তুরস্কের ক্ল্যাসিক্যাল সংগীতই অটোমান সংগীত বলে পরিচিত। অটোমান সুলতানদের সময়েই এ সংগীত বিকশিত হয়। সুলতানের দরবার, অটোমান তুরস্কের বড় বড় শহর ও সুফিদের খানকাহে সংগীতের আয়োজন হতো। অটোমানদের সময়কার সংগীতের বৈশিষ্ট্য ছিল শিল্পী এককভাবে সংগীত পরিবেশন করতেন এবং তার সঙ্গে থাকত স্বল্পসংখ্যক বাদ্যযন্ত্র। অটোমান সংগীতের একটি বৈশিষ্ট্য হলো এর সঙ্গে হেলেনিক ও পারসিক সংগীতের মিল পাওয়া যায়। আবার পারস্যের সংগীতে প্রভাব ছিল আরবের। আরবের সংগীতের প্রথম পর্যায়ে মাকাম ব্যবহারের ধারাটি দেখা যেত, তা পরবর্তী সময়ে পারস্যের সংগীতে গৃহীত হয়। অটোমান সংগীতে প্রায় ৬০০ মাকাম ব্যবহার হয়েছে। এছাড়া অটোমান সংগীতে জামান ও উসুর ব্যবহার দেখা যায়। একটি সময় নির্দেশক ও অন্যটি ধ্বনিবিষয়ক। তার্কিশ তানবুর (লুট), নেই, লিরা, কানুন (জিথার) ইত্যাদি ব্যবহারে সংগীত পরিবেশন করা হতো।

সংগীতকার ও সংগীতজ্ঞদের একটি অংশ সুলতানের দরবারেই সংগীত চর্চা করতেন। অটোমান দরবারের আরেকটি বিষয় হলো দরবারের সংগীতজ্ঞ বাদে দরবারের বাইরে থেকেও শিল্পী ও সংগীতকারদের আনা হতো। দরবারি ও দরবারের বাইরের সংগীতকার, শিল্পীদের সন্নিবেশিত এ সভাকে ‘কুমে ফাসিল’ নাম দেয়া হয়। এ পরিকল্পনার একটি প্রধান উদাহরণ হলেন হামামিজাদে ইসমাইল দেদে এফেন্দি। ইস্তানবুলের এ শিল্পী সরাসরি অটোমান দরবারের শিল্পী ছিলেন না। কিন্তু তাকে সুলতানের দরবারে আমন্ত্রণ করা হয়েছিল।

ইসমাইল দেদে এফেন্দি সুফিদের মেভেলভি তরিকার অনুসারী ছিলেন। তিনি বুসিক মাকামে নিজের সুরারোপ করা একটি সংগীত দিয়ে জনপ্রিয়তা লাভ করেন। এ গানের মধ্য দিয়েই তিনি ইস্তানবুলে প্রভূত জনপ্রিয়তা লাভ করেন। সুলতান তৃতীয় সেলিমের পক্ষ থেকে ইসমাইলকে আমন্ত্রণ করে দরবারে আনা হয়। এরপর একটি দীর্ঘ সময় ধরে দেদে এফেন্দি তার দরবেশের খানকাহ ও রাজদরবারে যাতায়াত অব্যাহত রাখেন। কিন্তু এরপর একটা সময়ে তিনি দরবারের শিল্পী হিসেবে সেখানেই স্থায়ী হয়ে যান।

দেদে এফেন্দির এই অন্তর্ভুক্তি প্রমাণ করে যে অটোমান দরবার সে সময়ের ইস্তানবুলের সংগীত সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখত। সময়ের সেরা সংগীতজ্ঞ ও শিল্পীদের চেনা, তাদের স্বীকৃতি ও দরবারে অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে তুরস্ক ও অটোমান সংগীতের উন্নতি সাধন হয়েছিল। কেবল সংগীত নয়, এর মাধ্যমে দেশটির সংস্কৃতির বৈচিত্র্যও বৃদ্ধি পায়। সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদও এ ধারা বজায় রেখেছিলেন। তিনি পশ্চিমা সংগীতের ভক্ত ছিলেন। তিনি তার কন্যা আয়শে সুলতানের জন্য পিয়ানো শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। ইস্তানবুলের সড়ক থেকে শুরু করে বড় বড় পরিবার ও সভায় তানবুরি কেমিল বের নাম শুনে আবদুল হামিদ তাকে প্রাসাদে ডেকে আনেন যেন অন্তত তার সংগীতের সঙ্গে পরিচিত হওয়া যায়।

