প্রথম প্রকাশের পরই অত্যন্ত প্রভাবসঞ্চারী একটি বই এবং একটি উদ্ভাবন কুশলকাজ হিসেবে সমাদৃত হয়েছিল ট্রান্সলেটরস থ্রু হিস্ট্রি, যা একই সঙ্গে তথ্যপূর্ণ এবং খুবই পাঠযোগ্য। অনুবাদকরা যুগে যুগে, দেশে দেশে বুদ্ধিবৃত্তিক আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন। উচ্চপ্রশংসিত এ গ্রন্থে বলা হয়েছে বিভিন্ন ভাষার বিকাশে, নানা সাহিত্যের আবির্ভাবে, জ্ঞান বিতরণে ও মূল্যবোধ বিস্তারে এ অনুবাদকদের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকজনের অমলিন অবদানের কথা, যা হয়ে উঠেছে বিশ্বসংস্কৃতিরই একটি অনুপম কাহিনী। সে কাহিনীর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার এই পাক্ষিক আয়োজনে পাঠকদের আমন্ত্রণ

(১৮ কিস্তি)

(দ্বিতীয় অধ্যায়)

‘অনুবাদকবৃন্দ এবং জাতীয় ভাষাসমূহের বিকাশ’

হিব্রু: ইসরায়েলের জন্য একটি আধুনিক ভাষা

হিব্রু একটি প্রাচীন ভাষা, যা সেমিটিক ভাষাপরিবারের উত্তরপশ্চিম কানানাইট শাখার অন্তর্ভুক্ত। অষ্টম খ্রিস্টপূর্বাব্দের উত্কীর্ণ লিপিতে প্রাচীন হিব্রুর আদিতম চিহ্ন পাওয়া যায়। তবে কিনা হিব্রু বাইবেলের টেক্সটেই মূলত ভাষাটি সংরক্ষিত হয়েছিল এবং চতুর্থ শতকের মধ্যে সেটি সংকলিত করা শেষ হয়। ডায়াস্পোরা অর্থাত্ ষষ্ঠ খ্রিস্টপূর্বাব্দের ব্যাবিলনীয় নির্বাসনের পর ইহুদি সম্প্রদায়ের ফিলিস্তিনের বাইরে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনার পর হিব্রু আর কেজো ভাষা রইল না। কেবল একটি পবিত্র ভাষা হিসেবেই সেটা টিকে থাকল এবং প্রধানত ধর্মীয় উদ্দেশ্যেই সেটা ব্যবহার হতো। অবশ্য কোনো কোনো সময়ে সেকুলার সাহিত্য রচনার কাজেও ইহুদি লেখকরা ভাষাটিকে ব্যবহার করেছেন (উদাহরণস্বরূপ মধ্যযুগীয় স্পেনে স্বর্ণযুগের হিব্রু সাহিত্য এবং ঊনবিংশ শতকের ইউরোপে ইহুদি আলোকায়ন আন্দোলনকালের সাহিত্যের কথা বলা যায়)। হিব্রু দৈনন্দিন জীবনের ভাষা ছিল না। সে কাজ চালানোর জন্য ইহুদিরা সেসব দেশের ভাষা ব্যবহার করত, যেসব দেশে তারা থাকত। সেই সঙ্গে তারা কেবল তাদের মধ্যেই প্রচলিত কিছু উপভাষা ব্যবহার করত, যেমন— ইদ্দিশ ও লাদিনো।

