ক্যান্সার এক প্রাচীন রোগ। পরিচয় জানার আগে ক্যান্সার মানে ছিল অসুস্থতা, তবে কারণটা অজ্ঞাত। ক্যান্সারকে বলা হয় ঈশ্বরের তরফ থেকে এ যুগের জন্য অভিশাপ। ক্যান্সার কোনো একটি রোগ নয়, সংশ্লিষ্ট সবগুলোকেই আমরা ক্যান্সার বলি। কারণ এগুলো কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী, কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। এ বায়োলজিক্যাল সাদৃশ্যের বাইরেও ক্যান্সারের সঙ্গে এমন অনেক রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক বিষয় জড়িয়ে আছে, যা রোগটির একটি সাধারণ বয়ানের জায়গা তৈরি করে। সব মিলিয়ে ক্যান্সারের ইতিহাস প্রায় চার হাজার বছরের।
আমাদের জীবনে ক্যান্সারের সর্বগ্রাসী উপস্থিতি সবসময়ই ছিল। এ রোগ আমাদের কল্পনায় হানা দিয়েছে, আমাদের স্মৃতিকে আচ্ছন্ন করেছে। আমাদের সব আলোচনা, চিন্তায় প্রবেশ করেছে। আমরা চিকিত্সকরা নিজেদের ক্যান্সারে নিমজ্জিত বলে মনে করি। আর রোগীরা দেখে, তারা এ রোগে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। আলেকজান্ডার সলঝেনিিসনের ক্যান্সার ওয়ার্ড উপন্যাসে চল্লিশের ঘরের এক যুবক পাভেল নিকোলেয়ভিচ তার ঘাড়ে একটা টিউমার আবিষ্কার করেন এবং দ্রুত এক ক্যান্সার হাসপাতালে ভর্তি হন। ক্যান্সার নির্ণয় পাভেলের যেন মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করে। এ ক্যান্সার তার পরিচয় বদলে দিল। তার গায়ে চড়িয়ে দিল রোগীদের জন্য নির্দিষ্ট এক বিশেষ পোশাক, এ পোশাক জেলখানার বন্দিদের পোশাকের চেয়ে ভিন্ন কিছু নয়। ক্যান্সার তার জীবনের সব বিষয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিল। পাভেল বুঝতে পারল ক্যান্সার তাকে এই সীমানাহীন মেডিকেল গুলাগে আটকে ফেলেছে। সলঝেনিিসন পাভেলের হাসপাতালের স্বৈরতান্ত্রিক পরিবেশকে তার দেশের কর্তৃত্ববাদী শাসনের সঙ্গে তুলনীয় করে দেখিয়েছেন। একবার জরায়ু ক্যান্সারে আক্রান্ত এক নারী চিকিত্সক ও ক্যান্সার গবেষক সিদ্ধার্থ মুখার্জীকে বলেছিলেন যে, ক্যান্সার শব্দটাই তার কাছে একটি কারাগার।
বিজ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে অনেক রোগের চিকিত্সা নিশ্চিত হয়েছে। কিন্তু ক্যান্সার এখনো এক রহস্যই রয়ে গেছে। হয় কেটে ক্যান্সারের টিউমার ফেলে দিতে হয় অথবা তেজস্ক্রিয় রশ্মি ব্যবহার করে সংশ্লিষ্ট কোষ পুড়িয়ে ফেলা হয়। অর্থাত্ শীতল ছুরি নয়তো গরম রশ্মি— এই হচ্ছে উপায়।
প্রাচীন মিসরে একজন চিকিত্সক ছিলেন, যার নাম ইমহোটেপ। খ্রিস্টপূর্ব ১৬২৫ বছর আগে তিনি জীবিত ছিলেন। তাকে বলা হয় মিসরীয় রেঁনেসার একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তার লেখা প্যাপিরাস ১৯৩০ সালে অনূদিত হয়। তিনি ছিলেন রাজা জোজেররের সভাসদ। তার আগ্রহ ছিল নিউরো সার্জারিতে। একই সময় তিনি স্থাপত্যবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা নিয়েও কাজ করেছেন। বহু শতক পর যখন গ্রিকরা মিসর দখল করল, তখন তারা ইমহোটেপের জ্ঞান উপলব্ধি করে তাকে প্রাচীন জাদুকর হিসেবে আখ্যা দেয় এবং তাকে তাদের চিকিত্সার দেবতা অ্যাসক্লেপিয়াসের সঙ্গে মিলিয়ে নেয়। তবে ইমহোটেপের লেখায় জাদু বা ধর্ম কিছুই ছিল না। তিনি লিখেছেন ভাঙা হাড়ের কথা; এমন সব শব্দ ব্যবহার করেছেন যে, শুনে মনে হবে আধুনিক যুগের কোনো সার্জিক্যাল টেক্সটবুক। