ভারত উপমহাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে মিয়ানমারের গা ঘেঁষে থাকা একটি সবুজ সুউচ্চ পাহাড় ও অরণ্য ঘেরা, উপত্যকা বিশেষ এক প্রাচীন জনপদ হচ্ছে মণিপুর। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যের (সেভেন সিস্টারস) অন্যতম রাজ্য মণিপুর। এ রাজ্যের সংখ্যালঘু মুসলিম জনগোষ্ঠীকে ‘মণিপুরি মুসলমান’, ‘মৈতৈ পাঙাল’ বা ‘পাঙাল’ জনজাতি হিসেবে অভিহিত করা হয়।
মণিপুরি মুসলমান জাতির অনন্য বৈশিষ্ট্য এরা একক কোনো জাতি বা জনগোষ্ঠী হতে সৃষ্ট নয়। এরা এসেছিল বিভিন্ন দেশ বা অঞ্চল থেকে, যদিও এদের বেশির ভাগ ছিল পাঠান বা আফগান। এ বিচিত্র জনগোষ্ঠী একটি স্বতন্ত্র একক জাতিতে রূপান্তরিত হয়েছিল মণিপুরি ভাষা, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি এবং ইসলাম ধর্মের মূল্যবোধকে ধারণ করে। এ জনগোষ্ঠীর কেউবা মণিপুরে এসেছিল যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে, আবার কেউবা এসেছিল ব্যবসায়ী বা পর্যটকের ভূমিকায়, কেউবা এসেছিল রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী হয়ে, আবার কেউবা এসেছিল রাষ্ট্রীয় স্বৈরাচার, সামাজিক ও রাজনৈতিক উত্পীড়ন থেকে মুক্তি পেতে। বস্তুত এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা নানা শ্রেণীর মুসলমান বিভিন্ন কারণে মণিপুরে বসতি স্থাপন শুরু করে। পরবর্তী সময়ে মণিপুরি মেয়েদের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে তাদের মণিপুরিত্বে রূপান্তর পাকাপোক্ত হয়। এ রূপান্তরকে প্রভাবিত করেছিল সে দেশের রাজশক্তিসহ সমকালীন মণিপুরিদের উদারনৈতিক চিন্তা ও চেতনা। ফলে এ রূপান্তর গোটা মণিপুরিদের মনন ও সংস্কৃতিকে অনেকখানি সমৃদ্ধ করেছে। বৃদ্ধি করেছে দেশের সার্বিক শক্তি।
প্রিসিলা রাজের মতে, মণিপুরি মুসলমানদের আকার ও দেহ গঠনে (নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য) মণিপুরিদের (মৈতৈদের) সাধারণ মঙ্গোলীয় বৈশিষ্ট্য থেকে অন্য রকম এবং বাঙালির মতোই বিচিত্র। মণিপুরি মুসলমানদের ধমনি-শিরায় বিভিন্ন জনধারার রক্ত সংমিশ্রণ ঘটেছে, বিধায় তাদের গায়ের রঙ কালো থেকে মঙ্গোলীয় পীত সব মাত্রায় যেমন হয়ে থাকে, চেহারার বৈচিত্র্যও হয় সে রকম। পারসিক সুউন্নত নাক থেকে শুরু করে রয়েছে বাঙালি সুলভ মাঝারি আকারের নাক। আবার কারো কারো নাক মঙ্গোলীয় ধরনের চাপা।
