ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুর থেকে মণিপুরি মুসলিমদের (পাঙাল) বাংলাদেশে আগমন আজ থেকে প্রায় ২০০ বছর আগে। মণিপুরি মুসলিমদের মাতৃভাষা মণিপুরি ভাষা। মণিপুরি ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে ভারতের মণিপুর, আসাম, ত্রিপুরাসহ অন্যান্য রাজ্যে বসবাসকারী মণিপুরি মুসলিম কবি ও লেখকরা গবেষণা করছেন দীর্ঘকাল ধরে এবং এক্ষেত্রে তাদের অবদানও উল্লেখযোগ্য। মণিপুরি মুসলিম কবি ও লেখকরা তাদের গবেষণা ও সৃজনকর্মের জন্য জাতীয় পদক ও সম্মাননা পেয়েছেন।

কিন্তু বাংলাদেশের পাঙালদের চিত্র ভিন্ন। বাংলাদেশে বসতি স্থাপনের পর নতুন দেশ ও পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে তাদের অনেকটা সময় ব্যয় হয়েছে। শুরুতে টিকে থাকার সংগ্রামই ছিল মুখ্য। ফলে সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মণিপুরি মুসলিম সমাজের অংশগ্রহণ হয়েছে অনেক বিলম্বিত। তার পরও কেউ কেউ ব্যক্তিগত আগ্রহে লেখালেখির সূচনা করেছিলেন। তাদের মধ্যে ইসলামী চিন্তাবিদ ও শিক্ষাবিদ মো. আব্দুস সামাদ, শিক্ষাবিদ মো. আব্দুল খালেক ও মওলানা মোহাম্মদ আব্দুল্লাহর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মো. আব্দুস সামাদের লেখা প্রবন্ধ ও কবিতা ইসলামী ফাউন্ডেশনের ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে। মো. আব্দুল খালেকের Manipuri Muslim (Meitei Pangal) in Bangladesh : Manipuri past and present, vol-4, Delhi-2005 প্রকাশিত হয়েছে। তাছাড়া তার কবিতার পাণ্ডুলিপিও সংরক্ষিত রয়েছে। অধ্যক্ষ মো. নুরুল ইসলামের মণিপুরি ভাষাভাষী মুসলিম সম্প্রদায়: সাম্প্রতিক কিছু ভাবনা ও সমীক্ষা, কমলিকা-১৯৮৬-এ প্রকাশিত হয়েছে।

এ পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রকাশিত গ্রন্থাবলির তালিকা নিম্নরূপ:

হাজী মো. আব্দুস সামাদ—

১) মণিপুরি মুসলমানদের ইতিবৃত্ত (ইতিহাস, ২০১৭)

২) ঘুরে এলাম মণিপুর (ভ্রমণকাহিনী, ২০২২)

সাজ্জাদুল হক স্বপন—

১) মণিপুরি মুসলিম (ইতিহাস, ২০২০)

২) স্নিগ্ধ প্রলেপ (কাব্য, ২০২২)

৩) অনুভবের ছোঁয়া (কাব্য, ২০২২)

রওশন আরা বাঁশি—

১) সমুদ্রের কাছে চিঠি (কাব্য, ২০২০)

২) বেদনায় মলাট বাঁধা (কাব্য, ২০২১)

৩) বিবর্ণ আবির (কাব্য, ২০২২)

উল্লেখ্য, মণিপুরি মুসলিম সমাজের হাজি মো. আব্দুস সামাদ (কাব্য), হুমায়ূন রেজা সোহেল (কাব্য), মোহাম্মদ আলী (কাব্য), ফরিদ আহমেদ (প্রবন্ধ) ও সৈয়দ আহমেদ শিমুলের (প্রবন্ধ) পাণ্ডুলিপি তৈরি হয়েছে যা গ্রন্থাকারে প্রকাশের অপেক্ষায়।

সাম্প্রতিক সময়ে মণিপুরি মুসলিমদের মধ্যে সাহিত্যচর্চার ধারা বেশ বেগবান হয়েছে। বিভিন্ন পত্রপত্রিকা, ম্যাগাজিন ও ফেসবুকে অনেকেই নিয়মিত লিখছেন। বর্তমান সময়ের এমন কয়েকজন লেখক হলেন—

প্রবন্ধ/নিবন্ধ: প্রকৌশলী আব্দুল মজিদ চৌধুরী, আব্দুল মজিদ, হাজি মো. আব্দুস সামাদ, খুরশেদ আলী, সাজ্জাদুল হক স্বপন, মোছাম্মদ বদরুন্নেছা, প্রকৌশলী আব্দুল হেকিম, ফরিদ আহমেদ, তমিজুর রহমান, নুসরাত জাহান রুমু, রাহমাতুন্নেছা রানী, আসমা খানম প্রমুখ।

