অপূর্ব বাংলার ধন্য ধান্য পুষ্প শব্দ ব্যাকরণ অন্বয় এবং আমাদের ক্রোধ ও ক্রান্তির ফেনা মুঠো ভরে ভরে মুদ্রণযন্ত্রের ইটাক-খিটাক বর্ণমালা বুননে ছুড়ে দেবার পরিপ্রেক্ষিত: ১০ অক্টোবর, ১৯৯০; সময়, দুপুরবেলা, আনুমানিক বললে ২টা হবে হয়তো।

একটু আগেই আলট্রাসাউন্ড তরঙ্গবাহিত ছবিতে একটি ব্যাঙাচির মতো পিচ্চি লালাভ ভ্রূণ দেখেছি; বাইরে উইস্কি উইস্কি ওয়েদার দিয়েছে এবং ভাবছি, ভ্রূণটা বড় হতে হতে হোমো/হিউম্যান না হয়ে যদি প্রজাপতি হয়ে যায়, শিলংয়ের পাইনবনে বজ্রপাতে জ্বলে যাওয়া গাছ দেখেছি, যা ঢাকা ছিল লাখ লাখ প্রজাপতিতে... লাখ লাখ প্রজাপতি আচ্ছাদিত স্ফটিক হয়ে যাওয়া বৃক্ষ দেখেছিলাম...

দিবাস্বপ্ন চটকা লেগে আউলা খেল যখন, মধুর ক্যান্টিনের ভেতর একটি প্রজাপতি উড়ে এসে আমার দাড়িদুড়ি জট খাওয়া মুখে বসে ও সুড়সুড়ি লাগে, গুলগুল্লার সিরা দিয়ে পাউরুটি খাচ্ছি, প্রতিটি টেবিলে উত্তেজিত আলাপ হচ্ছে এবং মৃদুভাবে আমার কানের কাছে মুখ এনে কেউ বলে, একটু আগে মতিঝিলে পুলিশের গুলিতে নিহত কয়জনের লাশ, অতঃপর মেডিকেলে এসেছে।

মধু প্রায় খালি। ছয়-সাতজন জোগাড় করতেই বেগ পেতে হয়। সবাই মেডিকেল কলেজের ইমার্জেন্সিতে পৌঁছলে ড. মিলনের (ড. শামসুল আলম খান) সঙ্গে সাক্ষাত্ হয়। ৩১ নং ওয়ার্ডে তিনি জেহাদের লাশটি দেখান।

মুজিববাদী ছাত্রলীগ (হা-অ) নেতা ইসহাক আলী পান্না এ সময় বলেন যে, চেহারা-বেশভূষা দেখে মনে হচ্ছে, লাশটি কোনো ছাত্রেরই হওয়া সম্ভব। তাই জেহাদকে ক্যাম্পাসেই নেয়া হোক।

ছাত্রলীগ সভাপতি হাবিব ভাই, ছাত্রমৈত্রীর সভাপতি স্বপন ভাই, ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি বাবুল ভাই, গণতান্ত্রিক ছাত্র ইউনিয়নের সহসভাপতি দীপু ভাই ততক্ষণে মেডিকেলে এসে পৌঁছেছেন এবং তারা ডেড হাউজের তালা ভেঙে মনা ও দুলালের লাশ বের করেন।

এ সময় হাবিবুর রহমান হাবিব মনার লাশ দেখিয়ে বলেন, আরে, এ তো যুবলীগ করত, এ লাশের দখল আমাদের। আরেকজন কে বলেন, না না ভাই, ও শ্রমিক লীগ করত তো!

অনেকক্ষণ থেকেই পুলিশি তত্পরতার খবর পাওয়া যাচ্ছিল। ভারী সেনা বহনকারী ট্রাকের শব্দে ক্ষণে ক্ষণে চমকে উঠছিলেন কয়েকজন।

তিন দলে ভাগ হয়ে লাশগুলোকে ক্যাম্পাসে স্মাগল করার কথা চিন্তা করা হয়। কিন্তু শহীদ আসাদ স্মৃতিস্তম্ভের সামনে হঠাত্ পুলিশ এসে ঘিরে ধরে মনা ও দুলালের লাশ বহনকারী ট্রলিগুলোকে এবং লাশ ছিনিয়ে নিতে সক্ষম হয়।

পুলিশের ট্রাকের শব্দ পেয়ে ছাত্রলীগের (না-শ) মোহসীন ভাই দ্রুত জেহাদের লাশ বহনকারী চাকা লাগানো ট্রলিটি মেডিকেল কলেজের মাঝের গেটের দিকে ঘুরিয়ে দিলেন। হাসপাতালের করিডোর দিয়ে ছোট দলটি চলে আসে ছাত্রী হলের পেছনে।

এ সময় ছাত্রলীগের (না-শ) মাসুদ ভাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারের একটি অ্যাম্বুলেন্স জোগাড় করে আনেন। অ্যাম্বুলেন্সে লাশ তুলে ক্যাম্পাস অভিমুখে যাত্রা করা হয়।

কেউ প্রস্তাব করছিলেন, জেহাদের লাশটি নিয়ে যেন ডাকসু ভবনে রাখা হয়। কিন্তু পুলিশের পক্ষে ডাকসু ভবন থেকে লাশ তুলে নিয়ে যাওয়া অপেক্ষাকৃত সহজ, এ বিবেচনায় লাশটি প্রথমে সূর্য সেন হলে আনা হয়।

সূর্য সেন হলের গেটে এসে পৌঁছলে ছাত্রদলের অত্যন্ত প্রভাবশালী কিছু ক্যাডার বাধা দেন। তখন ছাত্রদলের অস্ত্রধারীদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে সূর্য সেন হলে লাশটি রাখা তারা নিরাপদ মনে করেননি।

লাশ চলে আসে মহসীন হলের গেস্টরুমে। এ সময় ছাত্রদের মধ্যে খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং লাশ কাঁধে নিয়ে মিছিলের সূত্রপাত হয়। থেকে থেকে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ চলতে থাকে। কিন্তু ছাত্রদের সংঘবদ্ধ প্রতিরোধের মুখে পুলিশ সুবিধা করতে পারে না। এ সময়ই অনেকেই খেয়াল করেন, হঠাত্ই দলীয় স্লোগান দেয়া বন্ধ হয়ে গেছে।

সেদিন সন্ধ্যায়, অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে জেহাদের লাশ ছুঁয়ে সর্বস্তরের ছাত্র-জনতা শপথ নেন যে, স্বৈরাচারের পতনের আগে কেউ ঘরে ফিরবেন না।

দুই.

