মুহাম্মদ খসরুর জন্ম ভারতের হুগলি জেলায়। তার বাবার বাড়ি কেরানীগঞ্জের রুহিতপুরের মোহনপুর গ্রামে। বাবা হুগলিতে জুট মিলে কাজ করতেন। সেখানে দাঙ্গার বাস্তবতার কারণে পঞ্চাশের দশকে ঢাকায় চলে আসেন তারা।

জনপ্রিয় হালকা বিনোদনের বাইরে সিরিয়াস সিনেমার প্রতি দর্শক-নির্মাতাদের মনোযোগ ফেরাতে ’৬৩ সালে ঢাকায় শুরু করেন চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন। চলচ্চিত্র নির্মাণে কারিগরি দক্ষতা অর্জনের জন্য তিনি নিয়মিত আমন্ত্রণ করে আনেন দেশ-বিদেশের চলচ্চিত্রবোদ্ধা-নির্মাতাদের। তাদের দিয়ে কর্মশালা পরিচালনা করেন। তিনি প্রকাশ করেন চলচ্চিত্র-বিষয়ক পত্রিকা ধ্রুপদী। চলচ্চিত্র ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নিরন্তর সংগ্রাম করেছেন। রুচিশীল, উন্নত, সিরিয়াস চলচ্চিত্রপ্রেমী মানুষ, নির্মাতা তাকে ঘিরে তত্পর ছিলেন বহুকাল। কিন্তু এ কীর্তিমান মানুষটি এখন এক রকম স্বেচ্ছানির্বাসনে, ঢাকা ছেড়ে বসবাস করেন কেরানীগঞ্জের
আদি ভিটায়।

 

প্রশ্ন: আপনার জন্ম কি ঢাকায়?

মুহাম্মদ খসরু: না, হুগলিতে। ওখানে আমাদের বাড়িঘর ছিল, বাবা নৈহাটি জুট মিলে কাজ করতেন। তবে আমাদের মূল বাড়ি ছিল এটাই (কেরানীগঞ্জ, রুহিতপুর), বাবার চাকরির কারণে নৈহাটিতেই থাকা হতো। নৈহাটি জুট মিলে তখন সমরেশ বসু কাজ করতেন। তিনিও পূর্ববঙ্গের লোক, এখনকার সোহরাওয়ার্দী কলেজের কাছে বাড়ি ছিল। তার বিখ্যাত গল্প, দাঙ্গা নিয়ে লেখা, সেটা ঢাকাতেই একটা দেয়াল পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। গল্পের নাম এখন মনে পড়ছে না (আদাব)।

আমার পড়াশোনার শুরু এক মৌলভির কাছে, কিন্তু তিনি একদিন আমাকে নিল ডাউন করে শাস্তি দেয়ার পর তার কাছে যাওয়া বন্ধ করে দিই। তারপর আমাদের ভাড়াটিয়া ছিল এক ভদ্রলোক, খুবই পড়াশোনা জানা লোক, তার কাছে কিছুদিন প্রাইভেট পড়ি। আমাদের ছোট নদী... এ কবিতা দিয়ে আমার রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে পরিচয় ঘটে। স্কুলে গেছি কিছুদিন...। তো প্রথমে ওটা মাদ্রাসা ছিল পরে হাই স্কুল হয়ে যায়।

হুগলিতে আমার সে সময়ের খেলার সঙ্গী-সাথী ছিল সব অবাঙালি, বিহারি। ওরা কেন যেন ঢাকার নাম শুনলে খুব ভয় পেত। বলত, ‘ঢাকাকা বাঙালি হায়!’ অন্যদের সতর্ক করত— ‘এই ওকে কিছু বলো না, ও ঢাকাইয়া বাঙালি।’

প্রশ্ন: চলচ্চিত্রের সঙ্গে কীভাবে পরিচয় ঘটল?

মুহাম্মদ খসরু: সেটা সেই ছোটবেলা থেকেই। সিনেমার পোকা ছিলাম, দলবেঁধে বহুদূর চলে যেতাম। আট-দশজনের দল। তখন গৌরীপুরে ছিল রামকৃষ্ণ টকিজ আর ছিল নৈহাটি সিনেমা। একবার পুরো পরিবার নিয়ে সিনেমা দেখার স্মৃতিও মনে আছে, আমার বাবা আর আমার দুই মা। আমাদের নিজেদের ঘোড়ার গাড়ি ছিল, ওই গাড়িতে করে সিনেমা দেখতে গিয়েছিলাম। ছবির নাম ছিল চন্দ্রশেখর, বঙ্কিমের কাহিনী।

তখন নায়ক ছিল বাবু রাও আর খুব নামকরা নাচিয়ে ছিল ভগবান, যার নাচের স্টাইল পরে নকল করে নেচেছে অমিতাভ বচ্চন। এরা সবাই হিন্দি সিনেমার নায়ক। ভগবান বোধহয় বছর বিশেক আগে মারা গেছে।

প্রশ্ন: আপনার সিরিয়াস ধরনের ছবি দেখা শুরু কবে থেকে?

