শেরশাহের কাছে দিল্লির মসনদ হারালেন হুমায়ুন। সাহায্যপ্রার্থী হলেন পারস্যের সাফাভি শাসক শাহ তামাস্পের। দুই শাসকের দীর্ঘ আলোচনা হলো ভবিষ্যতে করণীয় নিয়ে। পরবর্তীকালে সে আলোচনা চিত্রিত করে রাখা হয় চেহেল সতুন প্রাসাদে। ছবিতে হুমায়ুন আর শাহ তামাস্প মুখোমুখি বসে। দুই পাশে হরেক রকমের বাদ্যযন্ত্র হাতে গায়ক দল। সাফাভি সাম্রাজ্যে অভ্যর্থনার কেন্দ্র হিসেবে সম্রাট শাহ আব্বাস রাজধানীতে নির্মাণ করেন চেহেল সতুন ও আলি কাপু প্রাসাদ। বিভিন্ন অঞ্চলের শাসক আগমন করলে আলোচনা চলত এখানেই। রাখা হতো সংগীতের আয়োজন। শুধু অতিথির মনোরঞ্জনের জন্য না, সাফাভি শাসকদের আভিজাত্য প্রদর্শন করতেও। চিত্রকর্ম থেকে পারসিক ইতিহাসে সংগীতের ঐতিহ্য কিছুটা হলেও অনুমিত হয়। বস্তুত পারস্যের সংগীতে যে প্রবল স্রোতের শুরু হয় তৈমুরিয় আমলে, সাফাভি যুগে তা স্থিতিশীল থাকেনি।
সাফাভি শাসনের শেকড় সুফিবাদে প্রোথিত। অথচ ক্ষমতায় আসার পরই শাহ ইসমাইল (১৪৮৭-১৫২৪) সুফিবাদের প্রভাব থেকে দরবারকে আলাদা করতে থাকলেন। দূরত্ব তৈরি করলেন সুফিদের সঙ্গে। নবগঠিত দরবারে ধর্মীয় নেতাদের মধ্যেও জারি হলো সুফিদের কঠোর সমালোচনা। সামা’ গুরুত্বপূর্ণ সুফি অনুষঙ্গ হওয়ার কারণে এ রাজনীতি লাভ করে বাড়তি মাত্রা। শাসন ব্যবস্থার ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে সংগীতের সমালোচনা ও সিদ্ধান্তগুলো প্রায়ই ছিল সুফিবিরোধী রাজনৈতিক উদ্দেশ্য দ্বারা প্রভাবিত। পরিণামে সুফিদের রাজনৈতিক প্রভাবই কেবল কমে আসেনি, লেখালেখিও হ্রাস পায় বিস্ময়করভাবে। পাঁচ শতক ধরে পারসিক সংগীতে যে বারো মাকামের ব্যবহার, তা সাফাভি আমলে পরিবর্তিত হয়ে যায়। বহুলাংশে বিলুপ্ত হয় সংগীতের তাত্ত্বিক আলোচনা ও শাস্ত্রীয় প্রয়োগ নিয়ে আগেকার অর্জন। অনেক বিখ্যাত সংগীতকার পারস্য ছেড়ে দিয়ে চলে যায় উসমানি ও মোগল সাম্রাজ্যে।
দৃশ্যের হঠাৎ পরিবর্তন আসে ষোড়শ শতাব্দীতে। উসমানি, সাফাভি ও মোগল সাম্রাজ্য তাদের স্বর্ণযুগ অতিক্রম করে এ সময়। সাফল্যের শীর্ষে আরোহণ করে সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে। বিকাশ লাভ করে শিল্প ও সংস্কৃতি। সাফাভি প্রশাসনে এ আমলে সম্পূর্ণ নতুন মাত্রা নিয়ে প্রবেশ করে সংগীত। আগে ধর্মীয় নেতারা সংগীতের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। এবার বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও উৎসবে অনুপ্রবেশ করতে থাকল সংগীত। সমাবেশে চালু হলো মহাকাব্য থেকে আবৃত্তির সংস্কৃতি। অনেকেই পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে থাকল সংগীতের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়াকে। সংগীতের এ পৃষ্ঠপোষকতা দেয়াটা রাজনীতি থেকে মুক্ত না পুরোপুরি। বিষয়টা স্পষ্ট করার জন্য আরেকটু পেছনে তাকানো জরুরি। আবদুল কাদির আল মারাগি প্রথমে জালায়েরি এবং পরে তৈমুরিয় দরবারের সংগীতকার। সংগীত