{ইদ্দিশ (আক্ষরিক অর্থ ইহুদি-সংক্রান্ত) একটি মিডল হাই জার্মান ভাষা। দশম শতকে রাইনল্যান্ডে (পশ্চিম জার্মানিতে রাইন নদী বরাবর, মূলত সেটার মাঝের অংশের একটি এলাকা, যার সীমানা ততটা সুনির্দিষ্ট ছিল না) ভাষাটির উদ্ভব ঘটে tiutsch-এর (যা আসলে মিডল হাই জার্মান ভাষার সমসাময়িক রূপ) একটি রূপভেদ হিসেবে (ইহুদিরা যেটাকে taytsh বলে)। হিব্রু লিপি বা স্ক্রিপ্টে লেখা এ ভাষা হিব্রু ও স্লাভিক ভাষাগুলোর কাছ থেকে নানা কিছু আহরণ করে সমৃদ্ধ হয়েছে। এটি আশকেনাজি ইহুদিদের প্রাথমিক কথ্য ভাষা ছিল, যারা রাইনল্যান্ডে বসতি স্থাপন করেছিল এবং পরে মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে ছড়িয়ে পড়েছিল। সারা বিশ্বের ইহুদি সম্প্রদায় একসময় এ ভাষায় কথা বললেও বর্তমানে ইদ্দিশ ভাষা অস্তগামী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গোড়ার দিকে ইদ্দিশভাষীর সংখ্যা ছিল ১ কোটি ১০ লাখের মতো। কিন্তু এখন সে সংখ্যা অনেক নিচে নেমে গেছে। ইদ্দিশ ভাষায় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, যেমন— পুস্তক রচনা, খবরের কাগজ ও সাময়িকপত্র প্রকাশ, নাট্য প্রযোজনা ইত্যাদি আগের তুলনায় ভগ্নাংশ মাত্র। তবে উত্তর আমেরিকার কিছু অংশে, ইউরোপে ও ইসরায়েলে ইদ্দিশ সংস্কৃতির একটা পুনরুজ্জীবন ঘটছে, বিশেষ করে জেফ্রি শ্যান্ডলারের ভাষায় ‘পোস্ট ভার্নাকুলার’ ইদ্দিশে। জুডীয়-স্প্যানিশ নামেও পরিচিত লাদিনো ভাষা আসলে মধ্যযুগীয় ক্যাস্টিলীয়, হিব্রু, আরবি ভাষা এবং অন্যান্য কিছু উপাদানের একটি মিশ্রণ। সেফার্ডিক ইহুদিরা মধ্যযুগে যখন স্পেন ও পর্তুগালে বাস করত, তখনই আদতে তারা এ ভাষায় কথা বলত। এর পর থেকে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়া নির্বাসিত সেফার্ডিকরা এ ভাষায় কথা বলতে শুরু করে।}

জায়নবাদ বা ইহুদি জনসাধারণের জাতীয়তাবাদী পুনরুজ্জীবন আন্দোলনের শুরু ঊনবিংশ শতকে, ইউরোপে। আন্দোলনটির উদ্দেশ্য ছিল এরেটস-ইসরায়েলে (Eretz-Israel, ইসরায়েল ভূখণ্ড বা প্রাক-রাষ্ট্র ইসরায়েল) জীবনের পুনঃসূচনা করা। জায়নবাদের গোড়ার দিকে এ আন্দোলন হিব্রু ভাষাকে দৈনন্দিন জীবনের ব্যবহার্য হিসেবে পুনরুজ্জীবিত করার কথা ভাবেনি। এমন একটি রূপান্তর ঠিক বাস্তবসম্মত বলে মনে করা হয়নি। এমনকি থিওডর হার্জেল, যিনি জায়নবাদের প্রথম নেতা এবং একটি ইহুদি রাষ্ট্রের প্রথম স্বপ্নদ্রষ্টা, তিনিও ভেবেছিলেন, রাষ্ট্রটির ভাষা হবে জার্মান। কিন্তু এ জায়নবাদী আন্দোলনের মধ্যেই হিব্রু ভাষাকে পুনরুজ্জীবিত করার ইচ্ছাটি ধীরে ধীরে দানা বাঁধে এবং এরেটস-ইসরায়েলে ইহুদিদের অভিবাসনের সঙ্গে তা শক্তি লাভ করতে থাকে।

{ইহুদি ডায়াস্পোরার সময় থেকেই নির্বাসিত ইহুদিরা জায়নের (বা জেরুজালেম) মাধ্যমে প্রতীকায়িত তাদের মাতৃভূমির জন্য আকুতি অনুভব করেছে। জায়নবাদের মধ্যে এ ঐত্যিহ্যের প্রতিফলন থাকলেও আরো সুনির্দিষ্ট অর্থে বলতে গেলে এটি আরো সাম্প্রতিক জাতীয়তাবাদী যে আন্দোলন আধুনিক ইসরায়েল নামের রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে, সেটাকে বোঝায়। জায়নবাদকে সাধারণত থিওডর (বেনইয়ামিন জিয়েভ) হারজেল (১৮৬০-১৯০৪) এবং ঊনবিংশ শতকের অন্য কিছু ব্যক্তিত্ব ও দলের সম্মিলিত চিন্তা ও কর্মের ফসল হিসেবে দেখা হয়।