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ইমহোটেপই প্রথম ক্যান্সারকে নির্দিষ্ট করতে পেরেছিলেন। তার লেখায় ‘বুকের ওপর স্ফীত হয়ে ওঠা’ ঠাণ্ডা, শক্ত, চামড়ার নিচে ছড়িয়ে পড়া মাংসপিণ্ডের কথা বলা হয়েছে, যা প্রকৃতপক্ষে স্তন ক্যান্সারের নিখুঁত বিবরণ। ইমহোটেপ যত রোগের বিবরণ দিয়েছেন, সেগুলোর জন্য চিকিত্সাও তিনি লিখেছেন। কিন্তু ৪৫ নম্বর কেস অর্থাত্ ‘বুকের ওপর স্ফীত হয়ে ওঠা’ বা ক্যান্সারের চিকিত্সার ঘরটি ফাঁকা। এখানে তিনি কিছু লিখে যাননি। কিছুই লেখেননি বললে ভুল হবে, একটি বাক্য লেখা আছে— ‘কোনো চিকিত্সা নেই।’ এর পরই ইতিহাস থেকে ক্যান্সারের ইতিহাস হারিয়ে গেল। তার জায়গা নিল টাইফাস। খ্রিস্টপূর্ব ১৭১৫ সালে টাইফাসের আক্রমণে বন্দরনগরী আভারিসের জনসংখ্যাই কমে গেল। খ্রিস্টপূর্ব দ্বাদশ শতকে স্মলপক্স মিসরীয় সম্রাট পঞ্চম রামেসিসের মুখে দাগ রেখে গেল। সিন্ধু উপত্যকায় যক্ষ্মা মৌসুমি ঢলের মতো বছরে কয়েকবার মহামারী হয়ে দেখা দিত। এসব মহামারীর কালে ক্যান্সার দেখা দিলে তা ছিল নীরবে, চিকিত্সাবিজ্ঞানের সাহিত্যে অদৃশ্য।
ইমহোটেপের ক্যান্সার-সংক্রান্ত বর্ণনার পর কেটে গেছে প্রায় দুই হাজার বছর। এ সময়কালে ক্যান্সার নিয়ে লিখিত আর কোনো দলিল আমাদের হাতে নেই। ৪৪০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে গ্রিক ইতিহাসবিদ হেরোডোটাস তার বিখ্যাত হিস্টোরিজ-এ পারস্যের রানীর এক অদ্ভুত রোগের কথা উল্লেখ করেছেন। এ রানীর নাম ছিল অ্যাটোসা, তিনি ছিলেন সাইরাসের কন্যা ও দারিয়ুসের স্ত্রী। নিজের শাসনের মাঝামাঝিকালে অ্যাটোসা তার স্তনে রক্তক্ষরণকারী একটি স্ফীত মাংসপিণ্ড দেখতে পান। এটা ছিল স্তন ক্যান্সারের একটি রূপ। অ্যাটোসা চাইলে ব্যাবিলন থেকে গ্রিসের সব চিকিত্সক তার প্রাসাদের বাইরে লাইন ধরতেন নিশ্চয়ই। অ্যাটোসা তা না করে তিনি নিজেকে গুটিয়ে নিলেন। নিজেকে পর্দায় ঢেকে রাখলেন। দারিয়ুসের ডাক্তার নিশ্চয়ই তাকে চিকিত্সার চেষ্টা করেছেন কিন্তু কোনো ফল হয়নি। তারপর একজন গ্রিক দাস ডেমোসিডেস রানীকে তার টিউমারটি কেটে ফেলার জন্য রাজি করান। এই কেটে ফেলাটা ডেমোসিডেস নিজেই করতে চেয়েছিলেন। অস্ত্রোপচারের পর রানী অ্যাটোসা হঠাত্ করেই হেরোডোটাসের ইতিহাস বিবরণী থেকে হারিয়ে যান। আমরা জানি না, সেই অস্ত্রোপচার কতটা সফল হয়েছিল এবং রানী অ্যাটোসা ঠিক কবে মারা গিয়েছিলেন। তবে এটা সত্য যে, অস্ত্রোপচার কিছু মাত্রায় সফল হয়েছিল, কারণ রানী তারপর বেশ কিছুদিনই বেঁচেছিলেন। দারিয়ুস তখন তার সাম্রাজ্যের পূর্বপ্রান্তে অবস্থিত সিথিয়া আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। অ্যাটোসার চাকর ডেমোসিডেস তখন গ্রিসে নিজের বাড়িতে ফিরতে চাইছিলেন, এজন্য তিনি রানীকেও রাজি করিয়ে ফেলেন। ডেমোসিডেস যেন গ্রিসে নিজের বাড়িতে ফিরতে পারেন, তাই রানী সাইরাসকে অনুরোধ করলেন পূর্বে না গিয়ে পশ্চিম দিকে গ্রিস অভিমুখে অভিযান চালাতে। শুরু হলো প্রাচীন দুনিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা পারস্য-গ্রিক লড়াই। এভাবে রানীর ক্যান্সার সেদিন ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিয়েছিল।
