১. মোবাইল-ইন্টারনেটের যুগে ‘পত্র’ লেখা কমে গেছে বেশ। কাগজে-কলমে পত্র এখন কজনইবা লেখেন। সেই সময় ও যত্ন আছে কি? মেসেজে মেসেজে পত্রের কাজ হয়ে যায় সারা। তবে পত্র আছে, থাকবে কর্মক্ষেত্রে ও জীবনে। ফুরিয়ে যাবে না পত্রের আবেদন, নিবেদন—
যে পত্রে আবেদন থাকে, তা আবেদনপত্র। যে পত্রে আমন্ত্রণ থাকে, তা আমন্ত্রণপত্র। যে পত্রে প্রেম থাকে, তা প্রেমপত্র। যে পত্রে দর আছে, তা দরপত্র। যে পত্রে প্রশ্ন আছে, তা প্রশ্নপত্র। যে পত্রে আছে প্রশংসা, তা প্রশংসাপত্র। আর যে পত্রে আছে অভিযোগ, তা অভিযোগপত্র।
আরো আছে— নিয়োগপত্র, চাহিদাপত্র, সংবাদপত্র, প্রবেশপত্র, সনদপত্র।
২. বাঘ আমাদের জাতীয় পশু, আমাদের গর্ব। এর ডোরাকাটা দাগ ও রাজকীয় ভাব নজর কেড়ে নেয়। তবে একে সামনাসামনি দেখার সাহস খুব কম মানুষেরই আছে। অন্যদিকে সিংহ পশুর রাজা। এর আছে সুন্দর কেশর। তবে বাঘ নিয়ে বাংলায় যত কথা-ভয়-আগ্রহ, সিংহ নিয়ে ততটা নেই—
যেখানে বাঘের ভয় সেখানে সন্ধ্যা হয়। বাঘে-মহিষে একঘাটে জল খায়। বনের বাঘে না মনের বাঘে খায়। টাকা হলে বাঘের দু চোখ মেলে। বাঘের বাচ্চা। বাঘ একদিন সত্যি সত্যি আসবে, তখন কেউ বাঁচাতে আসবে না (এক রাখালের গল্প)। সে তাকে বাঘের মতো ভয় পায়। আবার অনেকে বাঘকে ভালোবেসে মামা বলে— বাঘমামা।
৩. ‘নুন’- গ্রামের ভাষা, মুখের ভাষা। ‘লবণ’- বইয়ের ভাষা, পত্রিকার ভাষা, শহুরে ভাষা। অথচ বাংলায় থাকা নানা প্রবাদবাক্যে ‘লবণ’ জায়গা পায়নি, জায়গা পেয়েছে ‘নুন’।
* নুন খাই যার, গুণ গাই তার। * নুন আনতে পানতা ফুরায়। * কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা।
(তাহলে কি বলা যায় এই প্রবাদবাক্যগুলো উঠে এসেছে গ্রাম থেকে? গ্রামের বুড়োবুড়ির মুখ থেকে।)
৪. কারাবন্দি, ফ্রেমবন্দি— এসব বন্দির একটা সীমানা আছে, যা সবাই দেখতে পারেন, তবে নজরবন্দির সীমানা কারো নজরের ওপর নির্ভর করে, এই নজরের সীমানাপ্রাচীর অদৃশ্য।
৫. ‘কাল’ অর্থ সময়। সময় মানুষকে সুখী করে। সময় মানুষকে দুখী করে। কাল তিন প্রকার— অতীত কাল, বর্তমান কাল, ভবিষ্যত্ কাল। আজ যা বর্তমান একসময় তা হবে অতীত, আর ভবিষ্যত্ ধরা দেবে বর্তমানে। এভাবে চলে যায় দিন-মাস-বছর। বর্তমানই গড়ে দেয় ভবিষ্যতের ঠিকানা।
এছাড়া আরো কত কাল আছে বাংলায়— অকাল, আকাল, গতকাল, আগামীকাল, সকাল, বিকাল, সমকাল, চিরকাল, ইহকাল, পরকাল, একাল, সেকাল, আজকাল, দিনকাল, মহাকাল, কলিকাল।