মণিপুরি মুসলমানরা উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল বিশেষ করে সিলেট, তরফ, উসমানগড়, গুজরাট, কাছাড় ও আরাকান অঞ্চল থেকে কখনো বিচ্ছিন্নভাবে, আবার কখনো সংঘবদ্ধভাবে মণিপুরে প্রবেশ করে সেখানে স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়া মুসলমান জনগোষ্ঠী বিশেষ। তবে আরাকান, ত্রিপুরা, আসাম, মণিপুর, ইউনান অর্থাৎ সিল্ক রোড হয়ে চীনে গমনাগমনের সময় মণিপুরে থেকে যাওয়া কিছুসংখ্যক আরবের বংশধরও এদের মধ্যে রয়েছে বলে কোনো কোনো ঐতিহাসিক দাবি করেছেন। এদের বেশির ভাগই ১৬০৬ সালে তরফের সামন্তরাজ কর্তৃক মণিপুর অভিযানের জন্য প্রেরিত বাহিনীর অধস্তন পুরুষ। ১৬১২ সালে উসমানগড় ও সিলেটের পাঠান শক্তির পতনের পরে আত্মগোপনকারী পাঠানদের একটি অংশ সুদূর মণিপুরে গিয়ে সেখানকার পাঠানদের মধ্যে আশ্রয় গ্রহণ করে বলে কথিত র?য়েছে।
পরবর্তী সময়ে মণিপুরি মুসলমান রক্তধারায় মোগল রক্তধারাও সংযোজিত হয়। প্রথমত, ১৬৫৭ সালে শাহজাহান অসুস্থ হয়ে পড়লে তার পুত্রদের মধ্যে সিংহাসনের উত্তরাধিকার নিয়ে যুদ্ধ শুরু হলো। এতে শাহজাহানের পরাজিত পুত্র শাহ সুজা ও তার অনুগত বেশকিছু সমর্থক মণিপুরে গিয়ে আত্মগোপন করে বলে জোর কথিত রয়েছে। দ্বিতীয়ত, ১৬৬২ সালে আওরঙ্গজেবের সেনাপতি মীরজুমলা আসাম আক্রমণ করলে একপর্যায়ে মহামারী ও অতিবৃষ্টির কারণে দৈব-দুর্বিপাক এবং প্রাকৃতিক বিড়ম্বনার শিকার হন। এ সুযোগে অহম সৈন্যরা অতর্কিত আক্রমণ করলে তার বাহিনীর বেশ কিছুসংখ্যক সৈন্য শিবির ছেড়ে নাগা পাহাড়ে প্রবেশ করে। পরে তারা নাগা পাহাড় অতিক্রম করে সংগোপনে মণিপুরে প্রবেশ করে এবং সেখানকার মুসলমানদের সঙ্গে বসবাস করে।
মণিপুরে মুসলমানদের অনুগমনের বিস্তারিত ইতিহাস জানতে হলে ষোড়শ শতাব্দী বা তত্পূর্ব সময় থেকে ব্যবসা, বাণিজ্য, পরিভ্রমণ, রাজনৈতিক আশ্রয় ইত্যাদি উপলক্ষে মুসলমানদের মণিপুরে অনুগমন, পারস্য ও তুর্কিদের সিল্ক রোড ব্যবহার করে চীনে গমনাগমন থেকে শুরু করে সপ্তদশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে কাছাড় রাজের অনুরোধে তরফ, ইটা ও দক্ষিণ সিলেট তথা উসমান গড়ের তত্কালীন শাসক খাজা উসমান খাঁ লোহানী কর্তৃক মণিপুরে অভিযানে সৈন্য প্রেরণ এবং তত্পরবর্তী সংঘটিত অনুগমনের ঘটনাবলি গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। কিন্তু এ সংক্ষিপ্ত পরিসরে তা সম্ভব নয়, বিধায় বিচ্ছিন্ন বা ক্ষুদ্র পরিসরে অনুপ্রবেশের ঘটনাগুলো পরিহার করে সপ্তদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে সংঘটিত ব্যাপক মুসলমান অনুগমনের ঘটনাপ্রবাহ এখানে উল্লেখ করা হলো।
উল্লেখ্য, বাংলার আফগান আর বারোভূঁইয়ারা যখন মোগল সুবাদার ইসলাম খাঁর সৈন্যদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন, তখন মণিপুরের রাজা খাগেম্বা (১৫৯৭-১৬৫২) তার বৈমাত্রেয় ভাই শানোংবার সঙ্গে বিবাদে লিপ্ত ছিলেন। একদা নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতার মতো সামান্য একটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজপরিবারে অন্তঃকলহের সূত্রপাত হয়। এতে শানোংবা রাজ্য থেকে বিতাড়িত হন। আর এ অপমানের প্রতিশোধ নেয়ার মানসে শানোংবা