এবার যাওয়া যাক লাতিন আমেরিকায়। পেরু থেকে চিলি পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে আছে আতাকামা মরুভূমি। এ মরুভূমিতে কখনো বৃষ্টি হয়নি। এখানে কোনোকালে মানববসতি ছিল— এমনটা বিশ্বাস করা কঠিন। কিন্তু হ্যাঁ, একসময় এ মরুভূমিতে মানববসতি ছিল। অনেক কবর ও ছোট ছোট ঘরের সন্ধান পাওয়া গেছে এ মরুভূমিতে। এখানে চিরিবায়া সম্প্রদায়ের অনেক মমি হয়ে যাওয়া মরদেহ পাওয়া গেছে। চিরিবায়ারা কিন্তু এ মরদেহগুলো নিজেরা মমি করেনি। মরুর অবহাওয়াই এসব মরদেহকে মমি করে ফেলেছিল। ১৯৯০ সালে একটি কবরস্থান থেকে ১৪০টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনা দৃষ্টি আকর্ষণ করে ইউনিভার্সিটি অব মিনেসোটার অধ্যাপক আর্থার অফডারহেইডের। তিনি মূলত প্রাচীন নিদর্শনের প্যাথলজি পরীক্ষা করেন। অধ্যাপক আর্থার চিরিবায়া সাইট থেকে পাওয়া মমিগুলোর অটোপসি করলেন। হঠাত্ই তিনি অদ্ভুত এক আবিষ্কার করে বসলেন। মধ্যবয়সী এক নারীর মমির অটোপসি করার সময় তার পায়ের পাতায় আলুর মতো একটা মাংসপিণ্ড পেয়ে গেলেন। নিঃসন্দেহে এটা ছিল ক্যান্সারের নমুনা। ক্যান্সারের হাজার বছরের পুরনো নমুনা টিকে ছিল এই মমির শরীরে। আর্থারের মতে, এ নারী জীবিত অবস্থায় ক্যান্সারের কারণে প্রচণ্ড ব্যথা সয়েছিলেন।
অধ্যাপক আর্থারই একমাত্র প্যাথলজিস্ট নন, যিনি এ রকম প্রাচীন মরদেহে ক্যান্সারের নমুনা খুঁজে পেয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আরো অনেক মমিতে ক্যান্সারের সংরক্ষিত টিস্যু পাওয়া গেছে। এ রকম ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রাচীন নিদর্শন হচ্ছে মিসরের দাখলেহতে মমির তলপেটে পাওয়া ক্যান্সার। এ মমির মানুষটি খ্রিস্টপূর্ব ৪০০ বছর আগে জীবিত ছিলেন।’ অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন নমুনায় মূল টিউমার পাওয়া না গেলেও তার ফলে সৃষ্ট লক্ষণগুলো পাওয়া গেছে। এমন অনেক কংকাল পাওয়া গেছে, যেগুলোর হাড়ে ফুটো আছে। এসব ফুটো ক্যান্সারের কারণে সৃষ্ট। ১৯১৪ সালে দুই হাজার বছর পুরনো একটি মিসরীয় মমি পাওয়া গিয়েছিল, এ মমির পেলভিক হাড় ক্যান্সার আক্রমণের শিকার হয়েছিল বলে গবেষকরা নিশ্চিত হয়েছিলেন। নৃতত্ত্ববিদ লুই লিকে দুনিয়ার প্রাচীনতম কিছু মানবকংকাল উদ্ধার করেছেন। তিনি আফ্রিকা থেকে ২০ লাখ বছর আগেকার একটি কংকালের নমুনা উদ্ধার করেন, যেখানে লিমফোমার নমুনা পাওয়া যায়। যদি সত্যি হয়, তাহলে এটা হবে ক্যান্সারের সবচেয়ে প্রাচীন নিদর্শন। বলতেই হয়, ক্যান্সার কোনো আধুনিক রোগ নয়, এটা মানবজাতির সবচেয়ে পুরনো রোগগুলোর অন্যতম এবং খুব সম্ভবত সবচেয়ে প্রাচীন রোগ।
কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হচ্ছে, ক্যান্সার প্রাচীনতম রোগগুলোর একটি হলেও আশ্চর্যজনকভাবে চিকিত্সা সাহিত্যে এর দেখা কদাচিত্ পাওয়া যায়। টেস্টামেন্টে কুষ্ঠের কথা উল্লেখ আছে। মেসোপটেমিয়ায় মাইগ্রেনের উল্লেখ আছে, ভারতীয় বেদে উল্লেখ আছে ড্রপসির, চিকেনপক্সের দেবতাও আছেন। যক্ষ্মার উল্লেখ তো বিভিন্ন সভ্যতাতেই আছে। কিন্তু কোথাও সেভাবে ক্যান্সারের গল্প শোনা যায়নি। এই নীরবতার কারণ কী? একটি কারণ হলো, মানুষের আয়ুষ্কাল। ক্যান্সার হয় সাধারণত মধ্যবয়সে। নারীদের স্তন ক্যান্সার হয় সাধারণত ৪০ বছর বয়সে। প্রাচীনকালে মানুষ গড়ে ৪০ বছরের আগেই মারা যেত। তখন মানুষ যক্ষ্মা, কলেরা, স্মলপক্স, কুষ্ঠ, প্লেগের মতো রোগে অসুস্থ হতো এবং মধ্যবয়সে