১৯৯১ ইসারীর, ‘২১/২২ মে জুন’ আমি বাড়ি থেকে পালাই। তখন ঠিক কোরবানির ঈদের আগে আগে। ‘স্বৈরাচারের পতন’, ‘গণতান্ত্রিক নির্বাচন’ ইত্যাদি শেষে সাইক্লোন, টর্নেডো ও বন্যাবিধ্বস্ত বাংলাদেশ ধুঁকছে।

জেনারেল সাব জেলে তখন। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, জাতীয় পার্টি, মিজান চৌধুরীকেও বন্দি করে যশোর জেলে চালান দেয়া হয়। মিজান সাবের প্রতিপক্ষ, জাতীয় পার্টির আরেক নেতা মওদুদ নেপথ্য থেকে বের হয়ে ক্ষমতা নিচ্ছেন এবং তার শোডাউন হয় দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত জাতীয় পার্টির এমপি আনোয়ার হোসেন মঞ্জুকে মোটর শোভাযাত্রাসহকারে সংসদ ভবনে শপথ নেয়ার জন্য হাজির করার মধ্য দিয়ে।

এনডিপির সাকা চৌধুরীও মওদুদের সঙ্গী ছিলেন। স্পিকার সাহেবের সঙ্গে তাদের দীর্ঘ সলাহ হয় এবং এ সময় ডেপুটি স্পিকার শেখ রাজ্জাক আলী শুধু একবার বের হয়ে প্রধানমন্ত্রীর কক্ষে যান। সাকা চৌধুরী সাহেব কোরবানি ঈদে ৩ লাখ টাকার গরু কাটেন এবং অসংখ্য গরিব-গুর্বা তার দানের নেয়ামত পায়।

সরকারি হিসাবে সেবার সাইক্লোন, ঈদের আগে আট লাখ গবাদিপশুর মৃত্যু হয়েছিল। বিধ্বস্ত উপকূলীয় এলাকাগুলোয় কৃষক পরিবারে, হালের গরু-মহিষের অভাবও তীব্র ছিল।

তিন.

মোহাম্মদপুর, জেনেভা ক্যাম্প এলাকার সর্দার ছিলেন চিনু মিয়া। তার ছেলে কাশেম আমার দেখা স্ট্রংগেস্ট পারসন। ওর মতো শক্তিশালী আরেকজনকেই কেবল দেখেছি, সে রুবেল... আর প্রমিথিউস ব্যান্ডের এককালীন সদস্য আনিসও সুপার স্ট্রং ছিল।

আর্নল্ডের ‘কমান্ডো’ দেখার সূত্রে রুবেল ও আনিসের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। সে সময় ঢাকায় মাত্র কয়েকটি ভিসিআর ছিল; ভিডিও ক্লাব তখনো হয়নি এবং কোনো নতুন ভিডিও ক্যাসেট শহরে এলে ওটি ঘুরতে ঘুরতে এই কয়টি ভিসিআরওয়ালা বাড়ির কোনোটিতেই আসত।

আমাদের ভিসিআর ছিল— আনিস কারো মুখ থেকে তা শোনে। ও আমার বন্ধুর বন্ধু, এমন দূরবর্তী সূত্র ধরে, একদিন কমান্ডোর ক্যাসেট নিয়ে সে ও রুবেল বাসায় এসে হাজির হয়। আমরা সম্ভবত ‘রকি’ (III) ও ‘বেভারলি হিল কপস’ও একসঙ্গে দেখি পরবর্তী কোনো এক সময়ে।

রুবেল ও আমি কিছুদিন একসঙ্গে ব্যায়াম করতাম... রুবেল ১২০টি ডায়ামন্ড পুশআপ ও ২১৫ পাউন্ড ঘাড়ে নিয়ে ১০০ স্কোয়াট করত পানির মতো, ওই বয়সেই এবং ম্যাস সার্কিট ট্রেনিং, প্রোটিন লোডিং ইত্যাকার শব্দবন্ধ তার মুখেই আমি প্রথম শুনি।

আনিস ও রুবেলের সঙ্গে অডিও ক্যাসেট বদলাবদলি করে বিভিন্ন রকম সংগীত শোনা শুরু করি আমি। আনিস আমাকে প্রথম আয়রন মেইডেন থেকে বের করে এনে সাইকাডেলিক রক, যেমন— ক্যামেল, ম্যারিলিওন, পিংক ফ্লয়েড শোনানো শুরু করে। রুবেল আমাকে ক্যাপ্টেন বিফহার্ট ও ভেলভেট আন্ডারগ্রাউন্ড এবং বিশেষত ফ্র্যাংক জাপা ও জন জর্ন শোনায় এবং আজিব সব বই পড়ায়— লেস্টার ব্যাংয়ের বইটার কথা এখন মনে পড়েছে শুধু— মাথার মধ্যে শর্ট সার্কিট লাগায় কিছুটা, আর অন্য একটা বাস্তবতা, অন্য স্তর থেকে অনুভব করা ও মনকে মজিয়ে তোলার তালিম দেয়।