মণিপুর ত্যাগ করে মণিপুরের প্রতিবেশী রাজ্যে ভগ্নিপতি কাছাড় রাজশত্রু দমনের কাছে আশ্রয় গ্রহণ করেন। তিনি সেখানে কাছাড়রাজের পৃষ্ঠপোষকতায় সৈন্য সংগ্রহ করে মণিপুর আক্রমণের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। পরে শানোংবা কাছাড়রাজের পরামর্শে তার পাঠান মিত্র সিলেটের তত্কালীন শাসনকর্তা বায়েজিদ কররানীর সাহায্য প্রার্থনা করেন। উল্লেখ্য, তত্কালীন সিলেটের সঙ্গে কাছাড়ের খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। ১৬১২ সালে মোগল বাহিনী সিলেট আক্রমণ করলে কাছাড়ি সৈন্যরা বায়েজিদ কররানীর পক্ষাবলম্বন করে যুদ্ধ করেছিল। এতেই প্রমাণিত হয় তাদের গাঢ় সম্পর্কের কথা। মোগল সেনাপতি মির্জা নাথানের বাহারিস্তানে গায়েবিতেও বিষয়টি সমর্থিত হয়েছে।
শানোংবা ও কাছাড়রাজের অনুরোধ পেয়ে বায়েজিদ কররানী তত্কালীন বাংলার ভ্যাগ্যাকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্র, উসমানগড় রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা, ইটা ও তরফ অঞ্চলের অধিপতি, আফগানদের অঘোষিত রাজা, বারোভূঁইয়াদের অন্যতম ভূঁইয়া, স্বাধীন শাসক খাজা উসমান খাঁ লোহানীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং মণিপুর অভিযানের নিমিত্তে কাছাড়ে সৈন্য পাঠানোর অনুরোধ করেন। উল্লেখ্য, বায়েজিদ কররানীর অনুরোধ পেয়ে খাঁজা উসমান খাঁ লোহানী প্রস্তাবটির যৌক্তিকতা যাচাই করেন এবং রাজ্যের পশ্চাদভূমির সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের লক্ষ্যে সেখানে সৈন্য প্রেরণ করা যৌক্তিক মনে করেন। তাই তিনি তদীয় পুত্র এবং তত্কালীন তরফের সামন্তরাজকে মণিপুর অভিযানের জন্য কাছাড়ে সৈন্য পাঠানোর নির্দেশ দেন।
উল্লেখ্য, ষোড়শ শতাব্দীর সত্তরের দশকে বাংলায় যখন কররানী শাসকদের পতনোন্মুখ তখন ওড়িশায় চলছিল কুতলু খাঁর রাজত্ব। ১৫৭৬ সালে রাজহলের যুদ্ধে বাংলার শেষ সুলতান দাউদ কররানী মোগলদের হাতে পরাজিত ও নিহত হলে কররানী বংশীয় সরদাররা দেশের পূর্ব সীমান্তে পলায়ন করেন। অতঃপর ষোড়শ শতাব্দীর শেষের দিকে দাউদের সম্পর্কিত ভ্রাতা দ্বিতীয় বায়েজিদ কররানী ও ইয়াকুব কররানী সিলেটের শাসনভার গ্রহণ করেন। অন্যদিকে ১৫৯০ সালে ওড়িশার রাজা কুতলু খাঁর মৃত্যু হলে তদীয় ভ্রাতুষ্পুত্র এবং মন্ত্রী ঈসা খান লোহানী ওড়িশার রাজা হন। তিনি ১৫৯৫ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর পর তদীয় পুত্র খাজা সুলেমান এবং পরে খাজা উসমান রাজা হন। ‘বাহারীস্তান-ই-গায়বী’ ও ‘মাখজানে আফগানী’র মতে খাজা উসমান খাঁ লোহানী ৯৮৩ হিজরি বা ১৫৭২ সালে জন্মগ্রহণ করেন।