এ আদর্শের জন্য যারা সংগ্রাম করেছেন, তাদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলেন ‘হিব্রু ভাষার পুনঃপ্রবর্তক’ নামে প্রখ্যাত এলিজার বেন-ইয়েহুদা (১৮৫৮-১৯২২)। তিনি ছিলেন একজন ভাষাতাত্ত্বিক ও সাংবাদিক; ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দে তিনি এরেটস-ইসরায়েলে অভিবাসী হন। তার প্রকাশিত সাময়িকপত্রগুলোয় (Ha-zvi, Hashkafa) তিনি জনসাধারণকে তাদের দৈনন্দিন জীবনে হিব্রু ব্যবহারের জন্য উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করতেন। ‘আপনি আচরি ধর্ম পরেরে শেখাও’ নীতি মেনে তিনি নিজের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কেবল হিব্রু ভাষায় কথা বলতেন এবং হিব্রু ভাষায়ই নিজের সন্তানের শিক্ষাদান করেন, যা সে সময়ে খুবই অস্বাভাবিক একটি ব্যাপার ছিল। বেন-ইয়েহুদা একটি হিব্রু অভিধান রচনা করেন এবং অসংখ্য নতুন শব্দ তৈরি করে প্রাচীন হিব্রুকে আধুনিক জীবনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টায় ব্রতী হন। সেসব শব্দের অনেকগুলোই আজ আধুনিক হিব্রুর অংশে পরিণত হয়েছে।

এরেটস-ইসরায়েলের অধিবাসীরা নানা ভূখণ্ডের বাসিন্দা ছিলেন, সেটা বেন-ইয়েহুদার সময়ে এবং তার পরেও; এবং তাদের অনেকেই হিব্রুভাষী ছিলেন না: কথা বলা, পড়া বা লেখা, কোনোটিই তারা হিব্রু ভাষায় করতেন না। কাজেই সেখানে জীবন ছিল বহুভাষাময়। বিভিন্ন সংস্থা এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটানোর চেষ্টা করে। সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ঐকান্তিক উত্সাহ নিয়ে মাঠে নেমেছিল ১৯২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘ভাষারক্ষী সংঘ’ (The Language Defenders’ Corps)। তরুণদের নিয়ে গঠিত এ সংস্থা জনজীবনে হিব্রুর নিরঙ্কুশ ব্যবহারের সপক্ষে প্রবল উদ্দীপনার সঙ্গে সংগ্রাম শুরু করে। জায়নবাদী নেতাদের সমর্থনপুষ্ট হয়ে সংস্থাটির সদস্যরা হিব্রু ছাড়া অন্য কোনো ভাষায় অনুষ্ঠিত প্রকাশ্য অনুষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে সমাবেশ-মিছিল করত, সেগুলোয় বাধা দেয়ার চেষ্টা করত। আমদানিকৃত বইপত্র এবং বিদেশী ভাষায় প্রকাশিত যেসব স্থানীয় পত্রিকা অভিবাসীরা পড়ত, সেসবের বিরুদ্ধেও হিব্রু ভাষার প্রাধান্য বিস্তারের এ প্রচারণা পরিচালিত হতো। শেষ পর্যন্ত হিব্রুই এ লড়াইয়ে জয়লাভ করে: হিব্রু আজ ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রথম দাপ্তরিক ভাষা। হিব্রুই আজ সাহিত্য ও সাংবাদিকতায়, বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি-বিষয়ক রচনায় এবং দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহূত ভাষা।

{ইসরায়েলের আরেকটি দাপ্তরিক ভাষা হচ্ছে আরবি: নব্বইয়ের দশকের সুপ্রিম কোর্ট রুলিংয়ের পর থেকে ভাষাটি আগে চেয়ে অনেক ব্যাপকভাবে ব্যবহার হচ্ছে।}