নিয়েই লিখেছেন বিখ্যাত গ্রন্থ ‘জামিয়ুল-আলহান’। ১৪০৫-১৩ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন গান লিপিবদ্ধ করেছেন সেখানে। ৪৫টি মজলিসে বিভক্ত করে লেখা গানগুলোর বিষয়বস্তুর বড় অংশ জুড়ে দরবারকেন্দ্রিকতা। অর্থাৎ সংগীতচর্চায় দরবারি প্রভাবের ঐতিহ্য আগে থেকেই ছিল। সাফাভি শাসক শাহ হোসাইনের (১৬৬৮-১৭২২) সময় দরবারি সংগীতকার আমির খান গরজি রচনা করেন আর-রিসালা-দার ইলমিল মুসিকা। সেখানে সংকলিত হয় সাফাভি আমলের সংগীত। তার আগে সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে দরবারি সংগীতকার ছিলেন আকা মুমিন মুসান্নাফ। সংগীত নিয়ে তিনিও লিখেছেন রিসালা। আকা মুসান্নাফ কোনো সংগীতের পাশাপাশি তার মাকামকে উল্লেখ করে দিয়েছেন। ভারতীয় সংগীতে রাগের মতো পারসিক সংগীতে মাকাম ধারণা অনেক আগে থেকেই বিকাশ লাভ করেছিল। যা-ই হোক, আমির খান এই দিকে এগিয়ে গেছেন কয়েক ধাপ। কোন মাকামে গাওয়া হবে, কীভাবে সংগীতটি গাওয়া হতো দরবারে, সংগীতের ধরন এবং সম্পর্কিত অন্যান্য তথ্যও তুলে ধরেছেন তার লেখায়। অর্থাৎ নেহায়েত শিল্প হিসেবে জ্ঞান ও প্রতিভার সঙ্গে যুক্ত থাকেনি সংগীত। পরিণত হয়েছে দরবারের দিনলিপি ও বংশীয় আভিজাত্য প্রকাশের মুখপাত্র হিসেবে। প্রত্যেক গানকেই আনন্দময় হতে হবে, এমন কোনো শর্ত নেই, তবে প্রত্যেক গানের বিষয়বস্তু অবশ্যই হতে হবে সুলতান আর তার দরবারকে নিয়ে।
জালায়েরি ও তৈমুরীয় শাসনামলের সংগীতকার মারাগির লেখা শুরু হয়েছে আল্লাহর প্রশংসা দিয়ে। ধারাবাহিকভাবে ঠিক পরেই স্থান নিয়েছে রাসুল (সা.) ও চার খলিফার প্রশংসা। তারপর শুরু হয় শাসকের বিচার ও সামরিক শক্তির গুণগান। যেন কেবল মৃত্যু ছাড়া আর কিছু শাহকে হারাতে পারবে না। শাহ যেন জমিনে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। শাহের ক্ষমতা বোঝাতে আলোচনায় টানা হতো শাহনামার হোশাং, জামশেদ ও মোঙ্গল শাসক চেঙ্গিশ খানের দিগ্বিজয়ের গল্প। এ যেন বর্তমান শাসকের শেকড়ের পরিচয় বর্ণনা। যেন তিনিও তাদের মতোই শত্রুদের শিবিরে আতঙ্ক তুলতে সক্ষম। বিশেষ দিনগুলোয়ও নানা আয়োজনের মধ্যেই থাকত শাহের স্তুতিমূলক সংগীতের আসর। তবে জালায়েরি ও তৈমুরিয় শাসনামলে অধিকাংশ সময়েই শাহ কোনো বিশেষ নামকে উদ্ধৃত না করে একটা বিমূর্ত চিন্তা আকারে হাজির থাকত। ফলে প্রশংসার ধরনও ছিল কিছুটা পরোক্ষ। আল্লাহ ইহকাল ও পরকালের শাহ বা সম্রাট, পৃথিবীর শাহ তাই যেন আল্লাহর সেই চরিত্রের প্রতিবিম্ব। মারাগির যুগে কবিতায় প্রেম ও আধ্যাত্মিকতাও গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেছিল। অথচ তার গানের সংকলনে সেই অনুপাতে উপস্থিতি অল্পই।