খাজা উসমান মোগল সেনাপতি মানসিংহ কর্তৃক ওড়িশা থেকে বিতাড়িত হন। মোগল সেনাপতি কর্তৃক বিতাড়িত হয়ে ভাগ্যান্বেষী খাজা উসমান ময়মনসিংহের বোকাই নগরে এসে আশ্রয় গ্রহণ ও শিবির স্থাপন করেন। তত্কালীন বঙ্গীয় সুবাদার ইসলাম খাঁর আদেশে মোগল সেনাপতি শেখ কামাল বোকাই নগর আক্রমণ করলে খাজা উসমান লাউরের পথ ধরে দক্ষিণ সিলেট ও তরফের দিকে সৈন্য পরিচালনা করেন এবং ইটা রাজ্য ও তরফ দখল করে নেন। খাজা উসমান তার ছেলে খাজা মোমরেজকে তরফের সামন্ত নিয়োগ করে সেখানে পাঠান এবং হবিগঞ্জের পুটিজুরিতে দুর্গ স্থাপন করে ভাই খাজা ওয়ালীকে দুর্গপ্রধান করে রাজ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করেন। বানিচঙ্গের আনোয়ার খাঁ ও হুসেন খাঁ এবং সিলেটের বায়েজিদ কররানীর সঙ্গে ছিল তার মিত্রতা ও সখ্যতা। উল্লেখ্য, ১৫৭৬ সালে আকবর নামেমাত্র বাংলাকে মোগল সাম্রাজ্যভুক্ত করলেও কার্যত বাংলার পূর্বাংশ বারোভূঁইয়া ও আফগান সর্দাররা স্বাধীনভাবে শাসনকার্য পরিচালনা করছিলেন। ১৫৭৬-১৬১২ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ এ ৩৬ বছর মোগল সুবাদার ও সেনাপতিরা আফগান সর্দার ও বারোভূঁইয়াদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন।
এদিকে খাজা উসমানের অভ্যুদয় ও শক্তি বৃদ্ধির খবর পেয়ে সম্রাট জাহাঙ্গীর উসমানকে দমনের জন্য বঙ্গীয় সুবাদার ইসলাম খানকে নির্দেশ দেন। অবশেষে সেনাপতি সুজাত খানকে দাক্ষিণাত্য থেকে ডেকে পাঠান এবং তার নেতৃত্বে এক বিরাট মোগল বাহিনী পাঠান। আর এ মোগল বাহিনীকে প্রতিরোধ করার জন্য সম্মিলিত পাঠান শক্তিকে রাজ্যের পশ্চিম সীমান্তে নিয়োগ করা হয়। খাজা উসমানের নির্দেশ পেয়ে তরফের সামন্তরাজ মোগল আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য তথায় নিয়োজিত সৈন্য থেকে বাছাইকৃত ১ হাজার ৭ জন সৈন্যবিশিষ্ট এক সুশৃঙ্খল বাহিনী একজন সেনাপতি ও ১৬ জন সেনাধ্যক্ষের নেতৃত্বে কাছাড়ে প্রেরণ করেন। মণিপুরি মুসলমানদের ইতিহাসসংবলিত মণিপুরি ভাষায় লিখিত ‘নোংশমৈ’ নামক এক প্রাচীন পাণ্ডুলিপিতে ওই বাহিনীর সেনাপতির নাম মোহাম্মদ শানী নামে উল্লেখ রয়েছে। মণিপুরে লিখিত বিভিন্ন ইতিহাস গ্রন্থে মোহাম্মদ শানীকে তরফের নবাবের ভাই হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আর বাংলায় লিখিত বিভিন্ন ইতিহাস গ্রন্থে খাজা উসমান কর্তৃক তার পুত্র ও ভাইদের নেতৃত্বে তরফে সেনাবাহিনীকে সুসংগঠিত করার কথা উল্লেখ রয়েছে।
এ বাহিনী কাছাড়ি সৈন্যদের সঙ্গে যৌথভাবে ১৬০৬ সালে (মণিপুরি পঞ্জিকা মতে হৈরাং খোংজম মেনিসাংয়ের কুমসক ১৫২৮-এর ইঙা মাসের ১৭ তারিখ রোজ শুক্রবার) মণিপুরে অভিযান পরিচালনা করে। যৌথ বাহিনী মণিপুরের বিষ্ণুপুর নামক স্থানে পৌঁছলে মণিপুর বাহিনীর প্রতিরোধের সম্মুখীন হয় এবং যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যুদ্ধে জয়-পরাজয় অনিশ্চিত হলে যুদ্ধের একপর্যায়ে উভয় পক্ষ এক সমঝোতায় উপনীত হয়। সমঝোতা মোতাবেক