মুহাম্মদ খসরু: সেটা হয়েছে এই বঙ্গে আসার পর। তখন পরিচয় পত্রিকা পড়ে জেনেছিলাম যে, কলকাতায় একটা চলচ্চিত্র উত্সব হয়েছে। এটা ৪২ বা ৫২ কিংবা আরো আগেও হতে পারে, সঠিক সন-তারিখ মনে নাই। তবে রিভিউটা খুব বিশদ ছিল। ওই উত্সবে মারি সিটন এসেছিলেন। ’৪৭ সালে সত্যজিত্ রায় চিদানন্দরা মিলে একটা ফিল্ম সোসাইটি করলেন। এর আগে বোধহয় প্যারিসে ’২২ সালের দিকে ফিল্ম সোসাইটি হয়, আরো পরে ইংল্যান্ডে ব্রিটিশ ফিল্ম সোসাইটি।

তখন আমি ভাবলাম, আমাকে তো ছবি বানানো শিখতে হবে। এখানে আসার পর আমার শেখার স্পৃহা আরো বেড়ে গেল, তখন ওই চিন্তা থেকেই ফিল্ম সোসাইটির কথাও ভাবলাম, আমাদের এখানেও তো ও রকম হতে পারে। তত দিনে আমি চাকরিতে ঢুকে গেছি, বিসিকে। অ্যাসিসট্যান্ট ফটোগ্রাফার। তো ফিল্ম সোসাইটি নিয়ে চিন্তা করছি, কোথায় আগ্রহী লোকজন পাই, এ সময় একদিন ওয়াহিদুল হকের সঙ্গে দেখা। আমি বললাম, একটা ফিল্ম সোসাইটি করতে চাই। তখন ওয়াহিদ ভাই বললেন, আমরাও তো ফিল্ম সোসাইটি করার চিন্তা করছি। তো কাজ সহজ হয়ে গেল, ওয়াহিদ ভাইয়ের সঙ্গে এসে যোগ দিলেন কলিম শরাফী। কিন্তু পুরো দায়িত্বটা চাপল আমার ওপরই, আমাকে দায়িত্ব দিয়ে ওয়াহিদ ভাই লাপাত্তা। আরো পরে আলমগীর কবির এল, তখন ওর বাসাতেই সোসাইটির জিনিসপত্র রাখতাম।

প্রশ্ন: আলমগীর কবির বিলেতে ফিল্ম নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন?

মুহাম্মদ খসরু: বিলেতে কী করেছে বলতে পারব না। আমার সঙ্গে যখন দেখা, হি ওয়াজ ইন জেল, কী একটা পলিটিক্যাল কারণে... জেল থেকে ছাড়া পেয়েছে। আলমগীর কবির ভালো করত, করতে পারত জার্নালিজম, ফিল্ম ক্রিটিসিজমে তার একটা বাইটিং ছিল। তো আলমগীর কবীরের সঙ্গে আরো ছিল জামাল খান, ফারুক আলমগীর। আর ইয়াসিন নামে আমাদের একজন বন্ধু ছিল।

আমাদের ফিল্ম সোসাইটি শুরু হয় ’৬১ সালে, নাম দিয়েছিলাম পাকিস্তান ফিল্ম সোসাইটি।

প্রশ্ন: এ ফিল্ম সোসাইটির কাজ কী ছিল, আপনারা কী করতেন?

মুহাম্মদ খসরু: আমরা ছবি দেখাতাম। বিভিন্ন জায়গায়। গুলিস্তান হলে প্রায়ই ছবি দেখাতাম। মর্নিং শো চাইলে ভালোই কো-অপারেশন করত হল কর্তৃপক্ষ। অনেক নাচের ছবি দেখিয়েছি আমরা। নিশাতেও ছবি দেখাতাম। তখন খুব বিখ্যাত একটা ফরাসি ফিল্ম দেখিয়েছিলাম— আমব্রেলা অব শেরবুর। ক্যাথরিন দানিয়ুব ছিল। এসব ছবি দেখত ফিল্ম সোসাইটির সদস্যরা; হলের সাধারণ দর্শকরা না। সকালে সাড়ে সাত কি আটটায় শো হতো। আমাদের ছবি শেষ হলে হলের ওদের নিজস্ব মর্নিং শো শুরু হতো।

&dquote;&dquote;আমাদের ফিল্ম সোসাইটির প্রডাক্ট আজকের চলচ্চিত্র নির্মাতারা, তারা বেশির ভাগই কোনো না কোনোভাবে ফিল্ম সোসাইটির সঙ্গে যুক্ত ছিল। এ দেশে ফিল্ম সোসাইটির ইতিহাস ৫০ বছরের।

প্রশ্ন: আলমগীর কবিরকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

মুহাম্মদ খসরু: আলমগীর কবির সম্পর্কে কী বলব? কিছু লোক আছে না, তারা কিছু নিতেও জানে না, অন্যকে কিছু দিতেও জানে না; আলমগীর কবির ছিল তা-ই। আমি নিজে খুব ক্রিটিক্যাল মানুষ। আমার মুখও খারাপ। আমার নিজের স্বীকার করতে কোনো লজ্জা নেই, আমি ভদ্রভাবে কথা বলি না, বলতে পারিও না। গালাগালি এসে যায়। কিন্তু আমি সবাইকে নিয়ে চলতে পারি। যাহোক, আমরা যখন ’৬৯ সালে তুমুল গণআন্দোলনে ব্যস্ত, আলমগীর তখন আলাদা একটা ফিল্ম সোসাইটি বানিয়ে বসল ধুম করে, নাম দিল ঢাকা সিনে ক্লাব।

প্রশ্ন: তিনি আপনাদের ফিল্ম সোসাইটি থেকে বেরিয়ে গিয়ে এ সিনে ক্লাব করলেন?