আনিস ও রুবেল আমাকে রেইনবোয় নিয়ে যায় এবং কবির ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় হয়। রেইনবোর কোনো তুলনা অন্য কোনো দেশ বা সাংস্কৃতিতে আছে কিনা জানি না: এটি এলিফ্যান্ট রোডের একটি ছোট মিউজিক রেকর্ডিংয়ের দোকান; কিছু পারিশ্রমিকের বিনিময়ে রেইনবোর নিজস্ব সংগ্রহের এলপি থেকে নিজের পছন্দ করা গান বা বাজনা ক্যাসেটে তুলে নেয়া যেত।

রেইনবোর প্রোপ্রাইটর কবির ভাই আমাকে নিলয়দাসহ কিছু মানুষের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন, যাদের মুখে আমি অদ্ভুত সব বই, দার্শনিক, বাজিয়ে ও শিল্পীর নাম শুনতে থাকি। চার বছর ইংল্যান্ডে অতিবাহিত করে আশির দশকের শুরুতে আমি যখন ঢাকায় ফিরি, তখন মানুষের সঙ্গে মিশতে আমার খুব অসুবিধা হচ্ছিল এবং হঠাত্ করে বছরের শেষে স্কুলেও ভর্তি হতে পারছিলাম না। আগেও আমি সানবিমসে পড়তাম এবং আমার দিদুমণির ধারণা ছিল, ইংরেজি মাধ্যমে পড়ার দরুন বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে আমার সংশ্লিষ্টতা যথেষ্ট নয়।

এ দফা দিদুমণি চাইছিলেন, আমি শান্তিনিকেতনে পড়তে যাই এবং কলকাতায় তার পরিচিতজনদের সঙ্গে আমার ভর্তির ‘বিষয়টা তদবির করছিলেন’; কিন্তু বাংলা মাধ্যমে পড়াশোনা ও আমার ভবিষ্যতের অভিমুখ নিয়ে আম্মির ভিন্নমত ছিল। দিদুমণির সঙ্গে তার এ নিয়ে বচসা হয়। পরিবারের সবার ভিন্ন ভিন্ন মত হয় এবং বছরের শেষ বিধায় আমার ওপর ভর্তি তখনই হওয়া বা পড়াশোনা করা— এ চাপগুলো আর তেমন বেশিভাবে পড়ে না।

আমি জীবনের প্রথম নিয়ন্ত্রণের বাইরে কিছুটা নিজের মতো একটু স্পেস পাই। ঢাকা ফিরে এসে বংশাল থেকে আমি একটি চপার কিনেছিলাম। প্রায়ই এ সাইকেল নিয়ে এদিক-ওদিক চলে যেতাম। ঢাকায় সাইকেল চালানো ও হাঁটার চমত্কার জায়গা ছিল। বিকাল হলেই আন্টিরা সংসদ ভবনে হাঁটতে বের হতেন। রোলার স্কেটাররা আসত। সেকেন্ড ক্যাপিটাল ও ব্রেক ড্যান্স প্র্যাকটিসের জায়গা ছিল।

১৯৮৩তে মাইকেল জ্যাকসনের থ্রিলার রিলিজের আগে থেকেই ঢাকায় বুমবক্স বাজিয়ে, নাচার প্রচলন ছিল। আমরা নিজেরা মিক্সড টেপ বানাতাম এবং বন্ধুবান্ধব বা প্রেমাস্পদকে উপহার দিতাম। টেপের ওপরের আর্টওয়ার্ক ব্যাপক আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল।

যা হোক, আমি শিয়া মসজিদের কাছে একটি নদী আবিষ্কার করি, যেখানে বস্তির ছেলেরা লোপায় লোপায় বড় বড় বান মাছ পর্যন্ত ধরত। এখানে প্রথম আমি ঘুড়ি ওড়ানো, লাটিম ও মার্বেল খেলায় সচেষ্ট হই। কাশেম আমার সঙ্গী থাকত। আমি শুদ্ধ বাংলার বাইরে এবং আমার শ্রেণীগত উচ্চারণ ও স্বরের যে চর্চা তেমন নয়, এমন কয়েক ধরনের বাংলা ভাষাও আয়ত্ত করতে থাকি।

‘রাস্তার ছেলে’ বা ‘বস্তির ছেলেদের’ সঙ্গে মিশে খেলাধুলা করে যারপরনাই আনন্দ লাভ করি এবং হঠাত্ আবিষ্কার করি যে, হকি খেলায় আমার বিশেষ ব্যুত্পত্তি আছে।

আমার খেলার খ্যাতি কাটাশুর, বাঁশবাড়িয়া হয়ে বিজলী মহল্লা, শ্যামলী পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।

এ সময় ডাকসু নির্বাচন উপলক্ষে পুরো ঢাকা থেকে অস্ত্র সংগ্রহের ডাক আসে। মোহাম্মদপুর থেকে ৩২টি অস্ত্র যায়। কলতাবাজারের এক মাস্তান একটি জি-১০ সাপ্লাই দিয়ে পাদপ্রদীপের আলোয় আসে।

এলাকার অপরাধী বা বড়ভাইরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাডারদের প্রয়োজনে আসতে পারাটা পাওয়ার নেটওয়ার্কিংয়ের অন্তর্গত অপরিহার্য কাজ বলে গণ্য করত। ছাত্রদলের একটি বিশেষ গ্রুপের নেতা, বরিশালে সর্বহারা পার্টির সোর্স থেকে, কাটা রাইফেল ও কয়েকটি অত্যন্ত ব্যবহারোপযোগী চাইনিজ সাবমেশিনগান ক্যাম্পাসে আনেন। ক্যাম্পাসে এরই মধ্যে জাসদ ছাত্রলীগ তাদের শক্তি বাড়িয়েছে এবং বিভিন্ন সংঘর্ষে তাদের ব্যবহূত ব্যারেলে লাল ফিতা বাঁধা সাবমেশিনগান ‘টমিগান’ নামে কিংবদন্তির প্রসিদ্ধি লাভ করেছে।