আফগান বাহিনী মণিপুরে স্থায়ীভাবে বসবাস করবে এবং তাদের সব অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ রাজার কাছে সমর্পণ করবে, বিনিময়ে রাজা তাদের পুনর্বাসন করবেন। সমঝোতা মোতাবেক রাজা মণিপুরি মেয়েদের সঙ্গে তাদের বিয়ে দেন এবং মণিপুরের সমতল ভূমিতে উর্বর, উত্কৃষ্ট ভূমি প্রদান করেন। তিনি তাদের রাজকীয় সৈন্যবাহিনীতে নিয়োগসহ বিভিন্ন পেশায় পুনর্বাসন করেন। রাজা তাদের নতুন করে বিভিন্ন বংশ নামে অভিষিক্ত করেন। ফলে মণিপুরে ‘মণিপুরি মুসলমান’, ‘মৈতৈ পাঙাল’ বা ‘পাঙাল’ নামে এক নতুন জাতিসত্তার উদ্ভব ঘটে। উল্লেখ্য, এই ‘পাঙাল’ শব্দটি ‘বাঙাল’ শব্দ থেকে উৎসারিত, যা ‘খাঁ-ই-বাঙাল’ শব্দের স্খলন। অর্থাৎ প্রথমে ‘খাঁ-ই-বাঙাল’ থেকে স্খলন হয়ে ‘বাঙাল’ পরে ‘পাঙাল’-এ রূপান্তরিত হয়। অন্যদিকে মৈতৈ মার মৈতৈ এবং ‘খাঁ-ই-বাঙাল’ শব্দ থেকে ‘বাঙাল’ শব্দ নিয়ে ‘মৈতৈ বাঙাল’, যা রূপান্তরিত হয়ে ‘মৈতৈ পাঙাল’-এ স্থিতি লাভ করে। পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ আমলে এসে মৈতৈ লৈবাককে যখন মণিপুর করা হয়, তখন মৈতৈ জাতিকেও ‘মণিপুরি’ করা হয় আর পাঙালদের নামকরণ করা হয় ‘মণিপুরি মুসলমান’।
যা-ই হোক, মুসলমানদের সেখানে পুনর্বাসিত করার পর মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র কাজি নিয়োগ করে একটি মুসলিম সমাজ গঠন করা হয়। ইতিহাসবেত্তা Salam Irene-এর মতে, ‘From
among the Muslims who came to Manipur in 1606 A.D. the king appointed Mohammad
Shahni as one of the ‘Pangba Tara’ (Ten Ministers). He was the first Muslim to
be so appoited. Seperate administrative department were setup for the
governance of the Muslims, like the mankan shang and the pangal shanglen. Each
muslims khul (village) had a muhallah attached to the Masjid. A muslim
panchayet was also constituted in 1891-92 with five muslim members.’ অর্থাৎ মণিপুররাজ ১৬০৬ সালে আসা মুসলমানদের মধ্য থেকে মোহাম্মদ শানীকে রাজার ১০ পরামর্শকের (মন্ত্রী) সদস্য নির্বাচন করেন। তিনিই প্রথম মুসলমান, যিনি এ ধরনের পদে অধিষ্ঠিত হলেন। মুসলমানদের দেখাশোনা করার জন্য মাক্কান সাঙ এবং পাঙাল সাঙলেন নামীয় আলাদা প্রশাসনিক বিভাগ চালু করেন। প্রত্যেক মহল্লাসংলগ্ন মসজিদ ছিল। ১৮৯১-৯২-এর দিকে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি মুসলিম পঞ্চায়েতও গঠন করা হয়েছিল।