৬. মানুষ (বাঁচার জন্য) খাবার খায়, এছাড়া আরো অনেক কিছু খায়, যা পেটে প্রভাব না ফেললেও মন ও শরীরের অন্যান্য অংশে কখনো ইতিবাচক, কখনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলে—
গড়াগড়ি খায়, পল্টি খায়, ডিগবাজি খায়, ধাক্কা খায়, ঠেলা খায়, ধোঁকা খায়, ধমক খায়, চড়-থাপ্পড়/কিল/ঘুষি/লাথি খায়, বসের ঝাড়ি খায়, বেতের বাড়ি খায়, অবশেষে চুমু খায়।
৭. ‘বিরতি’র প্রয়োজন আছে কর্মে, যাত্রায়, খেলায়। নয়তো সেই কর্ম, যাত্রা, খেলা পরিণত হয় যন্ত্রণায়। বিরতি আছে কয়েক রকমের—
অস্ত্রবিরতি, যুদ্ধবিরতি, যাত্রাবিরতি, খেলায় আছে চা বিরতি/ পানিপানের বিরতি, নাটকে আছে বিজ্ঞাপন বিরতি, কর্মবিরতি।
৮. ফুল আছে অনেক রকম। বকুল ফুল, জবা ফুল, গোলাপ ফুল, গাঁদা ফুল, শিমুল ফুল, কদম ফুল— এসব ফুল নারীরা সাজসজ্জায় ব্যবহার করে থাকেন। এগুলো তাদের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। আরেকটি ফুল আছে যা গন্ধহীন, সজীবতাহীন এবং মানুষের হাতে গড়া। এ ফুল নারীর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে থাকে দিনে-রাতে সব সময়, বাড়ায় সৌন্দর্য। তা হলো ‘নাকফুল’।
আরো আছে কাশফুল, বাঁশফুল, ঘাসফুল। এগুলোর তেমন দাম নেই, তবে রূপ আছে।
৯. কথা ঠিক করে দেয় মানুষের পরিচয়। কথায় পরিবেশ ঠাণ্ডা হয়, আবার কথায় পরিবেশ গরম হয়—
যার কথা সত্য, সে সত্যবাদী। যার কথা মিথ্যা, সে মিথ্যাবাদী। যার কথা উগ্র, সে উগ্রবাদী। যার কথায় যুক্তি আছে, সে যুক্তিবাদী। আর যার কথা বাস্তব, সে বাস্তববাদী।
১০. রাজনীতিতে ‘শেষ কথা’ নেই, তবে ‘শেষ’ আছে অনেক কিছুর—
শেষ বিকাল= শেষ বিকালের মেয়ে। শেষ ইচ্ছা= শেষ ইচ্ছা পূরণ। শেষ রাত= ওস্তাদের মাইর শেষ রাতে। শেষ বয়স= শেষ বয়সে চাকরি। শেষ সময়= শেষ সময়ে ভর্তি হওয়া।
১১. যার ‘যোগ্যতা’ আছে, সে ‘যোগ্য’। যার নেই, সে ‘অযোগ্য’। যার বেশি আছে, সে ‘সুযোগ্য’। সুযোগ্য পাত্রপাত্রীর কদর রয়েছে সর্বত্র। আরো অনেক ‘যোগ্য’ আছে, যাদের ওপর ভরসা রাখতে হয় এবং তাদের নিয়ে চলতে হয়—
যার ওপর ‘বিশ্বাস’ করা যায়, তা বিশ্বাসযোগ্য। যার ওপর ‘নির্ভর’ করা যায়, তা নির্ভরযোগ্য। যা ‘গ্রহণ’ করা যায়, তা গ্রহণযোগ্য। যেখানে ‘বাস’ করা যায়, তা বাসযোগ্য।
(রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোয় সত্ ও যোগ্য লোক স্থান পাক, এটাই প্রত্যাশা। তবেই এগোবে দেশ, ভালো থাকবে জাতি।)