অটোমান শাসন ও শাসনামলে সংগীত ও বাদ্য বিশেষ অর্থবহ ছিল। ব্যানার, তবলা, টাগ ইত্যাদি সুলতানের শোভাযাত্রা, যুদ্ধ ইত্যাদিতে ভূমিকা রাখত। সে সময় সুলতানই ছিলেন শাসন ব্যবস্থার প্রধান ব্যক্তি। প্রাসাদ বা শাসন ব্যবস্থার ছিল নিজস্ব সংগীত আলয়। মোগলন নক্করখানার মতো অটোমানদেরও ছিল বিশেষ ব্যবস্থা। প্রতি সন্ধ্যায় প্রাসাদের সামনে বা তাঁবুতে সংগীতের আসর বসানো হতো। মূলত যেখানে সুলতান অবস্থান করতেন, সেখানেই হতো এ আয়োজন।

সুলতান দ্বিতীয় মুরাদের সময়ে অটোমান দরবারে সংগীত সম্পর্কিত লেখালেখি শুরু হয়। মারাগালি আবদুল কাদিরের লেখা মাকসুদুল এলহান এ সময়কার সংগীত সম্পর্কে তথ্য দেয়। পাশাপাশি এ বইয়ের বিস্তারিত আলোচনা প্রমাণ করে মুরাদ তার সময়ে সংগীতের প্রতি তার পৃষ্ঠপোষকতা রেখেছিলেন। এছাড়া আহমেদগলুর রিসালে-ই-মুসিকি উল্লেখযোগ্য। ফতেউল্লাহ মু’মিনের লেখা রিসালে-ই ইলমুল মুসিকিতে সংগীতের নানা খুঁটিনাটি নিয়ম-নীতি রয়েছে। বইটি তোপকাপি সারায়ে মিউজিয়ামে বর্তমানে সংরক্ষিত রয়েছে। এসব বইয়ের মধ্যে অটোমান সংগীত, সংস্কৃতির পাশাপাশি ১৫ শতকের তুরস্কে চলমান শাসনের সঙ্গে সংগীত ও সংগীতজ্ঞ সমাজের প্রতি শাসকদের দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিচয় পাওয়া যায়।

অটোমান সংগীতের ইতিহাস থেকে দেখা যায় প্রতিবেশী অঞ্চলগুলো এতে প্রভাব ফেলেছে। প্রথমত একটা সময় বাইজেন্টাইন সংস্কৃতির প্রভাব সরাসরি পড়েছিল তুরস্কের সংগীতে। এরপর বৃহত্তর পারস্যের সঙ্গে এর সাংস্কৃতিক মিশ্রণ হয়। পারস্য তথা ইরানের সংগীতের প্রভাবের পাশাপাশি অটোমান তুরস্কে ইসলামী সংগীতের প্রভাব পড়ে। মুসলিম সংগীতজ্ঞ ও সংগীতকাররা অটোমান তুরস্কের সংগীতে নিজেদের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছিলেন। আল-ফারাবি, ইবনে সিনা ও মারাগি ছিলেন এ সময়কার সংগীতের পুরোধা ব্যক্তিত্ব। অটোমান সংগীতের সঙ্গে সম্পৃক্ত শব্দ ও ধারণাগুলো লক্ষ করলে দেখা যায়, এগুলো আরবি কিংবা ফারসি। অটোমান সংগীতের নোটেশনের ক্ষেত্রে টার্কিতে এর কোনো নোট পাওয়া যায় না। এর জন্য তাদের নির্ভর করতে হয়েছে আরবি বা ফারসি ভাষা এবং আবর ও পারস্যের সংগীতের ওপর।

মূলত ১৫ শতকের পূর্ব পর্যন্ত অটোমানরা তৈমুরি রেনেসাঁ দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। এখানে মূলত পূর্ব ও মধ্য এশিয়ায় তৈমুরের উত্তরপুরুষদের ছোট ছোট রাজ্যে তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় সংগীত বিকশিত হচ্ছিল। এরপর ১৫ শতক থেকে অটোমানরা নিজেদের মতো করে সংগীতের ধারায় পরিবর্তন করার চেষ্টা করেন। পারস্য, মধ্য এশিয়া ও আরবের সংগীতের দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার কারণে অটোমান সংগীতে বৈচিত্র্য তৈরি হয়। এরপর ১৫ শতক থেকে অটোমানরা নিজস্ব ধারার সংগীত তৈরি করা শুরু করেন। এ সময় থেকে অটোমান সংগীতের ধারা আরো স্পষ্ট হয়। সংগীতের বিকাশের পেছনে সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতা একটি বড় ভূমিকা পালন করেছে। এ কারণে এ সময়কে সংগীতবিশারদরা ‘ফার্স্ট অটোমান রোমান্টিসিজম’ বলে অভিহিত করেছেন।