হিব্রু ভাষার পুনরুত্থানে অনুবাদ দুভাবে সাহায্য করেছিল। প্রথমত. অনুবাদের মাধ্যমে ভাষাটি ছড়িয়ে পড়েছিল। (সাহিত্য, শিক্ষা উপকরণ ইত্যাদি) বিভিন্ন বিষয়ের ওপর হিব্রুতে লেখা মূল টেক্সট যখন বিরল ছিল, তখন অনুবাদ সেই শূন্যস্থান পূরণ করেছিল। দ্বিতীয়ত. অনুবাদ অন্যান্য ভাষার সঙ্গে সংস্পর্শের মাধ্যমে খোদ হিব্রু ভাষার সমৃদ্ধি সাধন করেছিল।

অবশ্য আধুনিক হিব্রুর বিকাশে অনুবাদের প্রভাব আলাদা করে শনাক্ত করা খুব কঠিন। মূল হিব্রু টেক্সটগুলোও (যেমন— সাহিত্য ও খবরের কাগজ) ভাষাটিকে ছড়িয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। এবং যে প্রক্রিয়াটিকে অতিশুদ্ধতাবাদীরা সবসময় স্বাগত জানায়নি, অর্থাত্ অন্যান্য ভাষার সঙ্গে সংস্পর্শের মাধ্যমে হিব্রু ভাষার বিকাশ, সেটা কেবল অনুবাদের মাধ্যমেই ঘটেনি। হিব্রু বিদেশী ভাষার উপাদানগুলো আত্মস্থ করে নিয়েছিল, এখনো নিচ্ছে। কারণ ইসরায়েল এমনকি এখনো একটি অভিবাসীদের দেশ। এমন এক দেশ, যার অধিবাসীরা অসংখ্য ভাষায় কথা বলে, অসংখ্য ভাষায় লেখা বইপত্র পড়ে। ইসরায়েলি সংস্কৃতি সবসময়ই অন্যান্য সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে: রুশ, ইঙ্গ-মার্কিন, মধ্যপ্রাচ্যীয়, ভূমধ্যসাগরীয় ইত্যাদি। বিভিন্ন জাতিগত ও ভাষাগত দল যেসব ভাষায় কথা বলে, তা কেবল অনুবাদের মাধ্যমে হিব্রুতে ঢোকেনি, মূল ভাষাভিত্তিক বিদেশী টেলিভিশন অনুষ্ঠান ও চলচ্চিত্রের মাধ্যমের মতো অন্যান্য পথেও ঢুকেছে।

তার পরও পরবর্তী আলোচনায় আধুনিক হিব্রু ভাষার ওপর অনুবাদের সুনির্দিষ্ট প্রভাবটি নির্ণয়ের চেষ্টা করা হবে এবং সাহিত্যিক অনুবাদের ক্ষেত্রে সম্পাদিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজের ওপর আলোকপাত করা হবে।

ঊনবিংশ শতকের শেষভাগ ও বিংশ শতকের গোড়ার দিকের ডায়াস্পোরায় ইহুদি সাহিত্যজগতের প্রধান ব্যক্তিত্ব ছিলেন মেন্দেলে মোখার স্ফোরিম (১৮৩৫-১৯১৭)। এ ছদ্মনামের অর্থ হচ্ছে, ‘পুস্তক বিক্রেতা মেন্দেলে’ এবং তার আসল নাম ছিল শলোম ইয়া’কভ আব্রামোভিত্স্। জারের শাসনাধীন ওডেসায় বাস করতেন তিনি। ইদ্দিশ ভাষায় কথাসাহিত্য রচনা করতেন এবং নিজেই নিজের রচনা হিব্রু ভাষায় অনুবাদ করতেন। তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রচনা হচ্ছে ‘তৃতীয় বেঞ্জামিনের ভ্রমণ’, যা ডায়াস্পোরা সময়ের ইহুদি জীবনের একটি তীব্র ব্যঙ্গাত্মক রচনা। এটির হিব্রু সংস্করণ ১৮৯৬ সালে প্রকাশিত হয়। অনুবাদ সাধারণত মূল ভাষাটির সঙ্গে পরিচিত নয়, এমন পাঠকের চাহিদা পূরণ করে। কিন্তু এ অনুবাদটি সেই সব পাঠকের জন্য রচিত হয়েছিল, যারা এরই মধ্যে মূল ইদ্দিশ বইটির সঙ্গে পরিচিত এবং রচনাটির উদ্দেশ্য ছিল হিব্রু ভাষার পুনরুজ্জীবনে অবদান রাখা। আর এভাবে সেটি ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক— দুই ভূমিকাই পালন করেছিল।

ক্রমশ...