পৌঁছতে পৌঁছতেই মারা যেত। ক্যান্সার হলেও সে আর তার লক্ষণগুলো সেভাবে প্রকাশ করতে পারত না। আধুনিককালে ক্যান্সারের আধিপত্যের কারণ কী? মূলত এর পেছনে দুটি বিষয় জড়িত। এক. অন্যসব রোগের বিলুপ্তি বা প্রতিরোধ। দুই. আধুনিককালের জীবনধারা। তবে সিদ্ধার্থ দ্বিতীয় কারণটির সঙ্গে একমত নন। তার মতে, মানুষের আয়ু বৃদ্ধি তাকে ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কায় ফেলেছে। অন্য আরো অনেক কারণ থাকলেও বিশ শতকে এসে আয়ু বৃদ্ধিই ক্যান্সারের আধিপত্যের মূল কারণ।
ডেমোগ্রাফিক ও এপিডেমিওলজিক্যাল বিশ্লেষণ করলেও ক্যান্সারের সঙ্গে মানুষের আয়ু বৃদ্ধির সম্পর্কটি স্পষ্ট হয়। রোজওয়েল পার্ক যেমনটা উল্লেখ করেছেন যে, ১৯০০ সালে আমেরিকায় সবেচেয়ে বেশি মানুষ মারা যেত যক্ষ্মায়। জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বিখ্যাত চিকিত্সক অসলার যক্ষ্মাকে ‘মৃত্যুদূত’ বলে অভিহিত করেছিলেন। এরপর আসে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া। ক্যান্সার তখনো সাত নম্বরে। ১৯৪০ নাগাদ ক্যান্সার দুই নম্বরে চলে আসে। এ সময়ের মধ্যে আমেরিকানদের গড় আয়ু ২৬ বছর বৃদ্ধি পেয়েছিল।
মানুষের ভোগান্তি সৃষ্টি করা কোনো রোগের নাম মেডিকেল টার্মে যোগ হওয়ার আগেই স্থান পায় সাহিত্যে। যেমন— টাইফাস। এই উত্তাপ সৃষ্টিকারী জ্বরের নাম এসেছে গ্রিক টুফোন থেকে, তিনি ছিলেন বাতাসের পিতা। টাইফুনের নামও এসেছে এই টুফোন থেকে। টিউবারকিউলোসিস নামটি এসেছে লাতিন শব্দ টিউবার থেকে, যার অর্থ ফুলে ওঠা। খ্রিস্টপূর্ব ৪০০ অব্দে হিপ্পোক্রেটস প্রথমবারের মতো ক্যান্সার রোগটিকে নির্দিষ্ট করার জন্য একটি নাম ব্যবহার করেন— ‘কারকিনোজ’। এ গ্রিক শব্দটির অর্থ কাঁকড়া। ক্যান্সারের টিউমার ফুলে উঠলে এর ভেতরে রগগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দেখে মনে হয় যেন কোনো কাঁকড়া বালি খুঁড়ছে। ক্যান্সারের ইতিহাসে আরেকটি গ্রিক শব্দ জড়িয়ে আছে— ওনকোজ, সাধারণত টিউমারকে বোঝাতে এ শব্দ ব্যবহার হতো। তবে হিপ্পোক্রেটস যে অর্থে সে সময় কারকিনোজ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন, তা ঠিক আজকের ক্যান্সার নয়। তিনি মূলত শরীরের বাইরে তৈরি হওয়া, সহজে দেখা যায় এমন টিউমারের জন্য নামটি ব্যবহার করেছিলেন। মরণঘাতী ও সাধারণ টিউমারের পার্থক্য তিনি করতে পারেননি। অবশ্য তখন অণুবীক্ষণযন্ত্র ছিল না, তাই ক্যান্সারের অস্বাভাবিক কোষ বৃদ্ধি প্রাচীন গ্রিকদের পক্ষে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব ছিল না।
আজকের দিনে ক্যান্সার বিপুল বিক্রমে মানুষের দেহে বাসা বাঁধছে এবং তাদের মৃত্যু নিশ্চিত করছে। এখন প্রশ্ন উঠছে, অতীতে অনেক ভয়ানক রোগের ক্ষেত্রে যেমন হয়েছে, সেভাবে কি ক্যান্সারকে আমাদের সমাজ থেকে নির্মূল করা সম্ভব? উত্তরটা নিহিত রয়েছে এই বিস্ময়কর রোগের বায়োলজির মধ্যে। ক্যান্সার আমাদের জিনের মধ্যে মিশে গেছে। ক্যান্সার আমাদের শরীরের বিকাশের একটি ত্রুটি। কিন্ত্র এ ত্রুটি আবার আমাদের নিজেদের কারণেই সৃষ্ট।