মুহাম্মদ খসরু: আলমগীর তখনো আমাদের পাকিস্তান ফিল্ম সোসাইটির জেনারেল সেক্রেটারি। একটি সোসাইটির গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে সে এটা করতে পারে না। করলে এ পদ থেকে তাকে আগে রিজাইন দিতে হতো। সে তার তোয়াক্কা করে নাই।

প্রশ্ন: আলমগীর কবির এমন কেন করলেন?

মুহাম্মদ খসরু: করল লোভ থেকে। আসলে লোকটা তো প্রলেতারিয়েত গ্রুপে বিলং করে না, ওই সো কলড একটা লেফটিস্ট ভাব ছিল, তার চেয়ে জহির রায়হান অনেক ভালো ছিল।

প্রশ্ন: আপনাদের ফিল্ম সোসাইটির কার্যক্রমে একটু ফিরি, আপনারা যেসব ছবি দেখাতেন, সেগুলো কীভাবে পেতেন?

মুহাম্মদ খসরু: ছবিগুলো আমরা জোগাড় করতাম দূতাবাস থেকে। ব্রিটিশ কাউন্সিল আমাদের ছবি, হল দিয়ে সহযোগিতা করত, জার্মান কালচারাল সেন্টারও খুব উদার ছিল আমাদের প্রতি। ফরাসি ছবিও পেতাম, ত্রুফো, গদার, রিভেত...। কায়াদু সিনেমার গ্রুপের ছবি, নিউ ওয়েবের ছবি। আর সোভিয়েত ছবি দিয়ে তো ফিল্ম সোসাইটির কার্যক্রমই শুরু হয়। ক্রেনস আর ফ্লাইং ছবিটা দেখিয়েছিলাম প্রেস ক্লাবের উল্টো দিকে আমেরিকান সেন্টারে। তখন কোল্ড ওয়ার তুঙ্গে, অথচ মজাটা দেখো, রাশান ছবি দেখাচ্ছি আমেরিকান হলে। আমেরিকান ছবিও দেখিয়েছি ওদের হলে, অরসন ওয়েলসের ছবি দেখিয়েছি। শেষের দিকে ট্যাক্সি ড্রাইভার, মার্টিন স্করসেসের ছবি— অনেক খ্যাতিমান ডিরেক্টরের ছবি দেখিয়েছি।

প্রশ্ন: আপনারা ছবি দেখাতেন দর্শকদের শিক্ষিত করার উদ্দেশ্যে?

মুহাম্মদ খসরু: না, ঠিক তা না, একে বলা যায় চলচ্চিত্র বিষয়ে শিক্ষাদীক্ষা। কারণ চলচ্চিত্রের জন্য যেমন টেকনিক্যাল জ্ঞান দরকার, তেমনি চলচ্চিত্র বোঝার জন্য এনলাইটমেন্টও দরকার, কালচার বোঝারও ব্যাপার আছে। ভালো ছবির জ্ঞান থাকতে হবে একজন নির্মাতার, সেটা না থাকলে ছবি বানাতে পারবে কিন্তু ক্রিয়েটিভ ফিল্ম বলতে যা বোঝায়, তা পারবে না, কালচার বুঝবে না। একজনকে জিজ্ঞেস করো, সে ১০টা উপন্যাসের নাম পর্যন্ত বলতে পারবে না। এদের নিয়ে ছবি সম্ভব?

প্রশ্ন: আপনার ধ্রুপদী পত্রিকাকে সিনেমার ওপর সেরা বই বলেছিলেন কলকাতার রজত রায়—

মুহাম্মদ খসরু: কলকাতার অনেকের কাছেই এ পত্রিকা একটা দারুণ কিছু ছিল।

প্রশ্ন: আপনাদের সঙ্গে মাহবুব জামিলও তো জড়িত ছিলেন।

মুহাম্মদ খসরু: হ্যাঁ, তার হিস্ট্রি বলা বাকি আছে! তিনি নাকি ইদানীং বলেন, আমাদেরও আগে তিনিই ফিল্ম সোসাইটি করেছিলেন। আমার কথা হলো, সে রকম কিছু কেউ যদি করে থাকেন, তাহলে তার একটা চিহ্ন তো থাকবে। পাকিস্তান ফিল্ম সোসাইটি আমার হাতে হয়েছে। আরেকটা বড় বাপ এলেও এটা অস্বীকার করতে পারবে না, আমি ঢাকার ছেলে... আমার পড়াশোনা সেই ছোটবেলা থেকেই, এটা আমি বাড়িয়ে বলছি না। ...তাছাড়া আমার তো সুইসাইড করার কথা।

প্রশ্ন: কী বলেন?