অবশ্য এক দল ভিন্ন মতাবলম্বী ১৬০৬ সালে আসা মুসলমানদের যুদ্ধবন্দি হিসেবে চিত্রিত করার প্রয়াস চালিয়েছে। কিন্তু এক দল যুদ্ধবন্দিকে রাজার বিদুষী প্রদান করা, রাজার পৃষ্ঠপোষকতায় সুন্দরী যুবতী মেয়েদের মুসলমান সৈনিকদের সঙ্গে বিয়ে দেয়া, মণিপুরের সমতল ভূমিতে উর্বর ফসলি ভূমি প্রদান করা, রাজকর্মচারী ও রাজকীয় সৈন্যবাহিনীতে নিয়োগ প্রদান, রাজার পরামর্শক নিয়োগ, অভিবাসিত মুসলমানদের জন্য আলাদা বংশতালিকা প্রণয়ন ইত্যাদি তাদের দাবির অসারতা প্রমাণ করে। মণিপুরে অভিবাসিত হওয়ার পর মণিপুরে সংঘটিত প্রতিটি যুদ্ধে পাঙাল যোদ্ধারা তাদের শৌর্য-বীর্য এবং বীরত্বের অসাধারণ প্রমাণ রেখেছেন। সাত বছরের বার্মিজ দখলদারত্বের সময়ও মুসলিম সেনানায়ক তলেন কাজী ও তার সহযোগীদের অসীম সাহসিকতার কথা আজ ইতিহাসের অবিচ্ছেদ অঙ্গ। বার্মিজ দখলদারত্বের সময় মণিপুরের পাঙাল সম্প্রদায়ের ওপর অমানুষিক নির্যাতন করা হয়েছিল। বহু মণিপুরি মুসলমান সৈনিককে চরম নির্যাতন ও বন্দি করে আভায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেই বন্দি সৈনিকদের বংশধরেরা আজও মিয়ানমারে বসবাস করছে। আজ যে মণিপুরি মুসলমানরা বাংলাদেশ, আসাম ও ত্রিপুরায় বসবাস করছে, তাদের পূর্বপুরুষরাও একদিন বার্মিজদের চরম নির্যাতনের শিকার হয়ে মণিপুর ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিল।
আজ বিশ্বময় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মণিপুরি মুসলমানদের সংখ্যা পাঁচ লক্ষাধিক। এর মধ্যে মণিপুরে তিন লক্ষাধিক, আসামে লক্ষাধিক, মিয়ানমারে প্রায় ৩৫ হাজার, বাংলাদেশে প্রায় ১৫ হাজার, ত্রিপুরায় প্রায় পাঁচ হাজার আর বাদবাকি ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে এবং বিশ্বময় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশের একমাত্র মুসলমান ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এই মণিপুরি মুসলমান। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, ব্রিটিশ ভারতে সংঘটিত ভানুবিল কৃষক প্রজা আন্দোলনসহ এ দেশের প্রতিটি যৌক্তিক আন্দোলনে মণিপুরি মুসলমানরা অংশগ্রহণ করে আসছে। মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত আর প্রান্তিক শ্রেণীর এই মণিপুরি মুসলমানরা তাদের শিক্ষা, পরিবেশ, আর্থিক ও পেশাগত উন্নয়নে সবার পৃষ্ঠপোষকতা কামনা করে।
সূত্র
The Manipuri Muslim, কাজী হামিদ আলী।
Introduction to Manipur, এল ইবুংহাল সিং
A short History of Manipur,
আরকে জলজিৎ সিং। মণিপুরি মুসলিম, এমএ জনাব খান ইফম (মণিপুরি ভাষায়)
টার্কো আফগানগি চদা নাউদা, খৈরুদ্দিন খুল্লাকপম (মণিপুরি ভাষায়)
নোংশামৈ, মণিপুরে সংরক্ষিত প্রাচীন পাণ্ডুলিপি। (মণিপুরি ভাষায়)
সাপ্তাহিক শৈলী, ঈদুল ফিতর সংখ্যা ১৯৮৮, প্রিসিলা রাজ
মীতৈ পাঙাল হৌরকফম, কুল চন্দ্র শর্মা ও বদরুদ্দিন উমর। (মণিপুরি ভাষায়)
পাঙাল থোরাকপা, রাজকুমার শ্রী স্নাহাল সিংহ (মণিপুরি ভাষায়)
সিলেটের মাটি, সিলেটের মানুষ, ফজলুর রহমান
ইটার ইতিহাস, মুজিবুর রহমান
হাজী মো. আব্দুস সামাদ: লেখক ও গবেষক