মানুষ চায় প্রকৃতিকে বুঝতে, এজন্য তার হাতিয়ার বিজ্ঞান। এরপর এতে যুক্ত হয় প্রযুক্তি, যা মানুষ ও প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে কাজ করে। এগুলো মানুষের প্রবৃত্তি। ওষুধও একটি প্রযুক্তি। এর লক্ষ্য, মানুষের জীবনে প্রবেশ করে জীবন রক্ষা করা। ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াই এ লক্ষ্যকে চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে দেয়। কারণ এবার হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে জিনোমে। এটা এখনো নিশ্চিত নয় যে, জিনোমে হস্তক্ষেপ করলে তা ব্যাধি ও সাধারণ কোষের বিকাশের মধ্যে পার্থক্য করতে পারবে কিনা। অক্সফোর্ডে রিচার্ড পেটোর দরজায় একটি বচন ঝুলছে, ‘বুড়ো বয়সে মৃত্যু অনিবার্য। কিন্তু বেশি বয়স হওয়ার আগে নয়।’ ক্যান্সারকে পরাজিত করতে পারলে তা হবে মানবজাতির আরো অনেক প্রযুক্তিগত বিজয়ের একটি। এমনকি এটা হবে অনিবার্যের বিরুদ্ধে জয়। কারণ এটা আমাদের জিনের গঠনের ওপর জয়।
এ বিজয়ের চেহারাটা কেমন হবে? স্মরণ করুন রানী অ্যাটোসার কথা, যিনি খ্রিস্টের জন্মের ৫০০ বছর আগে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তিনি হচ্ছেন ক্যান্সারের ইতিহাসের ডোরিয়ান গ্রে। অ্যাটোসা ইতিহাসের বাঁক কেটে এগিয়েছেন কিন্তু তার টিউমারটি আজো মানুষের দেহে সেদিনেরই মতো রয়ে গেছে। অ্যাটোসার কেস আমাদের ক্যান্সার চিকিত্সার অতীত ও ভবিষ্যতের নির্দেশনা দেয়। গত কয়েক হাজার বছরে অ্যাটোসার চিকিত্সা কীভাবে পরিবর্তন হয়েছে, সেটা একটু দেখা যাক। শুরুতে আমরা অ্যাটোসাকে তার সময়কাল থেকে আরো দুই হাজার বছর পেছনে নিয়ে যাই, অর্থাত্ খ্রিস্টপূর্ব ২৫০০ অব্দে; ইমহোটেপের কাছে, তিনি অ্যাটোসার রোগের জন্য একটি নামও রেখেছিলেন। সেই হায়ারোগ্লিফিক আমরা এখনো পড়তে পারিনি। রোগটা শনাক্ত করতে পারলেও তিনি এর কোনো চিকিত্সা খুঁজে বের করতে পারেননি। খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ অব্দে অ্যাটোসা একেবারে আদিম পদ্ধতিতে শরীরে অস্ত্রোপচার করালেন। অস্ত্রোপচার করেছিলেন তার গ্রিক চাকর। এর ২০০ বছর পরে হিপ্পোক্রেট অ্যাটোসার টিউমারটিকে কারকিনোজ নামকরণ করেন। আরো হাজার বছর পরে অ্যাটোসার সেই টিউমার শরীর থেকে আলাদা করা হলো। কিন্তু তার পরও তার বৃদ্ধি, আক্রমণ বন্ধ হলো না। মধ্যযুগের শল্যচিকিত্সকরা ক্যান্সারের বিষয়ে তেমন কিছুই জানতেন না। কিন্তু তারা ছুরি দিয়ে টিউমারটি কাটলেন। অনেকে ওষুধ হিসেবে ব্যাঙের রক্ত, পবিত্র পানি, কাঁকড়ার ভর্তা প্রভৃতি ব্যবহার করলেন কিন্তু কোনো ফল মিলল না। ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে লন্ডনে জন হান্টারের ক্লিনিকে ক্যান্সারের বিভিন্ন ধাপ শনাক্ত করা হলো— প্রাথমিক, শেষ পর্যায়, আক্রমণাত্মক পর্যায় প্রভৃতি।
এরপর অ্যাটোসার টিউমার উনিশ শতকে এসে নতুনভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করল। এবার টিউমারটি আধুনিক অস্ত্রোপচারের মুখোমুখি হলো। বাল্টিমোরে হালস্টেডের ক্লিনিকে ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে অ্যাটোসার ক্যান্সারকে তখন পর্যন্ত সবচেয়ে সাহসী অস্ত্রোপচার করা হলো। টিউমারটি বুকের গভীর থেকে কেটে নেয়া হলো। এরপর বিশ শতকে এসে রঞ্জন রশ্মি ব্যবহার করে টিউমারটি নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করা হলো। পরবর্তী সার্জনরা অস্ত্রোপচার ও রশ্মি উভয়ই ব্যবহার করা শুরু করলেন আরো আধুনিক উপায়ে।