মুহাম্মদ খসরু: আমি যে রকম নিঃসঙ্গতার মধ্যে থাকি, একমাত্র বই আর টেলিভিশন আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। একটা ছেলেপেলে নাই কথা বলার মতো। আগে রুইতপুর থেকে ঢাকা যেতাম, এখান থেকে মাত্র আধা ঘণ্টা লাগে। এখন যাই না। ছবির হাটটা ভাইঙ্গা দিল। আগে ওখানে আমাদের অনেক বন্ধুবান্ধব আসত, অনেক পেইন্টার আসত। আমি ছবি করার জন্য পেইন্টিংয়ের যতটুকু জানা দরকার, তার চেয়ে বেশিই জানি বলতে গেলে। আমি মিউজিকের ছাত্র ছিলাম, মিউজিক কলেজের... মীর কাশিম খান আর বারীণ মজুমদারের। প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা যদি বলো, আমি তো ক্লাস থ্রিতে ওঠার পর ওই পাট চুকিয়ে দিই। আমি ঠিকই করেছিলাম। তবে এর পেছনে অর্থকড়ি অভাবের মতো কোনো ব্যাপার ছিল না। বাবার চাকরির সুবাদে আমরা ছোটখাটো জমিদারের মতো ছিলাম। আমাদের অনেক জমি ছিল। জমি বিক্রি করে খেতে খেতে এ পর্যন্ত আসছি। পড়াশোনা কেন ছেড়েছি একটু বলি, এই যে সিনেমার ব্যাপারগুলো বোঝার জন্য...। অন্যদিকে সময় কীভাবে পাই, আমাকে তিন ডিজিটের অংক দাও আমি পারব না। তখন অংকের সঙ্গে উর্দু-আরবি ছিল কম্পলসারি। তো আমার মনে হলো, আমি ১০০ বছর চেষ্টা করলেও পাস করতে পারব না। এসব ভেবেচিন্তেই পড়াশোনা ছেড়ে দিলাম।

প্রশ্ন: বিসিকে তাহলে চাকরি হলো কীভাবে?

মুহাম্মদ খসরু: বিসিকের ডিজাইন সেন্টারে তখন অনেক আর্টিস্টকে নিল, কামরুল হাসান আমাকে খুব ভালোবাসতেন। কিন্তু ইন্টাভিউয়ের সময় প্রশ্ন উঠল: এ তো অনেক ছোট, এত কম বয়সে চাকরি দেয়া কি ঠিক হবে? কামরুল হাসান তখন বললেন, অসুবিধা হবে না। ও আমাদের সঙ্গেই থাকবে। তো কামরুল হাসানের ওপর কথা বলবে কে! চাকরি হয়ে গেল।

বিসিক... কানেক্টটেড উইথ সিনেমা... আমাদের ডিপার্টমেন্টে ক্যামেরাও ছিল। বলোকস ক্যামেরা। তিন লেন্সের প্রফেশনাল ক্যামেরা। এটা ’৮০-৮৫ সালের কথা।

প্রশ্ন: বিসিকে আপনি যোগ দেন আলোকচিত্রী হিসেবে। ফটোগ্রাফি কোথায় শিখেছিলেন?

মুহাম্মদ খসরু: কোথাও শিখি নাই। একাডেমিক্যালি আমি কোথাও কিছু শিখি নাই, যা কিছু শিখছি নিজে নিজে।

প্রশ্ন: আপনার সম্পর্কে একটা কথা চালু আছে, ছাত্র ইউনিয়নের সব মেয়ে নাকি আপনার প্রেমে পাগল ছিল?

মুহাম্মদ খসরু: নাহ, পাগল ছিল না। ওরা আমাকে খুব পছন্দ করত। যে কারণে আমি অনেককেই ফিল্ম সোসাইটির সঙ্গে যুক্ত করেছিলাম। যেমন— গায়ক লিনু বিল্লাহর বোন মিনু বিল্লাহ, সারা যাকের, শামীম... এরা আসার পর সব ঠিকঠাকই চলছে। তবে একদিন জামিল এসে বলল, খসরু ভাই, এ মেয়েগুলো আপনারে সালাম দেয়, কথা কয় কিন্তু আমাগো লগে তো কথা কয় না! আমি বললাম, কথা বললেই কথা বলবে, ওরা বোবা নাকি! ওরা শিক্ষিত মেয়ে, ছবি দেখা শেষেই আমার সঙ্গে ছবি নিয়ে আলোচনা করত।

প্রশ্ন: এতে আপনাকে বোধহয় ঈর্ষা করত অন্যরা...

মুহাম্মদ খসরু: হ্যাঁ, ঠিক শব্দটা বলেছ।

প্রশ্ন: আচ্ছা, ফিল্ম সোসাইটির কাজ তো শুধু ছবি দেখানোতেই সীমাবদ্ধ ছিল।

মুহাম্মদ খসরু: না, ছবি দেখানোর পাশাপাশি পত্রিকা বের করেছি। তারপর দেশের বাইরে থেকে বড় বড় ফিলবোদ্ধাকে আনতাম। ভারতের সতীশ বাহাদুর এসে আর্কাইভের ডিজাইন তৈরি করে দিয়েছিলেন।

&dquote;&dquote;

প্রশ্ন: আপনি ১৬ বছর ধরে এই গ্রামে এসে থাকছেন, ঢাকা ছাড়লেন কেন? এই বিচ্ছিন্নতার কারণ কী?