সাফাভি আমলের লেখা সংগীত ভিন্ন রূপ গ্রহণ করে। এ কথা সত্য, পারসিক ঐতিহ্যে আগে থেকেই বিদ্যমান প্রেম ও আধ্যাত্মিকতাকে অনুসরণ করা হয়েছে এ যুগেও। তবে বিশ্বাসকেন্দ্রিক সংগীতে এসেছে মৌলিক পরিবর্তন। যেন শেকড়কে পুনর্গঠন করার প্রচেষ্টা। তার প্রমাণ আকা মুমিন মুসান্নাফ ও আমির খানের সংকলন। আকা মুমিন মুসান্নাফ এক গানে বলেছেন, ‘রুস্তম ও আফরাসিয়াবের কাহিনী ছেড়ে দাও, তার বদলে পাঠ করো আলী (রা.) কে।’ স্পষ্টত পূর্ববর্তী সময়ে প্রাচীন পারসিক ঐতিহ্যের প্রতি যে আকর্ষণ ছিল, তাকে সাফাভি আমলে ইসলাম পরবর্তী ঐতিহ্যে রূপান্তরের প্রয়াস চলেছে। বিশেষ করে শিয়া ইসলামের প্রভাবে আলী (রা.) ’র প্রশংসা গানের অন্যতম বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়। শাসকের প্রশংসাও এখন আর বিমূর্ত না। কোনো বিশেষ শাসকের কোনো বিশেষ কর্মের জন্য বিশেষভাবেই প্রশংসামূলক সংগীত রচিত হতে শুরু করল এ সময়। শাহ আব্বাসের ব্যাপারে লেখা একটা গানের কথা এ রকম, ‘ন্যায় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শাহ আব্বাস। তার সময়ে শরাব পরিবেশনকারীরা বাতাসে সত্য ও ন্যায়ের শরাব বিলিয়ে দেয়। সংগীতকার বাজাতে শুরু করে বিহ্বল হয়ে। দিগ্বিদিক থেকে আসতে থাকে প্রেমিকেরা।’ বিমূর্ত শাসক ধারণাকে এভাবে মূর্ত করে ফেলায় এ সময়ের স্তুতিমূলক সংগীত পুনরাবৃত্তি বৈশিষ্ট্যে আক্রান্ত। মারাগির লেখায় সমসাময়িক বিভিন্ন সমস্যাও চিত্রিত হয়েছে; সেটাও অনুপস্থিত সাফাভি আমলে। যেন সাফাভিরা আরো বেশি প্রশংসা চাচ্ছেন সংগীতকারদের কাছে আর সেই অনুসারে রচনা করে যাচ্ছেন সংগীতকাররা।
সংগীত একটা রাজবংশকে ব্যাখ্যা করার মাধ্যম হতে পারে। ইসলাম আগমনের আগে ও পরের রাজবংশে সংগীতকারদের পৃষ্ঠপোষকতা দেয়ার পেছনে এটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। তুর্কি ও মোঙ্গল জাতি ছিল সংগীতের একনিষ্ঠ পৃষ্ঠপোষক। সাফাভিরা সেই ঐতিহ্য একটু ভিন্নভাবে সামনে এগিয়ে নিয়েছে। অন্যান্য সাম্রাজ্যের চেয়ে প্রশাসনিকভাবে তার ছিল বেশি এককেন্দ্রিক। শুরু থেকেই চেয়েছে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে। প্রথম দিকে সংগীতকে নিষিদ্ধ করার কারণ ছিল এটাই। পরের দিকে সংগীতের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা সরিয়ে নেয়া হয় যদিও, নিয়ন্ত্রণ সরে যায়নি সংগীতের জগৎ থেকে। কীভাবে সংগীত চর্চিত হবে কিংবা কোনো ধরনের সংগীত চর্চিত হবে, সেগুলো নির্ধারণ করে দিয়েছেন শাসকরা। ফলে পরিবর্তন এসেছে সংগীতের গতি-প্রকৃতিতে।
দশম শতাব্দীর সংগীতজ্ঞ আবুল ফারাজ ইসপাহানি তার কিতাবুল আগানিতে আব্বাসীয় শাসক ও অভিজাতদের অনেক প্রশংসা করেছেন। তবে সেই সঙ্গে প্রাধান্য পেত অন্য বিষয়াবলিও। সাফাভি যুগে বিষয়বস্তু একমুখী হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক প্রবাহে কিছুটা সংযোজন ঘটলেও বিয়োজন কম ঘটেনি। সংগীতের এ রাজনীতিকরণে পরিবর্তিত হয়েছে পারসিক সংগীতের ভবিষ্যত গতি, মাত্রা ও গঠন। সাফাভিদের পতনের পর তাদের প্রতিস্থাপিত করে কাজার রাজবংশ। নয়া শাসন ব্যবস্থায় জন্ম নেয় নয়া সংগীতের ধারা। জারি থাকে সংগীতে রাজনৈতিক সমীকরণ।
আসরার আবদুল্লাহ: লেখক