সত্তরের দশকে নতুন ধরনের থেরাপি এল। অ্যাটোসার সার্জারির সঙ্গে এবার যুক্ত হলো কেমোথেরাপি। উদ্দেশ্য ছিল, নতুন করে ক্যান্সার কোষের সৃষ্টি রোধ করা। আরো দেখা গেল যে, তার টিউমার ইস্ট্রোজেন গ্রাহক। তাই ট্যামোক্সিফেন নামে একটি অ্যান্টি-ইস্ট্রোজেন ব্যবহার করা হলো। এভাবে চিকিত্সার পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে থাকল। এবার যুক্ত হলো হারসেপটিন ব্যবহার করে থেরাপি।
অ্যাটোসার টিকে থাকার ওপর এসব ভিন্ন চিকিত্সা কতটা ভূমিকা রেখেছে, সেটা পৃথক করাটা অসম্ভব। তবে এসব পদ্ধতি কিন্তু সেই খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ অব্দে অ্যাটোসার পরিণতি বদলে দিতে পারেনি। যা হয়েছে সেটা হলো, তার জীবনে বেশ কয়েক বছরের আয়ু যোগ হয়েছে। অর্থাত্ ৪০ বছরে ক্যান্সার ধরা পড়লে তিনি অন্তত ৬০তম জন্মদিন পালন করার প্রত্যাশা করতে পারেন।
নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি অ্যাটোসার ক্যান্সারের চিকিত্সায় নতুন বাঁক আসে। এবার অ্যাটোসার জিনোম পরীক্ষা করা হলো। এতে জিনের মিউটেশন পাওয়া গেল। এবার তার সুস্থ স্তনটিতে ব্যাপক পরীক্ষা চালানো হলো সেটি আক্রান্ত কিনা জানতে। তার দুই কন্যাকেও পরীক্ষা করা হলো। তাদের জিনের গঠনের ক্যান্সারের অনুকূল মিউটেশন পাওয়া গেল। এরপর তাদের ক্যান্সার সৃষ্টি হওয়া প্রতিরোধ করতে বিভিন্ন ধরনের থেরাপি দেয়া হলো। এসব পরীক্ষা দারুণ ফল বয়ে আনল। এক মেয়ের স্তনে ছোট একটা টিউমারসদৃশ গঠন পাওয়া গেল। অস্ত্রোপচার করে তার এ টিউমার ফেলে দেয়া হলো। বাকি জীবন তিনি সুস্থভাবেই পার করেন। অন্য মেয়েকে প্রতিরোধী থেরাপি দেয়া হলো এবং তিনি বাকি জীবন ক্যান্সারের আক্রমণ ব্যতীতই পার করে দিলেন।
এবার অ্যাটোসাকে ভবিষ্যতে নিয়ে যাই। অ্যাটোসা ২০৫০ সালে তার ক্যান্সার জিনোমের কোড একটি পয়সা আকৃতি ফ্ল্যাশ ড্রাইভে করে নিয়ে চিকিত্সকের কাছে গেলেন। তার প্রতিটি জিনের প্রতিটি মিউটেশনের নকশা এ ফ্ল্যাশ ড্রাইভে আছে। এ মিউটেশনগুলো তাদের ধরন অনুযায়ী সাজানো হবে। এবার গাণিতিকভাবে এসব নকশা থেকে তার শরীরে ক্যান্সারের বিকাশ ও টিকে থাকার পথ উদ্ধার করা হবে। থেরাপি দেয়া হবে এসব পথকে লক্ষ্য রেখে। ফলে অস্ত্রোপচার করে টিউমার সরানোর পরে তার শরীরে যেন নতুন করে ক্যান্সার সৃষ্টি না হয়, বাকি জীবন তাকে কিছু ওষুধ খেতে হবে।
তবে ভবিষ্যতে অ্যাটোসার এই টিকে যাওয়া নিয়ে খুব বেশি উচ্ছ্বসিত হওয়ার সুযোগ নেই। এ সাফল্যকে কিছু বিষয়ের পরিপ্রেক্ষিতে বিবেচনা করতে হবে। অ্যাটোসার ক্যান্সার যদি প্যানক্রিয়েটিক বা গলব্লাডার ক্যান্সার হতো, তাহলে সেটা স্তন ক্যান্সারের মতো চিহ্নিত করা সম্ভব হতো না। আবার যদি অ্যাটোসার টিউমার ইস্ট্রোজেনগ্রহীতা না হতো বা এইচইআর নেগেটিভ হতো এবং কেমোথেরাপিতে সাড়া না দিত, তাহলে তার বাঁচার সম্ভাবনা অনেক কমে যেত।
ক্যান্সারের ভবিষ্যত্ অনুমান করা সম্ভব নয়। এর জীবতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আমরা এখন অনেক কিছুই জানি না। এখনো স্তন ক্যান্সারের সঙ্গে প্যানক্রিয়েটিক বা গলব্লাডার ক্যান্সারের পার্থক্য নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। তবে যেটা আমরা নিশ্চিত তা হচ্ছে, ক্যান্সারের সব রহস্য উন্মোচন হলেও একে আমাদের জীবন থেকে পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়। আমরা বড়জোর চেষ্টা করতে পারি ক্যান্সার আক্রান্তের জীবন দীর্ঘ করতে। ক্যান্সারের বিরুদ্ধে জয়ের সংজ্ঞাটা তাই বদলে ফেলা উচিত। জুন গুডফিল্ড লিখেছিলেন, ‘ক্যান্সারের শুরু ও শেষ মানুষের মধ্যেই। বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের মাঝে এই মৌলিক সত্যটাকে মাঝে মাঝে আমরা ভুলে যাই।’