মুহাম্মদ খসরু: এখানে আমার একজনও পরিচিত লোক নাই। না ছেলে না মেয়ে। তারপরও থাকি। ঢাকা গেলেও এখন পরিচিত কাউকে পাই না। সবাই ব্যস্ত।

প্রশ্ন: আপনি সংসার করলেন না কেন?

মুহাম্মদ খসরু: সংসার বলতে কী বোঝায়, আমি বুঝি না। সংসার বলতে কি বিবাহ? আমাদের সোসাইটি হলো সবচেয়ে ব্যাকওয়ার্ড সোসাইটি। আমার চাওয়া ছিল, সবসময় মানুষ পরিবেষ্টিত হয়ে থাকব। বিয়ে ব্যাপরটা কখনই আমার পছন্দের ছিল না।

প্রশ্ন: আপনার কারো সঙ্গেই কোনো প্রেম-ভালোবাসা হয়নি?

মুহাম্মদ খসরু: না, কারো সঙ্গেই না। মেয়েদের সঙ্গে মিশলেই, কথা বললেই প্রেম-ভালোবাসা ধরা যাবে না। প্রেম-ভালোবাসা ভালো জিনিস, তবে আমাকে তারা নিতে পারে নাই। এর কারণ হতে পারে, আমি খিস্তিখেউড় করি বেশি। কিন্তু প্রেম-ভালোবাসার জন্য তো আমি খিস্তি বন্ধ করে দিতে পারি না। এটাই আমার ওয়ে অব টকিং। আমার কথা বলার ধরনই এ রকম। খিস্তি না করতে পারলে আমার পরানই ভরে না। আরেকটা কথা বলি, অধিকাংশ লোক আমারে অপছন্দই করে। কিন্তু অন্যের পছন্দ-অপছন্দ আমি কোনো দিনই কাউন্ট করি নাই। এখানে জেলাসি বেশি। বাইরে এক, ভেতরে আরেক। কিন্তু আমি সবসময় এক রকম থেকেছি।

প্রশ্ন: রণেশ গুপ্তের সঙ্গে আপনার খুব সখ্য ছিল...

মুহাম্মদ খসরু: হ্যাঁ, রণেশদা আর সত্যেন সেন মানে সত্যেনদা, এদের সঙ্গে সম্পর্ক হয় লেখা চাইতে গিয়ে। অনেক কথা, নানা রাজনৈতিক বিষয়ে আলোচনা...। আমি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলাম না কিন্তু সবসময় কমিউনিজমের পক্ষে কথা বলে এসেছি। এখন এ দেশে কোনো কমিউনিস্ট নাই, আমি স্বীকার করি না। রণেশদারে নিয়া ধ্রুপদীতে বিশেষ ক্রোড়পত্র করছিলাম, কমিউনিস্ট পার্টি তো এ রকম কিছু বের করতেই পারে নাই।

প্রশ্ন: স্বাধীনতার পরে আরো নানা রকম সামাজিক আন্দোলন হয়েছে, আপনি ফিল্ম সোসাইটি ছাড়া আর কোনো সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন?

মুহাম্মদ খসরু: আমি ’৭৮ সালে ছায়ানটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলাম। কিন্তু ওয়াহিদুল হক, সনিজদা খাতুনের সমস্যা হলো, এরা নিজেদের কথা সবসময় ঢোল পিটিয়ে বলত যেন অন্য আর কারো কোনো সংশ্লিষ্টতা নাই।

প্রশ্ন: রাজনীতি বিষয়ে আপনাকে বেশ অনীহ মনে হয়েছে, কেন?

মুহাম্মদ খসরু: রাজনৈতিক পার্টি করায় আমার কোনো বিশ্বাস ছিল না। পার্টি করে কেউ কোনো ভালো কাজ করে নাই। তোমরা দেখাতে পারবা কোন কাজটা করছে? জিয়াউর রহমান এসে কমিউনিস্ট পার্টির লোকজনকে দিয়ে মাটি কাটাল। পরে তারাই আবার আওয়ামী লীগে। অথচ পাশের দেশ ভারতে দেখো, ওখানে মাওদের আন্দোলন দেখো, অরুন্ধতী রায় পুরো একজন পার্টির লোক, সি ইজ ডুয়িং ভেরি ওয়েল। সে যা করছে, লিখছে সাংঘাতিক। আমাদের সংগঠন ছিল নন-পলিটিক্যাল অর্গানাইজেশন, ওটা আমাদের কনস্টিটিউশনেও উল্লেখ ছিল। তবে সমকালীন রাজনীতি সাড়ম্বরে করার কিছু নাই, এটা অটোমেটিক্যালি চলে আসে। জিয়াউর রহমানের সময় নানাভাবে হেনস্তা হয়েছি, গোয়েন্দা সংস্থার লোক সবসময় চোখে চোখে রাখত, কোথায় যাচ্ছি, কী ছবি দেখাচ্ছি, ধ্রুপদীর লাতিন আমেরিকান সংখ্যাটা বেশ র্যাডিকেল ছিল। ক্যামেরা যখন রাইফেল। এই নামটা ছিল একটা পত্রিকার, ধারণাটা ছিল গদারের, আমি ওখান থেকে নিয়েছিলাম। তাছাড়া সতীশ বাহাদুর লাতিন আমেরিকার অনেক ভালো ভালো ছবি সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন।

প্রশ্ন: ’৬০-এ শুরু করা আপনার ফিল্ম সোসাইটি, আপনি কি এখনো সোসাইটির সঙ্গে আছেন?