এ সময় মোহাম্মদপুর এলাকার অস্ত্র, বিচি বহন ও বিনিময়ের নেটওয়ার্ক সম্পর্কে আমার প্রভূত সম্যক ধারণা হতে থাকে। আমার কম বয়স, শ্রেণীগত অবস্থান ও কয়েকটি গাড়ি ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহারের সুবিধা থাকায় কয়েকজন বড় ভাইই আমাকে বিশেষ স্নেহ করেন এবং লর্ডস, হোটেল জাকারিয়া শ্যালেসহ এলিফ্যান্ট রোড ও মগবাজারের কয়েকটি বিশেষ ঠেকে আমার প্রতিপত্তি বাড়ে।

এ সময় ছাত্রদল নেতা পাগল শহীদ আমাকে ভিডিও গেম খেলা শেখান; তিনি কার্টুনেরও ভক্ত ছিলেন। ডিজনি ও ওয়ার্নার ব্রাদার্স কার্টুন ক্যারেকটারের পার্থক্য তিনি বুঝতেন। অন্তর্দলীয় কোন্দলে তিনি নিহত হলে আমি ঢাকার বিভিন্ন ভিডিও আর্কেডে ভিডিও গেম খেলে বেড়াতাম। টিপু সুলতান রোড থেকে গুলশান-২ পর্যন্ত বিভিন্ন গেমিং আর্কেডে আমি খেলেছি, যা শ্রেণী সম্পর্কের আরেক ধরনের মেল্টিং পট ছিল এবং মূলধারার বাইরে অন্য কিছু প্রণোদনা ও অনুভব গেমিংয়ের ভেতর দিয়ে আমি আয়ত্ত করি।

যাহোক, রুবেলের কথায় ফিরে আসি। রুবেল, কাশেম ও আমি সোনালি মাঠে অনুষ্ঠিত একটি হকি ম্যাচে খেলতে গিয়ে প্রচণ্ড মার খাই। নূরজাহান রোডের লাড্ডু ফ্রিডম পার্টি করত, সে নাইন গিয়ার দিয়ে স্ট্যাব করে রুবেলকে। আমার মাথা ফেটে গিয়েছিল। স্থানীয় লোকজন আমাকে নূরজাহান রোডের সিলেট ফার্মেসিতে নিয়ে আসেন ধরাধরি করে। ড. মশিউল আলম আটটি সেলাই দেন। কপালের সামনের কাটাটি বড় হলেও ওখানে সেলাই বসে না।

সম্ভবত তখন ১৯৮৫ বা ’৮৬ সাল হবে। দেশে উত্তাল স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং এ সময় আমি প্রথম উড়ির চরের নাম শুনি। আমি টিভি দেখতাম না। বাংলা খবরের কাগজ পড়ারও অভ্যাস ছিল না। বাবা অফিস থেকে ‘অবজারভার’ নিয়ে এলে মাঝেমধ্যে উল্টাতাম। ড. মশিউল আলমের চেম্বারে শুয়ে আছি যখন, বাসায় লোক গেছে খবর দিতে, এ সময় টেবিলে রাখা খবরের কাগজে উড়ির চরের জলোচ্ছ্বাসের খবর চোখে পড়ে।

প্রায় এক লাখ লোক ভেসে গিয়েছিল এই প্রলয়ঙ্করী দুর্যোগে; চরের মানুষদের সাহায্য দিতে রাজীব গান্ধী, জিয়াউল হক প্রমুখ এসেছিলেন।

মাথা ফাটার পর আবার কড়াকড়িতে পড়তে হয় আমার। তবে মা আমাকে রুবেলের বাসায় যাওয়ার অনুমতি দেন এই শর্তে যে, গাড়ি নিতে হবে এবং সঙ্গে বডিগার্ড হিসেবে থাকবে আব্বুর অফিসের এক পিয়ন, রংপুর থেকে খবর দিয়ে আনা, ছোটভাই আয়ুব আলী।

রুবেল ইন্দিরা রোডে থাকত, রুবেলের ছয় বোন, তারা ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। তারা আমাকে খুব আদর করে। রুবেলের মামা ফিলিস্তিনের যুদ্ধফেরত যুবক। দেশে আসার আগে তিনি প্রায় এক বছর জার্মানিতে ছিলেন এবং এক জার্মান ফ্রাউলাইনকে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ করে ঢাকায় নিয়ে এসেছিলেন। রুবেলদের গ্যারেজের দেয়াল তোশক দিয়ে সাউন্ডপ্রুফ করা হয়েছে এবং সেখানে রুবেলের মামা সবান্ধবে সংগীতচর্চা করেন।

ব্যান্ড প্র্যাকটিসে একটি হার্লি ডেভিডসন ১৩০০ সিসি মোটরসাইকেল চালিয়ে আসেন নিউটন ভাই, সঙ্গে তার কৃষ্ণাঙ্গ গার্লফ্রেন্ড। সবাই বলে, নিউটন ভাই এশিয়ার সেরা ড্রামার এবং তার ঝাঁকড়া অ্যাফ্রো, গোল জন লেলন গ্লাসেস ও দীর্ঘ সলো করার প্রবণতা বিস্ময় উদ্রেক করে...।

গ্যারেজে একটি নীল আলো জ্বালানো হয় প্র্যাকটিসের সময়। এখন দেয়ালে আঁকা অ্যাস্ট্রিক্সের চরিত্রগুলো জীবন্ত মনে হয়। মাঝেমধ্যে এখানে হ্যাপী ও লাকী আখন্দ আসেন, আজম খানের শ্রুতি ব্যান্ডের প্রাক্তন সদস্যরা আসেন, দুটি ফ্রেঞ্চ কাপল আসেন, গোয়া থেকে আসা ন্যুডিস্ট কলোনির সদস্য এক মহিলা আসেন... একজন ফিলিস্তিনি ডিজে, তিনিও আসেন মেডিকেল কলেজের পড়ার ফাঁকে... নিউটন ভাইয়ের কৃষ্ণাঙ্গ বান্ধবী নিপুণ হাতে গাঁজায় সিগারেট রোল করে এবং আমাকে বলে,

—ওয়াটস আপ, লিটল নিগার?

