ করা হয়েছে শুরুতেই। উদাহরণস্বরূপ, ভোপালি রাগের একটা গানের শিরোনাম দেয়া হয়েছে, ‘দার মাকামে ভোপালি’। বইয়ের প্রতিটি গানকে আবার ভাগ করা হয়েছে তিনটি পর্যায়ে। প্রথম পর্যায়ের নাম স্থায়ী, দ্বিতীয় পর্যায় অন্তরা এবং শেষ পর্যায়ে আভোগ। অবাক করার বিষয় হলো নওরাসের কোনো গানেই সঞ্চারী রাখা হয়নি। খুব সচেতনভাবেই কবি ত্যাগ করেছেন সঞ্চারী, উপরন্তু তিনটি পর্যায়কে দুটি বিশেষ অংশে ভাগ করেছেন সুলতান। সেই সঙ্গে চেষ্টা করেছেন ভারতীয় সংগীতের দুই বিশেষ ঘরানা ধ্রুপদ এবং খেয়ালের মধ্যবর্তী একটা ধারণা সৃষ্টি করার। তাতে তিনি যথেষ্ট সফল। রাগ ও রাগিণীর সম্পর্কে সুলতানের বিস্তারিত ধারণা থাকার পরও সব ক্ষেত্রে মেনে চলেননি প্রকারভেদগুলো।

ভারতীয় সংগীতশাস্ত্রে বিশ্বাস করা হতো কোনো বিশেষ সুরের জন্য অধিষ্ঠাত্রী দেবীর কল্পনা ছাড়া সংগীতকারের মনে যথাযথ আবেগ তৈরি হয় না। আর সেই অবস্থা প্রাপ্ত না হলে রাগের উদ্দেশ্য নিরর্থক। ফলে যেকোনো সুরের দুটি দিক, প্রথমটা শব্দে ও দ্বিতীয়টি চিত্রকল্পে। সুরচর্চার এই দুই ধারার মিলন ঘটানোর ঐতিহ্য অনেক প্রাচীন হলেও চিত্রের মাধ্যমে এঁকে প্রকাশ করা হয়নি তেমন। রাগমালায় সুলতান সেই চিত্রচিন্তার প্রয়োগ ঘটান। নিজের লেখা পুস্তকে তার অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কিতাব-ই নওরাসে তিনি এমনভাবে সুরের বর্ণনা দিচ্ছেন, যেন কোনো দক্ষ চিত্রকর ছবি আঁকাতে মগ্ন। উদাহরণ হিসেবে রাগিণী কারনাটার বর্ণনাই সুলতানের মুখে শোনা যেতে পারে। তার ভাষায়, অবিশ্বাস্য সুন্দরী নারী কারনাটা। নীল শাড়ি পরিহিতা, হাত শ্বেতপদ্মের মতো আর চোখ যেন ফুটন্ত কমল। বসন্তের মৌসুম এখন, চারদিকে কোকিল ডাকছে। সুন্দরী কারনাটা কবিকে উপদেশ দিচ্ছেন বিরহে কাতর না হওয়ার জন্য। আশ্বাস দিচ্ছেন শিগগির তার প্রিয়তমের ফিরে আসার।

দক্ষিণ ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসে সুলতান ইবরাহিম আদিল শাহের কিতাব-ই নওরাস গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। বিশেষ করে সংগীতচর্চার বিবর্তন ও অগ্রগতি বুঝতে। এ বইয়ের পাঠক অনায়াসে বুঝতে পারবেন ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে দক্ষিণাত্যে কারনাটি রাগিণী ছিল ব্যাপক জনপ্রিয়। ৫৯টি গানের উনিশটিই গাওয়া হয়েছে এ রাগিণীতে। জনপ্রিয়তার দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে নাম নেয়া যায় ভৈরবের। ছয়টি গান গাওয়া হয়েছে এ রাগে। চারটি করে গান লেখা হয়েছে মালার, কেদার ও তোড়িতে। গ্রন্থের বিভিন্ন গানে উপস্থিত থাকা সতেরোটি সুরের মধ্যে দুটি সুর ছিল পারস্য সংস্কৃতি থেকে আসা। তাদের নাম যথাক্রমে হাজিজ ও নাওরোজ। পারসিক সুরের উপস্থিতি দেখে প্রমাণিত হয় সেই সময়ে ভারতীয় সংগীতকে প্রভাবিত করেছিল পারসিক চিন্তাধারা। গানের বিষয়বস্তুও লক্ষণীয়। চিরাচরিত ভারতীয় গানে হিন্দু দেব দেবী ও উপমা চিত্রণ হাজির থাকত। সুলতানের পুস্তক ভারতীয় উপমাকে বর্জন না করেও গ্রহণ করেছেন আরবি-ফারসি সাহিত্য উপাদান। সংগীতচর্চায় ব্যবহূত যন্ত্র সম্পর্কেও পাওয়া যায় ধারণা। গিটার, করতাল, রুবাব, ঢোলক, দফ, সানাই ও উপাং ছিল সেই সময়ে বেশ জনপ্রিয়।