মুহাম্মদ খসরু: থাকব না কেন! আমার এই বাড়ি ফিল্ম সোসাইটির ঠিকানা। এখন সরকারের কাছে আমরা কিছু অর্থকড়ি চেয়েছি একটা অডিটোরিয়াম বানানোর জন্য, আসাদুজ্জামান নূর আমার অনেক পুরনো বন্ধু। আবেদন জমা দেয়া আছে।

প্রশ্ন: অন্য চলচ্চিত্র সংগঠনগুলোর জন্ম হলো কীভাবে, ফেডারেশনের, ফিল্ম সোসাইটির?

মুহাম্মদ খসরু: ওসব শুনলে তো হেসেই মইরা যাইবা, ফেডারেশনের সেক্রেটারি কে? মামুন, বেলায়েত হোসেন মামুন। যাহোক, আমাদের পরিকল্পনা ছিল নন্দনের মতো একটা হল করার, ইন্ডিয়ার কেরালায় যাও, সেখানেও ফিল্ম সোসাইটির হল আছে...আমরা এখানে কই যাব? বরং উল্টো একটা আইন করে ফিল্ম সোসাইটির কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ছবি দেখাতে হলে আগে তার সেন্সর করাতে হবে, বার্ষিক একটা চাঁদা দিতে হবে, ছবির জন্য অনুমতি নিতে হবে, কোথায় দেখানো হবে, কারা দেখবে— এগুলো জানিয়ে অনুমতি নিতে হবে। অনুমতি মিললে দেখাতে পারবে, না মিললে পারবা না। এটা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ রাখার জন্য বিএনপি করেছিল, কিন্তু এ সরকারও তো এটা বাতিল করে নাই। এখন আমাকে ধইরা নিয়া যাইতে পারে যে, তুমি এই ছবি দেখাইলা কেন?

প্রশ্ন: একটা ঘটনা ঘটেছিল রাশান বা জার্মান কালচারাল সেন্টারে একটা পোলিশ ছবি দেখানোর সময়, মাঝপথে পুলিশ এসে ছবি বন্ধ করে দেয়। অং রাখাইনের ছবিও এখানে দেখানো যাচ্ছে না, বাইরে দেখাচ্ছে...। তো আপনি এ কানুনের বিরুদ্ধে সবসময় কথা বলছেন, ওই তরফ থেকে বলা হচ্ছে— এটা নেই। কিন্তু আইন আসলে তো বাতিল হয়নি?

মুহাম্মদ খসরু: না না, এর মধ্যে তো পার্টির স্বার্থ ঢুইকা গেছে। এফডিসিতে আমাদের ফিল্ম সোসাইটির সালাউদ্দিন জাকি ছিল, কিন্তু আমাদের জন্য কিছুই করে নাই। ওর সময়ে একটা কোনো ভালো ছবি হইছে?

প্রশ্ন: শর্টফিল্ম ফোরাম তৈরি হলো কবে?

মুহাম্মদ খসরু: ওরা ফিল্ম সোসাইটিতে হেরে যাওয়ার পরই শর্টফিল্ম ফোরাম হলো। আলমগীর কবির আর মোরশেদুল ইসলাম।

প্রশ্ন: চলচ্চিত্র শিল্পের সঙ্গে, মানে ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে আপনাদের তেমন সংশ্লিষ্টতা ছিল না, আপনারা কি মনে করতেন, ওখানে ভালো ছবি হতে পারে না?

মুহাম্মদ খসরু: আসলে আমাদের তখন দেখার ছিল ছবিটা কে বানাচ্ছে, তার অ্যাটিচিউডটা কী, তার ছবি বানানোর ক্ষমতা কতটুকু, কী বিষয় নিয়ে সে ছবি বানাচ্ছে— এখনকার ছবি কি তোমরা দেখো? আমি মাঝে মাঝে এখনকার বিভিন্ন ছবির অংশ দেখি, নোংরামি বেড়ে গেছে, বিষয়বস্তু খুবই নিম্নমানের। আমাদের গোল্ডেন পিরিয়ড যাকে বলি, সেই স্বর্ণযুগের ছবি দেখো... ষাটের, সত্তরের ছবি... ইন্ডাস্ট্রির পুরনো সব লোকজন মারা যাওয়ার পর যেসব ছবি হইছে, সেগুলো আর দেখা যায় না।

প্রশ্ন: আপনারা ইন্ডাস্ট্রির বাণিজ্যিক ছবির চেয়ে উন্নত রুচির ছবির কথা বলেছেন, দেখিয়েছেন, কিন্তু বাণিজ্যিকভাবেও তো ভালো ছবি নির্মাণ সম্ভব?