প্রশ্ন উঠতে পারে, ক্যান্সারের বৈশিষ্ট্য ও চিকিত্সা নিয়ে এত অনিশ্চয়তা থাকা সত্ত্বেও কীভাবে এর অতীতকে ভবিষ্যতের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যায়? ১৯৯৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের পরিচালক রিচার্ড ক্লসনার বলেছিলেন যে, নব্বইয়ের দশকে ক্যান্সার গবেষণায় সে রকম কোনো সাফল্য আসেনি। তাই কোনো দশকের অর্জন তার পরের দশকে বিরাট ভূমিকা রাখবে— এমন মনে করার সুযোগ নেই। তিনি আরো বলেন, অপ্রত্যাশিত উত্স থেকে যখন কোনো বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার হয়, তখন তার ভবিষ্যত্ সম্পর্কে অনুমান করাটা খুব কঠিন। এজন্য তিনি ফ্লেমিংয়ের পেনিসিলিন আবিষ্কারের কথা তুলে ধরেছেন। এসব বিবেচনায় ক্লসনারের মন্তব্য অনেকাংশে সঠিক, তবে পুরোপুরি নয়। যখন সত্যিই কোনো বৈপ্লবিক আবিষ্কার হয়, তখন তার প্রভাবও বিস্তৃত হয়। প্রযুক্তির বিকাশ তার নিজের অতীতকেই মুছে দেয়। একসময় বলা হয়, ব্যাকটেরিয়াজনিত নিউমোনিয়ার চিকিত্সা সম্ভব নয়। কিন্তু পরবর্তীতে এই ভবিষ্যদ্বাণী করনেওয়ালারা ভুল প্রমাণিত হয়েছেন। ক্যান্সারের যেহেতু কোনো সুনির্দিষ্ট নিরাময় নেই এবং এর বিষয়ে অর্জিত জ্ঞানও সরল নয়, তাই অতীত সবসময়ই ভবিষ্যতের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে থাকবে। পুরনো পর্যবেক্ষণ নতুন তত্ত্বে পরিণত হবে।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয় বিজ্ঞানও হয় বিকশিত। ওষুধের ধরন প্রতিদিনই বদলে যাচ্ছে। আগামী ৫০ বছরে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের হাতিয়ার এত নাটকীয়ভাবে বদলে যাবে যে, এ রোগ প্রতিরোধের ভূগোল ও থেরাপি সেদিন আর আজকের সঙ্গে মেলানো যাবে না। ভবিষ্যতের বিজ্ঞানীরা মানুষের এ রাজব্যাধির বর্তমান চিকিত্সা নিয়ে হয়তো হাসবেন। তবে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াইটা আজকের মতোই থাকবে— বিরতিহীন, সৃষ্টিশীল, গতিময়; পরাজয় আর আশার মধ্যিখানে। একদিকে থাকবে ক্যান্সারের জন্য সর্বজনীন ওষুধ আবিষ্কারের চেষ্টা, আরেক দিকে হারের বেদনা।
গ্রিকরা টিউমারের জন্য দারুণ একটা শব্দ ব্যবহার করত— ‘ওনকোজ’, যার অর্থ বোঝা। নামটি যে কতটা দূরদর্শী ছিল, সেটা কল্পনার অতীত। ক্যান্সার আমাদের জিনোমের ওপর বোঝা তৈরি করে। এবার যদি গ্রিকদের ভাষার পেছনে তাকানো যায়, তবে সেখানেও আরেক চমক অপেক্ষা করে আছে। গ্রিক ভাষার উত্স ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষায় ওনকোজের অর্থ বদলে যায়। ওনকোজ এসেছে প্রাচীন শব্দ ‘নেক’ থেকে, এর অর্থ ছিল কোনো ভারী বস্তুকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যাওয়া। এটা শুধু ক্যান্সার কোষের ভ্রমণ নয়, একই সঙ্গে অ্যাটোসার সঙ্গে ক্যান্সারের দীর্ঘ বৈজ্ঞানিক যাত্রাকেও নির্দেশ করে।