ছোটগল্প: শামসুন্নাহার মিতা ও আসমা খানম।

ভ্রমণকাহিনী: মো. আব্দুল মজিদ, ডা. এহসান আলমগীর ও রাসেল আহমেদ।

ইসলামী চিন্তা: হাফেজ করিম উদ্দিন, মুফতি খুবাইব জাহাঙ্গীর, মওলানা গোলাম রাব্বানী, হাফেজ যোবায়ের আহমেদ প্রমুখ।

কবিতা: হাজী মো. আব্দুস সামাদ, সাজ্জাদুল হক স্বপন, রওশন আরা বাঁশি, হুমায়ুন রেজা সোহেল, মোহাম্মদ আলী, মোহাম্মদ রফিক, আমিনুল ইসলাম, মো. কামরুজ্জামান, আসমা খানম, তারানা রেজা, ফৌজিয়া আক্তার, রীনা পারভীন, রোশনী বেগম, মঈন উদ্দিন প্রমুখ।

বাংলাদেশে প্রকাশিত লিটল ম্যাগাজিন: অনৌবা খোংথাং, প্রত্যয়, শিখর ও থোং

ভারতের মণিপুরি মুসলিমদের মধ্যে কয়েকজন বিখ্যাত ও জনপ্রিয় কবি ও লেখকদের নাম—

কাব্য: খৈরুদ্দিন চৌধুরী, কায়ামুদ্দিন পুখ্রিময়ুম, আব্দুস সহীদ চৌধুরী, এমএ হাকিম শাহ, তাহের আলী, মুফিদুন নেছা, বদরুন নেছা, আজাদ কোমল, তাহির সাজবম, এমএ হাসিম, প্রকৌশলী আব্দুল হামিদ প্রমুখ।

উপন্যাস: লতিফ শাহ, কায়ামুদ্দিন পুখ্রিময়ুম, কিউএম কুতুবউদ্দিন, এমএ হাকিম শাহ, অজুর খান, আজাদ কোমল, মু. সলিম প্রমুখ।

ছোটগল্প: এমএ হাকিম শাহ, অসকর খান ও কায়ামুদ্দিন পুখ্রিময়ুম, রাহিজ উদ্দিন শেখ প্রমুখ।

ইসলামী সাহিত্য: আব্দুর রহমান, কিউএম কুতুবউদ্দিন, অফাজুদ্দিন (কাদির), এমএ হাকিম শাহ প্রমুখ।

নাটক: রাহিজ উদ্দিন শেখ।

প্রবন্ধ: এম মুমিন, শফি উল্লাহ চৌধুরী, মওলানা আবিমুদ্দিন, কিউএম কুতুবউদ্দিন, কায়ামুদ্দিন পুখ্রিময়ুম, এম এম আহমদ প্রমুখ।

ইতিহাস: এমএ জনাব খান, কাজী হামিদ আলী, কায়ামুদ্দিন পুখ্রিময়ুম, ডা. বদরুদ্দিন, খৈরুদ্দিন খুল্লাকপম, আব্দুর রহমান, খৈরুদ্দিন চৌধুরী প্রমুখ।

লোকসাহিত্য ও শিশুসাহিত্য: আব্দুর রহমান ও কায়ামুদ্দিন পুখ্রিময়ুম।

জার্নাল: থৌদাং, পয়ামে ইসলাম, নুমিৈল, য়াইফ ঈচেল, খোন্থাং, মিংশেল, ফিদম, লিকলম, ইথিল ইত্যাদি।

­মণিপুরি মুসলিমদের সাহিত্যচর্চার এ ধারা অব্যাহত থাকলে মণিপুরি ভাষা ও সাহিত্যের ভাণ্ডার যেমন সমৃদ্ধ হবে, তেমনি তাদের এসব রচনার মাধ্যমে বাংলাদেশী সাহিত্যের বহমান ঐতিহ্যের সমৃদ্ধির ধারায় কিছুটা হলেও নবতর সংযোজন হবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

তথ্যসূত্র

১. নীংশিং চেফোং ইকরা অ্যাওয়ার্ড ১৯৯৫, মু. রফি কোমল

২. সাজ্জাদুল হক স্বপন: মণিপুরি মুসলিম, ২০২০

 

রওশন আরা বাঁশি: কবি ও সংগঠক