—ওয়াটস আপ!

—একটু ওয়াকি টোবাকি সেবা করো।

—দুরো, আমি কত পিচ্চি না...

আমার উত্তর শুনে তারা হেসেই গড়িয়ে পড়ে।

এ সময় ঢাকা বেতারের ওয়ার্ল্ড মিউজিক প্রোগ্রামেও হঠাত্ করে পরিবর্তন আসে। কয়েকজন ডিজে জার্মান ইলেকট্রনিকস/ইন্ডাস্ট্রিয়াল সংগীত, বিশেষত. ক্র্যাফট, কেএমএফডিএম, আইনস্টারজেনডে নিনউবাউটেনের অসম্ভব প্রগতিশীল ও এক্সপেরিমেন্টাল সংগীত বাজাতে শুরু করে। সংগীতের সঙ্গে নতুন চিন্তা ও জীবন পদ্ধতির উদ্রেক হয়।

টি. রেক্স ও ডেভিড বোওয়ির সঙ্গে আমরা অলরেডি পরিচিত ছিলাম। রুবেলের মামা বলেন, ডেভিড বোওয়ি নিজেই ছুরি দিয়ে খুঁচিয়ে নিজের চোখ গেলে দিয়েছেন পাথরের চোখ লাগাবেন বলে: একে বলে পারফরম্যান্স আর্ট।

এ সময় ভিয়েনা অ্যাকসনিস্টদের সূত্রে আভাঁ গার্দ শব্দটি আমার চেতনায় প্রবেশ করে।

কেএমএফডিএমের পাফরম্যান্স বা তাদের মিউজিক হিসেবে ভ্যাকুয়াম ক্লিনার বা লোহার পাইপের ব্যবহার ইত্যাদি নিয়ে আমি উচ্ছ্বসিত ছিলাম। নিউটন ভাই একদিন বলেন, ‘এসব ব্যাপার না, গুরু হইতেছে একজন, তার নাম জন কেজ, জন কেজ শুন ইবাদ, তিনি হইলেন দেবদূত...’ নিউটন ভাই আমাকে ফরাসি উচ্চারণে ‘ইবাদ’ বইলা ডাকতেন।

এ সময় হাতে কপি করা একটি সাক্ষাত্কার আমার গোচরে আনা হয়, উইলিয়াম বারোজের নেয়া ডেভিড বোওয়ির সাক্ষাত্কার ছিল এটি। মূলত বোওয়ির জন্যই আমি এটি সংগ্রহ করি। তখনো বিট জেনারেশন বা উইলিয়াম বারোজের নামও শুনিনি।

গুলশান-২-এর ডিসিসি মার্কেটে ফরেনাররা পুরনো বই ও ম্যাগাজিন বিক্রি করতেন এবং প্রায় সব দোকানেই একটি কোণে পুরনো বইপত্র রাখা থাকত। একদিন ইকবাল স্টোরসে আমি উইলিয়াম বারোজের সফট মেশিন ও জাংকির কপি পাই। ব্রায়ান গেসিন, ক্রাউলি বা অ্যান্টন লা ভেই সম্পর্কে এ সময়ই অবগত হই। ক্রাউলির জীবনী ‘দ্য গ্রেট বিস্ট’ আমার নিত্যদিনের সাথি ছিল।

রুবেলের মামার প্রতিটি কাজকর্মে আমার অত্যধিক আগ্রহ ছিল। আমি প্রায়ই তাদের বাসায় গিয়ে এমনি এমনি বসে থাকতাম। জিনিসপত্র উল্টেপাল্টে দেখতাম। আমাকে কেউ কিছু বলত না। একাবার আমি খালি বাড়ি পেয়ে রুবেলের মামার বেডরুমে ঢুকে যাই। ঘরটির আসবাবহীনতা ও নিরলঙ্কার রূপ আমাকে বিস্মিত করে। পুরো বাড়ির শুধু এ ঘরেই কিছু এলপি, ম্যাগাজিন ও একটিমাত্র বই ছিল। আসলে বইটির মধ্যে গোঁজা প্যারিসের মেট্রো ম্যাপটাই আমার দৃষ্টি বেশি আকর্ষণ করে।

ততদিনে আমি পুরোপুরি ফ্রাঙ্কোফাইল হয়ে গেছি। প্যাটাই স্মিথের ‘বিকজ দ্য নাইট’ গানটি ঢাকায় খুব জনপ্রিয় ছিল, কিন্তু আমি তার ‘হর্সেস’ অ্যালবামটি রেইনবো থেকে রেকর্ড করে নিয়ে শুনেছিলাম এবং তার ও ব্রুস স্প্রিংস্টিনের লিরিকে আমি সমকালীন ভাষা, দৈনন্দিন ভাষার কাব্যিক রূপান্তরের সম্ভাবনা দেখতাম— কীভাবে ও কী প্রকৌশলে তারা এটি ঘটান, তা স্টাডি করতাম।

আমি বরাবরই কাউকে বুঝতে চাইলে তার পুরো জগত্টাকে নিজের মধ্যে আত্মস্থ করে নিই। আশির দশকে বাঙ্গুল্যান্ডের ঢাকা শহরে আমার শুধু একটু পড়াশোনা করারই ক্ষমতা ছিল: আমি প্যাটাই স্মিথের লেখা ও তার ওপর লেখা সব বই, আর্টিকেল ইত্যাদি সংগ্রহ করে পড়ছিলাম। তার এক সাক্ষাত্কারে তিনি ফরাসি কবি আখতুখ রিম্বোর, ‘ইল্যুমিনেশন’ নামধেয় বইটির উল্লেখ করেন এবং এ রিম্বোই ছিল আমার ফরাসি সাহিত্যে ঢোকার এন্ট্রি।

