কোণঠাসা হয়ে গেলে কৃষকরা রুখে দাঁড়ায়। বাংলা এমন ঘটনা একাধিকবার দেখেছে। এর মধ্যে বিস্মৃতপ্রায় হলেও ভানুবিল কৃষক বিদ্রোহ অন্যতম। মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ থানায় বিদ্রোহটি হয়েছিল। এ আন্দোলনে মুখ্য ভূমিকা পালন করে মণিপুরি মুসলমানরা। বাংলায় মণিপুরিদের আগমনের পর থেকেই তারা মূলত শ্রীহট্টে নিজেদের বসতি স্থাপন করে। তবে তাদের এ আগমনের একটা স্বতন্ত্র ইতিহাস রয়েছে।
মণিপুরি মুসলিমদের নিজস্ব নাম পাঙাল। তাদের উৎসভূমি ভারতের মণিপুর রাজ্য। ১৬০৩ সালে মণিপুর রাজ্যের মহারাজা ছিলেন খাগেম্বা। ছোট ভাই সানোংবার সঙ্গে ওই বছরে তার দ্বন্দ্ব হয়। সানোংবা বিদ্রোহী হয়ে পার্শ্ববর্তী কাছাড়ের রাজার আশ্রয় গ্রহণ করেন। তাদের নিয়ে এমনকি গঠন করেন সেনাবাহিনী। এই সেনার বেশির ভাগই ছিল মুসলিম। এরপর সিলেটের তত্কালীন শাসনকর্তা বায়েজীদ খান কররানীর সাহায্যও নেন। ১৬০৬ সালে ওসমান খাঁ লোহানীর সৈন্য সাহায্য নিয়ে সানোংবা মণিপুর আক্রমণ করেন। যুদ্ধের পরিণতি সম্পর্কে দ্বিমত আছে। কেউ বলেন খাগেম্বার কাছে সানোংবা-লোহানীর যুগ্ম দলের পরাজয় হয়। কেউ বলেন যুদ্ধ সমাপ্ত হয় সন্ধির মাধ্যমে। তবে ফল যা-ই হোক, এ সময় থেকেই মুসলিম সৈন্যদের একটি অংশ মণিপুরে বসবাস করার পাশাপাশি মণিপুরি নারীদের বিয়ে করে। এদের সন্তানরাই ‘মৈতৈ পাঙাল বা মণিপুরি মুসলমান’ নামে পরিচিত হয়।
এর দুইশ বছর পর পারিবারিক কলহের সূত্র ধরে বার্মার রাজা মণিপুর আক্রমণ করেছিলেন। ১৮১৯ সালে এ আক্রমণের ঘটনা ঘটেছিল। মণিপুরের তত্কালীন রাজা চৌরজিৎ সিং প্রাণভয়ে পালিয়ে আসেন শ্রীহট্টে। ১৮১৯ থেকে ১৮২৫ সাল পর্যন্ত সময়কে মণিপুরের ইতিহাসে ‘চহি তারেৎ খুনতাকপা’ (ধ্বংসের সাত বছর) বলা হয়। বর্মিদের আক্রমণে এ সময় মণিপুরি মুসলিমরা সিলেটে আসতে শুরু করে। পরবর্তী সময়ে তাদের এ আবাস স্বাধীন বাংলাদেশের অন্তর্গত হয়।
গত শতকের শুরুতে ঘটা ভানুবিল কৃষক আন্দোলনের পটভূমি প্রস্তুত হয়েছিল বহুকাল ধরে। বলা বাহুল্য, বাংলাসহ সম্পূর্ণ ভারত তখন ব্রিটিশ শাসন-শোষণে পর্যুদস্ত। জমিদারদের অত্যাচারের মাত্রা বেড়েছে বৈ কমেনি। মহাজন ও জমিদারদের বিরুদ্ধে তাই কৃষকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হতে শুরু করেছিল। সেই ক্ষোভের আগুন যখন জ্বলে উঠল তারই বহিঃপ্রকাশ ছিল ভানুবিল কৃষক আন্দোলন, যাকে কৃষক বিদ্রোহ বলেও অভিহিত করা হয়।
ভানুবিল নামক উপজেলাটি বর্তমানে সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলার অন্তর্গত। মণিপুরিরা যখন সিলেটে আসে তখন এ অঞ্চল ছিল ঘন জঙ্গলে ঢাকা। মণিপুরিরাই এখানে বন-জঙ্গল পরিষ্কার করে আবাস ও আবাদের সূচনা করে। নিজ দেশ ও অঞ্চল থেকে পালিয়ে এসে তারা এ নতুন আবাসকেই নিজেদের ভূমি বলে মেনে নিয়েছিল। সেখানে ব্রিটিশ ও জমিদারদের অত্যাচার বৃদ্ধি পেলে তারা সে বিষয়টি মুখ বুজে মেনে নেয়নি। প্রতিবাদ করেছিল তীব্রভাবে।
ভানুবিল এলাকাসহ এ অঞ্চলের ছনগাঁও, কোনাগাঁও, মাঝেরগাঁও, চিত্লীয়া, জাঙ্গালীয়া প্রভৃতি গ্রাম ছিল পৃথিমপাশার জমিদার আলী আমজদ খানের অধীন। তত্কালীন সময়ের দলিলপত্রে গৌরহরি সিংহ তালুক উল্লেখিত হলেও পরবর্তী সময়ে পৃথিমপাশার জমিদার আলী আমজদ খান এ এলাকার জমিদার হিসেবে আখ্যায়িত হন। ১৯০১-১৯০৭ সময়কালে আলী আমজদ খান ও তার নায়েব রাসবিহারী দাশ ব্রিটিশদের সহযোগী হিসেবে আবির্ভূত হন। জমিদার আর নায়েব মিলে কৃষকদের ওপর চালায় অন্যায় জুলুম ও শোষণ। রাসবিহারী রসিদ ছাড়াই খাজনা আদায় করতেন। তার সম্পর্কে প্রচলিত একটি ছড়া হলো—
‘পেটমোটা রাসবিহারী চলিতে না পারে
দশ-বারোজনে উঠাইয়া দিলা হাতিরও উপরে।’