সাহিত্যিক মানদণ্ডেও ইবরাহিম আদিল শাহের গ্রন্থটি কালোত্তীর্ণ। কবিতার জগতে চিত্রকল্প তৈরিতে সুলতানের মুনশিয়ানার পোক্ত দলিল এটি। গ্রন্থজুড়ে অনায়াসে ব্যবহার করা হয়েছে দারুণ সব সিমিলি ও মেটাফোর। তিনি বলছেন, পৃথিবী একটা দুধের বাটির মতো। জোসনাগুলো দুধ হয়ে পৃথিবীকে পূর্ণ করে রেখেছে। চাঁদ সেখানে মাখন। অন্যত্র প্রেমিকার চোখে দেখা নিজের প্রতিচ্ছবিকে তিনি কূপে পড়ে থাকা ইউসুফের সঙ্গে তুলনা করেছেন। প্রিয়ের চোখ অনেকভাবেই ধরা দিয়েছে তার কাছে। তার বর্ণনায় প্রিয়া নিজেকে লুকিয়ে ফেলেছে নিজের চোখের পর্দায়, যেভাবে খিজির নিজেকে অন্ধকারে লুকিয়ে রাখে। কবি হূদয় তাই বাদশা সিকান্দারের মতো বের হয়েছে প্রিয়ের অনুসন্ধানে। সুলতানের কল্পনার উচ্চতা ঠাহর করতে একটা উদাহরণ জরুরি। তিনি বলছেন, রাতে বিরহের আগুনে পুড়ছিল প্রেমিক। তার প্রতি দয়া দেখিয়ে কোমল আলো নিয়ে কাছে এল চাঁদ। কিন্তু প্রেমিকের কষ্ট কমার বদলে চাঁদের কষ্ট বাড়তে লাগল। বিরহে পুড়তে লাগল চাঁদ নিজেই। যখন সকাল হলো, পুড়ে পুড়ে চাঁদ তখন সূর্যে পরিণত হয়ে গিয়েছে। মানুষ প্রতারিত হয়ে পূজা করছে সেই সূর্যকে।

সাহিত্যিক বিচার-বিশ্লেষণের বাইরে গিয়ে ভারতীয় ভাষার ইতিহাস পাঠকদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে পরিগণিত হতে পারে কিতাব-ই নওরাস। দক্ষিণ ভারতের অন্যতম প্রাচীন পুস্তক হওয়ার জন্য সেই ভাষার গড়ন, বৈচিত্র্য ও ব্যবহারিক প্যাটার্ন দৃষ্টি আকর্ষণ করার মতো। বইয়ের সহজ গানগুলো পরবর্তীকালে উর্দু এবং কঠিন গানগুলো হিন্দি ভাষার প্রারম্ভিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে দাবি করেন পণ্ডিতেরা। গানের ভেতরে সুলতান দক্ষিণী ভাষার কিছু বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি আরবি-ফারসি শব্দগুলোকে ঈষৎ পরিবর্তিত রূপে ব্যবহার করেছেন। তাতে বোঝা যায় দীর্ঘদিন সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে স্থানীয়দের মাঝে আরবি-ফারসি শব্দের বিবর্তন। উত্তর ভারতের ব্রজবুলি বেশ ভালোভাবেই রপ্ত করেছিলেন সুলতান, তার ছাপও ধারণ করে আছে কিতাব-ই নওরাসে।

উত্তর ভারতের সংগীতের ইতিহাসে মুসলমানদের ঐতিহ্য পুরনো। দক্ষিণ ভারতের সুলতানি যুগও খুব একটা পিছিয়ে ছিল না এক্ষেত্রে। তার প্রমাণ আদিলশাহি সুলতান ইবরাহিম আদিল শাহের শাসনকাল। প্রমাণ সংগীতে তার পৃষ্ঠপোষকতা ও সংগীত নিয়ে তার রচিত গ্রন্থ ‘কিতাব-ই নওরাস’। বইটি নিয়ে কবি জুহুরির একটা উক্তি প্রণিধানযোগ্য, ‘পৃষ্ঠাগুলো যেন ফুলের বাগান, লাইনগুলো একেকটা গাছ। শব্দগুলো যেন তার পাতা এবং অর্থ হচ্ছে ফল। সমস্ত লেখাজুড়ে গান গেয়ে চলছে প্রাঞ্জলতার পাপিয়া, মন্ত্রমুগ্ধের মতো আটকে রাখে দর্শককে। কেবল অস্থির প্রেমিকের দীর্ঘশ্বাস থেকেই এমন শব্দ বের হওয়া সম্ভব। কেবল সে-ই এমন বাগান আঁকতে পারে, যে ইবরাহিমের মতো আগুনে ফুল ফোটাতে উস্তাদ। নওরাসের গানগুলো এসেছে একজন ন্যায়নিষ্ঠ ও পণ্ডিত সুলতানের ভেতর থেকে।’

 

আহমেদ দীন রুমি: লেখক