মুহাম্মদ খসরু: হ্যাঁ, খুব সম্ভব, সেটা হলো পপুলার ছবি। এখানে রূপবান হয়েছে, এটা দুনিয়া কাঁপানো ছবি ছিল। সত্যজিত্ পর্যন্ত এই ছবি নিয়ে কথা বলেছেন, বাংলাদেশে শুনি পপুলার ছবি হচ্ছে, রূপবানের নাম বলেছেন। নারী-পুরুষ গরুর গাড়ি বোঝাই করে এসে এ সিনেমা দেখেছে। তো এ সিনেমায় কোনো নোংরামি ছিল? ফোকগুলোয় নোংরামি ঢুকছে পরে। তখন তারা কী যুক্তি দিল— লোকজন নাকি ফোক ছবি দেখতে চায় না। আমার প্রশ্ন, দেখতে চায় না, তাই খারাপ জিনিস দেখাব? আমরা এর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করছি, সুরুজ মিয়া নামে একটা ছবি বলাকা হল থেকে আমরা নামিয়ে দিয়েছিলাম।

প্রশ্ন: আপনার দৃষ্টিতে ’৬০ থেকে এ পর্যন্ত কারা ভালো কাজ করেছেন বলে মনে করেন?

মুহাম্মদ খসরু: মেইন স্ট্রিমে তো কাউকে দেখি না।

প্রশ্ন: জহির রায়হানও না?

মুহাম্মদ খসরু: তুমি তো এখনকার কথা জিজ্ঞেস করলা?

প্রশ্ন: আমি ’৬০-এর পর থেকে এ পর্যন্ত বলেছি।

মুহাম্মদ খসরু: সেক্ষেত্রে বেস্ট ফিল্মমেকার এখনো জহির রায়হান। সে যে কয়টা ছবি বানাইছে, তার ধারেকাছেও পৌঁছতে পারেনি কেউ।

প্রশ্ন: জহির রায়হানের পর আর কাউকে দেখছেন না? তারেক মাসুদ?

মুহাম্মদ খসরু: ধুরু, তারেক মাসুদ... টিকবে না। ওর ওই ছবিটা তো আমার কাছে ক্লিয়ার না। লোকজন এত ফালাফালি করে, ওই ছবির মধ্যে আছে কী? মাটির ময়নায় ও কী বলতে চাইছে? ওর বাপ মোল্লা ঘরে বইসা রইছে, মিলিটারি ওরে কিছুই কইল না অথচ হিন্দু মেয়েরা সিঁদুর মুইছা পালায় যাইতেছে, এটা-ওটা... ওদের ধরে মারতেছে। এটা কীভাবে দেখায় সে, তারপর কতগুলো গিমিক, কী? কমিউনিস্ট পার্টির ছেলেমেয়েরা রাস্তায় স্লোগান দিতে দিতে যাইতেছে... আর ঘরে আয়না-মুয়না দিয়ে কী বানাইছে? কী বুঝাইতে চাইছে, আমি বুঝলাম না। ...জহির রায়হানের ডকুমেন্টারির তো ওয়ার্ল্ড সিনেমার মধ্যে স্থান পাওয়া দরকার। স্টপ জেনোসাইড। তবে অনেকে এটা বলে। অনেকেই জানে না, ইন্ডিয়ান টেকনিশিয়ানদের অনেক অবদান আছে এ ছবিতে। স্ক্রিপ্টের মধ্যেও অনেক কিছু বলা আছে, হাত বুলানো আছে... তখন ছবিটা করা দরকার ছিল... সত্যজিত্ রায়েরও কিছু পরামর্শ ছিল এই ডকুর ব্যাপারে। এটা অনেকেই জানে না, জানার দরকারও নাই। এটা জহির রায়হান করছে, সব কৃতিত্ব তাকেই দেয়া উচিত। জহিরের একটা ফোক ছবি আছে, যা অন্য ছবির সঙ্গে মেলে না। বেহুলা। শেষে যে ছবিটা করতে গিয়ে মারা গেল— লেট দিয়ার বি লাইট। ওটাও ভালো কাজ। কাজেই আমি মনে করি, ওই লেভেলে কেউ এখনো পৌঁছতে পারে নাই।

প্রশ্ন: এখানে সাদেক খান নদী ও নারীর মতো ছবিও তো বানিয়েছেন।

মুহাম্মদ খসরু: হ্যাঁ, ওটা ভালো ছবি। ওটার সিনেমাটোগ্রাফার ছিল ফরাসি। আই লাইক ইট।

প্রশ্ন: জহির রায়হান ছাড়া আর কোনো ফিল্মমেকার আমরা পেলাম না কেন?