রাসবিহারী খাজনা আদায় করে কোষাগারে জমা করতেন না। আত্মসাৎ বাদেও নানাভাবে জুমুল করা হতো প্রজাদের ওপর। তাদের জমি জায়গা দখল করার নজিরও রয়েছে। দিনে দিনে কৃষকরা ক্ষুব্ধ হয়ে খাজনা দিতে অস্বীকার করে। আমজদ এ সময় মণিপুরি সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ডেকে সমাধানের চেষ্টা করেন। এদের মধ্যে ছিলেন কাসেম আলী, হাজী হাফিজুর রহমান, পঞ্চানন ঠাকুর ও বৈকুণ্ঠ শর্মা। কাসেম ও হাফিজুর ছিলেন ‘পাঙাল’। এদের সঙ্গে সমঝোতা না হলে জমিদার সবাইকে আটকে রেখে অকথ্য নির্যাতন করেন। নির্যাতনের পর তাদের ছেড়ে দেয়া হয় কিন্তু সেখান থেকেই শুরু হয় অক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণ। এর পরের ঘটনাটি অনেকটাই সিনেমায় দেখা অত্যাচারী জমিদারের মতো। সাজ্জাদুল হক স্বপন রচিত মণিপুরি মুসলিম অনুসারে, ‘একপর্যায়ে জমিদার হাতি দিয়ে ঘরবাড়ি মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে নির্দেশ দেন, ফলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। দুপক্ষের সংঘর্ষ ছিল হিংসাত্মক ও রক্তাক্ত এবং এ সংঘর্ষের দাবানলে পড়ে নিহত হন কুখ্যাত নায়েব রাসবিহারী দাস। প্রজাদের পক্ষে এ যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন কাসেম আলী ও পঞ্চানন ঠাকুর।’
আমজদ আলীর পর তার পুত্র হায়দর আলী জমিদার হলেও একই অবস্থা জারি থাকে। সে সময়কার নায়েব প্রমোদ ধর একইভাবে অত্যাচার করত। পুরো সময়জুড়ে সংঘর্ষ চলছিল এমন নয়, তবে আন্দোলন চলমান ছিল। ভানুবিল মৌজায় সে সময় ছিল ৭৫২টি পরিবার। পুরো সময় এ আন্দোলনের সঙ্গে মণিপুরি মুসলমানরা যুক্ত ছিলেন। এদের মধ্যে প্রধান ব্যক্তিরা হলেন মো. কাসেম আলী, চাউরেন মুন্সী ও হাজী মো. সুলতান।
এদের মধ্যে কাসেম আলীই ভানুবিল কৃষক আন্দোলনের প্রধান নেতা হিসেবে স্বীকৃত। কাসেম আলী প্রথম জীবনে রাসবিহারী দাসেরই সহকারী হিসেবে চাকরি পেয়েছিলেন। মতানৈক্যের কারণে সে কাজ ছেড়ে দিয়ে তিনি কৃষক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। আন্দোলন করতে গিয়ে তিনি কারাবরণও করেছিলেন। অন্যদিকে নিজে অগাধ সম্পত্তির অধিকারী হলেও তিনি কৃষকদের পক্ষে ছিলেন। ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত এ ব্যক্তিকে এখনো শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হয়।
হাজী মো. সুলতানও ভূসম্পত্তির মালিক ছিলেন। এককালে জমিদার আমজদ খানকে তিনি হাতি উপহার দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি ছিলেন জুলুমের বিরুদ্ধে। সে কারণে কাসেম আলীর কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আন্দোলন করেছেন হাজী সুলতান। এ আন্দোলনে অংশ নিয়ে তিনি একাধিকবার কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং কারাগারেই মৃত্যু হয়েছে তার।
ভানুবিল কৃষক বিদ্রোহের ব্যাপ্তি ছিল ১৯৩০-১৯৩২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। এ সময়ে আন্দোলনের বার্তা ব্রিটিশ পার্লামেন্টে গিয়ে পৌঁছালে ঘটনার সরেজমিন তদন্তে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট থেকে উইলকিনসন ও কৃষ্ণ মেননসহ তিনজন প্রতিনিধি আসেন। এ আন্দোলনের ভেতর দিয়ে কংগ্রেস ও কমিউনিস্ট নেতাদের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপিত হয়। কংগ্রেসের পূর্ণেন্দু সেনগুপ্ত ও মৌলভীবাজারে দ্বারিকা গোস্বামী ছিলেন অন্যতম। দ্বারিকা গোস্বামী কংগ্রেসের কর্মী হলেও তিনি কমিউনিস্ট মতবাদে আকৃষ্ট হয়ে ভানুবিলে যোগাযোগ করেন। ১৯৩৫ সালে আসাম সরকারের উদ্যোগে শ্রীহট্ট প্রজাস্বত্ব আইন হলে কৃষকদেরও বেশ কয়েকটি অধিকার আদায় হয়েছিল। খাজনার হার কিয়ারপ্রতি (কিয়ার, জমির মাপের হিসাব) আড়াই থেকে দুই টাকায় নামানো হয়। এ সফলতার কৃতিত্ব নিঃসন্দেহে ভানুবিল কৃষক আন্দোলন ও আন্দোলনকারী ব্যক্তিদের।
আলী আমজাদ: লেখক