রিম্বোর মাধ্যমে আমি বোদল্যেখের খোঁজ পাই। বোদল্যেখের চিত্র সমালোচনাই ছিল আমার পড়া প্রথম চিত্রকলা-বিষয়ক লেখা। বোদল্যেখ আমাকে হ্বাগনারের কাছেও নিয়ে যান। যা হোক, রুবেলের মামা যে বইটি পড়ছিলেন, তার নাম ছিল ‘দ্য ওয়াইট গডেস’, রবার্ট গ্রেভসের লেখা। বইয়ের যে অংশে মেট্রো ম্যাপটি গোঁজা ছিল, সেখানে গ্রেভস প্রাচীন চন্দ্র উপাসক কৌমের জ্ঞানকাণ্ডের বর্ণনা দিচ্ছিলেন।

‘দ্য ওয়াইট গডেস’ অত্যন্ত জটিল বই এবং তখনো আমি নিিসর ‘বিয়ন্ড গুড অ্যান্ড ইভিল’ ও ‘কালোর্স কাস্টানেডা’ পড়িনি। আমি কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিলাম না যে, লুনার ও সোলার জ্ঞানকাণ্ড বলে গ্রেভস আসলে অ্যাপলনিয়ান ও ডায়োনজিয়ান নলেজ সিস্টেমকে নির্দেশ করছেন, তিনি কীভাবে ড্রুইডিক বাইবেল লথ বর্ণমালা, আরো পুরনো একটি সেল্টিক বর্ণমালাকে, অর্থাত্ সেল্টিক জ্ঞানকাণ্ড ও ভূমিকাকে অপসারিত করে, এটাকে বর্ণনা করছিলেন লেডি শার্লট গেস্টের ‘দ্য ব্যাটল অব ট্রিস’ কবিতাটি ব্যাখার মাধ্যমে। সেল্টিক ভাষায় বৃক্ষ বলতে জ্ঞান বা শিক্ষাপদ্ধতি বোঝায়। ব্যাটল অব ট্রিজ সেল্টিক ব্রিটেনে দুই প্রতিপক্ষ পৌরহিত্য প্রণালির ক্ষমতা দখলের দ্বন্দ্ব বৈ কিছু নয়।

এখানে একটি জ্ঞানকাণ্ড আর্যপূর্ব ব্রোঞ্জ যুগের গোপন জ্ঞান বহন করে এনেছিল, যা পুরো ইউরোপ ও ফিলিস্তিনে ব্যবহার হতো যুগপত্ বর্ণমালা ও ক্যালেন্ডার হিসেবেও, এ জ্ঞানের মূল প্রতীক তিন চন্দ্রের দেবী পেগান, সেল্টিক, হিন্দু বা নর্সদেরও পূজা পেয়েছে।

এসব কিছুই আমার মাথায় না ঢুকলেও সত্যের যে তীব্র ঘ্রাণ ও নেশা, তার স্বাদ আমি পেলাম ও মাতাল বোধ করলাম।

এ ঘটনার প্রায় পাঁচ-ছয় বছর পর ১৯৯১ ইসারীয় ২১ মে/২২ জুন, আমি বাড়ি থেকে পালিয়ে উড়ির চরে যাই।

বাড়ি থেকে পালানোর পরিপ্রেক্ষিত নিয়ে বলা এখানে প্রসাঙ্গিক নয়। এতটুকু উল্লেখ করা যায়, একটির পর একটি প্রতারণায় বিপর্যস্ত হয়ে জীবন থেকে বিশ্বাস উঠে গেছে ততদিনে আমার। প্রেম, বিপ্লব ও শিল্প— এসব প্রপঞ্চ আলাদা নয় এবং এসবই আমার আয়ত্তের বাইরে— এমনও ভাবছি।

মধ্যবিত্ত আকাঙ্ক্ষা নির্মোচনের নিবিষ্টতা বহু আগেই আমাকে একা করে দিয়েছে, কিন্তু বহিঃপৃথিবীর সঙ্গে সম্পর্কশূন্য ছিলাম না, আমার মননের নির্মাণও লিপ্ততার দাবি রাখত ও মেগাপলিসের মুখে পাহারারত এক চক্ষু সিংহীর গর্ভে যে জায়মান উদ্বাস্তু সময়, সে ছিল আমার যমজ ও মানুষের মরচে পড়া সুখ থেকে নৈরাজ্যের স্থাপত্য তুলে নিতে শিখে গেছি, বিভিন্ন অভিজ্ঞতায় দ্রুত নিজেকে পাকিয়ে ফেলেছি, পচিয়ে ফেলেছি।

যা হোক, প্রথমে কিছুদিন পালিয়ে ছিলাম নয়াবাজারে, কিন্তু আরমানিটোলার ডন আকবর শেঠ খুন হওয়ার পর আমার ওল্ড টাউন ছাড়তে হয়। রুবেলের বড় বোনের বিয়ে হয়েছিল এক লন্ডন প্রবাসী মলিকিউলার বায়োলজিস্টের সঙ্গে। তার ভাগনা আমাদের ভক্ত ও সন্দ্বীপের প্রভাবশালী পরিবার, এমন শুনি। ভাগনার জন্য সনির সিডি ওয়াকম্যান ও স্করপিয়নের সিডি ও সুমনের গানের ক্যাসেট নিয়ে রওনা হলাম সন্দ্বীপের উদ্দেশে।

রুবেল ওখানে গেছে কয়েকবার, আমি যাইনি। রুবেলের কথার তেমন ভরসা হয় না। ততদিনে ওর সঙ্গেও আমার সম্পর্কের বোঁটা আলগা হয়ে গেছে। কিন্তু উড়ির চর নামটা কেমন আকর্ষণ করতে থাকে।