মুহাম্মদ খসরু: স্বাধীনতার পর একটা কোনো ছবির কথা বলতে পারবা? সাহিত্যে দেখো, মুক্তিযুদ্ধের ওপর একটা কোনো ভালো উপন্যাস আছে? স্বাধীনতার ৪০ বছর তো কত আগেই পার হইয়া আসছি। কেন হলো না? একটা লেখক নাই? জার্মানরা, রাশিয়ানরা কত কাজ করছে। সো কলড শিক্ষিত লোকদের তো কোনো কন্ট্রিবিউশন নাই, তারা তো কোনো ফিল্মই দেখে না।

প্রশ্ন: আপনি সমাজের ইন্টেলেকচুয়াল গ্যাপের কথা বলছেন।

মুহাম্মদ খসরু: হ্যাঁ, এই গ্যাপ আমাদের সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা করছে। ওই শিক্ষিতরা ছবি দেখতেও আসে না, ছবি সম্পর্কে কোনো ধারণাও নাই।

প্রশ্ন: কিন্তু আপনারা তো অনেক চেষ্টা করেছেন, ভালো ছবি দেখিয়েছেন?

মুহাম্মদ খসরু: ফিল্ম সোসাইটির এই চেষ্টাই ব্যর্থ।

প্রশ্ন: আপনারা ব্যর্থ তাহলে?

মুহাম্মদ খসরু: হ্যাঁ, তার পরও আমি ব্যর্থ কিনা পাবলিকও বুঝবে... আমরা একটা চেষ্টা করছি, আমাদের প্রচেষ্টায় গভর্নমেন্টের কোনো সাপোর্টও নাই, পাবলিকেরও কোনো ইয়ে নাই...। আমরা বাড়ি থেকে লোকজনকে ধরে এনে ছবি দেখাইছি।

 প্রশ্ন: কেন ভালো ছবি হলো না, আপনারা সোসাইটিকে বুঝতে পারেননি, না আপনাদের চিন্তায় গলদ ছিল?

মুহাম্মদ খসরু: এটা ঠিক না, পাবলিকের মনোরঞ্জনের জন্য ছবি হবে না, আমি আমার জন্য ছবি বানাব। পাবলিক খাবে, এটা ভেবে ছবি কেন বানাবে? যারাই এটা ভেবেছে, তারা নিম্নশ্রেণীর ছবিটাও ভালোমতো বানাতে পারে নাই। পাশাপাশি আমি ছবি বানাচ্ছি কোনো ইন্টেলেকচুয়ালের জন্য, মনে এ চিন্তাই থাকা উচিত না। ব্যাপারটা হবে, আমি একটা ছবি বানিয়েছি, এখন এটা পাবলিককে দেখাব, সে এটা পছন্দ করতে পারে, না-ও করতে পারে। এখন পর্যন্ত যেসব ছবি তৈরি হচ্ছে, তাতে ওই ইন্টেলেকচুয়াল গ্যাপ রয়ে গেছে এবং পরিধি বরং বাড়তেছে।

প্রশ্ন: আপনার কি মনে হচ্ছে, এখানে মেধাহীন লোক কাজ করে ওভাররেটেড হচ্ছে, অল্পেই অনেক কিছু পেয়ে যাচ্ছে?

মুহাম্মদ খসরু: হ্যাঁ, তারেক মাসুদই তো সেই সিম্বল। প্রপার সমালোচনা নাই, তারেক হলো মন্দের ভালো। তারেকের মধ্যে আমি কোনো ডেপথ খুঁজে পাই না। আচ্ছা, ফারুকীর ছবি আমি দেখি নাই। কী রকম?

প্রশ্ন: আপনি একবার বলছিলেন, আমাদের ভালো গল্প নেই, ভালো ছবি না হওয়ার কারণ তাই কি?

মুহাম্মদ খসরু: না, একটা গল্প পড়ে তো আমি ঘুমাতে পারি নাই দুই রাত, হাসান আজিজুল হকের উপন্যাস— সাবিত্রী উপাখ্যান। অসাধারণ এক উপন্যাস।

প্রশ্ন: সূর্যদীঘল বাড়ি কিন্তু স্বাধীনতার পর হয়েছে, মসিউদ্দীন শাকেরও ফিল্ম সোসাইটির লোক—

মুহাম্মদ খসরু: ওটা একটা চ্যাম্পিয়ন ছবি। ধ্রুপদীর একটা সংখ্যাই করা হয়েছিল এ ছবি নিয়ে। স্ক্রিপ্ট ছেপেছিলাম। শাকেরের এ কাজে গিমিক ব্যাপরটা নাই, যেটা তারেকের কাজের মধ্যে প্রচণ্ডভাবে আছে। শাকের যা বলার সোজাসুজি বলে গেছে, কোনো ক্যামোফ্লাজ নেয় নাই। উপন্যাসটাও খুব পূর্ণাঙ্গ ছিল, শাকেরকে কষ্ট করে নতুন কিছু বলতে হয় নাই, শুধু উপন্যাসকেই তুলে গেছে।

প্রশ্ন: মোরশেদুল ইসলামের চাকাও কি ভালো কাজ না?

মুহাম্মদ খসরু: আমি দেখি নাই। ফটো দেখছি। কেমন বানাইছে? এটার ছবি অয় বাড়িতে লাগায় রাখছে। তবে যে কথা শুনি, এইটা তো নকল মনে হয়। এ রকম একটা নভেল আছে।

প্রশ্ন: হ্যাঁ, সেলিম আল দীনের...

মুহাম্মদ খসরু: আরে না, সেলিম আল দীন নকল করতে পারে না।

 

কৃতজ্ঞতা: কামরুল মিথুন