অটোমান সংগীতকার ও বাদ্যকারদের মধ্যে সিমার্দ নামে একজন উদ বাদকের নাম পাওয়া যায়। এছাড়া ইশাক নামে একজন কানুন বাদকের নামও এসেছে। তারা একাধারে বাদক ও বাদ্যযন্ত্র প্রস্তুতকারক। মুসলিউদ্দিন নামে একজন তানপুরা বাদক ছিলেন অটোমান দরবারে। দ্বিতীয় মেহমেতের সময় তিনি ১২ একের (অটোমান মুদ্রা) বিনিময়ে দরবারে কাজ করতেন। এ তথ্য প্রমাণ করে যে মেহমেতের মতো বিজেতারাও তাদের দরবারে যন্ত্রী ও শিল্পীদের যথেষ্ট সুযোগ দিয়েছিলেন। দুরসুর বের লেখা ইতিহাস থেকে আরো জানা যায় যে মেহমেতের পর শাহজাদা দ্বিতীয় বায়েজিদের সিংহাসন আরোহণ উপলক্ষে দরবারে সংগীতের আয়োজন করা হয়েছিল। এ অনুষ্ঠানে সভাসদরা উপস্থিত ছিলেন।

দ্বিতীয় বায়েজিদের শাসনামলে রচিত সাইয়েদিনিন আল মাতলাই বইয়ে অটোমান দরবারে গৃহীত সংগীত নীতির উল্লেখ রয়েছে। এ বইয়ের লেখক জানিয়েছেন সংগীত ও গণিত উভয় ক্ষেত্রেই আল ফারাবিকে অনুসরণ করা হয়েছে। এমনকি সংগীতে শব্দের ব্যবহারও গণিতের মাধ্যমে করা হতো। বায়েজিদের দরবারে অনেক সংগীতজ্ঞকে একত্র করা হয়েছিল। তাদের বেতন দৈনিক ভিত্তিতে নির্ধারিত ছিল। সুলতান সুলেমান তথা সুলেমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্টের সময়ে তার দরবারেও বহু সংগীতজ্ঞের সমাহার ছিল। তোপকাপি প্রাসাদে সুলতান সুলেমানের দুটি মিনিয়েচার রয়েছে। এর শিরোনামে রয়েছে ‘সুলেমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্টের বিনোদন’। এই চিত্রে সুলতানের জন্য সংগীতজ্ঞদের সংগীত পরিবেশন করতে দেখা যায়। সুলেমানের দুই পুত্র বায়েজিদ ও জাহাঙ্গীরের সময়েও তোপকাপি প্রাসাদে এ ধরনের সংগীতের আয়োজন হতো এমন দৃষ্টান্ত অটোমান মিনিয়েচার চিত্রেই রয়েছে।

অটোমান সংগীতে একটি নতুন ধারা ১৫ শতকে শুরু হয়েছিল, কিন্তু পুরোপুরি অটোমান ঘরানা তৈরি হয় সপ্তদশ শতকে। এ সময় নতুন সংশ্লেষণ বা সিনথেসিসের মাধ্যমে সংগীতের পরিবর্তন হয়। এটিকে লোকাল মডার্নিটি বা ‘মিউজিক্যাল রেনেসাঁ’ বলা হয়। মেহেলভি দরবেশদের হাত ধরেই মূলত এ নতুন ধারার সূচনা হয়। নতুন সংশ্লেষণের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তি ছিলেন কাসিমপাশা ওসমান এফেন্দি। তারা জটিল ছন্দ পরিহার করার চেষ্টা করেছেন। পরবর্তী সময়ে তার ছাত্র হাফিজ গানের মধ্যে লোকগাথা ও মুরাব্বা ঘরানার কবিতাকে সংগীতে নিয়ে আসেন। ষোড়শ শতকে এসে পারস্যের সংগীত ও আনাতোলিয়ার সংগীতের ঘরানার মধ্যে একধরনের মিশ্রণ ও সীমারেখা তৈরি করে নতুন করে তা অটোমান ঘরানায় এনে যুক্ত করেন।

ওসমান এফেন্দির আরেক উত্তরসূরি মুস্তাফা ইতরি বাইজেন্টাইন সংগীতের প্রচলিত ধারায় পরিবর্তন আনেন। এর পর থেকে গ্রিক সংগীতের সঙ্গে থেকে শুরু করে আরো কিছু মিশ্রণ হয়। দিমিত্রি ক্যান্টেমির ওসমান এফেন্দির ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তবে এ বিষয়গুলো আরো পরবর্তী সময়ের। অটোমান দরবারে যে সংগীত প্রচলিত ছিল তা ১৫ শতকে তৈরি হয়ে ১৬ শতকে বিকশিত হয়। এ দুই দশক এমনকি ১৭ শতকেও অটোমান সংগীতের সূচনার ও মূলধারার এ প্রচলন ছিল। পরবর্তী সময়ে স্বভাবতই অটোমান সংগীতেও পাশ্চাত্যের ছোঁয়া লাগতে শুরু করে। মূলত ইসমাইল দেদে এফেন্দির মাধ্যমে শুরু হয়ে অটোমান দরবারে সংগীত বিকশিত হয়। অটোমান মূল সংগীতে শেষ সংস্কারটি করেছিলেন ওসমান এফেন্দি। এর পরের অটোমান সংগীত দরবারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিল না।

 

আলী আমজাদ: লেখক