সন্দ্বীপের শিবের হাট থেকে নৌকায় উড়ির চর পৌঁছি। চেয়ারম্যান শাহাদ সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ করে রেখেছিল ভাগনা, কিন্তু সে গেছে ঢাকায়; হুদ্রাখালীর ভাইস চেয়ারম্যান মফিজুর রহমান সাহেব রিসিভ করেন আমাকে। যাত্রাপথেই ফরেস্ট বিভাগের সেলিমের কাছে এ সময় প্রথম কোদাইল্লা বুড়ির নাম শুনি।

সকালে দেখলাম, বাথানে শিঙ্গা ফুঁকা হচ্ছে, অদ্ভুত শিঙ্গা; তিনটা শোল মাছ পুড়িয়ে তালগাছের নিচে পুঁতে মানত দেয় তারা, আভূমি নত হয়ে আমাকে প্রণাম করে ও বলে যে, কোদাইল্লা বুড়ি আমাকে স্মরণ করেছে। ব্রতকথা ও ব্রতাচার নিয়ে চিন্তা করছিলাম। ব্রতকথা ও তার চিহ্ন ব্যবস্থা ও আচরণবিধি, এর পেছনের গোপন ও সাংকেতিক আচার ছাড়া বাস্তবতায় কোনো আঁচড় কাটতে পারে না।

ফার্টিলিটি কাল্ট ইত্যাদি ব্যাপার খুবই নতুন— আমি তত দিনে জানি যে, শ্যামানিজমকে আমরা যেভাবে পেয়েছি, তার শুরু প্যালিওলিথিক সময়ে, কৃষি শুরু হওয়ার আগে... কিন্তু বাঙালি কি এত পুরনো জাতি? এ চর্চাগুলো আমরা কীভাবে পেলাম তাহলে?

শ্যামানিজম কথাটা মনে হতে মনে হলো, এ ধারণাটি পেয়েছি প্রথম ড্যানি সুগারম্যানের লেখা, জিম মরিসনের জীবনীতে। ড্যানি সুগারম্যান থেকে ক্লোদ লেভি স্ট্রোস থেকে... হাঁটতে হাঁটতে দেখি একটি কৃষ্ণবর্ণ উদ্ভিন্নযৌবনা নগ্ন রমণী হাত তুলে চুল বাঁধে ও নিচু হয়ে মাটি চাটতে থাকে।

সাথের বাথানি বলে, নুন চাটে উনি, এ জায়গাটা নুনি...

এই লবণাক্ত মাটির স্বাদ নিতে রাতের বেলা বিভিন্ন পশুও আসবে। সাথের বাথানি বলল, তারে নাম জিজ্ঞাস করেন...

সকালে খুব আগ্রহ নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

তোমার নাম কী? বলি।

হলুদ চোখ তুলে সে আমার দিকে তাকায়।

—মুসা আলী, সে বলে।

—কী করো, এখানে? বলি।

—এইটা আমার কব্বর, মেয়েটা বলে।

সে হাত তুলে চারদিকের সিঁদুর ল্যাপটানো পাথরগুলো দেখায়। সাথের বাথানি বলে, এই পাথরগুলো জীবন্ত। তাদের চালের গুঁড়া ও দুধ-কলায় সিন্নি দেয়া হয় এবং একটি পাথর আঘাত পেলে সবগুলো থেকে রক্তপাত হয়। আমি বুঝতে পারি, যা সিঁদুর ভেবেছিলাম তা আসলে শুকনো রক্ত। মুসা আলী আমার দিকে তাকিয়ে খলখল করে হাসতে থাকে।

উড়ির চর উত্তর চর ও দক্ষিণ চর— এ দুই ভাগে বিভক্ত। উত্তর চরে নরওরেজিয়ান পাদ্রি, ফাদার নিকলসন থাকেন। তিনি এ চরের আদিমতম বাসিন্দা। তিনি মুসা আলীর ‘মা’ ও কোদাইল্লা বুড়ি, মুসা আলীর ‘পিতা’। পাদ্রি নিকলসনের আশীর্বাদ না নিয়ে কোদাইল্লা বুড়ির কাছে যাওয়া যায় না। পাদ্রি নিকলসনের কাছে যেতে হলে ইন্দুর কিল্লা পার হতে হবে।

মালেক মাঝি, সোলেমান সুকানী, রুস্তম মালাকার প্রভৃতি ১৬টি পরিবারের মানুষ প্রথম উড়ির চরে বসতির পত্তন করেন। তাদের আগে আগেই সন্দ্বীপ থেকে এসেছিলেন পাদ্রি নিকলসন। প্রথম বসতি স্থাপনকারী সবাই ছিলেন পশুপালনকারী। তারা ৬০০ মহিষ, ২০০ গরু ও অনেক ভেড়া নিয়ে এসেছিলেন। সে সময় জোয়ার এলে প্রায় সমস্ত চর ডুবে যেত। সাহেবের উদ্যোগে তাই বাথানিরা হাত দেয় ইন্দুর কেল্লা বানানোয়, যেখানে গরু-মহিষ নিয়ে সুকৌশলে আশ্রয় নেয়া যায় জোয়ারের সময়। ইন্দুর কেল্লা নির্মাণকালে হঠাত্ পাদ্রি নিকলসন মাটি খুঁড়ে একটি লাল সুতার গুটলি পান; সুতা অনুসরণ করে একটি কাঠের গুঁড়ি খুঁজে পাওয়া যায় এবং তার ভেতর থেকে কান্নার আওয়াজ আসে। কাঠের গুঁড়িটি কুড়াল দিয়ে চিরে ফেলে শিশু মুসা আলীকে পাওয়া যায়।