২০০৫ সালে আমেরিকার অ্যালাবামার একজন সাইকোলজিস্ট জারমেইন বার্ন মৃত্যুশয্যায় ছিলেন। তিনি হঠাত্ অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন। দ্রুত তাকে হাসপাতালে নেয়ার পর কয়েক দিনের পরীক্ষায় তার ক্যান্সার ধরা পড়েছিল। সেটা ছিল ২০০০ সাল। তার শরীরে কোনো অস্ত্রোপচার সম্ভব ছিল না, কোনো কেমোথেরাপিও তার জন্য যথেষ্ট ছিল না। ডাক্তাররা তাকে কিছু ওষুধ দিয়ে তার আয়ুষ্কাল বেঁধে দিলেন। জারমেইনের কথায়, ‘আমি হাসপাতালের কাগজে স্বাক্ষর করলাম, বিল পরিশোধ করে নিজেকে বোঝালাম। মরার জন্য আমাকে বাড়ি চলে যেতে বলা হলো।’ ২০০০ সালের শীতকালে নিজের মৃত্যুপরোয়ানা নিয়ে তিনি বাড়ি ফিরে গিয়েছিলেন। কয়েক মাস পরে লিউকোমিয়ার জন্য একটা ওষুধ নিয়ে হইচই শুরু হলো। ওষুধটি ক্যান্সার কোষের বিরুদ্ধে কাজ করে। অনেকের মতো জারমেইন যেন অশান্ত সাগরে খড়কুটো খুঁজে পেলেন। ২০০১ সালের আগস্টে তিনি গ্লিভেক নামের ওষুধটি নেয়া শুরু করলেন। তখনো এটা পরীক্ষামূলকভাবে রোগীদের দেয়া হচ্ছিল। কয়েক মাসের মধ্যে জারমেইনের টিউমার দ্রুতগতিতে সেরে উঠতে লাগল। মৃত্যুর মুখ থেকে জারমেইন ফিরে এলেন। তার এই ফিরে আসা চিকিত্সাবিজ্ঞানে মিরাকল হিসেবে গণ্য হয়। তাকে নিয়ে সংবাদপত্রে সংবাদ প্রকাশ হয়। তিনি ক্যান্সার আক্রান্তদের আশা দেখালেন। ক্যান্সার নির্মূল করা না গেলেও তা প্রতিরোধের ওষুধ আছে। এক ধরনের ওষুধ ব্যর্থ হলে নতুন ধরনের ওষুধ তৈরি হচ্ছে। কিন্তু ২০০৪ সালে জারমেইনের টিউমার গ্লিভেককে মানিয়ে নিল এবং পুনরায় বৃদ্ধি শুরু হলো। আবার তিনি অজ্ঞান হওয়া শুরু করলেন। আবার সেই মৃত্যুর অপেক্ষা। এবার শুনলেন গ্লিভেকের সেকেন্ড জেনারেশনের ট্রায়াল শুরু হয়েছে বোস্টনে। ২০০৪ সালে তিনি এই সেকেন্ড জেনারেশনের গ্লিভেক নেয়া শুরু করলেন। কিন্তু এবার আর কাজ হলো না। ২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে জারমেইনের টিউমার এত দ্রুতগতিতে বাড়তে শুরু করল যে, তিনি প্রতি সপ্তাহে ওজন মাপতে গিয়ে টিউমারের ওজন বৃদ্ধি টের পেতেন। এবার আর তিনি নতুন কোনো ওষুধ নিলেন না। মৃত্যুর জন্য তার নিজের শহর অ্যালাবামায় ফিরে গেলেন। কিন্তু তিনি মৃত্যুকে ভয় না পেয়ে ছিমছাম হয়ে চলতেন। তার সাজগোজ ছিল সুস্থ সময়ের মতো। ক্যান্সার যতই তাকে হুমকি দিচ্ছিল, তিনি যেন ততই তার বিরুদ্ধে লড়াই করছিলেন।
জারমেইনের ঘটনাটি ক্যান্সার নিয়ে একটি সত্য প্রকাশ করে। ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াই হচ্ছে সবসময়ের, এর বিরুদ্ধে বিজ্ঞানের লড়াই প্রতিদিনের। জারমেইন ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে ব্লগ ঘেঁটেছেন, ওষুধ বদলেছেন, হাসপাতাল বদলেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের অর্ধেকটা ঘুরে ঘুরে তিনি কেমোথেরাপি নিয়েছেন। মৃত্যুর আগের মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি নিজের সব শক্তি, সাহস, কল্পনা দিয়ে ক্যান্সারকে পরাজিত করতে চেয়েছেন। তবে কেউ তাকে সহায়তা করতে পারেনি। সেখানে তিনি শূন্যতা ছাড়া আর কিছু পাননি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত নিজের কাজ নিজেই করেছেন। তার এ লড়াই যেন ক্যান্সারের বিরুদ্ধে মানুষের চার হাজার বছরের পুরনো লড়াইয়ের প্রতীক হয়ে রইল।
চিকিত্সক ও ক্যান্সার গবেষক সিদ্ধার্থ মুখার্জীর দ্য এম্পেরর অব অল ম্যালাডিস: আ বায়োগ্রাফি অব ক্যান্সার গ্রন্থ অবলম্বনে। গ্রন্থটি ২০১১ সালে পুলিত্জার পুরস্কার পেয়েছে।