মুসা আলী জন্মের কয়েক দিনের মধ্যেই পাদ্রি নিকলসনের বুকে দুধ আসে এবং তিনি মুসা আলীকে স্তন্যদান করেন। পাদ্রি নিকলসন আমাকে বলেন, মুসা আলীকে স্তন্যদানের সময় তিনি প্রায় দশাপ্রাপ্ত হতেন। দুনিয়ার বস্তু ও শক্তির সঙ্গে একাকার হয়ে মিশে যেতেন— প্রায়ই তিনি বৃক্ষ বা ইন্দুর কিংবা বাজপাখির চেতনায় উপনীত হতেন।

পাদ্রি নিকলসন প্রার্থনা, রন্ধনকর্ম বা কৃষিকর্মে ফারাক করতে পারেন না আর, আমাকে বলেন তিনি। জগতের সঙ্গে মিশে যাওয়ার বা নিজ অস্তিত্বের সঙ্গে সার্বক্ষণিক সম্পর্ক তৈরি করে নিয়ে বাঁচার পদ্ধতিগত কাঠামো যেকোনো কার্যে আরোপ করা যায়, কিন্তু সবকিছু আরম্ভ হয় একটি চাবি টেপা থেকে।

চাবি টেপা? আমি বলি।

কিন্তু পাদ্রি নিকলসন আর কথা বলেন না।

নিজ সত্য বা ভাব, নিজের মধ্যেই বর্তমান আছে, নয়? তবে এ সত্যের অনুভব ও অনুধাবন কিসের মধ্য দিয়ে হবে, কার মধ্য দিয়ে হবে, কোন বস্তু বা শরীর উত্পাদনের মধ্য দিয়ে হবে...

ফেরার পথে দেখি পাথরগুলো থেকে রক্ত বের হচ্ছে। মুসা আলীর কোনো দেখা পাই না। কোদাইল্লা বুড়ির বাড়িতে তার ডাকেই কয়েকবার গিয়েও তার দেখা পাই না। এ সময় বাথানিরা আমাকে পাকিস্তানি ও ভারতীয় সরকারের টাকায় নির্মিত ‘ক্লাস্টার’ নামধেয় দালানের কঙ্কালগুলো দেখান। আমার সঙ্গে ইয়াসমীনের পরিচয় হয়, যিনি ঢলের সময় বাঁশের আঁটি ধরে বেঁচে গিয়েছিলেন, কিন্তু স্বামী ও তিন সন্তানকে হারিয়েছেন। ইয়াসমীন ক্রমে বাকশক্তি হারিয়ে ফেলছিলেন এবং তার শরীরও অবশ হয়ে নুয়ে যাচ্ছিল।

মুসা আলী আমাকে নিমপাতা দেয় ও বলে, নিমপাতা থেকে করাতের জন্ম। করাত ও ঢেঁকি নিয়ে সে আমাকে কাজ করতে বলে।

আমার সঙ্গী বাথানি বলে, তোর জাত ক সাহেবরে, তোর জাত কী? মুসা আলী, মাটির ঢেলা হাতে নিয়ে আমার হাতে দেয়, আমি দেখতে পাই, ঢেলাটিতে বিচিত্র কিছু লেখা রয়েছে।

মুসা আলী বলে, মাটি হইল আদম, তার জাত কী, তার জাত নাই... মাটিতে হাওয়া লাগলে জীবন হয়, হাওয়ার জাত কী, পাত কী? ইয়াসমীন কাঁদে। জীবন্ত পাথর কাঁদে। উড়ির চরের লোক ক্ষুধায় কাঁদে। আমি ভুলে যাই, আমার সাকিন ভুলে যাই, এর মধ্যেই কোনো এক সময় দেশে স্বৈরাচারের পতন হয়েছে, দেশে গণতন্ত্র এসেছে এবং আমি জ্ঞানী ও শিল্পী হওয়ার জন্য বিদেশযাত্রার প্রস্তুতি নিই।

বহু বছর পর শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের ওপর নির্মিত একটি তথ্যচিত্র দেখে উড়ির চরের মানুষগুলোর কথা আবার মনে হয়। শিল্পাচার্য ‘মনপুরা ৭০’ নামে একটি ছবি এঁকেছিলেন। ১৯৭০ ইসায়ীয় ১২ নভেম্বর বাংলাদেশের উপকূলবর্তী কয়েকটি অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস হয়। মনপুরা দুর্যোগাক্রান্ত একটি দ্বীপ, যার বাস্তবতা সম্ভবত জয়নুল আবেদিন তার ‘মনপুরা ৭০’-এ উপস্থাপন করেছিলেন। তথ্যচিত্রে শিল্পাচার্য বলেছেন, ‘মনপুরায় যখন তৃতীয় দিনে নামলাম, বন্ধু আর আমি ঘুরছি সারা দিন। যে কয়টা লোক বেঁচে আছে, তারা দৌড়ে আসলো। দেখলাম সবগুলো মানুষ জখমআলা; তারা আমাদের দেখে কাঁদতে আরম্ভ করলো, আমরাও কাঁদতে আরম্ভ করলাম। আপনারা বিশ্বাস করুন, আমার পিছনে সমুদ্রের খাড়ি, লাইন ধরে যেখানেই যান খালি (মৃত) গরু, মানুষ শুয়ে রইছে। মনুপুরা ছবি আঁকছি ২৮ ফুট লম্বা— বাঙালি মরলে সব এক হয়। তবে শেষ একটা ফিগার আমি মাথা নিচু করে রাখছি বসাইয়া, অরে যদি পারেন বুঝাইয়া-শুনাইয়া আবার উঠাইবেন, ভবিষ্যতে— এই রইলো আশা।’

বাংলাদেশের চিত্রকলা আন্দোলনের পুরোধা শাহাবুদ্দিন ও এসএম সুলতানকে আমি দেখেছি, জীবনের ব্যাপ্তিজুড়ে, বারবার, বাংলার চিরদুঃখী, মার খেয়ে পড়ে যাওয়া, মাথা নিচু করে থাকা মানুষগুলোর উত্থানপর্বের উপাখ্যান রচনা করতে।